ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব
সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী (র)
১
মুসলমানদের মানসিক গোলামি ও তার কারণ
রাষ্ট্রশাসন, বাদশাহী এবং বিজয় ও আধিপত্য দু’প্রকারঃ প্রথমটি মানসিক ও নৈতিক আধিপত্য, আর দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক ও বস্তুগত। প্রথম শ্রেণীর আধিপত্য হলো, কোনো জাতি যখন চিন্তা, গবেষণা, আবিষ্কার ও মানসিক শক্তিতে বিপুলভাবে উন্নতি লাভ করে, তখন অন্যান্য জাতি স্বভাবতই তার চিন্তাদর্শের প্রতি ঈমান পোষণ করে। তার ধ্যান-ধারণা, ধর্মবিশ্বাস ও মতাদর্শ তাদের মন-মস্তিস্ককে আচ্ছন্ন করে ফেলে; তারই ছাঁচে তাদের মানসিকতা গড়ে উঠে। তার সভ্যতাই তাদের আপন সভ্যতায় পরিণত হয়। তার জ্ঞান-বিজ্ঞানকেই তারা নিজস্ব জ্ঞান-বিজ্ঞান বলে গ্রহণ করে নেয়। এমনকি, তার ভালোমন্দ ও সত্যাসত্যই তাদের কাছে ভালোমন্দ ও সত্যাসত্যের মানদণ্ড বলে বিবেচিত হয়। দ্বিতীয় প্রকার আধিপত্য হলো, কোনো জাতি যখন বস্তুগত সমৃদ্ধির দিক থেকে অতীব শক্তিশালী হয়, তখন তার মোকাবিলায় অন্যন্য জাতি নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে অক্ষম হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় সামগ্রিকভাবে কিংবা আংশিকভাবে অন্যান্য জাতির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর জেঁকে বসে।
পক্ষান্তরে গোলামি বা পরাধীনতাও দু’প্রকারঃ প্রথমটি মানসিক আর দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক। উপরে আধিপত্য প্রসঙ্গে দু’টো শ্রেণীর যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, গোলামির এ দু’টো শ্রেণী ঠিক তার বিপরীত।
এক হিসেবে আধিপত্যের এই দু’টো শ্রেণী সম্পূর্ণ আলাদা। কোথাও মানসিক প্রাধান্য বিস্তৃত হলে রাজনৈতিক আধিপত্যও প্রতিষ্ঠিত হবে, এমনটি অনিবার্য নয়। কিংবা রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে মানসিক প্রাধান্যও কায়েম হয়ে যাবে, এরও কোনো বাঁধা-ধরা নিয়ম নেই। তবে প্রকৃতির নিয়ম এই যে, কোনো জাতি চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা এবং জ্ঞান সাধনা ও তথ্যানুসন্ধানের পথে অগ্রসর হলে, মানসিক উন্নতির সাথে সাথে বৈষয়িক অগ্রগতিও সে অর্জন করে। পক্ষান্তরে কোনো জাতি চিন্তা ও জ্ঞান-গবেষণার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লে মানসিক অবনতির সাথে সাথে তার বৈষয়িক অধঃপতনও শুরু হয়ে যায়। পরন্তু আধিপত্য, শক্তিমত্তা আর পরাধীনতা দুর্বলতার পরিণতি বিধায় মানসিক ও বৈষয়িক দিক থেকে দুর্বল ও নির্বীর্য জাতিগুলো তাদের দুর্বলতা ও নির্বীর্যতার পথে যতো এগিয়ে চলে, সেই অনুপাতেই তারা গোলামি ও পরাধীনতার শিকার হতে থাকে; আর এই উভয় দিক থেকে শক্তিমান জাতিগুলো তাদের মন-মগজ ও দেহ-সত্তার ওপর কর্তৃত্বশীল হয়ে বসে।
আজকের দিনে মুসলমান এই দ্বিবিধ গোলামিরই শিকার। কোথাও উভয়বিধ গোলামি পুরোপরি বর্তমান, আবার কোথাও রাজনৈতিক গোলামি কিছুটা কম হলেও মানসিক গোলামি সমধিক। দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমানে কোনো মুসলিম জনপদই সত্যিকারভাবে রাজনৈতিক ও মানসিক দিক দিয়ে পুরোপুরি স্বাধীন নয়। কোথাও তারা রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ভোগ করলেও নৈতিক ও মানসিক গোলামি থেকে আদৌ মুক্ত নয়। তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, হাট-বাজার, সভা-সমিতি, ঘরবাড়ি, এমনকি তাদের আপন দেহ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিচ্ছে, পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতি, চিন্তাধারা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান তাদের ওপর পুরোমাত্রায় কর্তৃত্বশীল। তারা পাশ্চাত্যের মগজ দিয়ে চিন্তা করে, পাশ্চাত্যের চোখ দিয়ে দেখে, পাশ্চাত্যের নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে চলে। তারা উপলব্ধি করুক আর নাই করুক তাদের মগজের ওপর এই ধারনাই চেপে রয়েছে যে, পাশ্চাত্য যাকে সত্য মনে করে, তা-ই সত্য, আর সে যাকে মিথ্যা ঘোষণা করছে, তা-ই মিথ্যা। তাদের মতে সত্যতা, যথার্থতা, সভ্যতা, নৈতিকতা, ভদ্রতা, শালীনতা ইত্যাদি ব্যাপারে পাশ্চাত্যের নির্ধারিত মানদণ্ডই হচ্ছে একমাত্র নির্ভুল মানদণ্ড। এমনকি, নিজেদের দীন ও ঈমান, চিন্তাধারা ও ধ্যান-ধারণা, সভ্যতা ও শালীনতা, চরিত্র ও রীতিনীতি, সব কিছুই তারা ঐ মানদণ্ডে যাচাই করে। যে জিনিস এই মানদণ্ডে পুরোপুরি উত্তীর্ণ, তাকেই তারা যথার্থ বলে মনে করে; তার সম্পর্কে তারা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হয়ে যায় এবং জিনিসটি পাশ্চাত্য মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়েছে বলে গর্ববোধ করে। আর যা কিছু এই মানদণ্ডের বিচারে উত্তীর্ণ নয়, তাকে তারা সচেতনভাবে হোক কি অচেতনভাবে ভ্রান্ত বলে মনে করে। কেউ তাকে প্রকাশ্যে বর্জন করে, কেউ মনে মনে বিরক্তি বোধ করে এবং কোনো রকম টেনে হিচড়ে তাকে পাশ্চাত্য মানদণ্ডে উতরিয়ে নেবার চেষ্টা করে।[গ্রন্থকার এ মন্তব্য করেছেন আজ থেকে ৪১ বছর আগে। এ দীর্ঘ সময়ে মুসলিম জাহানের রাজনৈতিক গোলামি কিছুটা শিথিল হয়েছে বটে, কিন্তু তাদের মানসিক গোলামি হ্রাস পায়নি এতোটুকুও।– সম্পাদক]আমাদের স্বাধীন জাতিগুলোর অবস্থাই যখন এই, তখন পাশ্চাত্য জাতিগুলোর অধীনস্থ মুসলমানদের মানসিক গোলামির কথা আলোচনা করে আর কি লাভ?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই গোলামির কারণ কি? এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে হলে একটি আলাদা গ্রন্থই রচনার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তবে সংক্ষেপে বললে তা নিন্মরূপ দাঁড়ায়ঃ
মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাধান্যের ভিত্তি স্থাপিত হয় চিন্তা-গবেষণা ও জ্ঞান সাধনার ওপর। যে জাতি এ পথে অগ্রগামী, সে-ই দুনিয়ার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের আসন অলঙ্কৃত করে; তার চিন্তাধারাই গোটা দুনিয়াকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। পক্ষান্তরে যে জাতি এক্ষেত্রে পেছনে পড়ে থাকে, তাকে স্বভাবতই অন্যের অনুবর্তী ও অনুসারী হয়ে থাকতে হয়। তার চিন্তাধারা ও মতাদর্শে লোকদের মস্তিষ্কেরওপর আধিপত্য বিস্তার করার মতো কোনো শক্তিই বাকী থাকেনা। জ্ঞানসাধক ও সত্যানুসন্ধিৎসু জাতির শক্তিশালী চিন্তা ও মতবিশ্বাসের বন্যা-প্রবাহ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবার মতো শক্তি-সামর্থ্য পর্যন্ত তার মধ্যে বর্তমান থাকেনা। মুসলমানরা যতোদিন সত্যানুসন্ধিৎসা ও জ্ঞান সাধনার পথে অগ্রসর ছিল, ততোদিন দুনিয়ার সকল জাতি তাদের অনুসরণ ও অনুবর্তন করে চলছে। ইসলামী চিন্তাধারা সমগ্র মানব জাতির চিন্তা-দর্শনকে আচ্ছন্ন করেছিল। ভালো-মন্দ, সুকৃতি-দুষ্কৃতি, ভ্রান্তি-অভ্রান্তি সম্পর্কে ইসলামের নির্ধারিত মানদণ্ড-সজ্ঞানে হোক আর অজ্ঞানে- সমগ্র দুনিয়ার কাছে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিল। আর দুনিয়ার লোকেরা কি ইচ্ছায়, কি অনিচ্ছায়- তাদের চিন্তাধারা ও কর্মকাণ্ডকে সেই মানদণ্ডের আদলেই গড়ে তুলেছিল। কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে চিন্তানায়ক ও গবেষকের আবির্ভাব যখন বন্ধ হয়ে গেলো, তারা ত্যাগ করলো চিন্তা-ভাবনা ও সত্যানুসন্ধিৎসা এবং জ্ঞান-সাধনা ও চিন্তা-গবেষণার ক্ষেত্রে ক্লান্ত হয়ে পড়লো, তখন তারা দুনিয়ার নেতৃত্ব থেকেই যেনো অবসর গ্রহণ করলো। অন্যদিকে পাশ্চাত্য জাতিগুলো এই সকল ক্ষেত্রেই দ্রুতবেগে এগিয়ে চললো। তারা চিন্তা-গবেষণার শক্তিকে কাজে লাগালো; বিশ্বপ্রকৃতির রহস্য উদঘাটনে আত্মনিয়োগ করলো; প্রকৃতির অন্তর্নিহিত শক্তিগুলোর উৎস সন্ধান করলো। এর অনিবার্য পরিণতি যা হবার তা-ই হলো। পাশ্চাত্য জাতিগুলো দুনিয়ার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের আসন দখল করে বসলো। এক সময় যেভাবে দুনিয়ার লোকেরা মুসলমানদের কর্তৃত্বের সামনে নতি স্বীকার করেছিলো, তেমনি তাদেরকেও পাশ্চাত্য জাতিগুলোর কর্তৃত্ব মেনে নিতে হলো। চার-পাঁচ শতক পর্যন্ত মুসলমানরা তাদের পূর্ব পুরুষদের বিছানো সুখশয্যায় অঘোরে ঘুমাচ্ছিল, আর পাশ্চাত্য জাতিগুলো ছিলো নিজেদের উন্নয়নের কাজে লিপ্ত। এরপর সহসা পাশ্চাত্য শক্তিগুলোর অভ্যুত্থান ঘটলো এবং মাত্র এক শতকের মধ্যেই তারা গোটা পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়লো। ঘুমের ঘোরে চোখ মেলে তাকিয়েই মুসলমানরা দেখতে পেলো, খ্রীস্টান ইউরোপ লেখনী ও তরবারি উভয় দিক থেকেই সুসজ্জিত; আর এই দ্বিবিধ শক্তির সাহায্যেই তারা গোটা দুনিয়ার ওপর কর্তৃত্ব চালিয়ে যাচ্ছে। একটি ক্ষুদ্রাকৃতির দল এর মোকাবিলায় প্রতিরক্ষার চেষ্টা করলো; কিন্তু তার না ছিলো লেখনীর শক্তি, আর না ছিলো তরবারির তেজ। ফলে তারা শুধু পরাজয়ই বরণ করতে লাগল। জাতির বাকী অংশ অর্থাৎ সংখ্যাগুরু দলটি যে কর্মনীতি অবলম্বন করলো, দুর্বল ও কাপুরুষরা চিরকাল তা-ই করে থাকে। তরবারির তেজ, যুক্তির বল, বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য-প্রমাণের সমর্থন এবং চোখ ধাঁধানো রূপ-সৌন্দর্যসহ যে ধ্যান-ধারণা, মতাদর্শ ও রীতিনীতি পাশ্চাত্য থেকে এলো, আরামপ্রিয় মস্তিষ্ক ও পরাভূত মানসিকতা তাকে একেবারে ঈমানের মর্যাদা দিয়ে বসলো। যেসব পুরনো ধর্মবিশ্বাস, নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক আইন-কানুন নিছক গতানুগতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো, এই নতুন ও শক্তিশালী বন্যার স্রোতে তা খড়কূটোর মতো ভেসে গেলো। আর চেতনাহীনতার এ পথে লোকদের মন-মগজে এইধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেল যে, পাশ্চাত্য থেকে যা কিছু আসে তা-ই সত্য এবং তা-ই হছে সভ্যতা ও বিশুদ্ধতার একমাত্র মানদণ্ড।
পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে অন্য যেসব জাতির সংঘর্ষ হয়েছে, তাদের কারো কারো তো স্থায়ী ও স্বতন্ত্র কোনো সভ্যতাই বর্তমান ছিলোনা। কারো কারো কাছে একটা স্বতন্ত্র সভ্যতা ছিলো বটে, কিন্তু তা অন্য সভ্যতার মোকাবিলায় আপন স্বাতন্ত্র্যকে বাঁচিয়ে রাখার মতো শক্তিশালী ছিলোনা। আবার কারো কারো সভ্যতার সাথে এই নবাগত সভ্যতার তেমন কোন মৌলিক পার্থক্যই ছিলোনা। ফলে এই সকল জাতি অতি সহজেই পাশ্চাত্য সভ্যতার রঙে রঙিন হয়ে গেলো এবং কোনো বড় রকম সংঘর্ষেরই প্রয়োজন দেখা দিলনা। কিন্তু মুসলমানদের ব্যাপারটা ছিলো তাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। এরা একটি স্থায়ী, স্বতন্ত্র ও পূর্নাঙ্গ সভ্যতার অধিকারী। এদের সভ্যতার একটি নিজস্ব ও পূর্নাঙ্গ নিয়ম-নীতি ও বিধি-ব্যবস্থা চিন্তা ও কর্ম উভয় দিক থেকেই জীবনের তামাম বিভাগের ওপর পরিব্যাপ্ত। পাশ্চাত্য সভ্যতার মূলনীতি ও ভিত্তি সম্পূর্ণ এই সভ্যতার পরিপন্থী। এ কারণেই প্রতি পদক্ষেপে এই দু’ সভ্যতার মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত দানা বেঁধে উঠেছে। আর এই সংঘাতের ফলে মুসলমানদের চিন্তা-বিশ্বাস ও বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে।
যে দর্শন ও বিজ্ঞানের কোলে পাশ্চাত্য সভ্যতা লালিত হয়েছে, পাঁচ-ছয় শতক ধরে তা শুধু নাস্তিকতা, ধর্মদ্রোহিতা ও বস্তুবাদের পথেই এগিয়ে চলেছে। এই সভ্যতা যেদিন জন্মলাভ করেছে, ঠিক সেদিন থেকেই ধর্মের সাথে এর সংঘাত শুরু হয়েছে; বরং বলা যায়, ধর্মের বিরুদ্ধে যুক্তি ও বুদ্ধির সংঘাতই এই সভ্যতার জন্মদান করেছে। যদিও বিশ্বপ্রকৃতির নিদর্শনাদির পর্যবেক্ষণ, তার বিচিত্র রহস্যের উদ্ঘাটন, তার অন্তর্নিহিত নিয়ম-শৃঙ্খলার অন্বেষণ, তার বাহ্যিক দৃশ্যাবলী সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা এবং এগুলোর সমন্বয়ে অনুমান ও সাক্ষ্য-প্রমাণের সাহায্যে ফলাফল নির্ণয় ইত্যাদির কোনটাই ধর্মবিরুদ্ধ কাজ নয়, তবু ঘটনাচক্রে রেনেসাঁ আমলে ইউরোপে নয়া বৈজ্ঞানিক আন্দোলনের সূত্রপাত হতেই খ্রীস্টান পাদ্রীদের সঙ্গে তার তীব্র বিরোধ ও সংঘর্ষ দেখা দেয়। কারণ এই পাদ্রী সম্প্রদায় তাদের ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিকে প্রাচীন গ্রীক দর্শন ও বিজ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছিলো। তারা এই আশা পোষণ করে রেখেছিল যে, আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধিৎসার ফলে এই ভিত্তিতে যদি সামান্যতম ফাটলও ধরে, তাহলে ধর্মের গোটা ইমারতই ধূলিস্মাৎ হয়ে যাবে। এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়েই তারা এই নয়া বৈজ্ঞানিক আন্দোলনের বিরোধিতায় লিপ্ত হলো এবং একে প্রতিরোধ করার জন্যে শক্তি পর্যন্ত প্রয়োগ করলো। প্রতিষ্ঠা করলো ধর্মীয় আদালত এবং এর মাধ্যমে এই আন্দোলনের অগ্রনায়ক ও নিশানবাহীদের কঠোর, নির্মম ও ভয়ঙ্কর শাস্তি প্রদান করতে লাগলো। কিন্তু এ আন্দোলন ছিলো এক অপ্রতিরোধ্য মানস-চেতনার ফল; তাই নিপীড়ন ও নির্যাতনে নিস্তেজ হবার পরিবর্তে এটি আরো জোরদার হয়ে উঠল।
এমনকি, শেষ পর্যন্ত মুক্ত চিন্তার বন্যা-প্রবাহ ধর্মীয় কর্তৃত্বকে একেবারে খতম করে দিলো।
শুরুতেই এই লড়াইটা ছিলো মুক্ত চিন্তার অগ্রনায়ক ও পাদ্রীদের মধ্যে সীমিত। কিন্তু পাদ্রীরা যেহেতু ধর্মের নামে স্বাধীন চিন্তানায়কের সঙ্গে লড়াই করছিল, তাই খুব শীগ্গীরই এটি খ্রীস্টান ধর্ম ও মুক্ত চিন্তার ধারকদের মধ্যকার দ্বন্দ্বে পরিণত হলো। অতপর ধর্ম বস্তুটাকেই (তা যে কোনো ধর্মই হোক না কেন) এই আন্দোলনের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে আখ্যা দেয়া হলো। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির চিন্তা-ভাবনাকে ধর্মীয় চিন্তাপদ্ধতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে ঘোষণা করা হলো। যে ব্যক্তি বিশ্বপ্রকৃতির বিষয়াদি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক পন্থায় চিন্তা-ভাবনা করবে, তার পক্ষে ধর্মীয় মতবাদ বর্জন করে নিজস্ব পথে চলা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হলো। বিশ্বপ্রকৃতি সম্পর্কে ধর্মীয় মতবাদের মূল ভিত্তি এই যে, এই বিশ্বজাহান থেকে ঊর্ধ্বতন এক শক্তিকে প্রাকৃতিক জগতের তামাম নিদর্শন ও দৃশ্যাবলীর কার্যকারণ বলে ঘোষণা করতে হবে। যেহেতু এটি ছিলো আধুনিক বৈজ্ঞানিক আন্দোলনের শত্রুদের মতবাদ, এজন্যই খোদা অথবা কোনো অতি-প্রাকৃতিক সত্তার ধারণা ছাড়াই বিশ্বপ্রকৃতির রহস্য উদঘাটন করা এবং খোদার অস্তিত্ব সম্পর্কিত ধারণা নিয়ে প্রাকৃতিক বিষয়াদির ওপর দৃষ্টিক্ষেপণকারী প্রত্যেকটি পন্থাকেই অবৈজ্ঞানিক আখ্যা দেয়াকে এই নয়া আন্দোলনের নায়কগণ অনিবার্য মনে করলো। এইভাবে নব্যযুগের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকদের মধ্যে খোদা, আত্মা কিংবা আধ্যাত্ববাদ ও অতিপ্রকৃতিবাদের বিরুদ্ধে এক তীব্র বিদ্বেষের সঞ্চার হলো। অথচ এটা আদৌ বুদ্ধি ও যুক্তিবাদের স্বাভাবিক পরিণতি ছিলোনা; বরং এ ছিলো নিতান্তই ভাবাবেগের আতিশয্যের ফলমাত্র। তারা খোদার প্রতি এই জন্যে বিদ্বেষী ছিলোনা যে, তাঁর অনস্তিত্ব বা অনুপস্থিতি সাক্ষ্য-প্রমাণের দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছিলো; বরং তার প্রতি এই জন্যে বিরক্ত ছিলো যে, তিনি ছিলেন তাদের এবং তাদের মুক্ত চিন্তার শত্রুদের প্রভু (মা’বুদ)। পরবর্তী পাঁচ শতকে তাদের যুক্তি, বুদ্ধি ও চিন্তা এবং তাদের বৈজ্ঞানিক আন্দোলন যেটুকু কাজ করেছে, তার মূলে এই অযৌক্তিক ভাবাবেগই সক্রিয় ছিল।
পাশ্চাত্য দর্শন ও বিজ্ঞান যখন আসল যাত্রাপথে পদক্ষেপ করে, তখন তার লক্ষ্য ছিলো খোদাপরস্তির সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে নিবন্ধ। তবু ধর্মীয় পরিবেশে বেষ্টিত থাকার ফলে শুরুতে প্রকৃতিবাদকে খোদাপরস্তির সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ে চলছিলো। কিন্তু যতোই সে নিজের লক্ষ্যপথে এগিয়ে চললো, খোদাপরস্তির ওপর ততোই প্রকৃতিবাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হতে লাগলো। এমনকি, খোদার অস্তিত্ব সম্পর্কিত ধারণা এবং তাঁর সঙ্গে প্রত্যেকটি অতি প্রাকৃতিক জিনিসের ধারণাই দার্শনিক-বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে বেমালুম গায়েব হয়ে গেলো। তারা এমন চরম প্রান্তে গিয়ে পৌঁছলো যে, বস্তু ও গতি ছাড়া তাদের কাছে আর কোনো জিনিসেরই অস্তিত্ব রইলোনা। তারা বিজ্ঞানকে প্রকৃতবাদেরই সমর্থক বলে ঘোষণা করলো। যে জিনিস মাপা বা ওজন করা যায়না, তার কোনো অস্তিত্বনেই, এই মতবাদের ওপর গোটা বিজ্ঞানী ও দার্শনিক সম্প্রদায় বিশ্বাস স্থাপন করে বসলো।
পাশ্চাত্য দর্শন ও বিজ্ঞানের ইতিহাস একথারই সাক্ষ্য বহন করে। পাশ্চাত্য দর্শনের জনকরূপে পরিচিত ডেকার্টে (মৃত্যু ১৬৫০) একদিকে যেমনি খোদার অস্তিত্বে প্রগাঢ় বিশ্বাসী ছিলেন, অপরদিকে তেমনি বস্তুর সাথে আত্মার স্বতন্ত্র অস্তিত্বও স্বীকার করতেন। অন্যদিকে তিনিই আবার বিশ্ব-প্রকৃতির নিদর্শনাদির যান্ত্রিক বিশ্লেষণ পদ্ধতির সূচনা করেন। শুধু তাই নয়, তাঁর প্রবর্তিত চিন্তাপদ্ধতিই পরবর্তীকালে নিরেট বস্তুবাদে পরিণত হয়। হব্স (মৃত্যু ১৬৭৯) আর এক ধাপ সামনে এগিয়ে অতি-প্রকৃতিবাদের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেন। তিনি বিশ্বপ্রকৃতি এবং এর প্রতিটি বস্তুকেই যান্ত্রিক বিশ্লেষণের উপযোগী বলে ঘোষণা করেন এবং এই জড়জগতের প্রভাবশীল যে কোনো আত্মিক বা অশরীরী শক্তির সম্ভাবনাকে অস্বীকার করেন; কিন্তু একই সাথে তিনি খোদার অস্তিত্বেও বিশ্বাস করেন। কারণ, বুদ্ধিবৃত্তির দৃষ্টিতে এমনি এক কার্যকারণ শক্তিকে স্বীকার করা আবশ্যক ছিলো। এ সময়েই সতের শতকের যুক্তিবাদের সবচেয়ে বড় অগ্রনায়ক স্পিনোজার (মৃত্যু ১৬৭৭) আবির্ভাব হয়। তিনি বস্তু, আত্মা এবং খোদার মধ্যে কোনো পার্থক্যই বাকী রাখলেন না। তিনি খোদা এবং বিশ্বপ্রকৃতিকে মিলিয়ে একটি অচ্ছেদ্য সত্ত্বা বানিয়ে দিলেন এবং খোদার সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে অস্বীকার করলেন। এদের উত্তরসূরী লিব্নিজ (মৃত্যু ১৭১৬) এবং লক্ (মৃত্যু ১৭০৪) খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু উভয়েরই মানসিক প্রবণতা ছিলো প্রকৃতিবাদের দিকে।
এইভাবে দেখা যায় যে, সতের শতকের দর্শনশাস্রে খোদাপরস্তি ও প্রকৃতিবাদ উভয়েই পাশাপাশি চলছিলো। অনুরূপভাবে বিজ্ঞানও সতের শতক পর্যন্ত পুরোপুরি জড়বাদে পরিণত হয়নি। কোপার্নিকাস, কেপলার, গ্যালিলও, নিউটন এবং বিজ্ঞানের অন্যান্য অগ্রনায়কেদের কেউই খোদার অস্তিত্বে অবিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু এরা বিশ্বপ্রকৃতির রহস্য উদ্ঘাটনে খোদায়ী মতবাদ পরিহার করে যেসব শক্তি ওবিধি-বিধান এই ব্যবস্থাপনাটি পরিচালনা করছে, সেগুলো অন্বেষণ করার ইচ্ছুক ছিলেন। এই খোদায়ী মতবাদ পরিহার করাটাই ছিলো প্রকৃতপক্ষে নাস্তিকতা ও প্রকৃতিবাদের বীজ তুল্য। এই বীজই পরবর্তীকালে মুক্ত চিন্তার বৃক্ষহিসেবে বিকশিত হয়। কিন্তু সতের শতকের বিজ্ঞানীদের এ সম্পর্কে কোনো চেতনাই ছিলোনা। তাঁরা প্রকৃতিবাদ ও খোদাপরস্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য রেখা আঁক্তে পারেননি; বরং এই দু’টো মতবাদ পাশা-পাশি চলতে পারে বলে তাঁরা মনে করতেন।
অবশ্য আঠার শতকে এসে এ সত্য প্রতিভাত হলো যে, খোদার সত্তাকে অগ্রাহ্য করে যে চিন্তাপদ্ধতি বিশ্বপ্রকৃতির রহস্য ও তার বিধি-বিধানের অনুসন্ধান করবে, তা কিছুতেই বস্তুবাদ, ধর্মহীনতা ও জড়বাদ পর্যন্ত না পৌঁছে পারেনা। এই শতকে জন টোলেন্ড, ডেভিড হার্টলে, জোসেফ প্রিস্টলি, ভলটেয়ার, লা-মেট্র, হোলবাক, কেবানিস, ডেনিস ডয়েড্রো, মন্টেস্কু, রুশো এবং এই ধরনের আরও কতিপয় স্বাধীন চিন্তাশীল দার্শনিক ও বিজ্ঞানীর আবির্ভাব হয়। এরা হয় প্রকাশ্যে খোদার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন, নতুবা তার স্বীকৃতি দিলেও মর্যাদার দিক দিয়ে তাকে একজন নিয়মতান্ত্রিক সম্রাটের চেয়ে বেশী গুরুত্ব প্রদান করেননি। অর্থাৎ এদের স্বীকৃত খোদা বিশ্বপ্রকৃতিকে একবার গতিবান করে তার থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। এখন আর এই ব্যবস্থাপনার পরিচালনায় তার কোনো ভূমিকা নেই। এই শ্রেণীর দার্শনিক ও বিজ্ঞানী বিশ্বপ্রকৃতি, জড়জগত এবং গতি ছাড়া আর কোনো জিনিসেরই অস্তিত্ব স্বীকার করতেন না। এঁদের মতে যেসব জিনিস পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার আয়ত্বাধীন, কেবল তা-ই সত্য। হিউম তার অভিজ্ঞতাবাদ ও সংশয়বাদের সাহায্যে এই চিন্তা পদ্ধতি জোরালোভাবে সমর্থন করেন। এমনকি যুক্তিসিদ্ধ বিষয়াদির সভ্যতার জন্যেও তিনি অভিজ্ঞতাকেই চূড়ান্ত মানদণ্ড বলে ঘোষণা করেন। অবশ্য বার্কলি বস্তুবাদের এই ক্রমবর্ধমান বন্যা প্রবাহের গতিরোধ করার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ অবধি তিনিও একে রোধ করতে সমর্থ হননি। অতপর হেগেল বস্তুবাদের স্থলে আদর্শবাদ প্রবর্তন করার প্রয়াস পান। কিন্তু নিরেট বস্তুর মোকাবিলায় সূক্ষ্ম আদর্শকে কেউ গ্রহণ করলোনা। কান্ট একটি মধ্যম পন্থা উদ্ভাবন করলেন। তিনি বললেন, ‘খোদার অস্তিত্ব, আত্মার স্থায়িত্ব, ইচ্ছার স্বাধীনতা ইত্যাদি আমাদের বোধগম্য জিনিস নয়, সুতরাং এগুলো মেনে চলা সম্ভব নয়; তবে এগুলোর প্রতি ঈমান পোষণ করা যেতে পারে। কারণ আমাদের বাস্তব বিচারবোধ এগুলোর প্রতি ঈমান পোষণেরই দাবী জানায়।’ এই ছিলো খোদাপরস্তি ও প্রকৃতিবাদের মধ্যে আপোষ সৃষ্টির সর্বশেষ প্রচেষ্টা। কিন্তু এ প্রচেষ্টাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কেননা বুদ্ধি ও চিন্তার ভ্রান্তি খোদার অস্তিত্বকে নিছক কল্পনাপ্রসূত কিংবা বড়জোর একজন নিষ্ক্রিয় ও ক্ষমতাহীন সত্তা বলে ঘোষণা করার পর শুধু নৈতিকতার হেফাজতের জন্যে তাকে মানা, ভয় করা এবং তার সন্তুষ্টি কামনা করাটা ছিলো নিতান্তই এক অযৌক্তিক ব্যাপার।
