জামায়াত অনলাইন লাইব্রেরি
  • নীড়
  • সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
  • বিভাগ ভিত্তিক
    • আল কুরআন
    • আল হাদিস
    • ফিকাহ
    • দাওয়াত ও তাবলিগ
    • ঈমান ও আক্বীদাহ
    • আমল-আখলাক ও মুয়ামালাত
    • ইসলাম ও ইবাদাত
    • পারিবারিক ও সামাজিক জীবন
    • ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন
    • সীরাত ও ইতিহাস
    • সীরাতে সাহাবা
    • নারী
    • রাজনীতি
    • অর্থনীতি
    • বিবিধ
  • কর্মী সিলেবাস
  • রুকন সিলেবাস
    • রুকন সিলেবাস (স্বল্প শিক্ষিত)
    • রুকন সিলেবাস (শিক্ষিত)
  • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (শিক্ষিত)
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (স্বল্প শিক্ষিত)
  • উচ্চতর অধ্যয়ন
  • অডিও বই
  • অন্যান্য
    • দারসুল কুরআন
    • দারসুল হাদিস
    • আলোচনা নোট
    • বইনোট
    • প্রবন্ধ
    • বুলেটিন
    • স্মারক
    • ম্যাগাজিন
    • এপস
    • রিপোর্ট বই
    • ছাত্রী সিলেবাস
কোন ফলাফল নেই
সকল ফলাফল দেখুন
  • নীড়
  • সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
  • বিভাগ ভিত্তিক
    • আল কুরআন
    • আল হাদিস
    • ফিকাহ
    • দাওয়াত ও তাবলিগ
    • ঈমান ও আক্বীদাহ
    • আমল-আখলাক ও মুয়ামালাত
    • ইসলাম ও ইবাদাত
    • পারিবারিক ও সামাজিক জীবন
    • ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন
    • সীরাত ও ইতিহাস
    • সীরাতে সাহাবা
    • নারী
    • রাজনীতি
    • অর্থনীতি
    • বিবিধ
  • কর্মী সিলেবাস
  • রুকন সিলেবাস
    • রুকন সিলেবাস (স্বল্প শিক্ষিত)
    • রুকন সিলেবাস (শিক্ষিত)
  • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (শিক্ষিত)
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (স্বল্প শিক্ষিত)
  • উচ্চতর অধ্যয়ন
  • অডিও বই
  • অন্যান্য
    • দারসুল কুরআন
    • দারসুল হাদিস
    • আলোচনা নোট
    • বইনোট
    • প্রবন্ধ
    • বুলেটিন
    • স্মারক
    • ম্যাগাজিন
    • এপস
    • রিপোর্ট বই
    • ছাত্রী সিলেবাস
জামায়াত অনলাইন লাইব্রেরি

মুসলিম নারীর নিকট ইসলামের দাবি

অন্তর্গতঃ ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন, কর্মী সিলেবাস
Share on FacebookShare on Twitter

মুসলিম নারীর নিকট ইসলামের দাবি

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী


স্ক্যান কপি ডাউনলোড


প্রকাশনায়
আধুনিক প্রকাশনী
২৫, শিরিশদাস লেন, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।
১ম প্রকাশ: অক্টোবর ১৯৮২ সাইয়্যেদ আবুল

بسم اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمُ .

সমগ্র বিশ্বজাহান ও তার মধ্যে বসবাসকারী সকল জীবের স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা। তিনি সবার প্রভু, রিযিকদাতা, প্রতিপালন ও সংরক্ষক। তিনি মানবজাতিকে বুদ্ধি ও বিবেক ভুল-নির্ভুলের উপলব্ধি, ভাল-মন্দের পার্থক্য করার জ্ঞান, চিন্তা করার, বুঝার এবং জীবন পথ বাছাই করার যোগ্যতা দান করেছেন। তিনি মানুষকে সত্যের পথে পরিচালিত করার জন্যে নিজের কিতাব ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। এবং দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর সত্যনিষ্ঠ বান্দাগণের উপর—যাঁরা মানুষকে জীবন যাপনের সহজ সরল পথ প্রদর্শন করেছেন, মানুষকে উন্নত নৈতিকতা এবং দুনিয়ায় মানুষ হিসেবে বাস করার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন।

সূচীপত্র

  1. মুসলিম দুনিয়ার অবস্থা
  2. চেতনাবিহীন মুসলমান
  3. মুসলমান হবার অর্থ
  4. ইসলামের দাবী কি ?
  5. আপনাদের কর্তব্য
  6. বড় কঠিন সময় আসছে
  7. সরকার ও জনমত
  8. ইসলামী রাষ্ট্রে নারীদের অধিকার
  9. পাশ্চাত্য সভ্যতা ও ইসলামী সভ্যতার পার্থক্য
  10. পূর্ণ ইসলাম অথবা পূর্ণ ফিরিংগীপনা

মুসলিম দুনিয়ার অবস্থা

মাতা, ভগ্নী ও কন্যাগণ ! এ দুনিয়ায় আজ কোটি কোটি মুসলমানের বাস। কিন্তু যে দুনিয়াকে আমরা মুসলিম দুনিয়া নামে আখ্যায়িত করি তার অবস্থা বর্তমানে একটি চিড়িয়াখানার ন্যায়। এ চিড়িয়াখানায় বিচিত্র প্রাণীর সমাবেশ, বিচিত্র তাদের বেশ ও বর্ণ। এ বিচিত্র ধরনের প্রাণীদের মধ্যে কেবল একটি মাত্র বিষয়েই সামঞ্জস্য আছে যে, তারা সবাই একই চিড়িয়াখানার অধিবাসী। মুসলিম দুনিয়ার অবস্থাও প্রায় এরই কাছাকাছি। এখানেও বিচিত্র ধরনের মানুষের সমাবেশ ঘটেছে। তাদের মধ্যে এমন লোক ও আছে যারা আল্লাহর অস্তিত্বে সন্দিহান, এমন লোকও আছে যারা ওহি ও রিসালাতের প্রতি সন্দিহান, এমন লোকও আছে যারা পরকাল স্বীকার করে না এবং একথাও স্বীকার করে না যে, মৃত্যুর পর একদিন আল্লাহর আদালতে এ মর্ত্যজীবনের সমস্ত হিসেব- নিকেশ পেশ করতে হবে। তাদের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা ইসলাম প্রদত্ত ভাল-মন্দের মানদন্ড অস্বীকার করে এবং চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় দায়িত্বহীন জীবন যাপনের প্রত্যাশী। তাদের মধ্যে এমন লোকও আছে যাদের দৃষ্টিতে ইসলাম প্রদত্ত জীবন যাপন পদ্ধতি যথার্থ নয় এবং তারা দুনিয়ার অন্যান্য পদ্ধতি থেকে নিজেদের মনের মতো একটিকে পছন্দ করে নিয়েছে। এসব কিছু করার পরও তারা নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবী করে এবং এ দাবীর স্বপক্ষে স্বীকৃতি আদায় করতে ও মুসলিম সমাজে একজন মুসলমানের জন্মগত অধিকার লাভ করতে তৎপর হয় ৷ সত্যিকার ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলমান বলতে যা বুঝায় এ বিরাট সমষ্টির মধ্যে তেমনি যথার্থ মুসলমান খুব কমই পাওয়া যাবে।