ঊনিশ শতকে বস্তুবাদ তার উৎকর্ষের চরম শীর্ষে পৌঁছে। ভোগট, রুখ্নার, জোলবে, কোমে, মোল্শট এবং অন্যান্য বিজ্ঞানী ও দার্শনিকগণ বস্তু এবং তার গুনাগুণ ছাড়া আর সব জিনিসের অস্তিত্বকেই বাতিল করে দেন। মিল দর্শনশাস্রে অভিজ্ঞতাবাদ এবং নীতিশাস্রে উপযোগবাদের প্রবর্তন করেন। অতপর স্পেনসার দার্শনিক বিবর্তনবাদ, বিশ্বপ্রকৃতির স্বাভাবিক সৃষ্টি এবং জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত উন্মেষের ধারণাকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে প্রচার করেন। পরন্তু জীবতত্ত্ব, শরীরতত্ত্ব, ভূতত্ত্ব এবং প্রাণীতত্ত্বের আবিষ্কার উদ্ভাবনী, ফলিত বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষ এবং বৈষয়িক উপকরণের প্রাচুর্য লোকদের মনে এই ধারণা গভীরভাবে বদ্ধমূল করে দিলো যে, বিশ্বপ্রকৃতি আপনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে; কেউ একে সৃষ্টি করেনি; তা নিজে নিজেই এক বাঁধাধরা নিয়মে চালিত হচ্ছে, এর কোনো সুনির্দিষ্ট চালক নেই; আপনা আপনিই এ বিবর্তন ও উৎকর্ষের পর্যায়গুলো অতিক্রম করে চলছে, এই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ওপর অপর কোনো অতি-প্রাকৃতিক সত্তার প্রভাব নেই। নিষ্প্রাণ বস্তুর ভেতরে কারো নির্দেশে প্রাণের সঞ্চার হয়না; বরং বস্তু তার নিজস্ব ধারায় বিবর্তিত হতে থাকলেই প্রাণের সঞ্চার হয়। বিবর্তন, ইচ্ছাশক্তি, অনুভূতি, চেতনা, বুদ্ধিবৃত্তি ইত্যাদি হচ্ছে এই বিবর্তিত বস্তুরই গুনগত বিশেষত্ব। মানুষ, পশু সবাই হচ্ছে যন্ত্র মাত্র; স্বাভাবিক নিয়মেই এরা চালিত হচ্ছে। এদের কলকব্জাগুলো যেভাবে বিন্যাস্ত হয়, তেমনি ধরনের কাজই এরা সম্পাদন করে থাকে। এদের ভেতরে কোন ইখতিয়ার বা ‘স্বাধীন ইচ্ছার’ অস্তিত্ব নেই। এদের নিয়ম-শৃঙ্খলার বিচ্যুতি ঘটলে এবং প্রাণশক্তি ফুরিয়ে গেলেই মৃত্যু হয়। এ মৃত্যু হচ্ছে স্বাভাবিক বিলুপ্তিরই নামান্তর মাত্র। অন্যকথায় যন্ত্র যখন ভেঙ্গেচুরে গিয়েছে, তখন তার গুন-বৈশিষ্ট্যও বিলীন হয়ে গিয়েছে। এখন আর তার হাশর বা পুনর্জীবন লাভের কোনোই সম্ভাবনা নেই।
এই প্রকৃতিবাদ ও বস্তুবাদকে স্থিতিশীল করে তোলা এবং একটা প্রামাণ্য ও সুসংবদ্ধ মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে ডারউইনের বিবর্তনবাদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাঁর লিখিত ‘প্রজাতির উৎস’ (Origin of Species) নামক গ্রন্থটি ঈসায়ী ১৫৮৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি বিজ্ঞান জগতে একটি প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থরূপে বিবেচিত হয়। এই গ্রন্থে যে যুক্তিধারা সন্নিবেশিত হয়, ঊনিশ শতকের বিজ্ঞানীদের কাছে তা ছিলো যুক্তির সর্বোত্তম পদ্ধতি। সে যুক্তিধারা থেকে এই মতবাদ আরো বলিষ্ঠরূপে সমর্থিত হয় যে, বিশ্বপ্রকৃতির তামাম ক্রিয়াকলাপ খোদার অস্তিত্ব ছাড়াই চলতে পারে। প্রকৃতির নিদর্শন ও দৃশ্যাবলীর জন্যে তার নিজস্ব নিয়ম-কানুন ছাড়া আর কোনো কার্যকারণের প্রয়োজন নেই। জীবনের নগণ্য স্তর থেকে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত সকল বস্তুরই বিকাশ ও বিবর্তন হচ্ছে এ যুক্তি ও বিচার বুদ্ধিহীন প্রকৃতির অনুক্রমিক ক্রিয়ার নিছক পরিণতি। মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তুকে কোনো বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ সত্তা সৃষ্টি করেননি; বরং যে প্রানবস্তু যন্ত্রটি একদিন কীটরূপে বিচরণ করতো, তা-ই শেষে বাঁচার লড়াই, যোগ্যতমের ঊদ্বর্তন এবং প্রকৃতির নির্বাচনে ইচ্ছা, অনুভূতি বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষরূপে আত্ম-প্রকাশ করে।
এই দর্শন থেকেই পাশ্চাত্য কৃষ্টি ও সভ্যতা জন্মলাভ করে। এতে না আছে কোনো বিচক্ষণ ও ক্ষমতাবান খোদার ভয়ের স্থান; আর না আছে নবুয়্যত, প্রাত্যাদেশ (ওহী) ও ইল্হামের কোনো গুরুত্ব। এর ভেতরে মৃত্যুর পর অপর কোনো জীবনের ধারণা, ইহজীবনের কৃতকর্ম সম্পর্কে জবাবদিহির চিন্তা, মানুষের ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের প্রশ্ন, জীবনের জৈবিক উদ্দেশ্যের চেয়ে উচ্চতর কোনো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সম্ভবনা ইত্যাদির কোনোই অবকাশ নেই। এ হচ্ছে নিরেট বস্তুবাদী সভ্যতা। এর গোটা অবয়বই খোদাভীতি, সরলতা, সত্যবাদিতা, সত্যানুসন্ধিৎসা, সচ্চরিত্র, দায়িত্বজ্ঞান, বিশ্বস্ততা, সৎকর্মশীলতা, লজ্জাশীলতা, পরহেযগারী ও পবিত্রতার ধারণা থেকে মুক্ত। পক্ষান্তরে এই সকল ধারণার ওপরই ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি স্থাপিত। ফলকথা, পাশ্চাত্যের গোটা মতাদর্শ ইসলামী মতাদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তার পথ ইসলামের অনুসৃত পথের সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলাম যে জিনিসগুলোর ওপর মানবীয় আচরণ ও তমদ্দুনের ভিত্তি স্থাপন করে, এ সভ্যতা চায় সেগুলোর মূলোৎপাটন করতে। পক্ষান্তরে এই সভ্যতা যে ভিত্তিগুলোর ওপর মানুষের ব্যক্তি চরিত্র ও সমাজ পদ্ধতির ইমারত গড়ে তুলতে চায়, তার উপর ইসলামের ইমারত এক মুহূর্তের জন্যেও টিকে থাকতে পারেনা। মোটকথা, ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতা হছে দুই বিপরীত লক্ষ্যগামী তরুণীর মতো। যে ব্যক্তি এর কোন একটিতে আরোহণ করবে, তাকে অন্যটি ত্যাগ করতেই হবে। আর যে একই সাথে উভয়টিতে আরোহণ করবে, সে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে।
দুর্ভাগ্যবশত যে শতকে এই নয়া সভ্যতা তার বস্তুতান্ত্রিকতা, ধর্মদ্রোহিতা ও নাস্তিকতার চরম প্রান্তে গিয়ে উপনীত হয়, ঠিক সেই শতকেই মরক্কো থেকে দূরপ্রাচ্য পর্যন্ত গোটা মুসলিম জাহান পাশ্চাত্য জাতিগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতা ও শাসনতান্ত্রিক প্রাধান্যের অক্টোপাসে বন্দী হয়ে পড়ে। ফলে মুসলমানদের ওপর পাশ্চাত্যের তরবারি ও লেখনীর হামলা এক সাথেই চালিত হয়। যাদের মন-মগজ পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের রাজনৈতিক প্রাধান্যে বশীভূত ও ভীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলো, তাদের পক্ষে পাশ্চাত্যের দর্শন, বিজ্ঞান ও তার উদ্ভাবিত কৃষ্টি-সভ্যতার জাঁকজমক থেকে আত্মরক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়লো। বিশেষ করে, যেসব মুসলিম জনপদ সরাসরি কোনো পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যের শাসনাধীন হয়ে পড়েছিলো, তাদের অবস্থা ছিলো আরো বেশি নাজুক। তাদেরকে পার্থিব আত্মস্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে বাধ্য হয়ে পাশ্চাত্য জ্ঞান অর্জন করতে হলো আর এই জ্ঞান অর্জন যেহেতু নিছক জ্ঞান অর্জনই ছিলোনা বরং ছিলো ‘এক পরাভূত মানসিকতা নিয়ে পাশ্চাত্য গুরুদের সামনে নতজানু হয়ে বসা’, এই জন্যে মুসলমানদের নতূন প্রজন্ম গভীরভাবে পাশ্চাত্য চিন্তাধারা ও বৈজ্ঞানিক মতবাদের প্রভাবে প্রভাবিত হলো; তাদের দৃষ্টিভঙ্গী ও মানসিকতা পাশ্চাত্য ছাঁচে গড়ে উঠতে লাগলো; তাদের হৃদয়-মন পাশ্চাত্য সভ্যতার বশ্যতা স্বীকার করে নিলো। তাদের মধ্যে ভালো-মন্দ পরখ করা এবং নিরেট ভালটিকে গ্রহণ করার মতো বিচারবোধ ও অনুসন্ধিৎসারই সৃষ্টি হলোনা! তাদের মধ্যে স্বাধীনভাবে চিন্তা-ভাবনা করার এবং ব্যক্তিগত বিচার-বুদ্ধির সাহায্যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মত যোগ্যতাই সৃষ্টি হতে পারলোনা। এরই ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ইসলামী সভ্যতা ও কৃষ্টির গোটা ভিত্তিমূলই আজ নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। ইসলামী পদ্ধতিতে চিন্তা-ভাবনা করার মতো মানসিক কাঠামোই বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছে। বস্তুত যারা পাশ্চাত্য পন্থায় চিন্তা-ভাবনা করে এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার মূলনীতির প্রতি আস্থা পোষণ করে, তাদের মানসিক গড়নটাই হচ্ছে অদ্ভুত প্রকৃতির। সে মানসিকতার সাথে ইসলামের নীতি কিছুতেই খাপ খেতে পারেনা। আর মূলনীতিই যখন খাপ খায়না, তখন খুঁটিনাটি ও ছোটখাটো ব্যাপারে নানারূপ সন্দেহ ও নিত্য নতুন সংশয়ের উদ্রেক হওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
এটা নিঃসন্দেহ যে, মুসলমানদের অধিকাংশ এখনো ইসলামের সভ্যতার প্রতি ঈমান পোষণ করে এবং মুসলমান হিসেবেই তারা বেঁচে থাকতে চায়। কিন্তু পাশ্চাত্য চিন্তা ও সভ্যতার প্রভাবে তাদের মন-মগজ ইসলামের প্রতি ক্রমশ বিমুখ হতে চলেছে এবং এই বিমুখতা দিনদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রাধান্য ও প্রভুত্বের কথা বাদ দিলেও পাশ্চাত্যের জ্ঞান বিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির প্রভাব প্রতিপত্তি দুনিয়াব্যাপী সবার মন মানসকে আচ্ছন্ন করে নিয়েছে। এর ফলে লোকদের দৃষ্টিভঙ্গী বদলে গেছে, কারো পক্ষে মুসলমানী দৃষ্টিতে দেখা এবং ইসলামী ধারায় চিন্তা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই যতোক্ষণ পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে স্বাধীন চিন্তানায়কের আবির্ভাব না ঘটবে, ততোক্ষণ এই নতজানু অবস্থার অবসান হবেনা। বস্তুত আজ ইসলামের এক নবজাগরণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। প্রাচীন ইসলামী চিন্তানায়ক ও তথ্যানুসন্ধানীদের রক্ষিত জ্ঞানসম্পদ আজকের দিনে ফলপ্রসূ হতে পারেনা; কেননা দুনিয়া আজ অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। ছয়’শ বছর আগে দুনিয়া যেসব পর্যায় অতিক্রম করে এসেছে, আজ তাকে আবার পেছনদিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। আজকে যে দুনিয়াকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে, জ্ঞান ও কর্মের ক্ষেত্রে সে-ই নেতৃত্বদানে সক্ষম হবে।
কাজেই আজকে আবার ইসলামকে দুনিয়ার নেতৃত্বের আসন অলংকৃত করতে হলে তার একমাত্র উপায় হচ্ছে মুসলিম সমাজে এমন চিন্তাবিদ ও তথ্যানুসন্ধানীর আবির্ভাব হতে হবে, যাঁরা চিন্তা-গবেষণা ও অনুসন্ধান অনুশীলনের সাহায্যে পাশ্চাত্য সভ্যতার গোটা ভিত্তিমূলকেই ধসিয়ে দিতে পারবেন। কুরআনের নির্দেশিত চিন্তা-গবেষণার পদ্ধতিতে যারা প্রাকৃতিক নিদর্শনাদির পর্যবেক্ষণ এবং তার রহস্যাবলীর অনুসন্ধান করে খালেস ইসলামী চিন্তাধারার ভিত্তিতে নতুন দর্শন শাস্রের ভিত্তি রচনা করবেন। যাঁরা কুরআনের অঙ্কিত রূপরেখার ভিত্তিতে এক নয়া প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ইমারত গড়ে তুলবেন। খোদাবিমুখ মতবাদকে বাতিল করে যাঁরা খোদায়ী মতবাদের ওপর চিন্তা ও গবেষণার ভিত্তি স্থাপন করবেন। সর্বোপরি এই আধুনিক চিন্তা ও গবেষণার ইমারতকে তারা এমনি সুদৃঢ়ভাবে গড়ে তুলবেন যে, তা গোটা দুনিয়াকেই আছন্ন করে ফেলবে এবং দুনিয়ার সর্বত্র পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সভ্যতার বদলে ইসলামের সত্য ও সুবিচার ভিত্তিক সভ্যতা উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে।
উপরে যা কিছু আলোচিত হলো, তার সারমর্মকে একটি উপমার সাহায্যে এভাবে পেশ করা যেতে পারেঃ দুনিয়াটা যেনো একটি রেলগাড়ী। একে চালিত করছে চিন্তা-গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধানের ইঞ্জিন। আর চিন্তাবিদ ও তথ্যানুসন্ধানীরা হচ্ছে এই ইঞ্জিনের ড্রাইভার। তাঁরা এই গাড়ীকে যেদিকে চালিত করেন, সেদিকেই সে ধাবিত হয়। যারা গাড়ীর আরোহী, তারা ইচ্ছায় হোক কি অনিচ্ছায়- তার গতিপানেই যেতে বাধ্য। যদি গাড়ীর কোনো যাত্রী তার গতিপানে যেতে অনিচ্ছুক হয়, তাহলে সে চলন্ত গাড়ীর মধ্যে বসে নিজের আসনটিকে এদিক-ওদিক ঘুরানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনা। কিন্তু আসনের মোড় ঘুরিয়ে দিলেই তাতে নিজের গতিমুখ বদলে যায়না; তা করতে হলে গাড়ীয়ে ইঞ্জিন দখল করে তার গতিকে নিজের ঈস্পিত পথে ঘুরিয়ে দিতে হবে। একমাত্র এভাবেই নিজের গতিমুখ বদলানো যেতে পারে।
বর্তমানে এই ইঞ্জিনটি যাদের করায়ত্ত, তারা সবাই আল্লাহবিমুখ এবং ইসলামী চিন্তাধারা সম্পর্কে নিদারুণ অজ্ঞও। এ জন্যেই গাড়ীটি তার যাত্রীদের নিয়ে ধর্মদ্রোহীতা ও বস্তুতান্ত্রিকতার পথে দ্রুত ছুটে চলছে। ফলে সমস্ত যাত্রীই ইসলামের লক্ষ্যস্থল থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে। তাই গাড়ীর এই গতিধারাকে বদলাতে হলে আজ থেকে ইঞ্জিন করায়ত্বের চেষ্টা করতে হবে। এই কাজটি যে পর্যন্ত না হবে, সে পর্যন্ত গাড়ীর গতি কিছুতেই বদলানো যাবেনা; বরং আমাদের শত আপত্তি-বিরক্তি ও চিৎকার সত্ত্বেও গাড়ী আল্লাহদ্রোহী ড্রাইভারদের নির্দেশিত পথেই চলতে থাকবে। (তরজামানুল কুরআনঃ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ ইং)
২
উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতার বিপর্যয়
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বর্তমান মুসলিম জাহানের অধিকাংশ দেশই সোনালী যুগের মুজাহিদদের প্রচেষ্টায় বিজিত হয়েছে। যারা এই দেশগুলো জয় করেছেন, তাঁরা রাজ্য বিস্তার কিংবা ধনার্জনের নেশায় নয়, বরং দুনিয়ার বুকে আল্লাহ্র কালেমা বুলন্দ করার উদ্দেশ্যেই জীবন পণ করে নিজেদের ঘরবাড়ি ত্যাগ করেছিলেন। তাঁরা দুনিয়াবী ভোগাসক্তির বদলে পরকালীন সুখাভিলাষের নেশায়ই বিভোর ছিলেন। এ জন্যেই তাঁরা বিজিতদের শুধু নিজেদের অনুগত ও করদাতা বানিয়েই ক্ষান্ত হননি, তাদেরকে ইসলামের রঙে রাঙিয়ে তুলবারও ব্যবস্থা করেন। তাদের গোটা জনসংখ্যা কিংবা তার অধিকাংশকেই তাঁরা মিল্লাতে ইসলামিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে নেন। পরন্তু জ্ঞানচর্চা ও কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদের ভেতর ইসলামী চিন্তাধারা ও সভ্যতাকে এমনিভাবে দৃঢ়মূল করে দেন যে, পরবর্তীকালে তাঁরা নিজেরাই ইসলামী কৃষ্টি-সভ্যতার নিশানবরদার এবং ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষকে পরিণত হন। এগুলো ছাড়া বাকি দেশগুলো বিজিত হয় সোনালী যুগের বহু পরে। তখন ইসলামী প্রাণ-চেতনা নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল এবং বিজেতাদের হৃদয়ে খালেস আল্লাহ্র পথে জিহাদের চেয়ে রাজ্যবিস্তারের আকাঙ্খাই অধিক প্রবলভাবে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঐসব দেশে ইসলামের প্রসার ও প্রতিষ্ঠার কাজ বহুলাংশে সফল হয়। এমনকি ঐ দেশগুলোতে ইসলাম নিরঙ্কুশ জাতীয় সভ্যতার সংস্কৃতির মর্যাদা লাভ করে।
দুর্ভাগ্যবশত এই উপমহাদেশের ব্যাপারটি উপরোক্ত দুই শ্রেণীর দেশ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। সোনালী যুগে এ দেশের খুব সামান্য অংশই বিজিত হয়। আর ঐ সামান্য অংশেও ইসলামী শিক্ষা ও সভ্যতার যেটুকু প্রভাব পড়েছিল, তথাকথিত মা’রেফাতের বন্যাপ্রবাহে তাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এরপরেই এখানে শুরু হয় মুসলমানদের বিজয় অভিযানের আসল ধারাক্রম। কিন্তু তখন বিজেতাদের মধ্যে সোনালী যুগের মুসলমানদের বৈশিষ্ট ও বিশেষত্ব বর্তমান ছিলোনা। তাঁরা এখানে ইসলাম প্রচারের পরিবর্তে রাজ্য বিস্তারের কাজেই নিজেদের সমগ্র শক্তি ব্যয় করেন। তারা লোকদের কাছে আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্যের বদলে নিজেদের আনুগত্য ও রাজস্ব দাবি করেন। এরই অনিবার্য ফলে কয়েকশ বছর রাজ্য শাসনের পরও উপমহাদেশের বেশির ভাগ অধিবাসীই অমুসলিম রয়ে যায় এবং ইসলামী কৃষ্টি ও সভ্যতা এখানে বদ্ধমূল হতে পারেনি। পরন্তু এখানকার যেসব অধিবাসী ইসলাম গ্রহণ করে, তাদের জন্যে ইসলামী শিক্ষা ও ট্রেনিংয়েরও কোন বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে নও মুসলিমদের ভেতরে প্রাচীন হিন্দুয়ানী চিন্তাধারা, ধর্ম-বিশ্বাস ও রসম-রেওয়াজ কম-বেশি অবশিষ্ট থেকে যায়। এমনকি খোদ বহিরাগত প্রাচীন মুসলমানরা পর্যন্ত এদেশের অধিবাসীদের সাথে মেলামেশার ফলে মুশরিকী রাজনীতির সঙ্গে উদার ব্যবহার এবং বহুতরো জাহিলী প্রথার অনুবর্তন শুরু করে।
মুসলিম ভারতের ইতিহাস এবং তার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে একথা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এদেশে যখন মুসলমানদের রাষ্ট্রশক্তি পূর্ণমাত্রায় বিরাজমান ছিলো তখনও ইসলামের প্রভাব ছিলো অত্যন্ত দুর্বল। এখানকার পরিবেশ যথার্থ ইসলামী পরিবেশ ছিলোনা। অবশ্য হিন্দুদের ধর্ম ও তমদ্দুনও ছিলো অত্যন্ত নিস্তেজ। তদুপরি পরাভূত ও পদানত জাতির ধর্ম ও তমদ্দুন হিসেবে তা হয়ে পড়েছিল আরো নিষ্প্রভ। কিন্তু তবু মুসলিম শাসকদের উদারতা ও গাফলতির পরিবেশে তা অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকায় এবং মুসলমানরা পুরোপুরি ইসলামী শিক্ষা ও ট্রেনিং লাভ না করায় এখানকার মুসলমানদেরও একটি বিরাট অংশ নিজেদের ধর্ম বিশ্বাস ও কৃষ্টি-সভ্যতার দিক দিয়ে ততোটা পরিপক্ক ও পূর্নাঙ্গ মুসলমান হতে পারেনি, যতোটা হতে পারতো খালেস ইসলামী পরিবেশ।
অবশেষে ঈসায়ী আঠার শতকে ভারতে ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে বড় সহায়ক সেই রাষ্ট্রক্ষমতাও মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে গেলো। প্রথমে মুসলমানদের সাম্রাজ্য বিচ্ছিন্ন হয়ে ছোটখাটো রাষ্ট্রে বিভক্ত হলো। তারপর একে একে মারাঠা, শিখ ও ইংরেজদের বন্যাপ্রবাহ এসে বেশির ভাগ রাষ্ট্রের অস্তিত্বই নিশ্চিহ্ন করে দিলো। এরপর স্বাভাবিকভাবেই এদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে গেলো। যে দেশে কয়েক শতাব্দীকাল ধরে মুসলমানরা শাসন চালিয়েছিল, মাত্র একশ বছরেই পুরো দেশ থেকে উৎখাত হয়ে তারা পরাভূত ও পদানত হলো। আর যেসব শক্তির সহায়তায় ভারতে ইসলামী কৃষ্টি ও সভ্যতা কিছু কায়েম ছিলো, ইংরেজদের রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গেই তা মুসলমানদের হাতছাড়া হতে লাগলো। তারা ফারসী ও আরবীর পরিবর্তে ইংরেজিকে শিক্ষার মাধ্যমে পরিণত করলো। সেই সাথে ইসলামী আইন ব্যবস্থা বাতিল করলো, শরয়ী আদালত ভেঙ্গে দিলো এবং দেওয়ানী ও ফৌজদারী ব্যাপারে নিজস্ব আইন প্রবর্তন করলো। এমনকি তারা ইসলামী আইনের প্রয়োগকে খোদ মুসলমানদের জন্যেও শুধু বিবাহ তালাক ইত্যাদির মধ্যে সীমিত করে দিলো আর এই সীমিত প্রয়োগ ক্ষমতাও কাজীদের পরিবর্তে সাধারণ দেওয়ানী আদালতের ওপর ন্যস্ত করা হলো। এইসব আদালতের বিচারকরা সাধারণত অমুসলিম বিধায় তাদের হাতে তথাকথিত ‘মুহামেডান ল’ দিন দিনই বিকৃত হতে লাগলো। অধিকন্তু শুরু থেকেই ইংরেজ শাসকদের এই নীতি ছিলো যে, একটি শাসক জাতি হিসেবে মুসলমানদের হৃদয়ে শতাব্দীকাল ধরে যে গৌরব ও মর্যাদাবোধ লালিত ও পরিপুষ্ট হয়ে আসছে আর্থিক বঞ্চনা ও নিষ্পেষণের সাহায্যে সেটিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে হবে। তাই একটি শতাব্দীর মধ্যেই এই জাতিকে তারা দরিদ্র, মূর্খ, নীচুমনা, চরিত্রহীন এবং অপমানিত ও লাঞ্ছিত করতে সমর্থ হলো।
এই পতনশীল জাতিটির ওপর শেষ আঘাতটি আসে ১৮৫৭ সালের গোলযোগের সময়। সে আঘাত শুধু মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতারই অবসান ঘটায়নি; বরং তাদের মনোবল একেবারে ভেঙ্গে দিলো। তাদের হৃদয়ে নৈরাশ্য ও হীনমন্যতাবোধের অমানিশা নেমে এলো। তারা ইংরেজদের শাসনক্ষমতার দাপটে এতোখানি সম্মোহিত হলো যে, তাদের ভেতরে স্বজাত্যবোধের চিহ্নমাত্র বাকি রইলোনা। এমনকি অপমান ও লাঞ্ছনার চরম প্রান্তে পৌঁছে গিয়ে তারা এ পর্যন্ত ভাবতে বাধ্য হলো যে, শান্তি ও নিরাপত্তার উপায় হচ্ছে ইংরেজদের আনুগত্য করা; মান ইজ্জত লাভের পন্থা হচ্ছে ইংরেজদের সেবা করা এবং উন্নতি ও প্রগতির উপায় হচ্ছে ইংরেজদের অনুসরণ ও অনুকরণ করা- এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই। পক্ষান্তরে তাদের নিজেদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কৃষ্টি-সভ্যতার যা কিছু সম্পদ রয়েছে, তা হচ্ছে দীনতা ও হীনতার প্রধানতম কারণ।
ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মুসলমানরা যখন আবার মাথা তুলে দাঁড়াবার চেষ্টা করলো, তখন তাদের মধ্যে দু’রকম দুর্বলতা বর্তমান ছিলো। প্রথম এই যে, চিন্তা ও কর্মের দিক থেকে আগে থেকেই তারা ইসলামী প্রত্যয় ও কৃষ্টি-সভ্যতায় পরিপক্ক ছিলোনা। পরন্তু এক অনৈসলামী পরিবেশ তার জাহিলী ধ্যান-ধারণা ও তমদ্দুনসহ তাদেরকে ঘিরে রেখেছিল। দ্বিতীয় হলো, গোলামি তার সমস্ত দোষত্রুটি সমেত কেবল তাদের দেহের ওপরই নয়; বরং তাদের হৃদয় ও আত্মার ওপরও চেপে বসেছিল। ফলে যেসব শক্তির সাহায্যে একটি জাতি তার তাহযীব ও তমদ্দুনকে বহাল রাখতে পারে, সেগুলো থেকে তারা বঞ্চিত হয়ে পড়ে।
এই দ্বিবিধ কমজোরীর মধ্যেই মুসলমানরা চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলো, ইংরেজ শাসকরা অতি সুকৌশলে আর্থিক উন্নতির সমস্ত দরজা তাদের জন্যে বন্ধ করে দিয়েছে এবং তার চাবি রেখে দিয়েছে ইংরেজি স্কুল ও কলেজের মধ্যে। এবার ইংরেজি শিক্ষা লাভ করা ছাড়া মুসলমানদের আর কোনোই গতি রইলোনা। তাই স্যার সৈয়দ আহমদের নেতৃত্বে এক প্রচণ্ড আন্দোলন গড়ে উঠলো। তার প্রভাবে গোটা উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজনবোধ জাগ্রত হলো। এ ব্যাপারে প্রাচীন পন্থীদের বিরোধিতা সম্পূর্ণ নিষ্ফল প্রতিপন্ন হয়। কারণ ধন দৌলত, মান ইজ্জত ও প্রভাব প্রতিপত্তির দিক থেকে জাতির আসল শক্তি যাদের করায়ত্তে ছিলো, তারা এই নয়া আন্দোলনকে অভিনন্দন জানালো এবং এর প্রত্যক্ষ সহায়তায় এগিয়ে এলো। ফলে ভারতের মুসলমানরা অতি দ্রুত ইংরেজি শিক্ষার দিকে এগিয়ে চললো। জাতির অকেজো ও অপদার্থ অংশটিকে পুরানো ধর্মীয় মাদ্রাসার জন্যে রেখে দেয়া হলো যাতে করে তারা মসজিদের ইমামতি ও মক্তব-মাদ্রাসায় শিক্ষকতার কাজ আঞ্জাম দিতে পারে। আর স্বচ্ছল ও স্বচ্ছন্দ শ্রেণীর উত্তম শিশুদেরকে ইংরেজি স্কুল-কলেজে পাঠানো হলো, যেনো তাদের নিষ্কলুষ মন-মগজে ফিরিঙ্গি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-কলার ছাপ অঙ্কিত হতে পারে।
এটা ছিলো ঊনিশ শতকের শেষ চতুর্থাংশের অবস্থা। ইউরোপে তখন বস্তুবাদের চরম উন্নতি ঘটে। ইতিপূর্বে আঠার শতকে বিজ্ঞান পুরোপুরি ধর্মকে পরাজিত করে।আধুনিক দর্শন ও নতুন বিজ্ঞানের নেতৃত্বে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ বিজ্ঞান ও নীতিশাস্ত্রের তাবত পুরনো মতবাদ বাতিল হয়ে নতুন মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। মোটকথা এইসব আধুনিক মতবাদের ভিত্তিতে ইউরোপে এক বিশেষ ধরনের কৃষ্টি ও সভ্যতার জন্ম হয়। এই বিরাট বিপ্লব জীবনের বাস্তব ক্রিয়াকাণ্ড থেকে ধর্ম এবং ধর্ম নির্দেশিত রীতিনীতিকে নির্বাসিত করে বটে, তবে চিন্তা ও কল্পনার জগতে ধর্মীয় প্রত্যয়ের কিছুটা প্রভাব তখনো বাকি ছিল। তাই তার বিরুদ্ধে এবার প্রচন্ড লড়াই শুরু হয়ে গেল। যদিও জ্ঞান বিজ্ঞানের কোনো একটি সূত্রও বিশ্বপ্রকৃতি সম্পর্কিত খোদায়ী মতবাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ (যাকে প্রকৃতই প্রমাণ বলা যায়) পেশ করতে পারেনি কিন্তু তবুও বিজ্ঞানীরা কোনরূপ দলীল প্রমাণ ছাড়াই নিছক ভাবাবেগের কারণেই খোদার প্রতি অপ্রসন্ন ও খোদায়ী মতবাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করতে থাকে। আর যেহেতু তখন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে তারাই ছিল দুনিয়ার নেতৃত্বের আসনে সমাসীন, তাই তাদের প্রভাবে খোদাবিমুখতার (Theophobia) ব্যাধি এক ব্যাপক মহামারীর ন্যায় ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে খোদার অস্তিত্বকে অস্বীকার করা বিশ্বপ্রকৃতিকে স্বাভাবিকভাবে সৃষ্ট এবং প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী চলমান বস্তু বলে মনে করা, খোদাপরস্তিকে কুসংস্কার আখ্যা দেয়া, ধর্মকে অনর্থক এবং ধার্মিকতাকে সংকীর্ণতা ও অন্ধত্ব বলে অভিহিত করা, প্রকৃতিবাদকে ঔদার্য ও স্বচ্ছ দৃষ্টির সমার্থক জ্ঞান করা তখন একটা ফ্যাশনে পরিনত হয়। এমনকি দর্শন ও বিজ্ঞানে যার এতটুকু জ্ঞান নেই এবং এই সকল জটিল প্রশ্ন গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধানের যে অনুপরিমাণ চেষ্টাও করেনি, এমন ব্যক্তিও শুধু সমাজে একজন আলোকপ্রাপ্ত লোক হিসেবে বিবেচিত হবার আকাঙ্খায় এই ধরনের মতবাদ জাহির করতো। ফলে আধ্যাত্মবাদ বা অতি প্রকৃতিবাদের সপক্ষে কিছু বলা বা লেখা তখনকার দিনে কুফরতুল্য অপরাধ ছিলো। এমনকি কোনো প্রখ্যাত বিজ্ঞানীও এ ধরনের কোনো মত প্রকাশ করলে বিজ্ঞানীদের মহলে তাঁর আর কোনো মর্যাদাই থাকতোনা, তাঁর তামাম কৃতিত্বই একেবারে ম্লান হয়ে যেত এবং তিনি বিদগ্ধ সমাজে আসন লাভেরই অনুপযুক্ত হয়ে পরতেন।
১৮৫৯ সালে ডারউইনের বিখ্যাত ‘প্রজাতির উত্স’ (Origin of Species) গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থটি প্রকৃতিবাদ ও নাস্তিকতাবাদের আগুনে তেল সংযোগের কাজ করে। অবশ্য ডারউইন তাঁর উদ্ভাবিত বিবর্তনবাদের সপক্ষে যে দলিল প্রমাণ পেশ করেন, তা ছিল নিতান্তই দুর্বল এবং প্রমাণ সাপেক্ষ। তাঁর মনগড়া বিবর্তন ধারায় কেবল একটি স্তরই নয়; বরং প্রতিটি বর্তমান স্তরের সামনে ও পেছনে অনেকগুলো স্তরই ছিলো অনুপস্থিত। ফলে বিজ্ঞানীরা এই মতবাদ সম্পর্কে তখন নিশ্চিত হতে পারেননি। এমনকি এর সবচেয়ে বড় প্রবক্তা হাক্সলে (Huxley) পর্যন্ত এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেননি। কিন্তু তা সত্বেও নিছক খোদাদ্রোহিতার কারণেই ডারউইনবাদকে গ্রহণ করা হলো। শুধু তাই নয়, তার সপক্ষে মাত্রাতিরিক্ত রকমের প্রচার চালানো হলো এবং সেটাকে ধর্মের বিরোধিতার, একটি প্রকান্ড অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হলো। কেননা, এই মতবাদটি বিজ্ঞানীদের ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে একটি বিরাট দাবিকে সপ্রমাণ করেছিল (অথচ ডারউইনবাদের আসল দাবিটিও ছিল প্রমাণ সাপেক্ষ)। তা হলো এই যে, গোটা বিশ্বপ্রকৃতি কোনো অতিপ্রাকৃতিক শক্তির সহায়তা ছাড়াই স্বাভাবিক নৈসর্গিক নিয়মে চালিত হচ্ছে। ধর্মবাদিগন এই মতবাদের ঘোর বিরোধিতা করলো। বৃটিশ এসোসিয়েশনের সভায় অক্সফোর্ড ও গ্লাডস্টোনের বিসপগন এর বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ করে ভাষণ দান করেন, কিন্তু তা সত্বেও তাঁরা পরাজিত হন। অবশেষে ইউরোপীয় ধর্মবাদিগন বৈজ্ঞানিক নাস্তিকতার সামনে এতখানি পরাভূত হলো যে, ১৮৮২ সালে ডারউইন মৃত্যুবরণ করলে ইংল্যান্ডের চার্চ তাকে সর্বশ্রেষ্ট সম্মানে ভুষিত করেন। অর্থাৎ তাঁকে ওয়েস্ট মিনিস্টার এবিতে সমাহিত করার অনুমতি দেয়া হলো। অথচ ইউরোপে ধর্মের কবর রচয়িতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন শিরোমণি। তিনিই চিন্তাধারাকে বস্তুতন্ত্র, নাস্তিকতা ও ধর্মদ্রোহিতার পথে চালিত করার ব্যাপারে প্রধাণ ভুমিকা গ্রহণ করেন। তিনি যে মানসিকতার গোড়াপত্তন করেন, তার ফলেই ইউরোপে বলশেকিভবাদ ও ফ্যাসিবাদ বিকাশ ও বৃদ্ধির সুযোগ লাভ করে।
বস্তুত এই সময়ই আমাদের যুবসমাজকে ইংরেজি শিক্ষা ও ফিরিঙ্গী সংস্কৃতির দ্বারা অনুগৃহীত হবার জন্যে ইংরেজি স্কুল ও কলেজে প্রেরণ করা হলো। তারা আগে থেকেই ইসলামী শিক্ষায় আনকোরা এবং ইসলামী সংস্কৃতিতে অপরিপক্ক ছিলো। পক্ষান্তরে ইংরেজ শাসন শক্তির সামনে পরাভূত এবং ফিরিঙ্গী সভ্যতার জাঁকজমকে ছিল মোহমুদ্গ্ধ। এর ফলে ইংরেজি স্কুলে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মানসিক কাঠামো বদলে গেলো। তাদের ঝোঁক প্রবনতা ধর্মের দিক থেকে ফিরে গেলো। কারন, ইউরোপের কোনো লেখক গবেষকের নাম কিছু পেশ করা হলে তাকে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেয়া এবং কুরআন, হাদিস ও ইসলামী মনিষীদের তরফ থেকে কিছু বলা হলে তার সপক্ষে প্রমাণ দাবি করা ছিলো ওই আবহাওয়ার সবচেয়ে প্রথম প্রভাব। এই পরিবর্তিত মানসিকতা নিয়ে তারা যে পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষা করলো, তার মূলনীতি ও শাখা প্রশাখার অধিকাংশই ছিল ইসলামের মূলনীতি ও শাখা প্রশাখার পরিপন্থী।
ইসলামে ধর্মের ধারণা হলো, তা হচ্ছে মানুষের জীবন বিধান। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্য ধর্মের ধারণা হচ্ছে তা একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস মাত্র, বাস্তব জীবনের সঙ্গে তার কোনই সম্পর্ক নেই। ইসলামে প্রথম জিনিস হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ইমান, আর পাশ্চাত্যে আদপেই আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকৃত নয়। ইসলামের গোটা কৃষ্টি ও সভ্যতাই ওহী ও রিসালাত সংক্রান্ত প্রত্যয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর পাশ্চাত্যে ওহীর সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ এবং রিসালাতের যথার্থতা সম্পর্কে সংশয় রয়েছে। ইসলামে আখিরাত বিশ্বাস হচ্ছে গোটা জীবন পদ্ধতি ও আচরণবিধির ভিত্তি, আর পাশ্চাত্যে এ ভিত্তিটাই ভিত্তিহীন বলে বিবেচিত। ইসলামে যেসব ইবাদত বন্দেগী ও ক্রিয়াকাণ্ড ফরয বলে গণ্য, পাশ্চাত্যে তা শুধু জাহিলি যুগের অর্থহীন প্রথার মাত্র। এইভাবে ইসলামের গত তাহযীব ও তমদ্দুন পাশ্চাত্যের কৃষ্টি সভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। আইনের ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হলো, আল্লাহই হচ্ছেন আইন প্রনেতা; রসুল আইনের ব্যাখ্যাদাতা, আর মানুষ শুধু আইনের অনুগত মাত্র। কিন্তু পাশ্চাত্যে আইন প্রণয়নে খোদার কোনো অধিকারই স্বীকৃত নয়। সেখানে আইন পরিষদ হচ্ছে আইন প্রনেতা আর জনগণ হচ্ছে পরিষদের নির্বাচক। রাষ্ট্রনীতিতে ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে খোদায়ী হুকুম কায়েম করা, আর পাশ্চাত্যের লক্ষ্য জাতীয় রাষ্ট্র। ইসলামের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে আন্তর্জাতিকতাবাদ আর পাশ্চাত্যের লক্ষ্যস্থল হচ্ছে জাতীয়তাবাদ। অর্থনীতিতে ইসলাম হালাল উপার্জন এবং যাকাত ও সদকা প্রদান ও সুদ বর্জনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে, আর পাশ্চাত্যের গোটা অর্থ ব্যবস্থাই সুদ ও মুনাফার ভিত্তিতে চালিত। নীতিশাস্ত্রে ইসলামের লক্ষ্য হচ্ছে আখিরাতের সাফল্য আর পাশ্চাত্যের লক্ষ্য হচ্ছে দুনিয়ার মঙ্গল।
অনুরূপভাবে সামাজিক বিষয়াদিতেও ইসলামের পথ প্রায় প্রতিটি ব্যাপারেই পাশ্চাত্যের পথ থেকে ভিন্নতর। পর্দা ও পোশাক, নারী পুরুষের সম্পর্ক, একাধিক বিবাহ, বিবাহ তালাক সংক্রান্ত আইন, জন্মনিয়ন্ত্রণ, পিতামাতার অধিকার, স্বামী স্ত্রীর অধিকার এবং এ ধরনের আরো বহুতরো বিষয়ে এ দু’ সভ্যতার পার্থক্য অনেক এবং এত প্রকট যে, তা বিস্তৃতভাবে বিবৃত করা নিষ্প্রয়োজন। এ পার্থক্যের কারণ এই যে, উভয় সভ্যতার মূলনীতিই পৃথক। আমাদের যুবসমাজ পরাভূত ও গোলামিসুলভ মানসিকতা এবং অসম্পূর্ণ ইসলামী শিক্ষা ও ট্রেনিংয়ের সঙ্গে যখন ওই পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষা এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবাধিনে ট্রেনিং লাভ করলো, তখন তার পরিনাম ফল যা হবার তা-ই হলো। তাদের মধ্যে ভালো মন্দ বিচারের কোনো যোগ্যতা সৃষ্টি হলো না। পাশ্চাত্য থেকে তারা যা কিছু শিখছিলো, তাকেই যথার্থ ও বিশুদ্ধতার মাপকাঠিরূপে গ্রহণ করলো। অতপর অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত জ্ঞান নিয়ে ইসলামের নীতি ও আইন কানুনকে তারা উক্ত মানদন্ডে যাচাই করতে লাগলো এবং কোনো বিষয়ে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য দেখতে পেলে কখনো পাশ্চাত্যের ভ্রান্তি উপলব্ধি করতে পারেনি; বরং ইসলামকেই ত্রুটিপূর্ণ মনে করে তার নীতিও আইন কানুনের সংশোধন ও পরিবর্তন করতে প্রস্তুত হলো।
ফলকথা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে আধুনিক শিক্ষা হিমালিয়ান উপমহাদেশের মুসলমানদের যতই কল্যাণ সাধন করুক না কেন, তাদের ধর্ম ও সভ্যতার যে বিরাট ক্ষতিসাধন করেছে, কোনো কল্যানের দ্বারাই তা পূর্ণ হতে পারেনা। (তর্জমানুল কুরআন: অক্টোবর ১৯৩৪ইং)
৩
আধুনিক কালের ব্যাধিগ্রস্ত জাতিসমূহ
আজ প্রাচ্য পাশ্চাত্য ও মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই একই বিপদে জড়িয়ে পড়েছে। তাহলো, নিরেট বস্তুতান্ত্রিকতার ক্রোড়ে লালিত এক সভ্যতা ও সংস্কৃতি এসে সবার উপর চেপে বসেছে। তাই সভ্যতার চিন্তা-পদ্ধতি ও কর্মকৌশল উভয়েরই ইমারত গড়ে উঠেছে ভ্রান্ত বুনিয়াদের ওপর। এর দর্শন, বিজ্ঞান, নৈতিকতা সামাজিকতা, রাজনীতি, আইন কানুন ইত্যাদি প্রত্যেকটি জিনিসই এক ভ্রান্ত জায়গা থেকে যাত্রা করে এক ভ্রান্ত পথে উত্কর্ষ লাভ করে এসেছে। আর বর্তমানে সে এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে, তার ধ্বংসের শেষ প্রান্ত খুবই নিকটবর্তী হয়ে পরেছে।
এই সভ্যতার সূত্রপাত হয়েছে এমন লোকদের মধ্যে, যাদের কাছে প্রকৃতপক্ষে খোদায়ী জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোনো স্পষ্ট ও পবিত্র উত্সই বর্তমান ছিলোনা। সেখানে ধর্মগুরু বা পুরোহিতদের অস্তিত্ব অবশ্যি ছিল; কিন্তু তাদের কাছে বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান বিজ্ঞান, খোদায়ী কানুন-এর কোনটাই বর্তমান ছিলনা। তাদের কাছে যে বিকৃত ধর্মীয় মতবাদটি ছিল, তা মানবজাতিকে চিন্তা ও কর্মের ক্ষেত্রে সোজা পথ প্রদর্শন করতে চাইলেও তা করতে মোটেই সক্ষম ছিলোনা। বরং তা শুধু পারতো জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি করতে। আর কার্যত সে তা-ই করলো। তার এই প্রতিবন্ধকতার ফলে যারা উন্নতি ও তরক্কীর জন্যে উৎসুক ছিল, তারা ধর্ম ও ধার্মিকতার উপর আঘাত হেনে এক ভিন্ন পথে যাত্রা করলো। এ পথে অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং অনুমান ও অন্বেষণ ছাড়া আর কোনই দিশারী ছিলোনা। এ দিশারিটি ছিলো সম্পূর্ণ অনির্ভরযোগ্য এবং নিজেই দিশারী ও আলোর মুখাপেক্ষী। তবু এটিই তাদের প্রধান নির্ভর হয়ে দাঁড়ালো। এর সাহায্যে তারা চিন্তা ভাবনা, গবেষণা, অনুশীলন ও সংগঠন পুনর্গঠনের পথে অনেক চেষ্টা সাধনা করলো। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা ভ্রান্তির সূচনা করে বসলো এর ফলে তাদের সমস্ত উন্নতির গতিধারায় এক ভ্রান্ত লক্ষ্যস্থলের দিকে নিবদ্ধ হলো। তারা ধর্মহীনতা ও বস্তুতান্ত্রিকতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে যাত্রা শুরু করলো। তারা বিশ্ব প্রকৃতিকে এভাবে দেখল যে, তার কোনো স্রষ্টা ও নিয়ন্তা (খোদা) নেই। বিশ্বজগত ও প্রাণীজগতের প্রতি এভাবে তাকালো যে, সত্যতা রয়েছে শুধু পর্যবেক্ষণ ও ইন্দ্রিয়ানুভূতির। এই দৃশ্যমান পর্দার আড়ালে আর কোনো বস্তুর অস্ত্বিত্ব নেই। এভাবে অভিজ্ঞতা ও অনুমানের সাহায্যে তারা প্রাকৃতিক নিয়মকে জানতে ও বুঝতে সক্ষম হলো বটে, প্রকৃতির স্রষ্টা অবধি পৌঁছতে পারলোনা।
অনুরূপভাবে তারা বিশ্বের ব্যবহারযোগ্য বস্তুনিচয়কে নিজেদের কর্তৃত্বাধীনে পেলো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো ব্যবহারও করলো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা যে ঐ গুলোর মালিক ও নিয়ামক নয়; বরং আসল মালিকের প্রতিনিধি মাত্র – এই ধারণা থেকেই তাদের মন মগজ একেবারে শূণ্য ছিলো। এই অজ্ঞতা ও অচেতনতা তাদেরকে দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহির মৌলিক ধারণা সম্পর্কে অচেতন করে দিয়েছিলো। এর ফলে তাদের গোটা কৃষ্টি ও সভ্যতাই ভ্রান্ত ভিত্তির ওপর গড়ে উঠে। তারা আল্লাহকে ছেড়ে ‘আত্মা’র পূজারী হয়ে দাঁড়ায় এবং ‘আত্মা’ আল্লাহর স্থান দখল করে তাদেরকে কঠিন ফিতনা ও বিভ্রান্তিতে নিক্ষেপ করে দেয়। সেই মিথ্যা খোদার বন্দেগীই আজ তাদেরকে চিন্তা ও কর্মের প্রতিটি খেতে এক মারাত্মক পথে টেনে নিয়ে চলছে। এ পথের মধ্যকার পর্যায়গুলো নেহাত ভীতিপ্রদ ও চোখ ধাঁধানো হলেও তার শেষ পরিনতি ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই নয়। সেই ভূয়া খোদাই বিজ্ঞানকে মানুষের ধ্বংসের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। নৈতিকতাকে আত্মপূজা, প্রদর্শনেচ্ছা, অবাধ্যতা ও উচ্ছৃঙ্খলতার ছাঁচে ঢালাই করে নিয়েছে। অর্থ ব্যবস্থার ওপর স্বার্থপরতার ও শয়তান চাপিয়ে দিয়েছে। সামাজিকতার শিরা উপশিরায় আত্মপূজা, বিলাসপ্রিয়তা ও আত্মকেন্দ্রিকতার হলাহল ঢেলে দিয়েছে। রাজনীতিকে জাতীয়তাবাদ, স্বদেশীকতা, বর্ণ ও গোত্রের পার্থক্য এবং শক্তি পূজার দ্বারা দুষিত করে মানবতার পক্ষে এক নিকৃষ্টতম অভিশাপ বানিয়ে দিয়েছে। ফলকথা পাশ্চাত্যের রেনেঁসা আসলে যে বিষবৃক্ষের বীজ রোপন করে, কয়েক শতকের মধ্যেই তা কৃষ্টি ও সভ্যতার এক বিরাট মহীরূহে পরিণত হয়। সে বৃক্ষের ফল সুমিষ্ট হলেও আসলে তা বিষদুষ্ট, তার ফল দেখতে সুন্দর ও সুদৃশ্য হলেও আদতে কাঁটাযুক্ত, তার শাখা প্রশাখায় বসন্তের শোভা থাকলেও তার থেকে প্রবাহিত বিষাক্ত বায়ু ভেতরে ভেতরে গোটা মানবতাকেই বিষাক্ত করে চলেছে।
যে পাশ্চাত্যবাসিগন এই বিষবৃক্ষকে সহস্তে রোপন করেছিল, তারা আজ নিজেরাই তার প্রতি বীতশ্রদ্ধ। কারণ সে বৃক্ষ জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগে এমন বিভ্রান্তি, জটিলতা ও পেরেশানির সৃষ্টি করেছে যে, তার যে কোনো প্রচেষ্টাই অসংখ্য জটিলতা ডেকে নিয়ে আসে। তার যে কোনো ডালই তারা কেটে ফেলে দেয়, সেখান থেকে, অসংখ্য কাঁটাযুক্ত ডাল ফুটে বেরোয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ তারা পুঁজিবাদের ওপর করাত চালালো, সঙ্গে সঙ্গে কম্যুনিজমের অভ্যুদয় ঘটলো। গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হানলো অমনি ডিক্টেটরবাদ আত্মপ্রকাশ করলো। সামাজিক সমস্যাবলীর সমাধান করতে গেল, সঙ্গে সঙ্গে নারিত্ববাদ ও জন্মনিয়ন্ত্রনের আবির্ভাব হলো। নৈতিক উচ্ছৃঙ্খলতার প্রতিকারের জন্যে আইন প্রয়োগের চেষ্টা করলো, তার ফলে আইন লঙ্ঘন ও অপরাধ প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। ফলকথা, কৃষ্টি ও সভ্যতার এই বিষবৃক্ষ থেকে বিকৃতি ও বিচ্ছৃঙ্খলতার এক অন্তহীন ধারা বেরিয়ে আসছে এবং তা পাশ্চাত্য জীবনকে আপদ মস্তক দু:খ কষ্ট ও ক্লেশের এক বিরাট ফোড়ার জ্বালা-যন্ত্রণা প্রতিটি শিরা উপশিরা ও স্নায়ুকেন্দ্রে অনুভূত হচ্ছে।
পাশ্চাত্য জাতিগুলো আজ সে ফোড়ার তীব্র যাতনায় আর্তনাদ করে উঠছে। তাদের হৃদয় মন উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে। তাদের আত্মা কোনো অমৃত রসের জন্যেছটফট করছে। কিন্তু অমৃতরস কোথায় পাওয়া যাবে, সে খবরই তাদের জানা নেই। তাদের অধিকাংশ লোক এখনো ভ্রান্তিতে লিপ্ত রয়েছে যে সমস্যার আসল উৎস হচ্ছে ঐ বিষ বৃক্ষের শাখা প্রশাখা মাত্র। তাই ডাল পালা কাটবার কাজেই তারা নিজেদের সমস্ত সময় ও মেহনত নিয়োজিত করেছে। কিন্তু তবু তারা বুঝতে পারে না যে, বিকৃতিটা ডাল পালায় নয়; বরং গাছের মূল শিকড়ে অবস্থিত। আর অসৎ বৃক্ষমূল থেকে সৎ ডাল পালা বেরুনোর প্রত্যাশা করা নির্বুদ্ধিতা বৈ কিছুই নয়।
পক্ষান্তরে আপন সভ্যতা বৃক্ষের মূলগত খারাপীকে উপলব্ধি করতে পেরেছে, এমন একটি ক্ষুদ্র দলও সেখানে রয়েছে।। কিন্তু যেহেতু তারা কয়েক শতক ধরে ঐ বৃক্ষের ছায়ায় প্রতিপালিত হচ্ছে এবং তারই ফল-ফলারি থেকে তাদের অস্থি গোশত গঠিত হয়েছে, তাই এর মূল ছাড়া অন্য কোনো মূল থেকে সৎ ডালপালা বিস্তৃত হতে পারে, তাদের মন মানস এ কথা উপলব্ধি করতে অক্ষম। ফলে উভয় দলের অবস্থা দাঁড়িয়েছে এক রকম। তারা অত্যন্ত ব্যাকুলতার সাথে তাদের যন্ত্রণা উপশমকারী কোনো জিনিস সন্ধান করে ফিরছে; কিন্তু তাদের অভীষ্ট বস্তুটি কি এবং তা কোথায় পাওয়া যাবে, এ খবরই তাদের জানা নেই।