চেতনাবিহীন মুসলমান

পরিস্থিতির এ পরিবর্তন কেন? এর কারণ হলো এই যে, আমাদের মুসলিম দুনিয়ায় বেশীর ভাগ বংশানুক্রমিক মুসলমানের বাস। তাদের বাপ-দাদারা মুসলমান ছিল এবং ঘটনাচক্রে তারা মুসলমানদের গৃহে জন্মলাভ করেছে, কেবল এ জন্যেই তারা মুসলমান। একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন আপনি একথা উপলব্ধি করতে পারবেন যে, জন্মের মাধ্যমে মানুষ বংশ লাভ করতে পারে, খান্দানী মর্যাদা লাভ করতে পারে স্বদেশ লাভ করতে পারে কিন্তু কোন ব্যক্তি নিছক জন্মের মাধ্যমে ইসলাম লাভ করতে পারে না। মানুষ জন্মগতভাবে জাঠ, রাজপুত, হিন্দুস্থানী, ইংরেজ ও জার্মান হতে পারে। কিন্তু মাতার জঠর ও পিতার শত্রু হতে মানুষ দ্বীন লাভ করতে পারে না। মানুষ স্বেচ্ছায় ও স্বজ্ঞানে দ্বীনকে পছন্দ ও গ্রহণ করতে পারে। এ ছাড়া দ্বীন লাভ করার দ্বিতীয় কোন পথ নেই। এ কারণে দেখা যায় যে, আমাদের মধ্যে যারা বংশানুক্রমিক মুসলমান এবং নিছক মুসলমান বাপ- দাদার গৃহে জন্মগ্রহণ করার কারণে ইসলামের সাথে সম্পর্কিত, তাদের নামটি মুসলমানের ন্যায় বটে কিন্তু ইসলামের সত্যিকার গুণাবলী তাদের মধ্যে অনুপস্থিত। ইসলাম তাদের জন্যে যে জীবন পদ্ধতি দান করেছে তার কোন চিহ্নই তাদের নিকট নেই। তারা কখনো সে জীবন পদ্ধতিকে জানার চেষ্টা করেনি, নিজেদের জন্যে কোন দিন তাকে পছন্দ করেনি এবং সে অনুযায়ী চলার আকাঙ্ক্ষা কোন দিন পোষণ করেনি। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাষায় ইসলামের মূলগত অর্থ হচ্ছে:

ذَاقَ طَعْمَ الْإِيمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللَّهِ رَبَّا وَمُحَمَّد رَسُولاً
وبِالْإِسلامِ دِينًا
-ঈমানের স্বাদ সেই ব্যক্তি গ্রহণ করেছে, যে আল্লাহকে প্রভু ও প্রতিপালক হিসেবে, মুহাম্মাদ (সা)-কে পথপ্রদর্শক হিসেবে। এবং ইসলামকে নিজের জীবন পদ্ধতি হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে।

এই হাদীসের আলোকে একথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, যে ব্যক্তি জেনে, বুঝে, স্বেচ্ছায় ও সানন্দে ইসলামকে গ্রহণ করেনি সে ইসলাম ও ঈমানের স্বাদও পায়নি।

মুসলমান হবার অর্থ

মুসলমান হবার অর্থ হচ্ছে: মানুষকে পূর্ণ সচেতনতার সাথে এই মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে যে, বিশ্বজাহানে কর্তৃত্ব, প্রতিপালন ও প্রভুত্বের যতগুলো দাবীদার আছে, তাদের মধ্যে একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বন্দেগী করতে হবে। যতগুলো শক্তি মানুষের নিকট তাদের ইচ্ছায় আনুগত্য করার, তাদের নির্দেশ মেনে চলার ও নিজের ব্যক্তিত্বকে তাদের হাতে সোপর্দ করার দাবী করে, তাদের সবার মধ্যে একমাত্র আল্লাহর সত্তার সামনে তাকে আনুগত্যের শির নত করতে হবে এবং একমাত্র তাঁরই ইচ্ছামত চলার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। আবার মুসলমান হবার অর্থ হচ্ছে এই যে, দুনিয়ার বিভিন্ন জীবন পদ্ধতির মধ্যে মানুষকে কেবল ইসলাম প্রদত্ত জীবন পদ্ধতিটিই পছন্দ করতে হবে। অন্য জীবন পদ্ধতিগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া তো দূরের কথা তাদের প্রতি কোন প্রকার আকর্ষণ ও প্রীতির লেশমাত্র তাদের অন্তরে স্থান পেতে পারবে না। তাকে ইসলাম প্রদত্ত পদ্ধতিকে সমগ্র হৃদয় দিয়ে ভালবাসতে ও তার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতে হবে। আবার মুসলমান হবার অর্থ হচ্ছে এই যে, যতগুলো পথপ্রদর্শক দুনিয়ার মানুষের পথপ্রদর্শনের দাবী করেছেন এবং আজো করছেন তাদের সবার মধ্যে একমাত্র মুহাম্মাদ (সা)-কে নির্বাচন করতে হবে এবং একমাত্র তাঁরই প্রদর্শিত পথে অগ্রসর হবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। অনুরূপভাবে যখন কোন ব্যক্তি আল্লাহকে প্রতিপালক হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ (সা)-কে পথপ্রদর্শক হিসেবে মেনে নেয়, একমাত্র তখনই সে মুসলমান হয়। আর যে ব্যক্তি এভাবে ইসলাম গ্রহণ করে সে নিজের ইচ্ছা-বাসনাকে আল্লাহর ইচ্ছা, ইসলামের বিধান ও মুহাম্মাদ (সা)-এর নির্দেশের অনুযায়ী করে। অতপর তার জন্যে ইতস্তত করার কোন পথই থাকে না। তার একথা বলারও অধিকার থাকে না যে, যদিও আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারে অধিকার দান করেছেন, যদিও মুহাম্মাদ (সা) এ ব্যাপারে বিশিষ্ট নির্দেশ দান করেছেন এবং যদিও কুরআন এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে তবুও আমি এর সাথে একমত নই। আমি নিজের মতানুসারে চলবো, অথবা দুনিয়ার প্রচলিত রীতি এর বিরোধী এবং এ প্রচলিত রীতির অনুসৃতিই আমার কর্তব্য। যে ব্যক্তি এহেন ধারণা ও মত পোষণ করে তার সম্পর্কে জেনে রাখা উচিত যে, সে আসলে ঈমান আনেনি। মানুষ যখন সত্যিকারভাবে ঈমান আনে তখন তার ইচ্ছা-বাসনা, চিন্তা, আবেগ, ভাল-মন্দ বিচারবোধ ও মতাদর্শকে পুরোপুরি ইসলামের অধীন করে দেয় এবং দুনিয়ার পরিচিত; জনপ্রিয় ও মনোমুগ্ধকর যাবতীয় অনৈসলামী পদ্ধতি প্রত্যাহার করে। একথাকেই রাসূলুল্লাহ (সা) নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করেছেন:

لا يُؤْمِنُ أحَدُكُمْ حَتَّى يَكُونَ هَوَاهُ تَبْعًا لِمَا جنت به . بـ
-আমি যে হেদায়াত এনেছি যতক্ষণ না তোমাদের ইচ্ছা-বাসনা তার অধীন হয় ততক্ষণ তোমাদের একজনও মুসলমান হতে পারে না।”

এর অর্থ এ দাঁড়ায় যে, যতক্ষণ মানুষের মনের শয়তানী শক্তি আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ না করে এবং অবনত মস্তকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নেতৃত্ব গ্রহণ না করে ততক্ষণ কোন ব্যক্তি মুসলমান হতে পারে না। যতক্ষণ কোন ব্যক্তি দাবী করে যে, জীবনে আমার ইচ্ছার আনুগত্য প্রতিষ্ঠিত হবে ততক্ষণ তার দিলে ঈমান ও ইসলামের স্থান নেই। ঈমান ও ইসলামের আলামত হচ্ছে এই যে, মানুষের মন অনায়াসে ও নির্বিবাদে একথা প্রকাশ করবে যে, আমি দ্বীনের আনুগত্য করতে প্রস্তুত। আবার মানুষের মধ্যে দায়িত্বানুভূতি জাগ্রত থাকাই হচ্ছে ইসলামী জীবনের পরিচয়। মু’মিনের জীবন হচ্ছে একটি দায়িত্বশীল মানুষের জীবন। যার দিলে ঈমান আছে যে কখনো এ অনুভূতিহীন হতে পারে না যে, তাকে জীবনের সমস্ত চিন্তা ও কর্মকান্ডের জন্যে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। দুনিয়ায় সে কি করেছে ? কি বলেছে ও শুনেছে ? কিভাবে জীবন যাপন করেছে ? কোন কাজে নিজের শক্তি ও যোগ্যতাসমূহ ব্যয় করেছে ? কিভাবে অর্থ উপার্জন করেছে এবং কিভাবে তা ব্যয় করেছে ? কোন্ উদ্দেশ্যে দুনিয়ায় প্রচেষ্টা চালিয়েছে ? এসব সম্পর্কে মৃত্যুর পর তাকে হিসেব দিতে হবে। ঈমানদার ব্যক্তির মন হতে কখনো এ অনুভূতির বিলোপ সম্ভব নয়। মু’মিন কখনো ধারণাই করে না যে, সে মরে মাটির সাথে মিশে যাবে এবং সে দুনিয়া থেকে বিদায় নিবে কিন্তু তার কর্মকান্ডের কোন ফলাফল প্রকাশিত হবে না। বরং সে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে যে, তার এ জীবনের পর আর একটি জীবন আছে—সেখানে আল্লাহর সামনে হাযির হয়ে তাকে নিজের প্রতিটি কাজের, প্রতিটি আকাঙ্খা-বাসনার এবং সকল তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ের হিসেব দিতে হবে। এ বিষয়টিকে রাসূলুল্লাহ (সা) নিম্নোক্ত ভাষায় বিবৃত করেছেন:

اَلَا كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولُ عَنْ رَعِيَّتِهِ –
—সাবধান ! তোমাদের প্রত্যেকেই রক্ষক এবং প্রত্যেককে তার রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।

এখানে রক্ষণাবেক্ষণ অর্থ হচ্ছে সন্তান-সন্ততি, চাকর-নফর, পশু বা জীবন যাপনের উপযোগী যে সমস্ত জিনিস মানুষের কর্তৃত্বাধীনে দান করা হয়েছে, যে বস্তুর ওপর মানুষের কর্তৃত্ব খাটে এবং যা তার অধীন এমন প্রতিটি বস্তুর ওপর সে রক্ষক নিযুক্ত হয়েছে, এ পরিপ্রেক্ষিতে দুনিয়ার কোন বস্তুই রক্ষণাবেক্ষণের আওতা মুক্ত নয়। প্রত্যেকে কোন না কোন পরিমন্ডলে রক্ষকের দায়িত্ব লাভ করেছে। নারী গৃহের রক্ষক। স্বামী সন্তান-সন্ততির রক্ষক। অফিসার অধীনদের রক্ষক। শাসক সমগ্র দেশের জনগণের রক্ষক। সারকথা হচ্ছে এই যে, মানুষ মাত্রই অবশ্যি কোন না কোন পর্যায়ের রক্ষক এবং কোন মানুষ পশু বা সম্পদ- সম্পত্তি অবশ্যি তার রক্ষণাবেক্ষণে আছে। মানুষের এ দায়িত্ব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, সাবধান! তোমার অধীনদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তোমার ওপর বর্তায় এবং তাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাকে তুমি কিভাবে ব্যবহার করেছ সে সম্পর্কে তোমাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এ বিশ্বাস মুসলমানের জীবনকে দায়িত্ববোধে পরিপূর্ণ করে। মুসলমান কখনো উচ্ছৃঙ্খল ও দায়িত্বহীন জীবন যাপন করতে পারে না। ইচ্ছা মতো পানাহার করা, ইচ্ছা মতো যে কোন কাজে নিজের শক্তি সময় ব্যয় করা এবং ইচ্ছা মতো যে দিকে দৃষ্টি যায় সে দিকে অগ্রসর হওয়া মুসলমানের কাজ হতে পারে না। মুসলমান কোন বাধনহারা পশুর ন্যায় ইচ্ছা মতো যে কোন ক্ষেতে প্রবেশ করে না, যেখানেই সবুজ ঘাস দেখে সেখানেই মুখ লাগিয়ে দেয় না এবং যে পথে দৃষ্টি যায় সেদিকেই দৌড়িয়ে চলে না। মুসলমানের জীবনের যথার্থ দৃষ্টান্ত রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিম্নোক্ত হাদীসটিতে বর্ণিত হয়েছে:

مَثَلُ الْمُؤْمِنِ وَمَثَلُ الْإِيمَانِ كَمَثَلِ الْفَرَس فِي أُخِيَّتِهِ
يَحُولُ ثُمَّ يَرْجِعُ إلى أخيَّتِه –
–মুসলমান ও ঈমানের দৃষ্টান্ত হচ্ছে যেমন খুঁটায় বাঁধা: ঘোড়া, সে যতই ছুটাছুটি করুক না কেন, তার গলার দড়ি তাকে আটকে রাখে এবং অবশেষে একটি রিশেষ সীমান্তে পৌঁছে আবার খুঁটার দিকে ফিরে আসে।

মুসলমান যখন ঈমান ও আনুগত্যের খুঁটায় নিজেকে আবদ্ধ করেছে তখন দড়ি যত লম্বা হোক না কেন একটি বিশেষ গন্ডির মধ্যেই সে ঘোরাফেরা করতে পারবে। ঐ গন্ডি অতিক্রম করার ক্ষমতা তার নেই। তার সমস্ত শক্তি ও প্রচেষ্টা আল্লাহ ও রাসূল নির্ধারিত গন্ডির মধ্যেই ব্যয় করতে পারে। তার সকল প্রকার আগ্রহ, সকল আনন্দ, সমস্ত তৎপরতা এবং যাবতীয় কর্মকান্ড নির্ধারিত গন্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ঐ সীমার বাইরে যাওয়ার সাহস তার নেই।

ইসলামের দাবী কি ?

এ সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যার পর এখন আমি বিবৃত করবো যে, আমরা মুসলমানরা কি চাই।
সমগ্র বিশ্বের মানব সমাজের জন্যে আমাদের দাওয়াত হচ্ছে: ইসলামকে যথাযথভাবে পর্যালোচনা করার পর তারা তাকে নিজেদের জীবনের,একমাত্র ব্যবস্থা, বিধান ও পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত কিনা এ সম্পর্কে তাদেরকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। আমি আগেই বলেছি যে, ইসলাম জন্মগতভাবে লাভ করা যায় না এবং বংশ ও গোত্রের মধ্যে সে ইসলাম অর্জন করাও সম্ভবপর নয়। এখন আপনাদের সামনে এ প্রশ্নটি উত্থাপন করা একান্ত অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। আপনারা স্বেচ্ছায় ও সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করেছেন কিনা—একথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আপনাদেরকে ব্যক্ত করতে হবে। ইসলাম আপনাদের ওপর যেসব বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে সেগুলো মেনে চলতে আপানারা সম্মত কিনা ? ঈমানের খুঁটায় ও আনুগত্যের দড়িতে আবদ্ধ থাকতে আপনারা সম্মত কিনা ? যদি কেউ ইসলামী জীবন ব্যবস্থাকে পছন্দ না করে এবং ইসলামের নীতি-নির্দেশ ও সীমানার মধ্যে অবস্থান করতে রাযী না হয় তাহলে তাকে পরিত্যাগ করার অধিকার তার আছে পুরোমাত্রায়। কিন্তু পরিত্যাগ করার অর্থ হচ্ছে এই যে, পুরোপুরি ও সুস্পষ্টভাবে ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে, নিজের নাম পরিবর্তন করতে হবে, মুসলিম সমাজ থেকে নিজের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে এবং নিজেকে মুসলমান হিসেবে প্রকাশ করা বন্ধ করতে হবে। অতপর স্বাধীনভাবে যে কোন পথে সে অগ্রসর হতে পারে, নিজের ইচ্ছামত যে কোন নাম লেখাতে পারে, অথবা প্রয়োজনবোধ করলে নিজের সহযোগীদের নিয়ে কোন নতুন সমাজ গঠন করতে পারে। মোটকথা আজকাল আমাদের সমাজে যে প্রতারণা ও ভাঁড়ামির অভিনয় চলছে তার অবসান হওয়া উচিত। একদল লোক ইসলামকে পছন্দ করে না, তার আনুগত্য করতে সম্মত নয়, চিন্তা ও কর্মক্ষেত্রে তাকে পরিহার করে অন্য পদ্ধতি গ্রহণও করেছে, অথচ তবুও নিজেদের মুসলমান বলে পরিচয় দিচ্ছে এবং শুধু পরিচয় দিয়েই ক্ষান্ত নয় বরং ইসলামের নিশান বরদার এবং তার পরিচালক হিসেবেও নিজেদেরকে প্রকাশ করছে। বহুদিন থেকে এ অভিনয় চলছে। এখন আমরা আর একে চলতে দেব না। অনুরূপভাবে ইসলামের যেসব বিষয় নিজের স্বার্থসিদ্ধির সহায়ক সেগুলো গ্রহণ করার এবং যেগুলো স্বার্থের অনুকূলে নয় সেগুলো প্রত্যাখ্যান করার যে মুনাফেকি নীতি আমাদের সমাজে পরিদৃষ্ট হচ্ছে তারও অবসান হওয়া উচিত।