বস্তুত পাশ্চাত্য জাতিগুলির সামনে কুরআন ও মুহাম্মদ সা.-এর আদর্শ ও কর্মনীতি পেশ করার এতাই উপযুক্ত সময়। আজ তাদের বলা দরকার, তোমাদের হৃদয় মন যে ইপ্সিত বস্তুটির জন্য উদ্বেলিত, তা হচ্ছে এই। যে অমৃতরসের জন্যে তোমরা চাতকের ন্যায় পিপাসার্ত, তা হচ্ছে এই। এ হচ্ছে এমন এক পূত পবিত্র মহীরুহ, যার মূল কাণ্ড এবং ডালপালা উভয়টাই সৎ। এর ফুল যেমন খুশবুদার, তেমনি কাঁটা মুক্ত। এর ফল যেমন সুস্বাদু, তেমনি প্রাণ সঞ্চারক। এর হাওয়া যেমন আরামদায়ক, তেমনি হৃদয়-মন শীতলকারী। এখানে তোমরা বাস্তব বিচার বুদ্ধির সন্ধান পাবে, চিন্তা ও দৃষ্টির একটি নির্ভুল কেন্দ্রবিন্দু খুজে পাব এবং সর্বত্তোম মানবীয় চরিত্র গঠনের উপযোগী জ্ঞানের সন্ধান পাবে। তোমরা এখানে এমন এক আধ্যাত্মিকের সন্ধান পাবে, যা সন্যাসী ও সংসার বৈরাগীদের জন্যে নয়; বরং দুনিয়ার কর্মক্ষেত্রে সংগ্রামকারীদের জন্যে আত্মিক শান্তি ও মানসিক স্বস্তির একমাত্র উৎস। এখানে তোমরা নৈতিকতা ও আইন কানুনের এমন উন্নত ও সুদৃঢ় বিধি ব্যবস্থা দেখতে পাবে, যা মানব প্রকৃতি সংক্রান্ত পুর্ণাঙ্গ জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং যা কখনো প্রবৃত্তির তাড়নায় বদলে যেতে পারে না। এখানে তোমরা কৃষ্টি সভ্যতার এমন নির্ভুল মূলনীতির সন্ধান পাবে, যা অবৈধ শ্রেণী-বৈষম্য ও কৃত্রিম জাতি-বিভেদকে নিশ্চিহ্ন করে মানব সমাজকে খালেস যুক্তিসঙ্গত ভিত্তির উপর সংগঠিত করে। সে মূলনীতি সাম্য, সুবিচার, উদারতা, দানশীলতা ও সদাচরণের এমন এক শক্তিময় ও সুসঙ্গত পরিবেশ সৃষ্টি করে, যাতে ব্যক্তি, শ্রেণী ও সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে স্বার্থ, অধিকার ও প্রয়োজনের খাতিরে দ্বন্দ, সঙ্ঘাত, লড়াই বাধবার কোনোই অবকাশ নেই; বরং সবাই এখানে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ব্যক্তিক ও সামাজিক কল্যানের জন্যে সানন্দে ও সন্তুষ্ট চিত্তে কাজ করতে পারে। কাজেই তোমরা যদি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে চাও, তাহলে এক প্রচণ্ড আঘাত এসে তোমাদের কৃষ্টি সভ্যতাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ইতিহাসের ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষ্টি সভ্যতাগুলোর শামিল করে দেবার আগেই ইসলামের বিরুদ্ধে তামাম বিদ্বেষকে তোমাদের মন থেকে মুছে ফেলে দাও। তোমাদের মধ্যযুগের ধর্মীয় উন্মাদদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে যে বিদ্বেষ লাভ করেছ এবং সেই অন্ধকার যুগের তামাম জিনিসের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করার পরও যাকে তোমরা আজ পযর্ন্ত আঁকড়ে ধরে রয়েছ, তাকে পরিহার করো এবং উদার মনে কুরআন ও মুহাম্মাদ সা.- এর মহান শিক্ষা সম্পর্কে অবহিত হও, তাকে গ্রহণ করো।
মুসলিম জাতিগুলোর অবস্থা পাশ্চাত্য জাতিগুলো থেকে কিছুটা ভিন্ন ধরণের। এদের রোগ যেমন আলাদা, রোগের কারণও ভিন্ন। কিন্তু তাদের চিকিৎসা পাশ্চাত্য বাসীদেরই অনুরূপ। অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর শেষ কিতাব ও শেষ নবীর মাধ্যমে যে জ্ঞান ও হেদায়াত পাঠিয়েছেন, তার দিকে প্রত্যাবর্তন করাই তাদের চিকিৎসা।
যে পরিস্থিতিতে ইসলামের সাথে পাশ্চাত্য সভ্যতার সংঘাত বেধেছে, তা ইসলাম ও অন্যান্য সভ্যতার মধ্যকার পুর্ববর্তী সংঘাত থেকে সম্পুর্ণ ভিন্ন ধরণের। রোমক, পারসিক, ভারতীয় ও চৈনিক সভ্যতার সঙ্গে যখন ইসলামের সংঘর্ষ বাধে, তখন ইসলাম তার অনুবর্তীদের চিন্তা ও কর্মশক্তির উপর পুর্ণ মাত্রায় কর্তৃত্বশীল ছিল। তাদের ভিতর জিহাদ ও ইজতিহাদের প্রচণ্ড ভাবধারা ক্রিয়াশীল ছিল। আধ্যাত্মিক ও বস্তুতান্ত্রিক উভয় দিক থেকেই তারা দুনিয়ায় এক বিজয়ী জাতির গৌরব অর্জন করেছিল এবং অন্য সব জাতির উপর নেতৃত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছিল। তখন দুনিয়ার কোনো কৃষ্টি সভ্যতাই তাদের কৃষ্টি সভ্যতার মোকাবিলায় দাড়াতে পারেনি। তারা যেদিকে এবং যে জাতির কাছেই পৌছেছে, তার চিন্তাদর্শ, মতাদর্শ, জ্ঞান-বিজ্ঞান, স্বভাব চরিত্র ও সমাজ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে। তাদের মধ্যে বাইরের প্রভাব গ্রহণের যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব বিস্তারের শক্তি ছিল অনেক বেশি। নিঃন সন্দেহে তারা অন্যদের কাছ থেকেও অনেক কিছু গ্রহণ করেছে; কিন্তু তাদের সভ্যতার মেজাজ এতোখানি সুদৃঢ় ও শক্তিশালী ছিল যে, বাহির থেকে এসে যা কিছুই তাতে যুক্ত হয়েছে, তা তার প্রকৃতির সাথে একেবারে খাপ খেয়ে গিয়েছে এবং বাইরের কোনো প্রভাবেই তার মেজাজে এতটুকু পার্থক্য সুচিত হয়নি। পক্ষান্তরে সে অন্যদের উপর যে প্রভাব বিস্তার করেছে, তা একেবারে বিপ্লবাত্মক বলে প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে কোনো কোনো অমুসলিম সভ্যতা তো ইসলামের মধ্যে বিলীন হয়ে নিজের স্বাতন্ত্রই বিলিয়ে দিয়েছে। আর যেগুলোর মধ্যে জীবনী শক্তি প্রবল ছিল সেগুলোও ইসলামের দ্বারা এতোটাই প্রভাবিত হয়েছে যে, তাদের মূলনীতিতে অনেক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। কিন্তু এ হচ্ছে তখনকার কথা, যখন মুসলমানদের ভেতর আদর্শের দীপশিখা অম্লান ও অনির্বাণ ছিলো।
মুসলমানরা কয়েক শতক ধরে লেখনী ও তরবারির সাহায্যে রাজত্ব চালিয়ে শেষ পর্যন্ত অবসন্ন হয়ে পড়ল। তাদের জিহাদী প্রাণশক্তি নিস্তেজ হয়ে পড়লো। ইজতিহাদী শক্তি নিষ্প্রভ হয়ে গেলো। যে মহা গ্রন্থ তাদের জ্ঞানের রৌশনি ও কর্মের শক্তি যুগিয়েছিলো, তাকে তারা নিছক একটি পবিত্র স্মৃতিশাস্ত্র বানিয়ে গেলাফবন্দি করে রেখেছে। যে মহান নায়কের অনুসৃত নীতি তাদের ক্রিস্টি ও সভ্যতাকে এক পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তবধর্মী জীবনাদর্শের রুপদান করেছিল, তার অনুসৃতিকে তারা বর্জন করল। তার ফলে তাদের উন্নতি ও তরক্কীর গতি স্তব্ধ হয়ে গেলো। প্রবাহমান স্রোতস্বিনী হঠাত নিশ্চল উপত্যকায় এসে গতিরুদ্ধ হয়ে ক্ষুদ্র সরোবরে পরিণত হলো। নেতৃত্ব ও কতৃত্বের আসন থেকে মুসলমানরা অপসারিত হলো। তাদের চিন্তাধারা জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্প সভ্যতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দুনিয়ার অন্য জাতির উপর যে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো, তার বাঁধন শিথিল হয়ে গেলো। পরন্তু ইসলামের মোকাবিলায় পাশ্চাত্যে এক ভিন্ন সভ্যতার অভ্যূদয় হলো। মুসলমানরা জিহাদ ও ইজতিহাদের যে ঝাণ্ডাকে দূরে নিক্ষেপ করেছিলো, পাশ্চাত্য জাতিগুলো তা নিজ হাতে তুলে নিলো। মুসলমানরা আরামে শুয়ে রইলো আর পাশ্চাত্যবাসী তাদের পরিত্যক্ত ঝাণ্ডা নিয়ে জ্ঞান বিজ্ঞান ও কর্মের ক্ষেত্রে এগিয়ে চললো। এমনকি যে নেতৃত্বের আসন থেকে অপসারিত হয়েছিল সেই আসনই এরা লাভ করলো। তাদের তরবারি দুনিয়ার অধিকাংশ এলাকাই জয় করলো। তাদের চিন্তাধারা, মতাদর্শ, জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্পকলা এবং কৃষ্টি ও সভ্যতার মূলনীতি সারা দুনিয়ার উপর ছড়িয়ে পড়লো। তাদের শাসন কতৃত্ব শুধু মানুষের দেহকেই নয়, তাদের দিল-দেমাগকেও অধিকারভুক্ত করে নিলো। অবশেষে কয়েক শতকের নিদ্রা থেকে জেগে উঠে মুসলমানরা চোখ মেলেই দেখতে পেলো, ময়দান সম্পুর্ণই তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে এবং অন্য লোকেরা এসে তার ওপর জেঁকে বসেছে। এখন জ্ঞান বিজ্ঞান, কৃষ্টি সভ্যতা, আইন কানুন ও রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে যা কিছুই আছে, সবই তাদের (মুসলমানদের) হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তাদের কাছে রয়েছে শুধু দীপ্তিহীন এক আলোক বর্তিকা।
আজকে ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে এক নতুন ধারায়। নিঃসন্দেহে পাশ্চাত্য সভ্যতা কোনো দিক দিয়েই ইসলামী সভ্যতার মোকাবিলা করতে সমর্থ নয়। এমনকি ইসলামের সঙ্গে যদি সংঘর্ষ বাধে, তবে দুনিয়ার কোনো শক্তিই তার সামনে টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইসলাম কোথায়? আজকের মুসলমানদের মধ্যে যেমন ইসলামী স্বভাব প্রকৃতি ও নৈতিক চরিত্রের বালাই নেই, তেমনি নেই ইসলামী চিন্তাধারা ও কর্মপ্রেরণা। তাদের মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ কোথাও সত্যিকার ইসলামী প্রাণ চেতনা নেই। তাদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের ব্যক্তিগত জীবনে যেমন ইসলামী আইন কার্যকর নয়, তেমনি নয় তাদের সামাজিক জীবনেও। তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির কোনো একটি শাখার ব্যবস্থাপনা প্রকৃত ইসলামী প্রণালীর উপর ভিত্তিশীল নয়। এমতাবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে নয়; বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে এক প্রাণবান, গতিশীল, জ্ঞানদীপ্ত ও কর্মচঞ্চল সভ্যতার সাথে মুসলমানদের নিশ্চল, জরাজীর্ণ ও অনগ্রসর সভ্যতার। আর এমনি অসম প্রতিযোগিতার ফলাফল যা হবার কথা, তাই হচ্ছে। মুসলমানরা ক্রমাগত পিছু হটছে। তাদের সভ্যতা পরাভূত হচ্ছে। ধীরে ধীরে তারা পাশ্চাত্য কৃষ্টির মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাদের মন মগজে দিন দিন পাশ্চাত্যপনা চেপে বসছে। পাশ্চাত্য ছাঁচে টাডেড় মাণোশীক কাঠামো গড়ে উঠছে। পাশ্চাত্যনীতির প্রেক্ষিতে তাদের চিন্তা ও দৃষ্টিশক্তির পরিশীলন হচ্ছে। তাদের ধ্যানধারণা, নৈতিকতা, অর্থনীতি, সামাজিকতা, রাজনীতি ইত্যাদি প্রতিটি জিনিসই পাশ্চাত্য রঙ্গে রঞ্জিত হচ্ছে। তাদের নব্য বংশধরগণের মনমানসে এই ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে যে, পাশ্চাত্য থেকে প্রাপ্ত বিধানই হচ্ছে সত্যিকার জীবন বিধান। সুতরাং এ পরাজয় হচ্ছে আসলে মুসলমানদের পরাজয়- ইসলামের পরাজয় নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত একে ইসলামের পরাভব বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই কঠিন বিপদে শুধু একটি দেশই পরিবেষ্টিত নয়। কেবল একটি জাতিই এ সংকটের মুখোমুখি নয়। আজ গোটা মুসলিম জাহানই এই ভয়াবহ বিপ্লবের পর্যায় অতিক্রম করে চলছে। প্রকৃতপক্ষে এই বিপ্লবের যখন সূত্রপাত হচ্ছিল, ঠিক তখন থেকেই সচেতন ভূমিকা গ্রহণ করা, আসন্ন সভ্যতার নীতি ও ভিত্তিমূলকে উপলব্ধি করা এবং পাশ্চাত্য দেশসমূহ পরিভ্রমণ করে এর বুনিয়াদী জ্ঞানবিজ্ঞান অধ্যয়ন করা ছিল আলিম সমাজের কর্তব্য। তাঁদের উচিত ছিলো, যেসব কার্যকরী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও বাস্তব প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে পাশ্চাত্য জাতিগুলো উন্নতি লাভ করেছে, ইজতিহাদী শক্তির দ্বারা সেগুলোকে আয়ত্বাধীন করে নিয়ে ইসলামী নীতির আলোকে মুসলমানদের শিক্ষা ও সমাজ জীবনে তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা। এতে করে যেমন শত শত বছরের নিষ্ক্রিয়তাজনিত ক্ষতি পূর্ণ হয়ে যেতো, তেমনি ইসলামের গাড়ীও আবার যুগের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম হতো। কিন্তু আক্ষেপের ব্যাপার হলো, খোদ আলিম সমাজই (ব্যতিক্রম ছাড়া) তখন ইসলামের সত্যিকার প্রাণচেতনা থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে না ছিল ইজতিহাদী শক্তি, না চিন্তা গবেষণার ক্ষমতা। তাঁদের বুদ্ধিমত্তা ও কর্ম শক্তিও লোপ পেয়েছিলো। খোদার কিতাব ও রসূলে খোদার আদর্শিক ও বাস্তব হেদায়াত থেকে ইসলামের সনাতন ও গতিশীল নীতি নির্ধারণ করে যুগের পরিবর্তিত অবস্থায় তাকে প্রয়োগ করার কোনো যোগ্যতাই তাঁদের মধ্যে ছিলোনা। তাঁদের মধ্যে পূর্ব পুরুষদের অন্ধ ও অনড় তাকলিদের ব্যাধি পুরোপুরি সংক্রমিত হয়েছিল। এর ফলে প্রতিটি জিনিসই তাঁরা এমন কিতাবাদিতে খোজ করতেন, যা কোনো কালোত্তীর্ণ খোদায়ী কিতাব ছিলোনা। তাঁরা প্রতিটি ব্যাপারেই এমন লোকদের মুখাপেক্ষী হতেন, যাদের মধ্যে নবীদের মত সময় ও পরিবেশের বন্ধনমুক্ত উদার দূরদৃষ্টি ছিলোনা। কাজেই সম্পুর্ণ পরিবর্তিত অবস্থায় মুসলমানদের সাফল্যজনক নেতৃত্ব দান করা তাঁদের পক্ষে কি করে সম্ভব ছিলো? তখন তো জ্ঞান বিজ্ঞান ও কর্মসাধনার ক্ষেত্রে এমন বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল, যার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করা কেবল খোদার পক্ষেই সম্ভবপর ছিলো। কিন্তু যুগ যুগান্তকালের আবরণ ভেদ করে সে পর্যন্ত পৌছবার মতো দৃষ্টিশক্তি কোনো সাধারণ মানুষের ছিলোনা।
একথা নিঃসন্দেহ যে, আলিম সমাজ নয়া সভ্যতা ও সংস্কৃতির মোকাবিলা করার জন্যে যথেষ্ট প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু মোকাবিলার জন্য প্রয়জনীয় উপায় উপকরণ ও সাজ সরঞ্জাম তাঁদের কাছে ছিলোনা। কারণ স্থরিবতার দ্বারা গতিশীলতার মোকাবিলা করা যায় না। তর্কশাস্ত্রের বলে যুগের গতিকে বদলানো যেতে পারেনা। নয়া অস্ত্রপাতির সামনে অকেজো মরচে ধরা হাতিয়ার কোনো কাজেই লাগতে পারে না। আলিম সমাজ যেসব পন্থায় জাতির নেতৃত্ব প্রদান করতে চাইছিলেন, তাতে সাফল্যের কোনো সম্ভাবনাই ছিলোনা। যে জাতি পাশ্চাত্য সভ্যতার বন্যা প্রবাহে বেষ্টিত হয়ে পড়েছিল, সে চোখের উপর ঠুলি বেঁধে এবং ইন্দ্রিয়ানুভূতিকে নিষ্ক্রিয় করে বন্যার অস্তিত্বকে কতক্ষণ অস্বীকার করতে এবং তার প্রভাব থেকে নিরাপদ থাকতে পারত? যে জাতির উপর আধুনিক সভ্যতা ও সংস্কৃতি রাষ্ট্রশক্তিসহ চেপে বসেছিলো, পরাভূত ও পদানত অবস্থায় সে তার বাস্তব জীবনকে ঐ সভ্যতার প্রভাব প্রতিপত্তি থেকে কিভাবে রক্ষা করতে পারতো? বস্তুত এমনি পরিস্থিতিতে যা হবার শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পরাজয় বরণের পর মুসলমানরা জ্ঞান বিজ্ঞান ও তাহযীব তমদ্দুনের ক্ষেত্রেও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো। আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি, মুসলিম জাহানের প্রতিটি দেশেই পাশ্চাত্যপনার তুফান মহামারীর বেগে ছড়িয়ে পড়ছে। আর তা বন্যা প্রবাহে ভাসতে ভাসতে মুসলমানদের নব্য বংশধরগণ ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূর থেকে দূরান্তরে চলে যাচ্ছে।
দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, আমাদের আলিম সমাজ আজ পর্যন্ত তাঁদের ভ্রান্তি উপলব্ধি করতে পারেননি। যে নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রথমদিকে আলিম সমাজ ব্যর্থতার গ্লানি বরণ করে নিয়েছিলেন, আজো প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশেই তাঁরা সেই একই দৃষ্টিভঙ্গির উপরই অবিচল রয়েছেন। কতিপয় ব্যতিক্রম ব্যক্তিত্বকে বাদ দিলে আলিম সমাজের সাধারণ অবস্থা হচ্ছে এই যে, যুগের বর্তমান গতি-প্রকৃতি ও মানসিকতার নতুন গড়নকে উপলব্ধি করার কোনো চেষ্টাই তাঁরা করেননা। যেসব বিষয় মুসলমানদের নব্য বংশধরগণকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোর প্রতি তাঁরা যত খুশি ঘৃণা প্রকাশ করতে প্রস্তুত; কিন্তু সে হলাহলের প্রতিকার করার মত ঝুকি গ্রহণ করতে তাঁরা অসমর্থ। আধুনিক পরিস্থিতিতে মুসলমানদের জন্য যে জটিল বৈজ্ঞানিক ও বাস্তব সমস্যাবলীর সৃষ্টি করেছে, সেগুলোর সমাধান করতে তাঁরা হামেশাই অপারগ। এর কারণ হলো, ইজতিহাদ ছাড়া ঐ সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভবপর নয়। অথচ ইজতিহাদকে এঁরা নিজেদের জন্যে হারাম করে নিয়েছেন। বস্তুত আজকে আমাদের আলিম সমাজ ইসলামের শিক্ষা ও তার বিধিব্যবস্থা প্রচার করার জন্যে যে পন্থা অবলম্বন করছেন তা আধুনিক শিক্ষিত লোকদেরকে ইসলামের সাথে পরিচিত করানোর পরিবর্তে উল্টো তাদেরকে বীতশ্রদ্ধ করে দেয়। এমনকি কখনো কখনো তাঁদের ওয়াজ নসীহত শুনে কিংবা তাঁদের রচনাবলী পড়ে স্বতস্ফূর্তভাবেই মন থেকে বলে উঠে, খোদা যেনো কোনো অমুসলিম বা পথভ্রষ্ট মুসলিমের কান পর্যন্ত এইসব অর্থহীন প্রলাপ না পৌছান! মোটকথা, আমাদের আলিম সমাজ তাঁদের চারদিক দু’শ বছরের পুরনো পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছেন।সেই পরিবেশ তাঁরা চিন্তা ভাবনা করেন, তার ভেতরেই তারা বাস করেন এবং তার উপযোগী কথাবার্তা তাঁরা বলেন। এ কথা নিসন্দেহ যে, এই সম্মানিত ব্যক্তিদের কল্যাণেই আজও দুনিয়ার ইসলামী জ্ঞান ভান্ডারের অমূল্য রত্নরাজি সংরক্ষিত রয়েছে এবং তাদের প্রচেষ্টার ফলেই আজ ইসলামী শিক্ষা যা কিছু বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু তাঁরা নিজেদের এবং সমসাময়িক যুগের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, তা-ই ইসলাম ও আধুনিক দুনিয়ার মধ্যে কোনরূপ সম্পর্ক স্থাপনে বাধার সৃষ্টি করছে। এর ফলে যারা ইসলামী শিক্ষার দিকে অগ্রসর হয়, তারা আর দুনিয়ার কোন কাজের উপযোগী থাকে না। আর যে দুনিয়ার কাজের যোগ্য হতে চায়, সে ইসলামী শিক্ষার সাথে সম্পূর্ণ অপরিচিত থেকে যায়। এই কারণেই আজ মুসলিম জাহানের দু’টি সম্পূর্ণ বিপরীতমূখী দলের অস্তিত্ব দেখা যায়। একদল ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইসলামী সভ্যতার নিশানবর্দার, কিন্তু জীবনের সর্বত্র মুসলমানদের নেতৃত্ব দানে অক্ষম। আর দ্বিতীয় দল মুসলামনদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ও রাজনীতির গাড়িকে চালিত করেছে বটে কিন্তু ইসলামের নীতি ও ভিত্তি, ইসলামী সভ্যতার প্রাণবস্তু এবং ইসলামের সমাজ পদ্ধতি ও তামাদ্দুনিক বিধি ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, অপরিচিত ও অনবহিত। এদের হৃদয়ের কোণে ঈমানের কিছুটা আলো রয়েছে বটে; অন্যান্য সবদিক থেকে এদের এবং অমুসলমানদের মধ্যে কোনোই পার্থ্যক্য নেই। কিন্তু যেহেতু জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বাস্তব কর্মশক্তি এই দলটিরই করায়ত্ব রয়েছে এবং এদের বাহুতেই গাড়ি চালানোর মত শক্তি রয়েছে, এজন্যই তারা মিল্লাতের গোটা গাড়িটি নিয়ে ভ্রান্তি ও গুমরাহীর পথে দ্রুত এগিয়ে চলছে। পথ থেকে তাদের ফিরিয়ে রাখা এবং সঠিক পথ প্রদর্শন করার মতোও আজ আর কেউ নেই।
আমি এই পরিস্থিতি লক্ষ্য করছি এবং এর ভয়ঙ্কর পরিণতিও নিজ চোখে দেখতে পাচ্ছি। যদিও নেতৃত্ব দান করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান-বুদ্ধি, অভজ্ঞতা ও যোগ্যতা আমার নেই এবং এমনি বিকৃত পরিবেশে, এতো বড় একটি জাতির সংশোধন করার মতো শক্তিও আমার নেই, তবু আল্লাহ আমার হৃদয়ে একটি ব্যথা দিয়েছেন। আজ সে সামন্য জ্ঞান ও বিচক্ষণতা তিনি আমায় দান করেছেন, তার সাহয্যে মুসলমানদের ঐ দু’টি দলকে ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতির আসল ও প্রকৃত উৎসের দিকে মনোযোগী হবার আহবান জানানো এবং সাফল্য ও ব্যর্থতার কোন তোয়াক্কা না করে নিজের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবার জন্য সেই ব্যথাই আমায় বাধ্য করেছে। কাজের শ্রেষ্ঠত্ব এবং নিজের দুর্বলতা দেখে আমার এই প্রচেষ্টাকে নিজের কাছেই তুচ্ছ বলে মনে হয়; কিন্তু সাফল্য বা ব্যর্থতা সবকিছুই হচ্ছে সর্বশক্তিমান আল্লাহর হাতে। আমার কাজ শুধু চেষ্টা করে যাওয়া। তাই সাধ্যানুযায়ী আমি আমার চেষ্টার পরিধিকে বিস্তৃত করতে চাই।
(তরজমানুল কুরআনঃ অক্টোবর ১৯৩৫ইং)
৪
মানবীয় আইন বনাম আল্লাহর আইন
১৯৩৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আমেরিকার মদ্য নিবারক আইনটি যথারীতি বাতিল ঘোষণা করা হয়। ফলে সভ্য দুনিয়ার অধিবাসীরা প্রায় চৌদ্দ বছর পর আবার নিরসের সীমা পেরিয়ে রসের চৌহদ্দীতে পদার্পন করে। প্রকৃতপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মিঃ পুজভেল্টের অভিষিক্ত হওয়াটাই ছিলো নিরসের ওপর রসের বিজয় লাভের প্রাথমিক ঘোষণা। এপ্রিল (’৩৩) মাসে একটি আইনের সাহায্যে শতকরা ৩১.২ ভাগ এ্যালকোহলযুক্ত মদকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। এরপর মাত্র কয়েক মাস অতিক্রান্ত না হতেই মার্কিন শাসনতন্ত্রের অষ্টাদশ সংশোধনীটি বাতিল করে দেয়া হলো। উক্ত সংশোধনী অনুযায়ি যুক্তরাষ্ট্রের চৌহদ্দীর মধ্যে মদের ক্রয়-বিক্রয়, আমদানী রফতানি ও চোলাই-প্রস্তুতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
বস্তুত আইনের সাহায্যে নৈতিকতা ও সামাজিক সংশোধনের এ ছিলো সবচাইতে বড় প্রচেষ্টা। দুনিয়ার ইতিহাসে এতো বড় প্রচেষ্টার আর কোনো দৃষ্টান্ত খঁজে পাওয়া যায়না। অষ্টাদশ সংশোধনীর আগে ‘এ্যন্টি সেলুন লীগ’ নামক সংস্থা কয়েক বছর ধরে পত্র-পত্রিকা, বক্তৃতা বিবৃতি প্রচারপত্র, নকশা-চিত্র, ম্যাজিক-লন্ঠন, ছায়াছবি এবং অন্যান্য বহুতরো উপায় আমেরিকানদের মন মগজে মদের অপকারিতাকে বদ্ধমূল করের দেবার চেষ্টা করছিল। এই বিরাট প্রচারকার্যে উক্ত সংস্থাটি পানির মতো অর্থের বন্যা ছুটিয়েছিল। অনুমান করা হয়েছে যে, আন্দোলনের সূচনা থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত শুধু প্রচারকার্যেই সাড়ে ছয়কোটটি ডলাল ব্যয়িত হয়েছে এবং মদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত বই-পুস্তক প্রকাশ করা হয়েছে, তার মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিলো নয়শো কোটির মতো!
এতদভিন্ন মদ্য নিবারক আইনটি কার্যকর করণে চৌদ্দ বছরে মার্কিন জাতিকে যে বিপুল ব্যয়ভার বহন করতে হয়েছি, তার মোটামুটি পরিমান ৬৫ কোটি পাউন্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সম্প্রতি ১৯২০ সালের জানুয়ারী থেকে ১৯৩৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়কার যে সংখাতত্ত্ব প্রকাশ করেছে তা থেকে জানা যায়, উক্ত আইনটি কার্যকর করার ব্যাপারে মোট দু’শ ব্যক্তি নিহত হয়েছে, ৫ লক্ষ ৩৪ হাজার ৩’শ ৩৫ জনকে কারারুদ্ধ করা হয়েছে, এক কোটি ৬০ লক্ষ পাউন্ড জরিমানা ধার্য করা হয়েছে এবং ৪০ কোটি ৪০ লক্ষ পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
জান ও মালের এই ভয়াবহ ক্ষতি এজন্যই বরদাশত করা হযেছিল যে, বিশ শতকের যে ‘সুসভ্য’ জাতির জ্ঞানের সূর্য্য মধ্যাহ্ন গগন পর্যন্ত উপনীত হয়েছে, তাকে দুষ্কৃতির উৎস থেক উৎসারিত বেশুমার আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও দৈহিক ক্ষতি সম্পর্কে অবহিত করা হবে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার পূর্বে ও পরে কয়েক বছরের ক্রমাগত প্রচেষ্টা –যাতে সরকারী শক্তিও অংশীদার ছিল- মার্কিন জাতির মদ্যপান সংক্রান্ত সংকল্পের সামনে ব্যর্থকাম হলো এবং শেষ পর্যন্ত ‘বিশ্ব-ইতিহাসের বৃহত্তম সংস্কার প্রচেষ্টা’ নিষ্ফল হলো্
মদ্য নিবাররন প্রচেষ্টার এই ব্যর্থতা এবং নিবারক আইনটির এই রদকরণের কারণ মোটেই এই নয় যে, মদের যেসব অপকারিতা দূর করার জন্য প্রচার প্রোপাগান্ডা ও আইনগত শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছিল, এক্ষণ সেগুলো উপকারী হয়ে দাড়িঁয়েছে অথবা কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্ক্রিয়া পূর্ব ঘোষিত ধারণাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে দিচ্ছে; বরং পূর্বের চেয়েও ব্যাপক ও বিপুল অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আজ এ সত্য স্বীকৃত হয়েছে যে, বেশ্যাবৃত্তি, ব্যভিচার, সমমৈথুন, চৌর্যবৃত্তি, জুয়াখেলা, হত্যাকান্ড এবং এমনিতরো অন্যান্য নৈতিক অপরাধ এই পাপ কেন্দ্রেরই ঘনিষ্ঠতম আত্মীয়। আর পাশ্চাত্য জাতিগুলোর নৈতিকতা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিকতার ধ্বংস সাধনে এর বিরাট ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু তবু মার্কিন সরকার এ করানে তার আইনটি প্রত্যাহার করে হারামকে হালাল করতে বাধ্য হয়েছে যে, মার্কিন জাতির বিপুল সংখ্যাধিক্য অংশ কোনো মতেই মদ ত্যাগ করতে প্রস্তুত হয়নি। তাই চৌদ্দ বছর আগে যে মার্কিন জনমত মদকে হারাম করেছিল, আজ আবার তাকে হালাল করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।
আমাদের জানা মতে, আজ পর্যন্ত কোনো ঘোরতর সুরা সমর্থকও মদ্যপানের ক্ষতিকে অস্বীকার করতে পারেনি, অথবা নিবারক আইন বিরোধিগণ ‘মদের আশীর্বাদ’ সম্পর্কে এমন কোনো তালিকা পেশ করতে সক্ষম হয়নি, যা তার ক্ষতির তুলনায় কিছুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে। মার্কিন কংগ্রেসে যখন জনমতের সমর্থনপুষ্ট অষ্টাদশ শাসনতান্ত্রিক সংশোধনী উত্থাপিত হয়েছিল, তখনই ‘রসহীনতা’ ও ‘রস-সমুদ্রের’ সমস্ত দিকের চুলচেরা বিশ্লষণ করা হয়েছিল। আর সেসব ক্ষতি ও অনিষ্টকারিতার প্রতি লক্ষ্য রেখেই কংগ্রেস উক্ত সংশোধনী বিলটি অনুমোদন করেছিল। ৪৬টি রাষ্ট্র উক্ত সংশোধনী সমর্থন করেছিল এবং প্রতিনিধি পরিষদ ও উচ্চ পরিষদ উক্তি সংশোধনী অনুসারে নিবারক আইন পাশ করেছিল। এসব কিছুই মার্কিন জাতির ইচ্ছা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছিল এবং যতোদিন নিষিদ্ধকরণের ব্যাপারটি কাগজ-পত্র ও লোকমুখে সীমিত ছিলো, গোটা জাতি সানন্দে তাকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু যখনই এই নিষেধাজ্ঞা বাস্ত ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হলো, সমগ্র মার্কিন জাতির চেহারাই তখন বদলে গেল। পাপাচারের অবর্তমানে একটিমাত্র রাত অতিবাহিত করেই দুনিয়ার সবচাইতে সভ্য, জ্ঞানী, সচেতন সত্যপ্রিয় এবং উন্নতিশীল জাতি একেবারে উম্মাদ হয়ে গেলো এবং বিরহের আবেগে সে এম কান্ডকারখানা শুরু করে দিলো, যা দেখে সন্দেহ হতে লাগলো যে, এ জাতি বুঝি প্রাচ্যকাব্যের কাল্পনিক প্রেমিকদের মতো বাস্তবিকই নিজের মাথা ঠুকে গুঁড়িয়ে ফেলবে।
এর ফলে অনুমোদিত মদ্যালয়গুলো বন্ধ হবার সাথে সাথে দেশের সর্বত্র অসংখ্য গুপ্ত মদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো। এসব আড্ডায় আইনের চোখে ধুলো দিয়ে মদ্যপান এবং তার কেনাবেচা জন্য বিচিত্র ধরণের কৌশল অবলম্বন করা হয়। কোনো ব্যক্তি তার কোনো বন্ধু বা প্রিয়জনকে এসব গুপ্ত মদ্যালয় এবং নির্দিষ্ট সঙ্কেতগুলো জানিয়ে দিলে তা একটি বিশেষ অনুগ্রহ বলে বিবেচিত হতো। পূর্বে সরকার লাইসেন্সপ্রাপ্ত মদ্যালয়গুলোর সংখ্যা, সেগুলোতে ব্যবহৃত মদের ধরন এবং তাতে যাতয়তকারীদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখতে পারতো। কিন্তু পাপাচারের এই আড্ডাগুলো ছিলো সরকারের নিয়ন্ত্রন সীমার বাইরে। এদের সংখ্যা ছিলো নিষিদ্ধকরণের পূর্বেকার অনুমোদিত শুঁড়ীখানাগুলোর চাইতে কয়েকগুন বেশী। পরন্তু এসব আড্ডায় স্বাস্থ্যের পক্ষে ভয়ানক ক্ষতিকর, নিকৃষ্ট ধরনের শরাব বিক্রি হতে লাগলো। তাতে অল্প বয়স্ক বালক-বালিকদের যাতায়ত অনেক বেড়ে গেলো। এর ভয়ঙ্কর পরিণতি দেখে যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তাশীল মহলে ব্যাপক উদ্বেগের সঞ্চার হলো। মদের দাম পূর্বের চাইতে কয়েকগুন বেশী চড়ে গেলো। মদ্য বিক্রয় এক বিরাট লাভজনক ব্যবসায়ে পরিণত হলো। ফলে লক্ষ লক্ষ লোক এই ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগ করলো। অন্যদিকে গোপন মদ্যালয় ছাড়াও অসংখ্য ভ্রাম্যমান মদ্য বিক্রেতার আবির্ভাব হলো। এসব চলমান মদ্যালয় স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, হোটেল-রেঁস্তোরা, প্রমোদকেন্দ্র এমনকি লোকদের ঘরে ঘরে পৌঁছে মদ্য বিক্রয় এবং নতুন নতুন খরিদ্দার সংগ্রহ করতে লাগলো। অনুমান করা হয়েছে যে, নিষিদ্ধকরণের পূর্বের চাইতে পরবর্তীকালে আমেররিকার শুঁড়ী-বিক্রেতার সংখ্যা অনুন্য দশগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। পরন্তু এই ব্যবসায় শহরের সীমা ডিঙ্গিয়ে গ্রামাঞ্চল অবধি বিস্তৃতি লাভ করেছে। ঘরে ঘরে শরাব তৈরির গোপন কারখানা প্রতিষ্টিত হয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষণার পূর্বে আমেরিকার মদ্য-চোলাইয়ের অনুমোদিত কারখানার সংখ্যা ছিলো মোট চারশ। নিষিদ্ধ ঘোষনার পর মাত্র ৭ বছরের মধ্যে ৭৯ হাজার ৪শত ৩৭ জন কারখানা মালিককে গ্রেফতার এবং ৯৩ হাজার ৮শত ৩১টি মদের দোকান বাজেয়াপ্ত করা হয়। এতদসত্ত্বেও মদের ব্যবসায় কিছুমাত্র হ্রাস পায়নি। বে-আইনি বিভাগের জনৈক সাবেক কমিশনার এক বিবৃতিতে বলেনঃ ‘আমরা সমগ্র কারখানা ও দোকানের মাত্র এ –দশমাংশ পাকড়াও করতে সমর্থ হয়েছি’।
এভাবে দেশে মদ্যপানের পরিমাণ অস্বাভিক রকম বেড়ে যায়। অনুমান করা হয় যে, নিষিদ্ধ আমলে মার্কিন জনসাধারণ প্রতি বছর ২০ কোটি গ্যালন মদ্যপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই পরিমাণটা ছিলো নিষিদ্ধ ঘোষণার পূর্ববর্তী পরিমাণের চাইতে অনেক বেশী।
এতো বিপুল পরিমাণে যে মদ ব্যবহৃত হয়, গুণগতো দিক দিয়ে তা ছিলো অত্যন্ত নিকৃষ্ট এবং স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর। এ সম্পর্কে চিকিৎসকদের অভিমত হচ্ছে এই; ‘এই বস্তুটিকে মদ বলার চাইতে বিষ বলাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। কারণ এটি কন্ঠনালী দিয়ে নিম্নে অবতরণর সঙ্গে-সঙ্গেই কলিজা ও মস্তিষ্কে এর বিষাক্ত প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। দু’দিন পর্যন্ত ঐ অঙ্গ দু’টি এর দ্বারা প্রভাবিত থাকে। এর নেশায় মানুষ কোনো সৎ চিন্তা ও সৎ কর্মের উপযোগী থাকেনা, বরং তার স্বভাব-প্রকৃতি গোলযোগ, উচ্ছৃঙ্খলতা ও অপরাধ প্রবণতার দিকে ধাবিত হয়।
এ ধরণের মদের ব্যবহারাধিক্যের ফলে আমেরিকাবাসির দৈহিক স্বাস্থ্য একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ নিউইয়র্ক শহরের সংখ্যাতত্ত্ব থেকে জানা যায় যে, ঘোষণার পূর্বে ১৯১৮ সালে এ্যালকোহলের প্রতিক্রিয়ায় রোগাক্রান্তদের সংখ্যা ৩৭৪১ এবং মৃত্যুবরণকারীদের সংখ্যা ছিলো ২৫২। আর ১৯২৬ সালে রোগাক্রান্তদের সংখ্যা ১১ হাজার এবং মৃত্যুবরণকারীদের সংখ্যা সাড়ে ৭ হাজারের গিয়ে উপনীত হয়। এতদভিন্ন যারা সরাসরি মদের প্রতিক্রিয়ায় প্রভাবিত হয়ে মৃত্যুবরণ কিংবা জীবনমৃত হয়ে পড়ে, তাদের সংখ্যা অনুমান করাই সম্ভব নয়।
এমনিভাবে অপরাধ, বিশেষত কিশোর ও যুবকদের অপরাধ প্রবণতা অস্বাভাবিক রকম বৃদ্ধি পায়। মার্কিন বিচারকদের একটি বিবৃতিতে বলা হয়: ‘আমাদের ইতিহাসে আর কখনো নেশাগ্রস্ত অবস্থায় এতো বিপুল সংখ্যক কিশোরকে গ্রেফতার করার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়না’। এভাবে কিশোর ও অল্পবয়স্কদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা মাত্রাতিরিক্ত রকমে বেড়ে যাবার পর যুবকদের সম্পর্কেও তদন্ত করা হয়। তার ফলে প্রমাণিত হয় যে, ১৯২০ সাল থেকে সমাজের মদ্যপান ও দুষ্কৃতিপরায়ণতা প্রতি বছর বিপুল হারে বেড়ে যাচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো শহরে ৮ বছরের মধ্যে শতকরা দু’শ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৩৩ সালে আমেরিকার জাতীয় অপরাধ সংস্থার (National Crime Council) ডিরেক্টর কর্ণেল মোস (Col. Moss) এ তথ্য প্রকাশ করেন যে, ‘বর্তমানে আমেরিকার প্রতি তিন ব্যক্তির মধ্যে একজন পেশাদার অপরাধী। পরন্তু আমাদের এখানে হত্যার অপরাধ শতকরা ৩’শ ভাগ বেড়ে গিয়েছে’।
মোটকথা, চৌদ্দ বছরে আমেরিকায় মদ্য নিরারনের যে ফলাফল প্রকাশ পায়, তার মোটামুটি বিবরণ হচ্ছে এইঃ
– লোকদের মন থেকে আইনের প্রতি মর্যাদাবোধ তিরোহিত হয় এবং সমাজের সর্বস্তরে আইন ভঙ্গ করার ব্যধি বিস্তার লাভ করে।
– মদ্যপান নিবারণের আসল লক্ষ্য অর্জিত হয়নি; বরং তার উল্টো নিষিদ্ধ ঘোষণার পর বস্তুটি পূর্বের চাইতেও বেশী পরিমাণে ব্যবহৃত হয়।
– নিবারক আইনটি কার্যকর করণে একদিকে সরকারের এবং অপরদিকে গোপনে মদ্য ক্রয়ের ফলে প্রজা সাধারণের অপরিমিত আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয় এবং এভাবে গোটা দেশের মেরুদন্ড ভেঙ্গে পড়ে্।
– রোগের প্রকোপ, স্বাস্থ্যহানি, মৃত্যুহার বৃদ্ধি, জনচরিত্রের বিপর্যয়, সামজের সকল স্তরে, বিশেষত নব্য বংশধরগণের মধ্যে দুষ্কৃতি ও পাপাচারের বিস্তৃতি এবং অপরাধমূলক কার্য অস্বাভাবিক রকমে বৃদ্ধি পায়।
এই ছিলো উক্ত আইনের নৈতিক ও তামাদ্দুনিক ফলাফল।
এই ফলাফল অর্জিত হয় এমন একটি দেশে, যাকে বিশ শতকের আলোকোজ্জ্বল যুগে সর্বাধিক সুসভ্য দেশ বলে গণ্য করা হয়। তার অধিবাসীরা উন্নতমানের শিক্ষা ও ট্রেনিংপ্রাপ্ত। জ্ঞান বিজ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার আলোকে তাদের মনমগজ আলোকদীপ্ত। তারা নিজেদের ভাল মন্দ ও লাভ ক্ষতি অনুধাবন করতে পুরোপুরি সমর্থ।
এই পরিণামফল প্রকাশ পায় এমন অবস্থায়, যখন কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এবং কয়েক’শ কোটি পত্র-পত্রিকা ও বই-পুস্তক প্রকাশ করে গোটা জাতিকে মদের অপকারিতা সম্বন্ধে মতর্ক করে দেয়া হয়েছিল।
এই ফলাফল আত্বপ্রকাশ করে এমন পরিস্থিতিতে, যখন মার্কিন জাতির এক বিরাট সংখ্যাগুরু অংশ নিষিদ্ধকরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভ করেছিলো এবং তাদের ইচ্ছানুসারেই নিবারক আইনটি পাশ হয়েছিলো।
সর্বোপরি এই পরিণামফলের অভিব্যক্তি ঘটে এমন অবস্থায়, যখন আমেরিকার মতো বিরাট রাষ্ট্র বিশ শতকের সর্বোত্তম শাসনযন্ত্রের সহায়তায় মদ্যপান ও মদবিক্রির মূলোচ্ছেদ করার জন্যে পূর্ণ চৌদ্দ বছর পর্যন্ত অবিচল ছিলো।
বস্তুত এই ফলাফল প্রকাশ না পাওয়া পর্যন্ত সরকার ও জনসাধারণ উভয়েরই সংখ্যাগুরু অংশ মদ্যপান নিষিদ্ধ ঘোষণার ব্যাপারে একমত ছিলো এবং এ কারণেই তা নিষিদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু যখন জানা গেলো যে, দেশবাসী কোন মতেই মদ্যপান ত্যাগ করতে সম্মত নয় এবং জবরদস্তিতে মদ বর্জন করানোর ফলে পূর্বের চাইতেও অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তখন সেই সরকার ও সংখ্যাগুরু জনসাধারণই আবার মদকে বৈধ করার ব্যাপারে মতৈক্যে উপনীত হলো।
এবার এমন একটি দেশের প্রতি একবার দৃষ্টিপাত করুন, যা আজ থেকে সাড়ে ১৩শ’ বছর পূর্বেকার অন্ধকার যুগে – যা সবচাইতে অন্ধকার যুগ বলে বিবেচিত হতো সে দেশের অধিবাসীরা ছিলো অশিক্ষিত। তাদের মধ্যে জ্ঞান বিজ্ঞান ও শিল্পকলার কোন নাম নিশানা পর্যন্ত ছিলোনা। তারা সভ্যতা ও সংস্কৃতির কোন সন্ধান জানতো না। তাদের মধ্যে লেখাপড়া জানা লোক হয়তো বা দশ হাজারে একজন পাওয়া যেত এবং তারও মান এতো নিম্ন যে, আজকের সাধারণ লোকও তার চাইতে বেশি জ্ঞান রাখে। বর্তমান যুগের সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান ও উপায় উপকরণ তখন মোটেই ছিলোনা। রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্র ছিলো একেবারেই প্রাথমিক অবস্থায় এবং তা কায়েম হবার পর মাত্র কয়েক বছরের বেশি অতিক্রান্তও হয়নি। তখনকার জনসাধারণ ছিলো মদের ভক্ত প্রেমিক। তাদের ভাষায় মদের প্রায় আড়াইশ’র মতো নাম ছিলো। সম্ভবত দুনিয়ার কোন ভাষায়ই এর এতো নামকরণ হয়নি। এটা ছিলো মদের প্রতি তাদের আসক্তির প্রমাণ। এর আরও একটি প্রমাণ হচ্ছে তাদের কাব্য সাহিত্য। তা থেকে জানা যায়, মদ্যপান ছিলো তাদের স্বভাবগত এবং তা বিবেচিত হতো তাদের জীবনধারণের পক্ষে একটি অপরিহার্য বস্তু হিসেবে।
এই পরিস্থিতিতে সেখানে মদ সম্পর্কে প্রশ্ন উঠলো। আল্লাহর রসূল স.-এর কাছে জিজ্ঞেস করা হলো, এ সম্পর্কে শরীয়তের বিধান কি? তিনি বললেন, আল্লাহর এরশাদ হচ্ছে এইঃ
(আরবী)
অর্থঃ ‘তারা তোমার কাছে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাওঃ এ দু’টিতে বড় বড় অপকার রয়েছে, অবশ্য লোকের জন্য কিছু উপকারিতাও আছে। কিন্তু এ দু’য়ের ক্ষতির পরিমাণ উপকারের চাইতে অনেক বেশি।’ (সূরা বাকারা: ২১৯)
এটা মদ সম্পর্কে কোন হুকুম ছিলোনা; বরং এতে মদের প্রকৃতি ও গুণাগুণ বিবৃত করে বলা হয়েছে যে, তাতে কল্যাণ ও অকল্যাণ উভয় জিনিসই বর্তমান রয়েছে। তবে অকল্যাণের দিকটিই বেশি শক্তিশালী। এই শিক্ষামূলক ঘোষণার ফলে জাতির একটি অংশ ততক্ষণাতই মদ্যপান ত্যাগ করল। এতদসত্ত্বেও মদ্যপায়ীরাই রইলো সংখ্যাগুরু।
এরপর আবার মদ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলো। কারণ কোন কোন লোক নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামায পড়তে গিয়ে ভুল করে ফেলত। এমতাবস্থায় রসূলে করীম স. আল্লাহর এই হুকুম শুনিয়ে দিলেনঃ
অর্থঃ ‘হে ঈমানদারগণ! নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা নামাযের কাছেও যেয়োনা; (নামায তোমাদের এমন অবস্থায় পড়া উচিত, যখন)তোমরা জানতে পারো যে, তোমরা কি বলছ।’ (সূরা নিসা: ৪৩)
এই আদেশ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই লোকেরা মদ্যপান করার জন্যে সময় নির্দিষ্ট করে নিলো। এরপর থেকে তারা সাধারণভাবে ফজর ও যোহরের মাঝখানে কিংবা এশার পর মদ্যপান করতে লাগলো, যাতে করে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামায পড়তে না হয় কিংবা নেশার কারণে নামায ত্যাগ করার প্রশ্ন উঠতে না পারে।
কিন্তু মদের আসল ক্ষতিকর দিকটি তখনও অনুদ্ঘাটিত ছিলো। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় লোকেরা প্রায় সময়ই গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করতো এবং তার পরিণতি খুনখারাবী পর্যন্ত পৌঁছতো। এ কারণে এ সম্পর্কে স্পষ্ট ও চূড়ান্ত নির্দেশ জানিযে দেবার প্রয়োজন হয়ে পড়লো। অতপর এরশাদ হলোঃ
(আরবী)
অর্থঃ ‘হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি, পাশাখেলা ইত্যাদি হচ্ছে শয়তানের উদ্ভাবিত নোংরা কাজ; সুতরাং ওগুলো তোমরা বর্জন করো। আশা করা যায়, এই বর্জনের ফলে তোমরা কল্যাণ লাভে সমর্থ হবে। শয়তান তো মদ ও জুয়ার সাহায্যে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বৈরিতা জাগিয়ে তুলতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখতে চায়। এটা জানার পরও কি তোমরা ওগুলো থেকে বিরত থাকবেনা? আল্লাহর আনুগত্য করো, রসূলের কথা শোনো এবং বিরত থাকো। কিন্তু তোমরা যদি অবাধ্যতা করো, তবে জেনে রেখো, আমার রসূলের কাজ হচ্ছে শুধু নির্দেশকে স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।’ (সূরা মায়িদা: ৯০-৯১)
এই নির্দেশ আসার সঙ্গে সঙ্গেই সুরা-রসিক ও মদ্য প্রেমিকগণ যারা মদের নামে নিজেদের জীবন পর্যন্ত উত্সর্গ করতে প্রস্তুত ছিলো – এর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লো। মদ্য নিবারণ সংক্রান্ত ঘোষণা শোনার সাথে সাথেই সুরা পাত্রগুলোকে ভেঙ্গে ফেলা হলো। মদীনার অলিগলিতে মদের বন্যা-প্রবাহ বয়ে গেলো। এক মজলিশে বসে দশ এগার জন সাহাবী সুরা পান করে নেশায় বুঁদ হয়েছিলেন। এরই মধ্যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘোষণাকারীর এই আওয়াজ কানে এলো যে, মদকে চিরদিনের জন্য হারাম করে দেওয়া হয়েছে। সেই নেশার ঘোরেই খোদায়ী হুকুমের প্রতি এমনি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হলো যে, সাহাবাগণ অনতিবিলম্বে সুরা পান বন্ধ করে দিলেন এবং সুরা পাত্রগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়া হলো। এক ব্যক্তি কোথাও বসে সুরাপান করছিলো। সে মুখে কেবল পেয়ালাটি তুলে ধরেছে, এমন সময় কেউ এসে মদ্য নিবারক আয়াতটি পড়ে শোনালো। অমনি তার মুখ থেকে পেয়ালাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। ফলে সে এক ফোঁটা মদও গলাধকরণ করতে পারলোনা।
এরপর যে ব্যক্তিই সুরা পান করেছে, তাকে জুতা, লাঠি, লাথি, ঘুসি ইত্যাদি দ্বারা শাস্তি দেয়া হয়েছে। পরে এর শাস্তিস্বরূপ ৪০টি করে বেত্রাঘাত দেয়া হতে লাগলো। শেষে ৮০টি বেত্রাঘাতের শাস্তি নির্দিষ্ট করে দেয়া হলো। ফলে আরবদেশ থেকে মদ্যপানের নাম নিশানা পর্যন্ত মুছে গেলো। এরপর ইসলাম যেখানেই গিয়েছে, বিভিন্ন জাতিকে স্বাভাবিকভাবেই সে ‘নিরস’ পরহেযগার বানিয়ে দিয়েছে। এমনকি, আজও ইসলামের প্রভাব অত্যন্ত দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ কোনরূপ ‘নিবারক আইন’ বা দণ্ডবিধি ছাড়াই মদকে সম্পূর্ণ বর্জন করে চলছে। মুসলিম জাতির মধ্যে সুরাপায়ীদের সংখ্যা যদি গণনা করে দেখা হয়, তাহলে আজও হয়তো এ জাতিকে দুনিয়ার অন্যান্য জাতির চাইতে বেশি পরহেযগার দেখা যাবে। পরন্তু এ জাতির মধ্যে যারা সুরাপান করে, তারাও একে অত্যন্ত গুনাহ্র কাজ বলে মনে করে। তাদের হৃদয় এজন্যে অনুতপ্ত হয় এবং অনেক সময় নিজে নিজেই তওবা করে এ কুঅভ্যাস ছেড়ে দেয়।
বস্তুত ন্যায় নীতি ও বিচার বুদ্ধির জগতে চূড়ান্ত ফয়সালা নির্ভর করে অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ওপর। এর সাক্ষ্যকে কখনো মিথ্যা বলে প্রমাণ করা যায়না।এখানে সবার সামনেদু’টি অভিজ্ঞতা রয়েছেঃ একটি আমেরিকার, দ্বিতীয়টি ইসলামের। উভয় অভিজ্ঞতার মধ্যকার পার্থক্য্ সুস্পষ্ট। এবার এ দু’টি অভিজ্ঞতার তুলনা করে এ থেকে শিক্ষালাভ করে এ থেকে শিক্ষালাভ করা প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তিরই কর্তব্য।