أَفَتُؤْمِنُوْنَ بِبَعْضِ الْكِتُبِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضِ
-তোমরা কি আল্লাহর কিতাবের একাংশের ওপর ঈমান এনেছো এবং অপরাংশ অস্বীকার করছো? (সূরা আল বাকারা: ৮৫)

এ আয়াতটির সাহায্যে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ইয়াহুদীদের তিরস্কার করেছিলেন। কেননা, তারা আল্লাহর কিতাব থেকে তাদের পছন্দ মত অংশগ্রহণ করতো এবং অপছন্দনীয় অংশ প্রত্যাখ্যান করতো। ঈমানের নামে এ আত্মপূজা ও কামনার আনুগত্যের জাল মুদ্রা এখন আর চলতে পারে না, ইসলামের আনুগত্য করার জন্যে মুসলমান হবার পরিবর্তে নিছক নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে মুসলমান হওয়ার এবং ইসলামের নামে নিজের অধিকার দাবী করার ন্যায় প্রতারণা ও জালিয়াতী কোন ভদ্রলোকের জন্য সম্মানজনক নয়। আপনার নিজের জীবন পদ্ধতি হিসেবে ইসলামকে পছন্দ করেন কিনা এ প্রশ্নটি আজ আমরা প্রত্যেক ব্যক্তির সামনে রাখতে চাই এবং তাঁর নিকট থেকে এর দ্ব্যর্থহীন জবাব প্রত্যাশা করি। যদি পছন্দ না করেন তাহলে অনুগ্রহ করে দ্বিধাহীন চিত্তে সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করুন এবং ইসলামী মিল্লাতের সীমানার বাইরে পদার্পণ করুন। আর যদি পছন্দ করেন এবং যথাযথই আপনি মুসলমান থাকতে চান তাহলে সাচ্চা দিলে ইসলামকে গ্রহণ করুন। ইসলামের অংশবিশেষ বা কতিপয় অংশকে গ্রহণ না করে পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে গ্রহণ করে সোজাসুজি আনুগত্যের পথ অবলম্বন করুন। ইসলামকে নিজের জীবন পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করার পর পুনর্বার আযাদীর দাবী করবেন না। মুসলমান হবার পর কোন ব্যক্তির একথা বলার অধিকার থাকে না যে, আমি নিজের বুদ্ধি ও রুচি অনুযায়ী ইচ্ছা মতো যে কোন পথ গ্রহণ করবো। এ স্বাধীনতাটি আপনার জন্মগত অধিকার বলে ইসলাম স্বীকার করে না। একথা কেবল পুরুষদের নিকট নয় বরং মহিলাদের নিকট ও আমরা বলতে চাই। মহিলাদের নিকট আমাদের আবেদন এই যে, আপনাদের স্বাতন্ত্র বজায় রাখুন। আপনাদের ব্যক্তিত্বকে পুরুষদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে হারিয়ে ফেলবেন না। আপনাদের দ্বীনকে পুরুষদের হাতে সপে দেবেন না। নারী পুরুষের লেজুড় নয়। তার একটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব আছে। নারীকেও পুরুষের ন্যায় আল্লাহর সামনে হাযির হতে হবে। নিজের কর্মকান্ডের হিসেব তার নিজেকেই পেশ করতে হবে। কিয়ামতের দিন প্রত্যেক নারী তার নিজের কবর থেকে উঠবে। নিজের কার্যাবলীর হিসেব দেবার সময় সে একথা বলে নিষ্কৃতি পাবে না যে, আমার কার্যাবলীর হিসেব আমার স্বামীর নিকট থেকে গ্রহণ করো। নিজের জীবন যাপন পদ্ধতির জন্যে সে নিজেই দায়ী। পৃথিবীতে কি চিন্তা করে সে নিজের পথে চলেছে, এ সম্পর্কে আল্লাহর সামনে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। কাজেই নারীদের প্রশ্ন আমরা পুরুষদের নয় বরং খোদ নারীদের সামনেই পেশ করছি। তাদেরকে বলছি যে, আপনাদের চলার পথ সম্পর্কে আপনারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন এবং এ ব্যাপারে নিজেদের পুরুষদের সিদ্ধান্তের অধীন বা মুখাপেক্ষী হবেন না। ইসলামকে আপনারা নিজেদের দ্বীন ও জীবন পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করেন কিনা ? ইসলামের বিভিন্ন নীতি তার সীমানা, বিধি-নিষেধ তার আরোপিত দায়িত্বসমূহ তথা তার সমস্ত বিষয় ও দিক বিবেচনা করে আপনারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন যে, আপনারা তাকে গ্রহণ করেন কিনা ? এ সমস্ত বিষয়সহ যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তাহলে আন্তরিকতার সাথে তার আনুগত্য করুন। আংশিক নয় বরং পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে নিজের দ্বীন ও জীবন পদ্ধতিতে পরিণত করুন। অতপর সজ্ঞানে এ নীতি ভংগ করা থেকে বিরত থাকুন। আর যদি গ্রহণ না করেন তাহলে কোন প্রকার জড়তার আশ্রয় না নিয়ে প্রকাশ্যে তাকে পরিহার করা এবং তার নামকে অবৈধভাবে ব্যবহার না করাই হবে ভদ্রতা ও সততার পরিচায়ক। আমরা দীর্ঘকাল থেকে একথাই বলে আসছি। আমাদের বই-পত্র যদি আপনারা কিছু পড়ে থাকেন তাহলে আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে, আমরা সর্বদা নিজেদের সদস্য ও সমর্থক বৃন্দকে একথাই বলে এসেছি যে, আপনাদের মাতা-ভগ্নী, স্ত্রী- কন্যাদের নিকট অবশ্যি ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দিন কিন্তু নিজেদের কর্তৃত্বের জোরে কখনো তাদেরকে নিজেদের পথে টেনে আনবেন না। তাদেরকে চিন্তা করার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দান করুন। ইসলামের দাবী তাদের সামনে উপস্থাপিত করলেই দাওয়াত পৌঁছার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। অতপর এ দাবী স্বীকার করা বা না করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ স্বাধীনতা নারীদের থাকা উচিত।

আপনাদের কর্তব্য

এভাবে বিচার বিবেচনার পর যে সমস্ত মহিলা স্বেচ্ছায় ইসলামকে নিজেদের দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করবেন, তাদের করণীয় সম্পর্কে এবার আমি কিছু আলোচনা করবো।
প্রথম কাজ —প্রথম কাজ হচ্ছে এই যে, আপনাদের জীবনকে ইসলামের ছাঁচে ঢালাই করুন। জাহেলিয়াতের প্রত্যেকটি বস্তুকে নিজেদের মধ্য থেকে খুঁটে খুঁটে বের করে দিন। ইসলাম ও জাহেলিয়াতের বিভিন্ন বিষয়কে পৃথক করার ক্ষমতা নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি করুন। অতপর নিজেদের জীবন ক্ষেত্র পর্যালোচনা করুন এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখুন যে, সেখানে জাহেলিয়াতের কোন প্রভাব অবশিষ্ট আছে কিনা ? এ ধরনের যাবতীয় প্রভাব থেকে নিজেদের জীবন ক্ষেত্রকে মুক্ত করুন এবং নিজেদের চিন্তা, সামাজিকতা, চরিত্র এবং সমগ্র কর্মপদ্ধতিকে ইসলামের অনুগত করুন।