আমেরিকায় বছরের পর বছর ধরে মদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হয়েছে। এর অপকারিতা বিবৃত ও বিজ্ঞপিত করার কাজে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। চিকিত্সা বিজ্ঞান, সংখ্যাতাত্বিক প্রমাণ এবং যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে তার শারীরিক, নৈতিক ও আর্থিক অনিষ্টকারীতাকে এমনিভাবে প্রতিপন্ন করা হয়েছে যে, তা অস্বীকার করা কিছুতেই সম্ভবপর নয়। ছবির সাহায্যে মদের অপকারিতাকে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করানো হয়েছে। জনসাধারণ যাতে নিজেরাই মদের অনিষ্টকারীতা বুঝতে পেরে তা বর্জন করতে প্রস্তুত হয়, সর্বোতভাবে তার চেষ্টা করা হয়েছে। তাছাড়া জাতির সবচাইতে বড় প্রতিনিধিত্বশীল সংস্থা Congress বিপুল ভোটাধিক্যে মদ্য নিবারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং এর জন্যে প্রয়োজনীয় আইনও পাশ করে। সর্বোপরি তার কেনাবেচা. চোরাই-প্রস্তুতি ও আমদানি-রপ্তানিকে বন্ধ করার জন্যে সরকার (যে সরকার তত্কালীন দুনিয়ার বৃহত্তম শক্তিবর্গের অন্যতম) তার সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করে। কিন্তু জাতি (যে জাতি তখনকার শিক্ষিত ও আলোকপ্রাপ্ত জাতিগুলোর অগ্রনায়ক ছিলো) তাকে বর্জন করতে সম্মত হয়নি। অবশেষে চৌদ্দ–পনের বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই তারা হারামকে আবার হালাল করতে বাধ্য হয়ে গেলো।
অপরদিকে ইসলামী রাষ্ট্রে মদের বিরুদ্ধে কোন প্রচারণা চালানো হয়নি। সেখানে প্রচার-প্রোপাগাণ্ডা বাবদ একটি পয়সাও ব্যয়িত হয়নি। কোন ‘এ্যান্টি সেলুন লীগ’-ও গঠন করা হয়নি। সেখানে আল্লাহ্র রসূল কেবল এইটুকু বলে দিয়েছেন যে, ‘আল্লাহ্ তোমাদের জন্য মদকে হারাম করে দিয়েছেন।’ তাঁর মুখ থেকে এই নির্দেশটি বেরুবার সঙ্গে সঙ্গেই গোটা জাতি (যে জাতি মদের প্রেমে আমেরিকার চাইতেও বেশি অগ্রবর্তী ছিলো এবং পারিভাষিক জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তায় কেউ তার সমকক্ষ ছিলোনা) সুরাপান থেকে বিরত হলো। তারা মদকে এমনিভাবে বর্জন করল যে, ইসলামের সীমার মধ্যে থেকে তাদের পক্ষে ‘রসহীনতা’ থেকে ‘রসসমুদ্রে’ প্রত্যাবর্তন করা অসম্ভব হয়ে গেলো। পরন্তু এই ‘রসহীনতা’র মধ্যে আবদ্ধ থাকার জন্যে তাদের কোন অনুশাসন, কোন জিজ্ঞাসাবাদ বা কোন দণ্ডবিধিরও প্রয়োজন রইলোনা। কারণ কোন জবরদস্তি শক্তি বর্তমান না থাকলেও তারা সুরাপান থেকে বিরত থাকবে। সর্বোপরি এমন কোনো হারামও নয় যে, একে কোন রকমে আবার হালাল করা যেতে পারে। যদি তামাম দুনিয়ার মুসলমানও মদের স্বপক্ষে সর্বসম্মতভাবে ভোট দেয়, তবুও এ হারাম কখনো হালাল হতে পারেনা।
এই বিরাট তারতম্যের কারণ অনুসন্ধান করলে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা যাবে। সে বিষয়গুলো শুধু মদের ব্যাপারেই নয়; বরং আইন ও নীতি শাস্ত্রের সমস্ত প্রশ্নেই মূলনীতি হিসেবে প্রযোজ্য।
প্রথম কথা এই যে, মানবীয় বিষয়াদিস সংগঠন ও পরিচালনায় ইসলাম ও পার্থিব বিধি ব্যবস্থার মধ্যে একটি মৌল পার্থক্য আছে। আর পার্থিব বিধি ব্যবস্থা নির্ভর করে সম্পূর্ণ মানবীয় অভিমতের ওপর। এই কারণেই তা শুধু সামগ্রিক ও মৌলিক ব্যাপারেই নয়, বরং প্রতিটি খুঁটিনাটি ব্যাপারেই সাধারণ কিংবা বিশিষ্ট লোকদের অভিমতের শরণাপন্ন হতে বাধ্য। আর মানবীয় অভিমতের (তা সাধারণ লোকদের হোক কি বিশিষ্ট লোকদের) অবস্থা হচ্ছে এই যে, প্রতিটি মূহুর্তে তা অভ্যন্তরীণ ঝোঁক প্রবণতা, বাহ্যিক কার্যকারণ এবং জ্ঞান বুদ্ধির পরিবর্তনশীল নির্দেশের দ্বারা (তা হামেশা নির্ভুল হবে এমন কোনো কথাও নেই) প্রভাবিত হতে থাকে। এই প্রভাবের ফলে চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে হামেশা পরিবর্তন দেখা দেয়। এই পরিবর্তনের অনিবার্য ফলেই ভাল-মন্দ, ভুল-নির্ভুল, বৈধ-অবৈধ এবং হারাম-হালালের মানদণ্ড পরিবর্তিত হতে থাকে। আর এই পরিবর্তনের ফলে আইনের পরিবর্তনও অনিবার্য হয়ে পড়ে। এভাবে সেখানে নৈতিকতা ও সভ্যতার কোনো স্থায়ী, সুদৃঢ় ও অপরিবর্তনীয় মানদণ্ড কায়েম হতে পারেনা। মানুষের মতো বৈচিত্র্য সেখানে আইনের ওপর কর্তৃত্ব করে, আর আইনের বৈচিত্র কর্তৃত্ব করে মানব জীবনের ওপর। এর দৃষ্টান্ত হলো, যেনো কোনো আনকোরা ড্রাইভার মোটর চালনা করছে। তার অপরিপক্ক হাতে অনিয়মিতভাবে গাড়ির স্টিয়ারিং এদিক সেদিক ঘুরিয়ে দিচ্ছে। এই অনিয়মিত ঘুরানোর ফলে মোটরের গতিও অনিয়মিত ও অনিশ্চিত হবে। সে দৃঢ়তার সাথে কোনো নির্দিষ্ট পথে চলতে পারবেনা। আর গাড়ি যখন এলোমেলোভাবে চলতে থাকবে, তখন খোদ ড্রাইভারের ওপরই প্রভাব পড়বে। কখনো সে সোজা পথে চলতে থাকবে, আবার কখনো চলবে বাঁকা পথে। কখনো কোনো গর্তে গিয়ে পড়বে, আবার কখনো কোনো প্রাচীরের সাথে সংঘর্ষ বাঁধাবে। আবার কখনো তা উঁচুনিচু, বন্ধুর পখে চলতে গিয়ে হোঁচট খাবে।
পক্ষান্তরে ইসলামী আইন ও নীতিশাস্ত্রের গোটা মূলবস্তু এবং বেশির ভাগ খুঁটিনাটি বিষয়ই আল্লাহ এবং রসূল কর্তৃক নির্ধারিত। সেখানে মানবীয় অভিমতের বিন্দু পরিমাণও স্থান নেই। তবে জীবনের পরিবর্তনশীল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ঐ মৌলিক বিধান ও খুঁটিনাটি দৃষ্টান্ত অনুসারে প্রয়োজনমতো ছোটখাট ব্যাপারে নয়া আইন রচনার অধিকার মানুষের রয়েছে। কিন্তু সে আইনও অনিবার্যভাবে শরয়ী মূলনীতির আলোকেই রচিত হতে হবে। বস্তুত এই খোদায়ী আইনের ফলেই আমাদের কাছে নৈতিকতা ও সভ্যতার একটি স্থায়ী ও অপরিবর্তনশীল মানদণ্ড বর্তমান রয়েছে। আমাদের নৈতিক ও সামাজিক বিধি-ব্যবস্থায় বৈচিত্র ও বিভন্নমুখিতার কোনো নাম নিশানা পর্যন্ত নেই। আমাদের গতকালকার হারাম আজকে হালাল এবং আগামীকাল আবার হারাম হতে পারেনা। এখানে যা হারাম করা হয়েছে, তা চিরকালের জন্যেই হারাম আর যা হালাল করা হয়েছে, তা কিয়মত অবধি হালাল। আমরা আমাদের মোটরের স্টিয়ারিং এক সুনিপুণ ও সুদক্ষ ড্রাইভারের হাতে সঁপে দিয়েছি। তিনি আমাদের মোটরকে সোজা পথে চালিত করবেন, এব্যাপারে আমরা নিশ্চিন্ত :
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۖ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّالِمِينَ ۚ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ
অর্থঃ আল্লাহ্ ঈমানদার লোকদের একটি সুনিশ্চিত বাণীর সাহায্যে দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে স্থিতি ও দৃঢ়তা দান করেন, আর যালিম ও অবাধ্য লোকদের তিনি পথভ্রষ্ট করে দেন, যাতে করে তারা কোথাও স্থিতি লাভ করতে না পারে।’ (সূরা ইব্রাহীম : ২৭)
এর ভেতরে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিহিত রয়েছে। তাহলো, বৈষয়িক রাষ্ট্রে মানব জীবনের জন্যে কোনো বিধি-ব্যবস্থা প্রণয়ন কিংবা নৈতিক চরিত্র, সমাজ ব্যবস্থা ও তামাদ্দুনিক কাঠামোর সংশোধনের নিমিত্ত কোনো বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হলে নেহায়েত খুঁটিনাটি ব্যাপারেও জনগণের সম্মতির অপেক্ষা করতে হয়। তার আইন কানুনের প্রত্যেকটি ধারা কার্যকরীকরণে জনমতের উপরে নির্ভরশীল হতে হয়। জনগণের মতের বিরুদ্ধে যে সংস্কার বা গঠনমূলক আইনই কার্যকরী করা হোক, শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করতেই হয়। এটা শুধু আমেরিকার অভিজ্ঞতাই নয়; বরং দুনিয়ার সমস্ত অভিজ্ঞতাই একথার সাক্ষ্য বহন করে। এ থেকে এ সত্যই প্রমাণিত হয় যে, মানব চরিত্র ও সমাজ ব্যবস্থার সংশোধনের বেলায় পার্থিব আইন সম্পূর্ণ অক্ষম ও অনুপযোগী। কারণ সে আইন বিকৃত জনসমষ্টির সংশোধন করার প্রয়াসী, তার মঞ্জুরী অমঞ্জুরী বা প্রত্যাবর্তন প্রত্যাহারের জন্যেও সেই জনমতের ওপরেই তাকে নির্ভর করতে হয়।
ইসলাম এই জটিলতার নিরসন করেছে অন্য একটি উপায়ে; আর একটু তলিয়ে চিন্তা করলেই দেখা যাবে যে, এ ছাড়া এই সমস্যার আর কোনো সমাধান নেই। তাহলো এই যে, নৈতিক চরিত্র, সমাজনীতি ও তামাদ্দুনিক প্রশ্নাবলী উত্থাপন এবং শরয়ী বিধানের প্রতি আনুগত্যের দাবি জানানোর পূর্বে সে গোটা মানব জাতিকে আল্লাহ্, তাঁর রসূল এবং তাঁর কিতাবের প্রতি ঈমান পোষণের আহ্বান জানায়। অবশ্য ঈমান আনা বা না আনা মানুষের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ঈমান আনবার পর তার ইচ্ছা বা অনিচ্ছার আর কোনো প্রশ্ন থাকেনা। অতপর আল্লাহ্র তরফ থেকে তাঁর রসূল যে নির্দেশই দান করেন এবং আল্লাহ্র কিতাব যে আইনই নির্দিষ্ট করে দেয়, তার আনুগত্য তার পক্ষে অপরিহার্য। এই মূলভিত্তি স্থাপনের পর ইসলামী শরীয়তের তামাম বিধিব্যবস্থা তার ওপর কার্যকরী হয়ে যাবে। এরপর আর কোনো খুঁটিনাটি বা মৌলিক প্রশ্নেই তার সদিচ্ছা বা অনিচ্ছার কোনো স্থান থাকবেনা। এ কারণেই শত শত কোটি টাকার অপচয়, অতুলনীয় প্রচার প্রোপাগান্ডা এবং রাষ্ট্রশক্তির অপরিমেয় প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমেরিকায় যে কাজ সম্ভব হয়নি, তা ইসলামী রাষ্ট্রে আল্লাহ্র তরফ থেকে রসূলের একটিমাত্র ঘোষণায়ই হয়ে গিয়েছে।
তৃতীয় শিক্ষামূলক বিষয় এই যে, কোনো মানব সমাজ জ্ঞান বিজ্ঞান ও শিল্পকলার দীপ্তিতে যতোই প্রদীপ্ত হোক এবং বুদ্ধিবৃত্তিতে যতো উন্নতির শিখরেই আরোহণ করুক না কেনো, সে খোদায়ী আইন কানুনের অনুগত ও আজ্ঞানুবর্তী না হলে এবং তার ভেতর ঈমানী শক্তি পয়দা না হলে নিজের বল্গাহীন প্রবৃত্তির কবল থেকে সে কখনো মুক্তিলাভ করতে পারেনা। তার ওপর প্রবৃত্তির দুর্বার আকাঙ্খা চেপে বসবে। ফলে তার প্রবৃত্তি যে বস্তুটির প্রতি আকৃষ্ট হবে, তার অপকারিতা সূর্যালোকের চাইতে উজ্জ্বল করে দেখালেও তার বিরুদ্ধে বিজ্ঞানকে (অর্থাৎ বুদ্ধি পূজারীদের উপাস্য) সাক্ষী হিসেবে এনে দাঁড় করালেও তার মোকাবেলায় সংখ্যাতাত্ত্বিক সাক্ষ্য পেশ করলেও (যা বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে কখনো মিথ্যা হতে পারেনা) এবং তার অনিষ্টকারীতাকে অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণলদ্ধ জ্ঞানের সাহায্যে প্রমাণ করে দিলেও সে কখনো অই প্রিয় বস্তুটি বর্জন করবেনা। এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, মানুষের ভেতর নৈতিক চেতনা সঞ্চয় করা, তার বিবেক বুদ্ধিকে পরিচালিত করা এবং তার মধ্যে আপন প্রবৃত্তিকে বশীভূত করার মতো শক্তির সৃষ্টি করা দর্শন, বিজ্ঞান বা বুদ্ধিবৃত্তির কাজ নয়। এ কাজ ঈমান ছাড়া আর কোনো উপায়ে সম্পন্ন হতে পারেনা। (প্রথম প্রকাশঃ তরজমানুল কুরআন : জানুয়ারি ১৯৩৪ সাল)
৫
পাশ্চাত্য সভ্যতার আত্মহত্যা
রাষ্ট্রনীতি, ব্যবসায় বাণিজ্য, শিল্পকলা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য জাতিগুলোর বিস্ময়কর উন্নতি ও অগ্রগতি একশ্রেণীর লোকের মন মগজ অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। তাদের মনে এই ধারণার সঞ্চার হয়েছে যে, ঐ জাতিগুলোর উন্নতি ও তরক্কী হয়তো বা অক্ষয়, অবিনশ্বর। দুনিয়ায় তাদের প্রভুত্ব ও আধিপত্য চিরতরে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। পৃথিবীর রাজত্ব ও উপায় উপকরণের কর্তৃত্বের ব্যাপারে একেবারে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ দেয়া হয়েছে। তাদের শক্তি ও ক্ষমতা এমনই মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত যে, তা উৎখাত করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।
বস্তুত এটা কোনো নতুন ধারণা নয়; বরং প্রত্যেক যুগের প্রতাপশালী জাতিগুলো সম্পর্কেই এরূপ ধারণা পোষণ করা হয়েছে। মিসরের ফিরাউন বংশ, আরবের আদ ও সামূদ, ইরাকের কালদানি, ইরানের কিসরা, গ্রীসের দিগ্বিজয়ী বীর, রোমের বিশ্ববিশ্রুত সম্রাট, জগজ্জয়ী মুসলিম মুজাহিদ, তাতারীদের দুনিয়াখ্যাত সেনাবাহিনী প্রমুখ সবাই এই পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে একই রূপ প্রতাপ ও শক্তির তামাসা দেখিয়ে গেছেন। পালাক্রমে এরা প্রত্যেকেই আপন আপন ভোজবাজির নৈপুণ্য দেখিয়ে একইভাবে দুনিয়ার মানুষকে বিস্মিত করে দিয়েছেন। যখন যে জাতিই মাথা তুলেছে, এভাবেই সে দুনিয়ার ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। এমনি করেই সে বিশ্বময় নিজের খ্যাতি, যশ ও বীর্যবত্তার ডঙ্কা বাজিয়েছে আর এভাবেই দুনিয়ার মানুষ ধারণা করে নিয়েছে যে, তাদের শক্তি ও ক্ষমতা অক্ষয়, অবিনশ্বর। কিন্তু তাদের আয়ুষ্কাল যখন পূর্ণ হয়ে গিয়েছে এবং অক্ষয় ও অবিনশ্বর ক্ষমতার অধিকারী সম্রাট তাদের কর্তৃত্বের অবসান ঘোষণা করেছেন, তখন তাদের এমনি পতন ঘটেছে যে, অধিকাংশ জাতিই দুনিয়ার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। কোনো কোনোটির নাম-নিশানা দুনিয়ায় থাকলেও তারা তাদের শাসিতের শাসনাধীন, গোলামদের গোলাম এবং পদানতদের পদানত হয়েই বেঁচে রয়েছে :
قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِكُمْ سُنَنٌ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ
অর্থঃ তোমাদের পূর্বে অনেক যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। পৃথিবীতে ঘুরে দেখো, যারা (আল্লাহ্র বিধান) অস্বীকার করেছে, তাদের পরিণাম কি হয়েছে!’ (সূরা আলে ইমরানঃ আয়াত ১৩৭)
বস্তুত বিশ্বপ্রকৃতির গোটা ব্যবস্থাপনাই এমনি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যে, এখানে কোনো স্থিতি ও বিরতির অবকাশ নেই। এখানে এক অবিশ্রান্ত গতি, পরিবর্তন ও আবর্তন বিদ্যমান। এটি কোনো জিনিসকেই এক অবস্থায় টিকে থাকতে দেয়না। এখানে সৃষ্টির সাথে লয়, ভাঙ্গার সাথে গড়া, উত্থানের সাথে পতন হাত ধরাধরি করে চলছে। এমনিভাবে এর বিপরিত নিয়মও চালু রয়েছে। আজ একটি মাষা পরিমাণ বীজ যেখানে বাতাসের বেগে উড়ে উড়ে বেড়ায় কাল তা-ই মাটিতে স্থিতি লাভ করে এক প্রকান্ড ডালপালাযুক্ত বৃক্ষে পরিণত হয়। আবার পরদিন তা-ই শুকিয়ে মাটিতে একাকার হয়ে যায়। অতপর প্রকৃতির সঞ্জিবনী শক্তিগুলো তাকে ত্যাগ করে অপর কোনো বীজের লালন পালনে নিয়োজিত হয়। এই হচ্ছে জীবনের ভাঙ্গা গড়া ও উত্থান পতনের নিয়ম। কিন্তু মানুষ এর কোনো একটি অবস্থাকে একটু বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে দেখলেই মনে করে যে, এ অবস্থা একেবারে চিরস্থায়ী। সে অবস্থাটি যদি নিম্নগামী হয় তবে মনে করে যে, চিরকাল এরূপ নিম্নগামীই থাকবে। আবার তা যদি উর্ধ্বগামী হয় তো ধারণা করা হয় যে, চিরদিন এমনি উর্ধ্বগামীই থাকবে। কিন্তু এখানে পার্থক্য যাকিছু তা বিলম্ব আর অবিলম্বের; আসলে কোনো অবস্থাই চিরস্থায়ী নয় :
إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِّثْلُهُ ۚ وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنكُمْ شُهَدَاءَ ۗ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ
অর্থঃ কালের উত্থান পতন আমি মানুষের মধ্যে আবর্তন করে থাকি।’ (সূরা আলে ইমরানঃ আয়াত ১৪০)
দুনিয়ার গোটা পরিবেশই আবর্তিত হচ্ছে এক ধরণের গতিক্রমের মধ্যে। জন্ম মৃত্যু, যৌবন বার্ধক্য, শক্তি দৌর্বল্য, শীত বসন্ত, শুষ্কতা সজীবতা সবকিছুই হচ্ছে এই আবর্তনের বিভিন্ন রূপমাত্র। এই আবর্তন ধারায় পালাক্রমে প্রত্যেক জিনিসেরই একবার সুদিন আসে। তখন শুরু হয় তার বিকাশ বৃদ্ধি, প্রকাশ পায় তার শৌর্যবীর্য, পরাকাষ্ঠা দেখায় সে আপন রূপ ও সৌন্দর্য। এমনকি একদিন সে উন্নতি ও প্রগতির চরম প্রান্তে গিয়ে উপনীত হয়। এসময়ে সে ক্ষীণ, খর্বকায়, দুর্বল ও অক্ষম হয়ে পড়ে এবং যে শক্তিগুলো তার বিকাশ বুদ্ধির সূচনা করেছিল, শেষ পর্যন্ত তা-ই তাকে ধ্বংস করে দেয়।
গোটা সৃষ্টিজগতে এই হচ্ছে আল্লাহ্ তায়ালার বিধিবদ্ধ নিয়ম। দুনিয়ার অন্যসব জিনিসের মতো মানুষের ওপরও রয়েছে এ নিয়ম পুরোপুরি কার্যকর। তাকে ব্যক্তিগতভাবে বিচার করা হোক, কি জাতিগত দৃষ্টিতে মান-অপমান, সুখ-দুঃখ, উন্নতি-অবনতি এবং এমনিতরো অন্যান্য সমস্ত লক্ষণই ঐ গতিক্রমের সাথে বিভক্ত হতে থাকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও জাতির মধ্যে। এখানে এমন কেউ নেই, যাকে এই ভাগাভাগির বেলায় করা হয়েছে সম্পূর্ণ বঞ্চিত, কিংবা যার উপর কোনো অবস্থাকেই করা হয়েছে চিরস্থায়ী। সুদিন বা দুর্দিন কোনো অবস্থায়ই এর ব্যতিক্রম হয়না :
سُنَّةَ اللَّهِ فِي الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلُ ۖ وَلَن تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا
অর্থঃ পূর্বে যারা অতীত হয়েছে তাদের ব্যাপারে এটাই ছিলো আল্লাহর রীতি। তুমি আল্লাহর রীতিতে কখনো কোনো পরিবর্তন পাবেনা। (সূরা আহযাব : আয়াত ৬২)
এই পৃথিবীর আনাচে-কানাচে আমরা অতীত জাতিগুলোর অনেক নিদর্শন দেখতে পাই। তারা তাদের কৃষ্টি সভ্যতা, শিল্পকর্ম ও কলাকুশলতার প্রচুর স্মৃতিচিহ্ন রেখে গেছে। সেসব স্মৃতিচিহ্ন দেখে মনে হয়, আজকের প্রগতিশীল ও প্রতাপশালী জাতিগুলোর চাইতে তারা কিছুমাত্র খাটো ছিলোনা; বরং সমকালীন জাতিগুলোর ওপর তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিলো এদের চাইতেও বেশি :
أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ ۚ كَانُوا أَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَأَثَارُوا الْأَرْضَ وَعَمَرُوهَا أَكْثَرَ مِمَّا عَمَرُوهَا وَجَاءَتْهُمْ رُسُلُهُم بِالْبَيِّنَاتِ ۖ فَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَٰكِن كَانُوا أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ
অর্থঃ তারা ছিলো এদের চাইতেও প্রবল শক্তিমান। তারা যমীনকে ভালোভাবে কর্ষণ করেছিলো এবং এতোটা আবাদ করেছিলো যতোটা এরা করে নাই।’ (সূরা রূম : আয়াত ৯)
কিন্তু তবু তাদের পরিণতি কি হয়েছে? তারা আপাত সৌভাগ্যের নেশায় হলো প্রতারিত। ঐশ্বর্য আর ভোগাড়ম্বর তাদের নিক্ষিপ্ত করলো অহমিকার গর্ভে। স্বাচ্ছন্দ্য তাদের জন্য হয়ে দাঁড়ালো আপদ(ফিতনা)। প্রতিপত্তি ও রাষ্ট্রক্ষমতার গরবে তারা পরিণত হলো অনাচারের প্রতিমূর্তিতে। এভাবে নিজস্ব দুষ্কৃতির দ্বারা নিজেদের ওপরই তারা শুরু করে দিলো জুলুম চালাতে :
فَلَوْلَا كَانَ مِنَ الْقُرُونِ مِن قَبْلِكُمْ أُولُو بَقِيَّةٍ يَنْهَوْنَ عَنِ الْفَسَادِ فِي الْأَرْضِ إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّنْ أَنجَيْنَا مِنْهُمْ ۗ وَاتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا مَا أُتْرِفُوا فِيهِ وَكَانُوا مُجْرِمِينَ
অর্থঃ আর যালেমরা তো সেই সব সামগ্রীর স্বাদ আস্বাদনে লিপ্ত ছিলো যা তাদেরকে বিপুল পরিমাণে দেয়া হয়েছিলো। আর তারা ছিলো মহা অপরাধী।’ (সূরা হুদ : আয়াত ১১৬)
তাদের এই বিদ্রোহ আর অবাধ্যতা সত্ত্বেও আল্লাহ তাদের অবকাশ দিলেন :
وَكَأَيِّن مِّن قَرْيَةٍ أَمْلَيْتُ لَهَا وَهِيَ ظَالِمَةٌ ثُمَّ أَخَذْتُهَا وَإِلَيَّ الْمَصِيرُ
অর্থঃ কতো জনপদ এমন ছিলো যারা ছিলো যালেম। আমি প্রথমে তাদের অবকাশ দিয়েছি, তারপর পাকড়াও করেছি।’ (সূরা আল হজ্জ : আয়াত ৪৮)
আর এ অবকাশও কোনো মা’মুলি অবকাশ ছিলোনা; বরং বিভিন্ন জাতিকে শতাব্দীর পর শতাব্দী অবকাশ দেয়া হলো। কিন্তু প্রতিটি অবকাশই তাদের জন্য এক নতুন আপদ হয়ে দাঁড়ালো :
وَيَسْتَعْجِلُونَكَ بِالْعَذَابِ وَلَن يُخْلِفَ اللَّهُ وَعْدَهُ ۚ وَإِنَّ يَوْمًا عِندَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ
অর্থঃ কিন্তু আল্লাহর নিকট একদিন তোমাদের গণনার হাজার বছর।’ (সূরা হজ্জ : আয়াত ৪৭)
তারা মনে করলো যে, তাদের চাতুর্যের সামনে আল্লাহ অসহায়। কাজেই দুনিয়ার ওপর এখন আল্লাহর নয়, তাদেরই রাজত্ব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খোদার গযব উদ্বেলিত হয়ে উঠলো। তাদের উপর থেকে সুদৃষ্টি ঘুরে গেলো। সুদিনের পরিবর্তে দুর্দিন ঘনিয়ে এলো। তাদের চালবাজির মোকাবিলায় আল্লাহও এক কঠিন চাল প্রয়োগ করলেন। কিন্তু তারা আল্লাহর সে চাল উপলব্ধি করতেই পারলনা,প্রতিরোধ করবে তারা কোথেকে?