দ্বিতীয় কাজ—দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে এই যে, আপনাদের গৃহের পরিবেশ সংশোধন করুন। এ পরিবেশে পুরাতন জাহেলিয়াতের যেসব রীতির প্রচলন আছে সেগুলোও দূরে নিক্ষেপ করুন এবং ইংরেজ শাসনামলে আধুনিক যুগের জাহেলিয়াতের যেসব প্রভাব আমাদের গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে সেগুলোকেও খতম করুন। বর্তমানে আমাদের গৃহে নতুন ও পুরাতন জাহেলিয়াতের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ ঘটেছে। একদিকে ‘প্রগতিবাদী চিন্তা’ আমাদের মুসলিম নারীদেরকে ফিরিংগীয়ানা চাল-চলনে উদ্বুদ্ধ করেছে আর অন্যদিকে এ প্রগতিবাদী চিন্তার সাথে সাথে পুরাতন যুগের জাহিলী চিন্তা, শিরকী আকীদা-বিশ্বাস ও অনৈসলামী রীতিনীতিও আমাদের সমাজে পুরাদস্তুর চালু আছে। বর্তমানে যেসব মহিলার মনে ঈমানী দায়িত্বানুভূতি জাগ্রত হবে তাদের পুরাতন জাহেলিয়াতের রীতিনীতি, চিন্তা-ধারণাকে নিজেদের গৃহাভ্যন্তর থেকে বাছাই করে করে দূরে নিক্ষেপ করতে হবে এবং এই সংগে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও বিলেতি সভ্যতার অন্ধ-অনুসৃতির ফলে অন্দর মহলে আধুনিক যুগের জাহেলিয়াতের যে প্রদর্শনী শুরু হয়েছে সেগুলোকেও সমূলে উৎখাত করতে হবে।

তৃতীয় কাজ—নিজেদের সন্তানদেরকে ইসলামী পদ্ধতিতে শিক্ষাদান করা হচ্ছে আপনাদের তৃতীয় কাজ। আমাদের নয়া বংশধরদের দুর্ভাগ্য যে, গৃহের অঙ্গনে কুরআনের ধ্বনি কোন দিন তাদের কানে পৌঁছে না এবং কোন দিন তারা নিজেদের গৃহে লোককে সালাত আদায় করতেও দেখে না। এদিক দিয়ে আমরা অবশ্যি সৌভাগ্যের অধিকারী ছিলাম। ছেলেবেলায় আমরা নিজেদের গৃহে কুরআনের আওয়াযও শুনেছি এবং বড়দেরকে সালাত আদায় করতেও দেখেছি। আমাদের চার পাশে দ্বীনের কিছু না কিছু চিহ্ন অবশিষ্ট ছিল। কিন্তু আমাদের বর্তমান বংশধররা এদিক দিয়ে দুর্ভাগ্যের চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। তারা গৃহের এমন পরিবেশে লালিত হচ্ছে যেখানে না কুরআনের আওয়ায কখনো ধ্বনিত হয়, না সালাতের চিত্র কখনো দৃশ্যপটে ফুটে ওঠে। যদি আমাদের গৃহের এ অবস্থা অপরিবর্তিত থাকে এবং আমাদের নতুন বংশধররা এভাবে ভ্রান্ত শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে যখন তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন পরিচালনা করবে তখন হয়তো ইসলামের নাম নিশানাও অবশিষ্ট থাকবে না। আপনারা এখন এ পরিস্থিতির অবসান করুন। গৃহের পরিবেশে প্রতিদিনকার উঠা-বসা, চলা-ফেরায় ও জীবনের বিভিন্ন কর্মে ইসলামকে উপস্থাপিত করার এবং আমাদের শিশু-কিশোরদের সামনে তাকে সচল ও সক্রিয় বস্তু হিসেবে দৃশ্যমান করার চিন্তা করুন। ছেলেরা তাকে দেখবে তার স্বাদ গ্রহণ করবে এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হবে। তাদের কানে কুরআনের আওয়ায বারংবার ধ্বনিত হবে। স্বগৃহে তারা প্রতিদিন পাঁচবার সালাতের দৃশ্য অবলোকন করবে। অতপর স্বাভাবিকভাবে তারা বড়দের অনুকরণ করবে এবং তাদেরকে সালাত আদায় করতে দেখে নিজেরাও সালাত আদায় করবে। তারা তাওহীদের পয়গাম শুনবে, তারা রাজনীতির বিষয়বস্তু অনুধাবন করবে। ইসলামের চিত্র তাদের হৃদয়পটে খোদিত হবে। তাদের অভ্যাস সংশোধিত হবে। তাদের মধ্যে ইসলামী রুচিবোধ সৃষ্টি হবে। নতুন বংশধরদের জন্যে আমাদের এসব কিছুর প্রয়োজন। কাজেই যেসব মহিলা ইসলামকে জেনে বুঝে গ্রহণ করবেন এ প্রয়োজন পূরণ করার জন্যে তাদেরকে নিজেদের ক্রোড় ও গৃহকে মুসলমানে পরিণত করতে হবে। তাহলেই মুসলিম শিশু-সন্তানরা সেখানে লালিত হতে পারবে।

চতুর্থ কাজ—আপনাদের চতুর্থ কাজ হচ্ছে এই যে, আপনারা পরিবারের পুরুষদের ওপর প্রভাব বিস্তার করুন। স্বামী, পুত্র, পিতা ও ভ্রাতাদেরকে ইসলামী জীবন যাপনের জন্যে আহ্বান করুন। জানি না মেয়েরা কি কারণে এ ভুল ধারণা পোষণ করে যে, তারা পুরুষদেরকে প্রভাবিত করতে পারে না। অথচ প্রকৃতপক্ষে মেয়েরা পুরুষদের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা রাখে। মুসলমান মেয়েরা যদি একথা বলতে শুরু করে যে, তারা হযরত মুহাম্মাদ (সা) ও হযরত আবু বকর (রা)-এর চেহারা পছন্দ করে, চার্চিল ও ট্রুম্যানের চেহারা পছন্দ করে না, তাহলে দেখবেন মুসলমান যুবকদের চেহারা দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। মুসলমান মেয়েরা যদি বলতে শুরু করে যে, ‘কালো’ সাহেবদের জীবনধারা তারা পছন্দ করে না বরং সালাত, সওম, পরহেযগারী, সচ্চরিত্রতা, আল্লাহভীতি, ইসলামী আদব-কায়দা ও ইসলামী সভ্যতা সংস্কৃতি প্রকাশ যে জীবনে সুস্পষ্ট এমন ইসলামী জীবনকেই তারা ভালবাসে তাহলে আপনাদের চোখের সামনেই পুরুষদের জীবনে পরিবর্তন দেখা দেবে। মুসলমান স্ত্রীরা যদি স্বামীকে পরিষ্কাভাবে বলে দেয় যে, হারাম পথে উপার্জিত অর্থে সজ্জিত ড্রইং রুম তারা পছন্দ করে না, ঘুষের টাকায় বিলাস বহুল জীবন যাপন করতে তারা প্রস্তুত নয় বরং হালাল পথে উপার্জিত সীমিত অর্থে নুনভাত খেয়ে ভাঙ্গা কুঁড়ে ঘরে বসবাসই তাদের নিকট অধিকতর প্রিয়, তাহলে হারাম উপায়ে অর্থোপার্জনের বিভিন্ন কারণ অংকুরেই বিনষ্ট হবে এবং বহু প্রচলিত অসৎবৃত্তি ও অন্যায়ের মূলোৎপাটিত হবে। অনুরূপভাবে যে সকল বোন ইসলামকে নিজেদের দ্বীন হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন তাঁরা সবাই যদি পরিবেশ ও পরিস্থিতি সংশোধনে আত্মনিয়োগ করেন, তাহলে তারা নিজেদের আত্মীয় পরিজন পরিবারের ব্যক্তিগত ও বাইরের পরিচিত পরিবারসমূহকেও বিভিন্ন ত্রুটি ও অন্যায় থেকে রক্ষা করতে এবং নতুন ও পুরাতন জাহেলিয়াত থেকে পবিত্র করতে পারেন। আপনাদের নিকট মহান কর্তব্যের ডাক এসে গেছে। আপনাদের আত্মীয়-পরিজন ও পরিচিতজনদের সামনে নরম ও মিষ্ট ভাষায় জাহেলিয়াতের বিভিন্ন পদ্ধতির সমালোচনা করুন। ইসলামের নির্দেশাবলী তাদেরকে বুঝান। ইসলামের বিধি-নিষেধ ও হালাল-হারাম সম্পর্কে তাদেরকে অবগত করুন এবং নিজেরাও ইসলামের বিধি-নিষেধ ও হালাল-হারাম মেনে তাদের সামনে নিজেদের যথার্থ আদর্শ পেশ করুন। এভাবে অগ্রসর হলে আমাদের সমাজের সম্পূর্ণ কাঠামোটাই পরিবর্তিত হতে পারে।
একটি কঠিন প্রশ্ন: এখন যদি আপনারা যথার্থই ইসলামকে নিজেদের জন্য পছন্দ করে থাকেন, তাহলে আপনাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেবে। প্রশ্নটি হচ্ছে এই যে, আপনারা জাহেলিয়াতের অনুসৃতি ও ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ব্যাপারে নিজেদের পুরুষদের সাথে সহযোগিতা করবেন কিনা? এর সুষ্ঠু দ্ব্যর্থহীন সমাধান আপনাদেরকে অবশ্যি করতে হবে। যদি আপনারা সত্যিই ইসলামকে পছন্দ করে থাকেন, তাহলে আপনাদেরকে অবশ্যি এ প্রশ্নের নেতিবাচক জবাব দিতে হবে। অন্যের পার্থিব ও বস্তুগত লাভের খাতিরে নিজেদের পরকালীন ক্ষতি বরদাশত করা আপনাদের জন্যে কোনক্রমেই সংগত হবে না। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:

اِنَّ شَرَّ النَّاسِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَبْدُ أَنْهَبَ أُخِرَتَهُ بِدُنْيَا
غَيرِمٍ
-কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি সর্বাধিক দূরবস্থার সম্মুখীন হবে, যে অন্যের পার্থিব লাভের খাতিরে নিজের পরকালকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

কাজেই আপনাদের পুরুষদের পার্থিব লাভের খাতিরে আপনারা নিজেদের পরকালকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে উদ্যত হবেন না। মুসলিম নারী হিসেবে আপনারা স্বামী, পুত্র, পিতা ও ভাইদেরকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিন যে, ইসলামের আনুগত্যের ক্ষেত্রে আমরা আপনাদের সাথে সহযোগিতা করতে পারি কিন্তু যদি আপনারা ইসলামী বিধি-নিষেধসমূহের আনুগত্য পছন্দ না করেন তাহলে আপনাদের পথে আপনারাই চলুন আমরা আপনাদের সহযোগী হতে পারি না। আপনাদের দুনিয়ার জন্যে আমরা নিজেদের আখেরাতকে বিনষ্ট করতে পারি না। অন্যদিকে, যেসব মহিলার স্বামী, পুত্র, পিতা ও ভাই আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করেন তাদের সাথে পরিপূর্ণ সহযোগিতা করা ও বিপদ-আপদে ও দুঃখ-কষ্টে সমভাগী হওয়া তাদের কর্তব্য। বলা বাহুল্য, যে ব্যক্তি ইসলামের সীমার মধ্যে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত করবে সে অর্থ উপার্জনের জন্যে সকল প্রকার সম্পদের দিকে হাত প্রসারিত করতে পারে না। সে হারাম উপায়ে অর্থোপার্জন করে বিলাসিতার সামগ্রী সংগ্রহ করতে পারে না। কাজেই মুসলিম নারীকে হালাল পথে উপার্জিত সামান্য অর্থের ওপরই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। ইসলাম নির্ধারিত পথে জীবন যাপনকারী পিতা, স্বামী ও পুত্রের উপর চাপ দেয়া এবং তাদেরকে নিজের আয়েশ আরাম ও বিলাস-ব্যাসনের সামগ্রী সংগ্রহে বাধ্য করা উচিত নয়। অনুরূপভাবে আল্লাহর দ্বীনের আনুগত্য করতে ও তাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে প্রচেষ্টা চালাবার ব্যাপারে পুরুষদেরকে নানান দুঃখ- কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়, তাই এ ক্ষেত্রে নিজেদেরকে সত্যপথাশ্রয়ী পুরুষদের সত্যিকার সহযোগী ও সহধর্মিনী প্রমাণ করাই মুসলিম নারীদের কর্তব্য।

বড় কঠিন সময় আসছে

বর্তমানে আমাদের সামনে আছে একটি বিরাট কাজের পরিকল্পনা। আমাদেরকে এদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এ কাজ বিপুল প্রচেষ্টা ও সাধনা সাপেক্ষ। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্টের পূর্ব পর্যন্ত এদেশের অধিবাসীরা স্বাধীন ছিল না। কিন্তু ১৫ই আগষ্টের পর আমাদের দেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। বর্তমানে এ দেশের লোকেরা নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে। তারা নিজেদের জন্যে কোন ধরনের জীবন ব্যবস্থা, কোন্ ধরনের চরিত্রনীতি ও কোন ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা পছন্দ করবে এ ব্যাপারে তাদেরকে এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। আপনারা দেখতে পাবেন এ প্রশ্নে এখানে অনতিবিলম্বে একটি ভীষণ দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যাবে। একদিকে আছে তথাকথিত ইসলামের দাবীদাররা। তারা বাপ-দাদাদের নিকট থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে নিছক ইসলামের নামটি অর্জন করেছে কিন্তু জীবন ব্যবস্থা হিসেবে তাকে কোনদিন গ্রহণ করেনি এবং গ্রহণ করতে প্রস্তুতও নয়। ইসলামের নামে যেসব অধিকার লাভ করা যেতে পারে সেগুলো তারা অবশ্যি হাসিল করতে চায়, কিন্তু ইসলাম যেসব বিধি-নিষেধ আরোপ করে সেগুলো থেকে তারা নিজেরা মুক্ত থাকতে এবং ইসলামকে ও মুক্ত রাখতে চায়। তারা মুসলমানদের ওপর কুফরী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম রাখতে ও কুফরী আইন-কানুন জারী রাখতে চায়। অন্যদিকে তাদের মুকাবিলায় আছে বিপুল সংখ্যক জনসমষ্টি। তারা ইসলামকে নিজেদের জীবনব্যবস্থা হিসেবে পছন্দ করে। তারা চায়, এদেশে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক এবং ইসলামী আইন-কানুন জারী হোক। এ দু’টি দলের মধ্যে শীঘ্রই একটি দ্বন্দ্ব দেখা দেবে। পুরুষদেরকে যেমনি ইসলাম রূপী কুফরের সাথে সহযোগিতা অথবা সত্যিকার ইসলামকে সমর্থন করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে, তেমনি মুসলিম নারীদেরকেও এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে যে, তারা তাদের ওজন কোন তুলাদন্ডে স্থাপন করবেন। এ দ্বন্দ্বের সময় পরিস্থিতির যে কত প্রকার রূপ পরিবর্তন হবে তা বলা যায় না। আমার মাতা ও ভগ্নীদের নিকট আবেদন এই যে, আপনারা চিন্তা ও বিচার — বিশ্লেষণ করে নিজেদের ভবিষ্যত কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ করুন। যদি আপনারা সর্বান্তকরণে ইসলামকে চান তাহলে এ দ্বন্দ্বে নিজেদের সম্পূর্ণ ওজন প্রকৃত ইসলামের তুলাদন্ডে স্থাপন করতে হবে।

সরকার ও জনমত

বর্তমান গণতন্ত্রের যুগে জনগনের মতামতের ওপর সরকারের নীতি নির্ভরশীল। সরকারের ক্ষমতা হচ্ছে জনগন প্রদত্ত। কাজেই আমাদের জনগণ সত্যিকার মুসলমান না হওয়া পর্যন্ত সরকার মুসলমান হতে পারে না। দেশের জনগণ যদি ইসলামের কালেমা পাঠ না করে, আল্লাহকে নিজেদের মালিক ও শাসক বলে স্বীকার না করে এবং ইসলামকে নিজেদের জীবন পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ না করে, তাহলে প্রকার ইসলামের কালেমা পাঠ করবে না এবং আল্লাহকে মালিক ও শাসক হিসেবে মেনে নিয়ে তাঁর দ্বীনের আনুগত্য করবে এটা কোন কালেই সম্ভব নয়। এদেশের জনগণ নিজেদেরকে মুসলমান বলে গর্ব অনুভব করে। তাই আমরা চাই তারা জেনে বুঝে ইসলামের কালেমা পাঠ করে ইসলামী জীবনব্যবস্থাকে স্বেচ্ছায় ও সানন্দে নিজেদের জীবনের জন্যে নির্বাচন করবেন। যখন তারা এভাবে কালেমা পাঠ করে ইসলামকে গ্রহণ করবে তখন তাদের মতামতের ভিত্তিতে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে তা হবে কালেমাকে প্রতিষ্ঠাকারী, আল্লাহর সামনে নতি স্বীকারকারী ও তাঁর আইন-কানুন প্রবর্তনকারী সরকার।

ইসলামী রাষ্ট্রে নারীদের অধিকার

এ প্রসঙ্গে আমি বিশেষ করে কয়েকটি কথা বলতে চাই। ইসলামী রাষ্ট্র সম্পর্কে সাধারণভাবে এ বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে যে, যদি কোন প্রকারে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তাহলে একটি ভয়াল অন্ধকার যুগ সমগ্র দেশকে গ্রাস করে নেবে এবং জাতির সমগ্র উন্নয়নমূলক কার্যাবলী অকস্মাৎ স্তব্ধ হয়ে যাবে। বিশেষ করে বলা হয় যে, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় নারীর মর্যাদা হ্রাস প্রাপ্ত হবে। অথচ প্রকৃতপক্ষে যদি এখানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তা পুরুষদের ন্যায় নারীদের জন্যেও রহমাত ও বরকত প্রমাণিত হবে। ইসলামী রাষ্ট্রে আপনাদের মর্যাদা কি হবে তা আমি সংক্ষেপে বিবৃত করছি।

এক: ইসলাম আধুনিক গণতন্ত্রের আবির্ভাবের বহু বছর পূর্বে নারীর ভোটাধিকার স্বীকার করে নিয়েছে। যে যুগে নারীর স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব অস্বীকার করা হতো এবং বলা হতো যে, নারী শয়তানের এজেন্ট ছাড়া আর কিছুই নয়, এমন অন্ধকার যুগেও ইসলাম সর্বপ্রথম নারীর ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সামগ্রিক বিষয়াবলীতে তাকে মতামত প্রকাশের অধিকার দান করেছে। ইসলামী রাষ্ট্রে প্রত্যেকটি প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলা প্রত্যেকটি প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের ন্যায়ই ভোটাধিকার লাভ করবে।

দুই: ইসলাম নারীদেরকে উত্তরাধীকার এবং অর্থ ও সম্পত্তির পূর্ণ মালিকানা দান করে। তারা নিজেদের সম্পদ যে কোন শিল্প-বাণিজ্যে খাটাতে পারে এবং তা থেকে অর্জিত মুনাফার ওপর নিজেদের একচ্ছত্র মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। বরং তাদের অতিরিক্ত সময়কে তারা নিজেদের পক্ষ থেকে যে কোন ব্যবসায়ে বা শ্রমে নিয়োগ করার অধিকার রাখে এবং তা থেকে তারা যদি কিছু উপার্জন করে তার উপর তাদের নিজেদের পূর্ণ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। তাদের স্বামী ও পিতাগণ তাদের সম্পদের ওপর কোন প্রকার অধিকার রাখে না।

তিন: ইংরেজদের শাসনামলে এ দেশে যে বিকৃত দাম্পত্য আইন প্রবর্তিত হয়েছে এবং যার ফলে বহু মুসলিম মহিলার পার্থিব জীবন জাহান্নামে পরিণত হয়েছে, ইসলামী রাষ্ট্রে তাকে পরিবর্তিত করে নারীদের পূর্ণ অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণকারী ইসলামের প্রকৃত দাম্পত্য আইন জারী করা হবে। সাম্প্রতিক কালে পশ্চিম পাঞ্জাব পরিষদে যে তথাকথিত শরীয়াত বিলটি গৃহীত হয়েছে, তা পূর্ণত শরীয়াতের আইনের ভিত্তিতে রচিত নয় এবং এটি শরীয়াতের আইনের একটি বিকৃত রূপ। আমার লিখিত ‘স্বামী-স্ত্রীর অধিকার’ পুস্তকটি যদি আপনারা পড়ে থাকেন, তাহলে আপনারা অবশ্যই জানতে পেরেছেন যে, নারী-পুরুষ উভয়ের যাবতীয় অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণ ইসলামের আইন ছাড়া অন্য কারো আইনের দ্বারা সম্ভব নয়। ইসলামী রাষ্ট্রে এমন দাম্পত্য আইন জারী হবে যা আপনাদের সকল প্রকার অভিযোগ দূর করতে সক্ষম হবে।

চার: বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীরা প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে, ইসলামী রাষ্ট্রে নারীদেরকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখা হবে। বরং বিপরীত পক্ষে তাদের জন্যে সর্বোচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। তবে এ ব্যবস্থা আধুনিককালের গার্লস স্কুল ও গার্লস কলেজসমূহের পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে না এবং সহশিক্ষার নীতিতে পরিচালিত হওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না। বরং সেখানে ইসলামী বিধি-নিষেধ অনুগত ব্যবস্থা প্রবর্তিত হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতি বিভাগে উন্নতমানের নারী শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হবে। আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, ইসলামী বিধি-নিষেধ অব্যাহত রাখা যদি অপরিহার্য হয়ে থাকে, তাহলে কেমন করে গার্লস মেডিকেল কলেজ চালানো সম্ভবপর হবে ? আমার জবাব হচ্ছে এই যে, যদি সরকার ইসলামের কালেমা পাঠ করে এবং ইসলাম প্রবর্তিত নীতি অনুসারে কাজ করার সিদ্ধান্ত করে, তাহলে ইসলামী পদ্ধতিতে মহিলা মেডিকেল কলেজ পরিচালনার মতো উপকরণ সৃষ্টি করা মোটেই কঠিন হবে না। আমাদের দেশে যেসব অভিজ্ঞ ও পারদর্শী মুসলমান লেডী ডাক্তার আছেন তাদেরকে আমরা মহিলাদের ডাক্তারী শিক্ষার জন্যে নিযুক্ত করতে পারি, অথবা মনে করুন যদি তেমন মহিলা ডাক্তার না পাওয়া যায়, তাহলে আমরা অন্য ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারি অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য চরিত্র ও কর্মজীবনের অধিকারী জাতির বয়োবৃদ্ধ ডাক্তারদের ওপর এ দায়িত্ব অর্পণ করতে পারি। তাঁরা কয়েক বছরের মধ্যে প্রয়োজন সংখ্যক লেডী ডাক্তার তৈরী করবেন। তারপর আমরা পুরুষ ডাক্তারের দ্বারা মহিলাদের শিক্ষাদানের মুখাপেক্ষী থাকবো না। এভাবে প্রতিটি বিভাগে সর্বোচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে এবং এর জন্যে ইসলাম প্রবর্তিত বিধি-নিষেধ লঙ্ঘন করারও প্রয়োজন হবে না।

পাঁচ: আমরা মুসলিম মহিলাদেরকে প্রয়োজনীয় সামরিক শিক্ষাদানেরও ব্যবস্থা করবো। এবং এ ব্যাপারেও ইনশাআল্লাহ ইসলাম প্রবর্তিত বিধি-নিষেধ লঙ্ঘন করার প্রয়োজন হবে না। আমরা বন্ধুদেরকে বহুবার বলেছি যে, বর্তমানে জাতীয়তার যুদ্ধ সীমা ছাড়িয়ে গেছে এবং মানুষ পশুর নিকৃষ্টতম রূপ পরিগ্রহ করছে। আমরা এমন সব যালেম শক্তির মুখোমুখি হয়েছি যারা মানবতার মুখে পদাঘাত করতে একটুও ইতস্তত করে না। আল্লাহ না করুন আগামীতে যদি কোন যুদ্ধের মধ্যে আমরা নিক্ষিপ্ত হই, তাহলে আমাদেরকে যে চরম বর্বরতার সম্মুখীন হতে হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাই আমাদের নারী সমাজকেও প্রতিরক্ষার জন্যে প্রস্তুত রাখা উচিত। প্রত্যেকটি মুসলিম মহিলা যেন নিজের ধন, প্রাণ ও ইয্যত-আব্রু রক্ষা করতে সক্ষম হয়। এভাবে তাদেরকে তৈরী করতে হবে। তাদের যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার পদ্ধতি শিক্ষা করা উচিত। সন্তরণ, ঘোড় সওয়ারী, সাইকেল, মোটর সাইকেল চালানো এবং ফাষ্ট এইড সম্পর্কে ট্রেনিং গ্রহণ করা উচিত। অতপর কেবল নিজেদের ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষা সম্পর্কে ট্রেনিং নিয়ে ক্ষান্ত হলে চলবে না বরং প্রয়োজন হলে যুদ্ধে পুরুষদেরকে সাহায্য করার মতো ট্রেনিংও গ্রহণ করা উচিত। ইসলামের সীমানার মধ্যে অবস্থান করে আমরা এসব কিছু করতে চাই। ইসলাম প্রবর্তিত বিধি-নিষেধ লংঘন আমাদের কাম্য ও উদ্দেশ্য নয়। পুরাতন যুগেও মুসলমান নারীরা যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার ও প্রতিরক্ষার ট্রেনিং গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তারা যুদ্ধের পূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করেছিল নিজেদের স্বামী, পিতা, পুত্র ও ভাইদের নিকট। অতপর নারীরা নারীদেরকে ট্রেনিং দিয়েছিল। বর্তমানেও অতি সহজে এ পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। সামরিক লোকদেরকে তাদের ‘মহাররম’ মহিলাদের সামরিক ট্রেনিংয়ের কাজে নিযুক্ত করা যেতে পারে। অতপর যথেষ্ট সংখ্যক মহিলার ট্রেনিং গ্রহণের পর তাদেরকে অন্যান্য মহিলাদের ট্রেনিং দানের জন্যে নিযুক্ত করা যেতে পারে।