(আরবী)
অর্থঃ তারা একটা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলো, অথচ আমরাও একটা পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম,যা তারা টেরই পায়নি।(সুরা আন নামলঃআয়াত ৫০)
আল্লাহর পরিকল্পনা কখনো প্রত্যক্ষভাবে আসেনা বরং তার বিষক্রিয়া শুরু হয় খোদ মানুষের ভিতর থেকে-তার দিল দিমাগে অনুপ্রবেশ করার পর থেকে। তা আক্রমন চালায় মানুষের বিবেক বুদ্ধি,অনুভুতি, বিচারবোধ,চিন্তাশক্তি ও বোধশক্তির উপর। তা অন্ধ করে দেয় তার অন্তরদৃষ্টিকে। তা তার চর্মচক্ষুকে অন্ধ করেনা বটে, কিন্তু তার জ্ঞানচক্ষুকে অন্ধ করে দেয়ঃ
(আরবী)
অর্থঃ “আসল ব্যাপার হল চক্ষু অন্ধ হয়না, বরং অন্ধ হয় অন্তর যা বুকের মধ্যে থাকে”।(সুরা আল হাজ্জঃআয়াত ৪৬)
অন্ধ!আর হৃদয় চক্ষুই যখন অন্ধ হয়ে যায়, তখন নিজের কল্যানের জন্য যে ফন্দি ফিকিরই সে খাটায়,তাই তার পক্ষে হানিকর হয়ে দাঁড়ায়। সাফ্যলের আশা দিয়ে যে পদক্ষেপ সে করে, তাই তাকে নিয়ে যায় ধ্বংসের দিকে। তার সমস্ত শক্তিই ঘোষনা করে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তার নিজের হাত নিজের গলাটিপে ধরে আপনা থেকেঃ
(আরবী)
অর্থঃএকবার দৃষ্টই নিক্ষেপ করে দেখো তাদের ষড়যন্ত্রের পরিনতি কি ভয়াবহ হয়েছে,আমার তাদের এবং তাদের কওমকে পুরোপুরি নাস্তানাবুদ করে দিয়েছি।(সুরা আন নামলঃ৫১)
এই সুদিন আর দুর্দিনেরই একটি পুর্ণাঙ্গ চিত্র আমরা দেখতে পাই খান্দানে ফিরাউন ও বণী ইসরাইলের কাহিনীতে। মিশরবাসী যখন উন্নতি ও প্রগতির চরম শিখরে আরোহণ করল, তখন তারা কোমড় বেঁধে লাগল জোর জুলুম ও বিদ্রেহাত্নক কার্যকলাপে। তাদের বাদশাহ ফিরাউন দাবি করল খোদায়ী মর্যাদার। তার কিছুকাল আগে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের আমলে বণী ইসরাইলগন সেখানে গিয়ে করেছিল বসতি স্থাপন। ফিরাউন এই দুর্বল কওমটিকে পরিনত করলো জুলুম ও পীড়নের লক্ষ্যবস্তুতে। শেষ পর্যন্ত তার মিসরবাসীর অবাধ্যতা গেলো সীমা অতিক্রম করে। তাই আল্লাহ সিদ্ধান্ত করলেন তাদের অপদস্থ করে, তাদের কাছে ঘৃন্য, সেই কওমটিকে সমুন্নত করবার।অবশেষে আল্লাহর সিদ্ধান্তই কার্যকর হলো। সেই দুর্বল জাতির মধ্যে পয়দা করা হল হযরত মুসা আলাইহিস সালামকে। তাঁর প্রতিপালন করানো হলো ফিরাউনের ঘরে এবং খোদ তারই স্বহস্তে। অতঃপর তাকে নিযুক্ত করা হলো মিসরীয়দের গোলামী থেকে নিজ কওমকে মুক্ত করানোর খেদমতে। তিনি ফিরাউনকে নম্রভাবে বোঝালেন কিন্তু সে বিরত হলোনা। আল্লাহর পক্ষ থেকে ফিরাউন ও তার কওমকে বারংবার সতর্ক করা হলো, উপুর্যপরি দুর্ভিক্ষ ও বন্যার প্রকোপ দেখা দিল, আসমান থেকে শোণিতধারা বর্ষিত হল। পঙ্গপালের আক্রমনে তাদের ফসলের ক্ষেত বিরাণ হয়ে গেল।
উকুন ও ব্যাঙের উপদ্রবে তারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো। কিন্তু তবু তাদের অহমিকা কিছু মাত্র হ্রাস পেল নাঃ
(আরবী)
অর্থঃ তারা অহংকারে মেতে উঠেছিলো আর তার ছিলো অহংকারী জাতি।(সুরা আরাফঃআয়াত ১৩৩)
একে একে সমস্ত যুক্তি প্রমান যখন চুড়ান্ত হলো। তখন খোদায়ী আযাবের সীদ্ধান্ত কার্যকরী হল। আল্লাহর নির্দেশে হযরত মুসা আলাইহিস হালাম আপন কওমকে সঙ্গে নিয়ে মিসর ত্যাগ করলেন। ফিরাউনকে তার দলবলসহ সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়া হল। ফলে মিসরের রাষ্ট্রশক্তি এমন বিপর্যস্ত হলো যে, কয়েক শতক পর্যন্ত তা আর মাথা তুলে দাড়াতে পারলো নাঃ
(আরবী)
অর্থঃ আর আমরা তাকে ও তার বাহিনীকে পাকড়াও করলাম তারপর তাদের ডুবিয়ে দিলাম সমুদ্রে। চেয়ে দেখো কি ভয়াবহ পরিনতি হয়েছে এই যালেমদের।(সুরা আল কাসাসঃআয়াত ৪০)
অতঃপর এলো ইসরাঈলের পালা। মিসরীয় জাতিকে বিপর্যস্ত করার পর বিশ্ব জাহানের মালিক সেই লাঞ্ছিত ও অপমানিত কওমতিকেই দুনিয়ার রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রদান করলেনঃ
(আরবী)
অর্থঃআর তাদের স্থানে আমরা নির্যাতিত লোকদেরকে সেই অঞ্চলের পুর্ব পশ্চিমের অধিকারী বানিয়ে দিলাম, যাকে আমরা কানায় কানায় প্রাচূর্যে ভরে দিয়েছিলাম। আর এভাবেই সবর অবলম্বন করার কারনে বনী ঈসরাইলের ভাগ্যে তোমার প্রভুর কল্যানময় ওয়াদা পুরন হয়ে গেলো।(সুরা আরাফঃআয়াত ১৩৭)
এবং তাকে দান করলেন দুনিয়ার সমস্ত জাতির উপর শ্রেষ্ঠত্বঃ
(আরবী)
অর্থঃ আর আমি তোমাদেরকে বিশ্ব জাতি সমূহের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলাম।(সুরা বাকারাঃআয়াত ৪৭)
কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্ব ও রাষ্ট্র ক্ষমতা ছিলো স্ৎকর্ম ও সদাচরণের শর্ত সাপেক্ষ। হযরত মুসা আলাইহিস সালামের জবানিতে আগেই বলে দেয়া হয়েছিলো যে, তোমাদের কে দুনিয়ার খিলাফত দেয়া হবে অবশ্যই; কিন্তু তোমরা কিরুপ কাজ করো(*****), তার প্রতিও লক্ষ্য রাখা হবে। বস্তুত এ শর্ত শুধু বণী ঈসরাইলের বেলাই নয়,বরং দুনিয়ায় যে জাতিকেই রাষ্ট্র শক্তি দান করা হয়, তার প্রতিই এই শর্ত আরোপিত হয়ঃ
(আরবী)
অর্থঃঅতঃপর আমরা তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করলাম তোমরা কি রকম কাজ করো তা দেখার জন্য।(সুরা ইউনুসঃ আয়াত ১৪)
তাই বণী ঈসরাইল যখন আপন প্রভুর সাথে অবাধ্য আচরন করল, তাঁর বাণী ও কালামকে বিকৃতদুষ্ট করল, সত্যকে মিথ্যার দ্বারা বদলে ফেললো, হারামখোরী, মিথ্যাচার, বেঈমানী ও ওয়াদা ভঙ্গের নীতি গ্রহন করলো, অর্থগৃদ্ম, লোভী, কাপুরুষ ও আরাম প্রিয় হয়ে উঠলো, খোদার নবিগনকে হত্যা করতে শুরু করলো, সত্যের পথে আহবানকারীদের সাথে দুশমনি শুরু করলো, সৎ নেতৃত্বের প্রতি অপ্রসন্ন হলো এবং অসৎ নেতৃত্বের আনুগত্য স্বীকার করলো, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সুদৃষ্টিও তাদের উপর থেকে উঠে গেল। তাদের কাছ থেকে পৃথিবীর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব ছিনিয়ে নেয়া হলো। ইরাক, গ্রীস, রোমের দূর্ধর্ষ সম্রাটদের দ্বারা তাদের পর্যদুস্ত করানো হল। তাদেরকে ঘর ছাড়া করা হলো।ভবঘুরের ন্যায় লাঞ্চনা ও গঞ্জনার সাথে দেশে দেশে ঘুরান হলো। তাদের হাত থেকে রাষ্ট্রশক্তি ছিনিয়ে নেয়া হল। দু’হাজার বছর যাবত তারা লা’নতে এমনভাবে জড়িয়ে পড়লো যে,দুনিয়ার কোথাও তারা এতোটুকু মর্যাদাকর ঠাঁই খুঁজে পেলনা।
([এই প্রবন্ধ প্রকাশের কয়েক বছর পর ফিলিস্তিনে ইসরাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে লোকেদের মনে এই সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে যে, এটা কুরআনের ভবিষ্যতের পরিপন্থি। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এই রাষ্ট্রটি নিজের শক্তিতে নয়; বরং আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্সের উপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং একে টিকিয়ে রাখার জন্য দুনিয়ার চারদিক থেকে ইহুদিরা এসে এই ক্ষুদ্র ভুখন্ডে জমায়েত হচ্ছে। কিন্তু যে দিন এই পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ কোন বড় যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে ইসরাইল কে সমর্থন দিতে অপারগ হয় পড়বে, সে দিন তার জন্যে মৃত্যুর পয়গাম নেমে আসবে এবং প্বার্শবর্তী আরব রাষ্ট্রগুলো এই ময়লার মোড়কটিকে তুলে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে। বস্তুত ইহুদীরা পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের সহায়তায় আরব ভুমিতে জোরপুর্বক তাদের নিজ্স্ব আবাস ভুমি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে,দৃশ্যত একে তাদের কামিয়াবি বলে মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ তাদের বিরাট শাস্তিরই নামান্তর])
(আরবী)
অর্থঃফলশ্রুতিতে তাদেরকে গ্রাস করল লাঞ্চনা,অধপতন ও দুরাবস্থা,আর তারা পরিবেষ্টিত হলো আল্লাহর গযবে।(সুরা বাকারাঃআয়াত ৬১)
আজকে আবার আমরা খোদায়ী নিয়মের পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি। পুর্বেকার জাতিগুলো যে কর্মফলের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছিলো, তা-ই আজ পাশ্চাত্য জাতিকে জড়িয়ে ফেলেছে। তাদেরকে যতোটা সতর্কীকরণ সম্ভব ছিলো, প্রায় সবই করা হয়েছে। মহাযুদ্ধে প্রলয়কান্ড, আর্থিক দুর্গতি, বেকারীর আধিক্য, কুৎসিত ব্যাধির প্রকোপ, পারিবারিক ব্যবস্থার বিপর্যয়, এসব হচ্ছে তার উজ্জ্বল নিদর্শন। তাদের যদি চোখ থাকতো তো এগুলো দেখেই বুঝতে পারতো যে, জুলুম, অবাধ্যতা, আত্নপুজা ও সত্য বিকৃতির কী পরিনাম হয়ে থাকে। কিন্তু তারা ঐ নিদর্শনগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহন করছেনা; বরং সত্যের প্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শনে তাদের ক্রমাগত একগুয়েমিই পরিলক্ষিত হয়েছে। তাদের দৃষ্টি ব্যাধির মুল কারন অবধি পৌছুচ্ছেনা। তারা শুধু রোগ লক্ষনই দেখতে পাচ্ছে এবং তারই প্রতিকার করার ব্যাপারে নিজেদের সমস্ত চেষ্টা যত্ন ব্যয় করছে। এ কারনে ওষুধ যতই প্রয়োগ করা হচ্ছে, ব্যাধি ততোই বেড়ে চলছে। এখন অবস্থা দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে যে,সতর্কবাণী ও যুক্তিপ্রমানের পর্যায় শেষ হচ্ছে এবং চুড়ান্ত ফয়সালার সময় অত্যাসন্ন।
সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাশ্চাত্য জাতিগুলোর উপর দু’টি প্রচন্ড শয়তান চাপিয়ে দিয়েছেন। তারা তাদেরকে ধ্বংস ও বিণাশের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তার একটি হচ্ছে বংশ নিধনের শয়তান আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে জাতীয়তাবাদের শয়তান। প্রথম শয়তানটি চেপে বসেছে তাদের ব্যক্তিদের ওপর, আর দ্বিতীয়টি বসেছে তাদের জাতি ও রাজ্যসমূহের ওপর। প্রথমটি তাদের পুরুষ ও নারীদের বিবেক বুদ্ধিকে বিকৃত করে দিয়েছে। তাদের নিজস্ব হাত দ্বারাই তাদের বংশধরদের নিধণ করাচ্ছে।তাদেরকে গর্ভনিরোধের কলা কৌশল শিক্ষা দান করছে। গর্ভপাতের জন্য উদ্বুদ্ধ করছে। বন্ধ্যাত্বকরণের মাহাত্য বোঝাচ্ছে। এর ফলে তারা নিজেদের প্রয়োজনীয় শক্তি তারা নিজেরাই বিনষ্ট করে ফেলছে। এটি তাদের এমনি হৃদয়হীন করে দিয়েছে যে, তারা নিজেদের সন্তানকে নিজেরাই হত্যা করছে। ফলকথা,এই শয়তান ক্রমশ তাদের আত্নহত্যায় প্রবৃত্ত করাচ্ছে।
দ্বিতীয় শয়তানটা তাদের বড় বড় রাষ্ট্রনায়ক ও সেনাধ্যক্ষদের থেকে নির্ভুল চিন্তা ও সঠিক কর্মপন্থা গ্রহনের শক্তি ছিনিয়ে নিয়েছে। সে তাদের মধ্যে আত্নসর্বস্বতা, প্রতিদ্বন্দিতা, প্রতিহিংসা, ঘৃনা বিদ্বেষ ও লোভ লালসার কুৎসিত মনোবৃত্তি পয়দা করেছে। তাদেরকে পরস্পর বিবাদমান ও বৈরী ভাবাপন্ন বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত করে দিচ্ছেঃ
(আরবী)
অর্থঃঅথবা তিনি তোমাদেরকে বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত করে দিবেন এবং এক দলের দ্বারা আরেক দলের শক্তির স্বাদ গ্রহন করাবেন।(সুরা আ’নাম;আয়াত ৬৫)
তাদেরকে পরস্পরের শক্তি ও ক্ষমতার স্বাদ গ্রহনে উদ্বুদ্ধ করেছে। আর এ-ও হচ্ছে এক ধরনের খোদায়ী আযাব। মোটকথা সে তাদেরকে এক প্রচন্ড আত্নহত্যার জন্য তৈরী করেছে। এটি পর্যায়ক্রমে নয়;বরং আচানক অনুষ্ঠিত হবে। সে তামাম দুনিয়ায় গোলা বারুদ জমা করেছে এবং বিভিন্ন জায়গায় বিপদকেন্দ্র বানিয়ে রেখেছে। এখন সে কেবল একটি বিশেষ মুহূর্তের জন্য প্রতীক্ষমান। সে মুহূর্তটি আসামাত্রই সে কোন একটি বারুদাগারকে অগ্নিশলাকা দেখিয়ে দেবে। তারপর দেখতে না দেখতেই এমন ধ্বংসলীলা বিস্ফোরিত হবে,যার ফলে পুর্ববর্তী জাতিগুলোর ধ্বংসলীলাও ম্লান হয়ে যাবে।
এ পর্যন্ত আমি যা কিছু বলেছি, তাতে কোনো অত্যুক্তির অবকাশ নেই। বরং ইউরোপ, আমেরিকা,জাপানে আসন্ন মহাযুদ্ধের বিপুল প্রস্তুতি([এখানে স্মর্তব্য যে,প্রবন্ধটি লেখা হয়েছিলো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কয়েক বছর আগে]) দেখে খোদ তাদেরই দুরদর্শী নেতৃবৃন্দ শিউরে উঠেছেন এবং এই ভয়াবহ যুদ্ধের পরিনাম চিন্তা করে তারা অত্যন্ত দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি মার্কিন মিলিটারী স্টাফের প্রাক্তন সদস্য সার্জেল নিউম্যান(sergel neuman)আসন্ন যুদ্ধ সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। তাতে তিনি বলেছেন,আসন্ন যুদ্ধ শুধু সৈন্যদের লড়াই হবেনা, বরং তাকে ব্যাপক গনহত্যা বলাই হবে সমীচিন। এই হত্যাযজ্ঞে নারী ও শিশুদের পর্যন্ত রেহাই দেয়া হবে না। বিজ্ঞানীদের বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের দায়িত্বটা সৈন্যবাহিনীর হাত থেকে কেড়ে নিয়ে রাসায়নিক দ্রব্য ও নিষ্প্রান যন্ত্রের হাতে সোপর্দ করে দিয়েছে। এই মরণাস্ত্রগুলো সামরিক ও অসামরিক লোকের মধ্যে পার্থক্য করতে সম্পূর্ন অক্ষম। পরুন্ত এখন যুদ্ধমান শক্তিগুলোর লড়াই ময়দান বা দুর্গের মধ্যে নয়,বরং শহর,বন্দর ও লোকালয়ের মধ্যে হবে। কারণ আধুনিক যুদ্ধনীতি অনুযায়ী শত্রুপক্ষের আসল শক্তি সেনাবাহিনীর মধ্যে নয়, বরং তার জনপদ, বাণিজ্যকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার মধ্যে নিহিত। তাই এখন যুদ্ধ বিমান থেকে নানারকম বোমা বর্ষন করা হবে। সেসব থেকে অগ্নিদগীরক পদার্থ, বিষাক্ত গ্যাস ও রোগ জ়ীবানু নির্গত হয়ে যুগপৎ লক্ষ লক্ষ মানুশকে নাস্তানাবুদ করে দেবে। তার মধ্যে এমন এক প্রকার স্বয়ংক্রিয় বোমা রয়েছে,যার একটি মাত্র গোলা লন্ডনের বৃহত্তম ইমারতটি চূর্নবিচূর্ন করে দিতে পারে([পরবর্তীকালে আনবিক বোমা ও উদযান বোমা নামে এর চাইতেও ভয়ংকর মারণাস্ত আবিস্কৃত হয়েছে এবং নাগাসাকি ও হিরোশিমাতে তার ধ্বংসলীলার একটি ক্ষুদ্র নমুনাও পেশ করা হয়েছে])। গ্রীন ক্রস গ্যাস(green cross gas) নামে এক প্রকার বিষাক্ত গ্যাস হিসেবে পরিচিত। এর প্রকৃতি এই যে,এটি যার নাকে প্রবেশ করবে,তার মনে হবে যেনো সে পানিতে ডুবে গিয়েছে। আর এক প্রকার বিষাক্ত গ্যাসের নাম হচ্ছে ইয়েলো ক্রস গ্যাস(yellow cross gas)। এর প্রকৃতি হচ্ছে সাপের বিষতূল্য। এটি নাকে প্রবেশ করলে ঠিক সর্প দংশন করার মত বিষক্রিয়া দেখা দেয়। এমন ধরনের আরো নানা প্রকার গ্যাস রয়েছে। এই গ্যাসগুলো প্রায় অদৃশ্য। প্রথম দিকে এগুলোর প্রতিক্রিয়া মোটেই অনুভুত হয়না। পরে যখন অনূভুত হয়,তখন প্রতিক্রিয়া বা চিকিৎসার কোন সম্ভাবনাই থাকে না।এ র মধ্যে এক বিশেষ ধরনের গ্যাস বহু উর্ধ্বে উঠে ছড়িয়ে যায়। এর প্রভাবিত এলাকা দিয়ে কোন বিমান অতিক্রম করলে তার চালক সহসাই অন্ধ হয়ে যায়। অনুমান করা হয়েছে যে, কোন কোন বিষাক্ত গ্যাসের এক টন পরিমান যদি প্যারীস নগরের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়,তবে তার এক ঘন্টার মধ্যেই গোটা শহর টিকে সম্পুর্ন ধ্বংস করে ফেলা যেতে পারে।আর এই কাজটি সম্পাদন করার জন্য মাত্র একশ বিমানই যথেষ্ট।
সম্প্রতি এক বৈদ্যুতিক অগ্নুৎপাদক গোলা আবিস্কার করা হয়েছে। এর ওজন মাত্র এক কিলোগ্রাম। কিন্তু এইটুকু গোলার ভেতরে এতোখানি শক্তি রয়েছে যে,কোনো জিনিসের সঙ্গে এর সংঘাত লাগলে হঠাৎ তিন হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপ উৎপন্ন হয় এবং তা থেকে এমনি প্রচন্ড অগ্নুৎপাত হয় যে, তা কিছুতেই নেভানো সম্ভব নয়। তাতে পানি নিক্ষেপ করলে পেট্রোলের ন্যায় কাজ করে। তাকে নেভানোর জন্য বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত কোনো পন্থা উদ্ভাবন করতে পারেনি। অনুমান করা হচ্ছে যে, একে শহরে বন্দরের বড় বড় বাজারে নিক্ষেপ করা হবে, যাতে করে তার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত অবধি আগুন লেগে যায়। অতপর লোকেরা ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে পালাতে শুরু করলে বিমান থেকে বিষাক্ত গ্যাসের বোমা বর্ষণ করে ধ্বংসযজ্ঞকে পূর্ণতর করা হবে।
এসব মারণাস্ত্রের আবিস্কার দেখে রণ বিশেষজ্ঞগণ অনুমান করেছেন যে, মাত্র কয়েকটি বোমারু বিমানের সাহায্যে দুনিয়ার বৃহত্তম ও সুরক্ষিত রাজধানীকেও দু’ঘন্টার মধ্যে ধুলিসাৎ করে দেয়া যেতে পারে। লক্ষ লক্ষ লোকের বাসস্থানকে এমনিভাবে বিষাক্ত করা যেতে পারে যে, রাতে তারা ভালোয় ভালোয় শোবে বটে, কিন্তু সকালে একজনও জীবিত উঠবেনা। এভাবে বিষাক্ত পদার্থ দ্বারা একটি গোটা দেশের প্রাণী সম্পদকে বিষাক্ত, গবাদী পশু ধ্বংস এবং ক্ষেত খামার ও বাগ বাগিচাকে নিশ্চিহ্ন করা যেতে পারে। এই সর্বধ্বংসী হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার কোনো কার্যকরী পন্থা আজও আবিস্কৃত হয়নি। এতে কেবল উভয় যুদ্ধমান পক্ষ পরস্পরের প্রতি হামলা করে ধ্বংস হয়েই যেতে পারে, ধ্বংসের হাত থেকে কেউ বাঁচতে পারে না।
এই হচ্ছে আসন্ন মহাযুদ্ধের প্রস্তুতির একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণণা। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হয়ে আপনারা What would be The Character of a New War নামক পুস্তকটি দেখুন। এই পুস্তকটি জেনেভার আন্তপার্লামেন্টারী ইউনিয়ন’ নামক সংস্থা যথারীতি গবেষনা ও তথ্যানুসন্ধানের পর প্রকাশ করেছে।
এটি পড়লে সহজে অনুমান করতে পারবেন যে, পাশ্চাত্য সভ্যতা কিভাবে নিজের ধ্বংসের উপকরণ নিজ হাতেই সংগ্রহ করেছে। এখন তার আয়ুস্কাল রয়েছে শুধু তার যুদ্ধ ঘোষণার তারিখ পর্যন্ত।১ ([দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে- ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত – কি সব কান্ড ঘটেছে তার একটি নমুনা নাগাসাকির ধ্বংসলীলার মধ্যে দেখা যেতে পারে। এর চাইতে বিস্তৃত নমুনা দেখতে হলে লর্ড রাসেলের Seourge of Swastika নামক পুস্তকটি পড়ুন এবং একটি খোদাহীন সভ্যতা কিভাবে একটি গোটা জাতিকে হিংস্র পশুর চাইতেও নিকৃষ্টতর জীবে পরিণত করতে পারে তার নিদর্শন দেখুন।])
যেদিন দুনিয়ার দু’টি বৃহৎ রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যাবে, সেদিনই পাশ্চাত্য সভ্যতা ধ্বংসের জন্যে খোদায়ী ফায়সালা কার্যকর হয়েছে মনে করতে হবে, কারণ দু’টি বৃহঃ রাষ্ট্র ময়দানে অবততণ করার পর যুদ্ধ কিছুতেই বিশ্বব্যাপী রূপ ধারণ না করে পারেনা। আর যুদ্ধ বিশ্বব্যাপি হলে ধ্বংসও হবে বিশ্বব্যাপি, সন্দেহ নেই।
(আরবী)
অর্থঃ লোকেরা স্বহস্তে যা কিছু অর্জন করেছে তার ফলে জলে স্থলে সর্বত্র বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, যাতে করে তারা কোনো কোনো কৃতকর্মের স্বাদ গ্রহন করতে পারে। সম্ভবত তারা এখনও (সৎ পথে) প্রত্যাবর্তণ করতে পারে।” সূরা রুমঃ৪১)