পাশ্চাত্য সভ্যতা ও ইসলামী সভ্যতার পার্থক্য

দৃষ্টান্ত স্বরূপ এ ক’টি কথা আমি এখানে বললাম। এ থেকে আপনারা ধারণা করতে পারেন যে, ইসলামী রাষ্ট্রে নারীদেরকে নিছক খেলার পুতুল বানিয়ে রাখা হবে না, যেমন দুর্ভাগ্যক্রমে অনেক নাদান লোক ধারণা করে থাকে। বরং তাদেরকে সম্ভাব্য সকল প্রকার উন্নতি লাভে সাহায্য করা হবে। মোটকথা অবশ্যি জেনে রাখবেন যে, আমরা নারীদেরকে নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রেখেই পূর্ণ মর্যাদা দান করতে চাই, তাদেরকে পুরুষে পরিণত করতে চাই না। আমাদের সভ্যতা ও পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে পার্থক্য এখানেই। পাশ্চাত্য সভ্যতা নারীকে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন মর্যাদার আসনে সমাসীন করে না এবং তাকে কোন প্রকার অধিকার দান করতে প্রস্তুত হয় না যতক্ষণ না সে কৃত্রিম পুরুষে পরিণত হয়ে পুরুষের দায়িত্ব পালন করতে প্রস্তুত হয়। কিন্তু আমাদের সভ্যতা নারীকে নারীরূপে প্রতিষ্ঠিত রেখেই সকল প্রকার মর্যাদা ও অধিকার দান করে এবং তামাদ্দুনের যেসব দায়িত্ব সম্পাদনের জন্যে প্রকৃতি তাকে গঠন করেছে কেবল সেসব বোঝাই তার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। এ ব্যাপারে আমাদের সভ্যতাকে আমরা পশ্চাত্য সভ্যতার তুলনায় অনেক গুণ বেশী উন্নত ও শ্রেষ্ঠ মনে করি। অত্যন্ত শক্তিশালী যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের সভ্যতার নীতিসমূহ নির্ভুল ও যক্তিসংগত। তাই নির্ভুল ও পবিত্র বস্তুর পরিবর্তে ভ্রান্ত ও দুর্গগন্ধযুক্ত বস্তু গ্রহণ করার কোন কারণই আমরা দেখতে পাই না। আধুনিককালের মিশ্রিত সমাজের সাথে আমাদের বিরোধের মূলে কোন প্রকার বিদ্বেষ বা অন্ধ বিরোধিতা নেই। আমরা গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছি যে, এই ধ্বংসকর সমাজ পদ্ধতিকে পরিহার করার মধ্যেই আমাদের নিজেদের, আপনাদের ও সমগ্র মানবতার সভ্যতা এবং সংস্কৃতির উন্নতি ও কল্যাণ নিহিত। কেবল যুক্তির সাহায্যে আমরা এর ভ্রান্তির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করিনি বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এ সভ্যতার যে ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে এবং দুনিয়ার অন্যান্য জাতির চরিত্র ও তামাদ্দুনের ওপর এর যে প্রভাব পড়েছে তা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। তাই পাশ্চাত্য সভ্যতার রঙে রঞ্জিত আমাদের উচ্চ শ্রেণী জাতিকে ধ্বংসের যে আবর্তে নিক্ষেপ করতে চায় সেদিকে আমরা তাকে অগ্রসর দেখতে চাই না। এ শ্রেণীটি নিজেদের চরিত্র বিনষ্ট করেছে এবং এখন সমগ্র জাতির চরিত্র ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। এর বিপরীত পক্ষে আমরা চেষ্টা করছি আমাদের দেশ ও জাতিকে ইসলামী নৈতিকতার গন্ডীর মধ্যে রেখে উন্নতির পথে অগ্রসর করতে। কিন্তু আমাদের ভাইদের সাথে সাথে আমাদের বোনদের সমগ্র শক্তিও যখন আমাদের সহযোগী হবে তখনই আমরা এ প্রচেষ্টায় সাফল্য অর্জন করতে পারবো।

পূর্ণ ইসলাম অথবা পূর্ণ ফিরিংগীপনা

এখন আপনাদেরকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে যে, আপনারা ফিরিংগীপনা অথবা ইসলাম এ দু’টির মধ্যে কোনটিকে গ্রহণ করবেন ? এ দু’টির মধ্যে অবশ্যি একটির নির্বাচন করতে হবে। দু’টিকে মিশ্রিত করার কোন অধিকার আমাদের নেই। যদি ইসলামকে পছন্দ করেন তাহলে পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে গ্রহণ করতে হবে এবং তাকে নিজেদের সমগ্র জীবন পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দান করতে হবে। কেননা (আরবি) অর্থাৎ তোমরা পুরোপুরি ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করো এবং নিজেদের জীবনের সামান্যতম অংশও ইসলামের আনুগত্যের বাইরে রেখো না। যদি এ পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য আপনাদের নিকট গ্রহণীয় না হয় এবং ফিরিংগীপনা তথা পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রতি আপনারা কিছুটা আকৃষ্ট থাকেন তাহলে এখন মুখে ইসলামের দাবী না করে আপনাদের খেয়াল খুশী মতো যে পথে অগ্রসর হবেন সে পথের নাম উচ্চারণ করাই সংগত হবে। অর্ধেক ইসলাম ও অর্ধেক কুফর দুনিয়াতে কোন কাজে আসে না এবং আখেরাতেও এর দ্বারা কোন উপকার লাভের সম্ভাবনা নেই। উপরন্তু এ মিশ্রিত বস্তুটির ওপর ইসলামের লেবেল এঁটে দেয়াও একটি মিথ্যাচার।

© Bangladesh Jamaat-e-Islami

  • আমাদের সম্পর্কে
  • প্রাইভেসি পলিসি
  • যোগাযোগ
কোন ফলাফল নেই
সকল ফলাফল দেখুন
  • নীড়
  • সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
  • বিভাগ ভিত্তিক
    • আল কুরআন
    • আল হাদিস
    • ফিকাহ
    • দাওয়াত ও তাবলিগ
    • ঈমান ও আক্বীদাহ
    • আমল-আখলাক ও মুয়ামালাত
    • ইসলাম ও ইবাদাত
    • পারিবারিক ও সামাজিক জীবন
    • ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন
    • সীরাত ও ইতিহাস
    • সীরাতে সাহাবা
    • নারী
    • রাজনীতি
    • অর্থনীতি
    • বিবিধ
  • কর্মী সিলেবাস
  • রুকন সিলেবাস
    • রুকন সিলেবাস (স্বল্প শিক্ষিত)
    • রুকন সিলেবাস (শিক্ষিত)
  • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (শিক্ষিত)
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (স্বল্প শিক্ষিত)
  • উচ্চতর অধ্যয়ন
  • অডিও বই
  • অন্যান্য
    • দারসুল কুরআন
    • দারসুল হাদিস
    • আলোচনা নোট
    • বইনোট
    • প্রবন্ধ
    • বুলেটিন
    • স্মারক
    • ম্যাগাজিন
    • এপস
    • রিপোর্ট বই
    • ছাত্রী সিলেবাস

@BJI Dhaka City South