যাই হোক, দুনিয়ার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব সম্পর্কে নতুন কোনো বন্দোবস্ত গ্রহন এবং যালিম ও অত্যাচারীদের পতন ঘটিয়ে অপর কোনো জাতিকে (সম্ভবত তা কোনো নিপীড়িত জাতি হবে) দুনিয়ার খিলাফতের মর্যাদায় অভিষিক্ত করার সময় এখন অত্যাসন্ন। এই মর্যাদার জন্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কাকে মনোনীত করেন, তা-ই এখন লক্ষ্য করবার বিষয়।
এরপরে দুনিয়ার কোন কওমটিকে সমুন্নত করা হবে, আমাদের তা জানবার কোনো উপায় নেই। এ হচ্ছে সম্পূর্ণ আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছাধীন ব্যাপার। তিনি যার কাছ থেকে ইচ্ছা, কর্তত্ব ছিনিয়ে নেন, আবার যাকে ইচ্ছা দান করেনঃ
(আরবী)
অর্থঃ বলো, হে আল্লাহ! সমস্ত রাজ্য ও সাম্রাজ্যের মালিক! তুমি যাকে চাও রাজ্য দান করো, আর যার থেকে ইচ্ছা রাজ্য কেড়ে নাও। (সূরা আল ইমরানঃ ২৬) কিন্তু এ ব্যাপারেও একটি নির্ধারিত কানুন রয়েছে। সেটি তিনি তাঁর প্রিয় কিতাবে বিবৃত করেছেন। তা হলো এই যে, তিনি এমন কোনো জাতিকে সমাসীন করেন, যারা সেই অভিশপ্ত কওমটির ন্যায় বদকার ও অবাধ্য হবে না।
(আরবী)
অর্থঃ যদি তোমরা অবাধ্য আচরণ করো তা হলে তোমাদের পরিবর্তে অপর কোনো জাতিকে সমুন্নত করা হবে। তারা তোমাদের মতো হবেনা। (সূরা মুহাম্মদঃ আয়াত ৩৮)
এ কারণেই বাহ্যিক লক্ষনাদি দেখে মনে হয়, আজকাল যেসব দুর্বল পরাধীন জাতি পাশ্চাত্য সভ্যাতার অনুকরণ করছে এবং ফিরিঙ্গি জাতিগুলোর সদগুনাবলী (যা কিছু সামান্য তাদের মধ্যে অবশিষ্ট রয়েছে) বর্জন করে তাদের দোষত্রুটিগুলো (যা তাদের অভিশপ্ত হবার হেতু) গ্রহন করেছে, আসন্ন বিপ্লবে তাদের সফলকাম হবার কোনোই সম্ভাবনা নেই। (প্রথম প্রকাশঃ তরজমানুল কুরআন, অক্টোবর ১৯৩২ সাল)
৬
পাশ্চাত্য সভ্যতার আর্তনাদ
(লর্ড লোথিয়ানের ভাষণ)
[প্রবন্ধটি ১৯৩৯ সালের মার্চে তরজমানুল কুরআন পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়।]
১৯৩৮ সালের জানুয়ারী মাসের শেষ সপ্তাহে আলীগড় ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন (উপাধি বিতরণের সভা) উপলক্ষে লর্ড লোথিয়ান একটি ভাষণ দান করেন। তাঁর এই ভাষণটি (অবিভক্ত) ভারতের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের আধুনিক ও প্রাচীন পন্থীদের পক্ষে বিশেষভাগে প্রণিধানযোগ্য। এতে তাদের জন্যে প্রচুর শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে। এই ভাষণে এমন এক ব্যক্তি আমাদের সামনে তাঁর দিল দিমাগের পর্দা উন্মোচন করেছেন, যিনি আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান ও তার সৃষ্ট সভ্যতাকে দূর থেকে দেখেননি; বরং নিজে সেই সভ্যতার কোলে ভূমিষ্ঠ হয়েছেন এবং জীবনের সুদীর্ঘ ৫৬টি বছর সেই সমুদ্র মন্থনে অতিবাহিত করেছেন। তিনি পয়দায়েশী ও খান্দানি সূত্রে ইউরোপিডয়ান এবং অক্সফোর্ডে উচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত। তিনি বিখ্যাত রাউন্ড টেবিল পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন এবং প্রায় একুশ বছর যাবত বৃটিশ সরকারের বড় বড় দায়িত্বশীল পদে কাজ করেছেন। তিনি কোনো বৈদেশিক পর্যবেক্ষক নন, তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতারই স্বগৃহের লোক। এ হিসেবেই তিনি আমাদেরকে সেই ঘরের আসল বিকৃতি, তার কার্যকরণ এবং ঘরের লোকেরা বর্তমানে কিসের জন্যে পিপাসার্ত, তা বিবৃত করেছেন।
একদিক থেকে এই ভাষণটি আমাদের আধুনিক শিক্ষিত লোকদের জন্যে অধিকতর শিক্ষাপ্রদ। কারণ, এ থেকে তাঁরা জানতে পারবেন, পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞান এবং তার সৃষ্টি সভ্যতার সবটুকু কেবল সঞ্জীবনীই নয়; বরং এতে অনেক বিষেরও সংমিশ্রণ রয়েছে। যারা এ ওষুধটি তৈরি করেছে এবং কয়েকশ বছর একে ব্যবহার করে দেখেছে, তারা নিজেরা্ই আজ একে পুরোপুরি সেবন না করার জন্যে আপনাদের সতর্ক করে দিচ্ছে। তারা বলছেঃ ‘এ বস্তুটি আমাদের ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে পৌছে দিয়েছে এবং তোমাদেরও ধ্বংস করে ছাড়বে। আমরা নিজেরাই এক খাঁটি সঞ্জীবনীর প্রত্যাশা করছি। আমরা নিশ্চিতরূপে না জানলেও অনুমান করি যে, সে সঞ্জীবনী তোমাদের কাছেই বর্তমান রয়েছে। কাজেই তোমরা যেনো নিজেদের সঞ্জীবনীকে ধূলিসাৎ করে আমাদের বিষদুষ্ট ওষুধটির স্বাদ গ্রহনে লেগে না যাও।‘
অন্যদিকে আমাদের আলিম ও ধার্মিক সম্প্রদায়ের জন্যেও এ ভাষণটিতে রয়েছে প্রচুর চিন্তার খোরাক। তাঁরা বর্তমানে যে দুনিয়ায় বসবাস করছেন, তার সামনে ইসলামী শিক্ষার কোন দিকগুলোকে উজ্জল করে তুলে ধরা দরকার, তা এ থেকে তাঁরা অনুমান করতে পারবেন। এই দুনিয়া কয়েক শতাব্দী ধরে বস্তুবাদী সভ্যতার পরিক্ষা-নিরিক্ষা চালিয়ে আজ এররূপ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কয়েক শতক আগে সন্ধানী ভাবধারা ও মুক্ত চিন্তার যে সঞ্জীবনী আমরা ইউরোবাসীকে সরবরাহ করেছিলাম, তারা তাকে নিছক অজ্ঞতাবশত ধর্মহীনতা ও বস্তুতান্ত্রিকতার বিষমিশ্রিত করে এক নতুন সভ্যতা সঞ্জীবনীর জন্ম দিয়েছে। সে সঞ্জীবনী নিজের শক্তিবলে তাদেরকে উন্নতির শীর্ষদেশে উন্নিতি করেছে বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে তার বিষক্রিয়াও বরাবর ক্রিয়াশীল রয়েছে। এমনকি সে সঞ্জীবনী আজ পুরোপুরি বিষদুষ্ট হয়ে পড়েছে। তার তিক্ত পরিণাম ফল উত্তমরূপে ভোগ করার পর আজ আবার তারা নতুন সঞ্জীবনীর সন্ধানে চারদিকে দৃষ্টিক্ষেপ করছে। তাদের সঞ্জীবনীর ভেতর কী কী বিষাক্ত জিনিস রয়েছে এবং সেগুলো তাদের জীবনে কী গুরুতর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে, তা তারা বুঝতে পেরেছে। আর ঐ প্রতিক্রিয়াগুলোকে দূর করার জন্যে কী ধরনের সঞ্জীবনী তাদের প্রয়োজন, তাও তারা আজ অনুভব করতে পারছে। কিন্তু যে সঞ্জীবনীর তারা সন্ধান করে ফিরছে, তা যে ইসলাম ছাড়া দুনিয়ার আর কারো কাছে বর্তমান নেই এবং যে দাওয়াখানা থেকে তারা প্রথম বটিকাটি নিয়েছিল এই শেষ বটিকাটিও যে সেখানেই পাওয়া যাবে এই কথাটুকু তাদের জানা নেই। এই পর্যন্ত পৌছার পরও যদি তারা ঈস্পিত সীবনীর জন্যে ছুটাছুটি করতে থাকে এবং তা না পেয়ে হলাহল দ্বারা সারা দুনিয়াকে বিষাক্ত করতে থাকে, তাহলে সে মহাপাপে তাদের সঙ্গে আমাদের আলিম সমাজকেও সমানভাবে শরীক হতে হবে। আজকে খোদাতত্ত্ব, অতিপ্রকৃতিবাদ এবং খুঁটিনাটি শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে বিতর্ক বাহাসে লিপ্ত থাকবার সময় আলিম সমাজের নেই। রসূল সা. এর গায়েবী ইলম ছিলো কিনা? আল্লাহ মিথ্যা বলতে পারেন কিনা? রসূলের কোনো তুলনা সম্ভব কিনা? ইসালে সওয়াব ও কবর যিয়ারতের শরয়ী মর্যাদা কী? শব্দ করে আমীন বলা ও ‘রাফে ইয়াদাইন’ করা হবে কিনা? মসজিদের মিনার ও মিম্বরের মধ্যে কতোটুকু পার্থক্য রাখা হবে ইত্যাকার খুঁটিনাটি সমস্যার সমাধান করার জন্যে আজ আমাদের ধর্মীয় নায়কগণ নিজেদের সমগ্র শক্তি ক্ষমতার অপচয় করছেন। কিন্তু আজকের দুনিয়ায় এই সমস্যাগুলোর কোনই গুরুত্ব নেই এবং এগুলোর মীমাংসার ফলে সত্য মিথ্যা ও হেদায়াত গুমরাহীর এই বিশ্বব্যাপী লড়াইয়ের অবসান হতে পারেনা; বরং কয়েক শতক ধরে খোদাবিমুখতা ও ধর্মহীনতার ভিত্তিতে জ্ঞান বিজ্ঞান ও সমাজ তমুদ্দুনের ক্রমবিকাশের ফলে যে জটিল সমস্যাবলীর উদ্ভব হয়েছে, সেগুলোর যথাযথ উপলব্ধি করাই হচ্ছে আজকের সবচাইতে বড় প্রয়োজন এবং সেগুলো পুরোপুরি বিশ্লেষণ করে ইসলামী নীতির আলোকে তার গ্রহনযোগ্য সমাধান পেশ করাই হচ্ছে আজকের আসল কাজ। আমাদের আলিম সমাজ যদি এ কাজের জন্যে নিজেদেরকে যোগ্য করে না তোলেন এবং সুষ্ঠুভাবে এটি সম্পন্ন করার প্রয়াস না পান, তাহলে ইউরোপ আমেরিকার যা পরিণাম হবার তা তো হবেই, খোদ মুসলিম জাহানও একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ পাশ্চাত্য দেশগুলো যেসব সমস্যায় জর্জরিত, গোটা মুসলিম জাহান ও ভারতবর্ষে তা-ই আজ অতি তীব্রতার সঙ্গে পয়দা হচ্ছে। আর এগুলোর কোনো সঠিক সমাধান পেশ না করার ফলে মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই আজ ঐ ব্যাধিগ্রস্থদের ‘নোসখা’-ই ব্যবহার করে চলেছে। কাজেই বিষয়টি আজকে আর শুধু ইউরোপ আমেরিকার নয়; বরং এটি আমাদের নিজস্ব ঘর এবং আমাদের ভাবী বংশধরদেরই সমস্যা।
এসকল কারণেই আমাদের আধুনিক শিক্ষিত সমাজ ও আলিম সম্প্রদায়ের পক্ষে লর্ড লোথিয়ানের ভাষণটি প্রণিধান করা কর্তব্য। আমরা তাঁর বক্তব্যের মর্মোপলব্ধি করার জন্যে মাঝে মাঝে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাসহ ভাষণটি এখানে উদ্ধৃত করছি।
লর্ড লোথিয়ান তাঁর ভাষণের শুরুতেই বলেনঃ
আর একটি বিচার্য বিষয়ের প্রতি আজ আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আধুনিক যুগের বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষার যে মারাত্বক কুফল আজ ইউরোপ ও আমেরিকা ভোগ করছে, ভারতবর্ষ কী তা থেকে বেঁচে থাকতে পারে? আধুনিক বিজ্ঞানের উৎকর্ষের ফলে পাশ্চাত্যে দু’টি বিরাট পরিণাম ফল উদ্ভূত হয়েছে। একদিকে সে প্রকৃতি এবং তার শক্তিগুলোর ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে অনেক প্রশস্ত করে দিয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত তরুণ সমাজে এবং সাধারণভাবে গোটা দুনিয়ায় উত্তরাধিকার সূত্রে ধর্মীয় অনুশাসনকে দুর্বল করে দিয়েছে। আধুনিক পৃথিবীর অন্তত অর্ধেক বিকৃতি এই দু’টি কারণ উদ্ভূত হয়েছে। আজকের সুসভ্য মানুষ বিজ্ঞানের আবিস্কৃত শক্তির নেশায় আত্মহারা বটে, কিন্তু সে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সমাজ তমদ্দুনের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক ক্ষেত্রে সুষম উন্নতি সাধন করতে পারেনি। অথচ এ জিনিসটি বৈজ্ঞানিক শক্তিগুলোকে মানুষের ধ্বংসের পরিবর্তে তার কল্যাণের কাজে নিয়োজিত করার নিশ্চয়তা বিধান করতে পারতো।’
এই ভূমিকায় লর্ড লোথিয়ান প্রকৃতপক্ষে মানবীয় তাহযীব ও তমদ্দুনের বুনিয়াদী সমস্যার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। বিজ্ঞান নিছক বিজ্ঞান হিসেসে চিন্তা-গবেষণা ও অন্বেষণ অনুশীলনের ঔৎসুক্য বৈ-কিছু নয়। এরই বদৌলতে মানুষ বিশ্বপ্রকৃতির অন্তর্নিহিত শক্তিগুলোর অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হয় এবং সেগুলোকে কাজে লাগানোর জন্যে উপায় উপকরণ সংগ্রহ করে। এই জ্ঞান সম্পদের উন্নতির ফলে মানুষ যে নতুন শক্তিগুলো অর্জন করে, সেগুলোকে প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহার করতে শুরু করলে তাকে বলা হয় সভ্যতার উৎকর্ষ। কিন্তু এই জিনিস দু’টি আপনা থেকে মানুষের কল্যাণের নিশ্চয়তা বিধান করতে পারেনা। এগুলো যেমন কল্যাণের হেতু হতে পারে, তেমনি হতে পারে ধ্বংসের কারণও। হাত দ্বারা কাজ করার পরিবর্তে মানুষ যন্ত্রের সাহায্যে কাজ করতে শুরু করেছে। জানোয়ারে চড়ে সফর করার পরিবর্তে রেল, মোটর, জাহাজ ও বিমানে চড়ে যাতায়াত আরম্ভ করেছে। ডাক হরকরার পরিবর্তে বিজলী তার ও ওয়ার্লেসের মাধ্যমে সংবাদ আদান প্রদান করা হচ্ছে। এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ আগের চাইতে বেশী সুখী ও স্বচ্ছল হয়েছে। এই জিনিসগুলো দ্বারা তার যে পরিমাণ স্বাচ্ছন্দ্য বাড়তে পারে, সেই পরিমাণে তার বিপদ ও ধ্বংসের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পেতে পারে। কারণ যে স্তরে মানুষের কাছে শুধু তীর ধনুক ও তরবারি জাতীয় অস্ত্র ছিলো, তার তুলনায় যে সভ্যতা তার হাতে মেশিনগান, বিষাক্ত গ্যাস, উড়োজাহাজ ও ডুবোজাহাজ তুলে দিয়েছে, তা অনেক বেশি মারাত্বক হতে পারে। জ্ঞান বিজ্ঞানের ও তমদ্দুনের উন্নতির পক্ষে কল্যাণের হেতু বা ধ্বংসের কারণ হওয়াটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সেই সভ্যতার ওপর, যার প্রবাবধীনে জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও কৃষ্টি তমদ্দুন বিকাশ লাভ করে। প্রকৃতপক্ষে ক্রমবিখাশের ধারা মানবীয় চেষ্টা সাধনার লক্ষ্য এবং অর্জিত শক্তিগুলোর প্রয়োজ ক্ষেত্র নির্ণয় করার দায়িত্ব হচ্ছে সভ্যতার। এটিই মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের স্বরূপ নির্ধারন করে, তার সামাজিক জীবনের নিয়মনীতি এবং ব্যক্তিগত,জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াদির জন্যে নৈতিক বিধি বিধান তৈরি করে দেয়। ফলকথা জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে যে শক্তিগুলো মানুষ অর্জন করেছে, সেগুলোকে তার সভ্যতার মধ্যে কিভাবে প্রয়োগ করবে, কী উদ্দেশ্যে এবং কী প্রকারে ব্যবহার করবে, বিভিন্নরূপ ব্যবহার বিধির মধ্যে কোন কোনটি বর্জন আর কোন কোনটি গ্রহন করবে, সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত করার জন্যে এই জিনিসটিই মানুষের মনকে যোগ্য করে তোলে।
বস্তুত জড়জগতে পর্যবেক্ষণ এবং প্রাকৃতিক নিয়ম কানুন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করাটাই কোনো উচ্চতর সভ্যতার ভিত্তি হতে পারেনা। কারণ এগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মর্যাদা একটি বুদ্ধিমান জীবের বেশি কিছু নয়। এগুলোর সাহায্যে শুধু বস্তুতান্ত্রিক জীবনাদর্শই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। অর্থাৎ মানুষের জন্যে এই দুনিয়ার জীবনটাই হচ্ছে একমাত্র জীবন। এ জীবন নিজের জৈবিক কামনা-বাসনাকে যতোদূর সম্ভব পূর্ণ করাই হচ্ছে তার চরম ও পরম লক্ষ্য।বিশ্ব প্রকৃতিতে বাঁচার সংগ্রাম,প্রাকৃতিক নির্বাচন ও যোগ্যতমের উর্ধ্বতন সম্পর্কে যে বিধান কার্যকরী রয়েছে, তাকেই চরম সত্য বলে গ্রহণ করে এবং আশ পাশের তামাম সৃষ্টবস্তুকে নিষ্পিষ্ট করে সবার ওপরে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে শক্তির আসল প্রয়োগ ক্ষেত্র। এই জীবন দর্শনই হচ্ছে ইউরোপের অনুসৃত কৃষ্টি সভ্যতার মূল ভিত্তি। এরই ফলে জ্ঞান বিজ্ঞান ও সভ্যতার উতকর্ষ মানুষের হাতে যতো শক্তিই তুলে দিয়েছে, তা মানবতার কল্যাণের পরিবর্তনের তার ধ্বংসেরে পথেই নিয়োজিত হতে শুরু করেছে। আজ ইউরোপবাসী নিজেরাই অনুভব করতে পারছে যে, তাদের জৈবিক সভ্যতা থেকে উচ্চতর একটি মানবিক সভ্যতার প্রয়োজন। আর সেই সভ্যতার ভিত্তি ধর্ম ছাড়া আর কিছুই হতে পারেনা।
সামনে এগিয়ে লর্ড লোথিয়ান বলেনঃ
সায়েন্টিফিক স্পিরিট(সন্ধানী মনোভাব) ক্রমশ লোকদের ভেতর থেকে পুরন কুসংস্কারগুলো দূর করে দিয়েছে,জ্ঞান বিজ্ঞানের পরিধিকে বিস্তৃত করেছে এবং এভাবে প্রাচীনকালের বহু বন্ধন থেকে নর-নারীকে মুক্তিদান করেছে সন্দেহ নেই; কিন্তু সেই সঙ্গে সে মানুষকে আধ্যাতিক ও ধর্মীয় সত্যেরও প্রচন্ড মুখাপেক্ষী করে তুলেছে। অথচ সত্য অবধি পৌছাবার কোনো পথের সন্ধান সে দিতে পারেনি। আজকের অধিকাংশ পাশ্চাত্যবাসী শিশুসুলভ ক্ষিপ্রতা, বৈচিত্র বিলাস ও ইন্দ্রিয় সুখের নেশায় বিভোর। অনাড়াম্বর জীবন যাপনের সামর্থ তাদের থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ধর্মের পেশকৃত আদিম, অসীম ও অনন্ত সত্যের সঙ্গে তাদের কোনোই সংযোগ নেই।
ধর্ম মানুষের জন্যে অপরিহার্য পথিকৃত। মানব জীবনের জন্যে প্রয়োজনীয় নৈতিক লক্ষ্য, মর্যাদা ও তাতপর্য লাভ করার এটিই একমাত্র মাধ্যম। এর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সংকুচিত হবার ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বংশগত ও শ্রেণীগত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক অপকৌশলের প্রতি পাশ্চাত্য দুনিয়া আসক্ত হয়ে পড়েছে এবং যে বিজ্ঞান বস্তুগত উন্নতিকেই চরম লক্ষ্য বলে আখ্যা দেয় এবং জীবনকে দিন দিন জটিল ও দুর্বিষহ করে তোলে, তারপ্রতি ঈমান এনে বসেছে। পরন্তু বর্তমান যুগের সবচাইতে বড় আপদ জাতীয়তাবাদের কবল থেকে মুক্তিলাভের জন্যে আত্মা ও জীবনের মধ্যে যে ঐক্যের প্রয়োজন, সেই ঐক্য প্রতিষ্ঠা করাও আজকের ইউরোপের পক্ষে দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ-ও হচ্ছে ধর্মীয় কর্তৃত্ব হ্রাস পাবার একটি উল্লেখযোগ্য ফল।
অতঃপর লর্ড লোথিয়ান ভারতের আধুনিক শিক্ষিত লোকদের সামনে এই প্রশ্ন উত্থাপন করেনঃ
ভারতের দু’টি বৃহৎ ধর্ম হিন্দুমত ও ইসলাম কি পাশ্চাত্যের ধর্মীয় বিদ্বেষের চাইতে বেশি সাফল্যের সঙ্গে আধুনিক যুগের সমালোচনা ও সন্ধানী ভাবধারার মোকাবিলা করতে পারবে? এটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি ভারতকে পাশ্চাত্যের ওপর আপতিত বিপদাপদ থেকে রক্ষা করতে হয়, তবে এই প্রশ্নটির প্রতি এদেশের চিন্তাবিদ ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উচিৎ। এটা নিঃসন্দেহে যে, সন্ধানী ভাবধারা ক্রমে ক্রমে ভারতের জনগণের মধ্য থেকে কুসংস্কার ও অজ্ঞতার উৎপাদনগুলোকে বিলীন করে দেবে এবং এটা খুবই ভালো কাজ হবে। কিন্তু এই জিনিসটি কি ভারতের রাজনৈতিক,তামাদ্দুনিক ও শৈল্পিক জীবনের ভাবী নেতৃবৃন্দের মন মগজ থেকে উভয় ধর্মের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূলনীতিকেও বের করে দেবে? আমি হিন্দুমত ও ইসলামের অভ্যন্তরীন জীবন সম্পর্কে বেশী পরিচিতির দাবীদার নই। তবু আমি মনে করি, এই দু’টি ধর্মের মধ্যে এমনসব উপাদান রয়েছে, যা ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষাপ্রাপ্ত পুরুষ ও মেয়েদেরকে আয়ত্তাধীন রাখার ব্যাপারে এর যে কোন একটিতে যোগ্য করে তুলতে পারবে। খ্রীষ্টধর্ম তো এ ব্যাপারে এমন কতকগুলো ভ্রান্ত বিশ্বাসজাত বন্ধনের ফলে ব্যার্থকাম হয়েছে, যা এই ধর্মের মহান প্রবর্তকের পেশকৃত সত্যতাকেই গোপন করে ফেলেছে।
এখানে লর্ড লোথিয়ান নিজেই স্বীকার করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে হিন্দুত্ববাদ ও ইসলাম সম্পর্কে তার বেশি কিছু জানাশোনা নেই। তিনি শুধু দূর থেকে হিন্দুধর্ম ও ইসলামের মধ্যে কতিপয় উল্লেখযোগ্য জিনিস দেখতে পেয়েছেন। তাঁর মতে এই জিনিসগুলো আধুনিক সমালোচনা ও সন্ধানী ভাবধারার মুকাবিলায় শিক্ষিত লোকদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিকতার উচ্চতর নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত রাখতে সফলকাম হতে পারে। কিন্তু যারা এই উভয় ধর্ম তথা ভারতের সমস্ত ধর্মের অভ্যন্তরীন অবস্থা সম্পর্কে অবহিত তাদের কাছে এটা মোটেই গোপন নয় যে, সমালোচনা ও সন্ধানী ভাবধারার মুকাবিলায় টিকে থাকতে চাইলে একমাত্র ইসলামই টিকে থাকতে পারে; বরং স্পষ্টতম ভাষায় বলতে গেলে,এমনি ভাবধারাসহ কোনো ধর্মের পক্ষে তাঁর অনুবর্তীদের নিয়ে সামনে এগোবার এবং প্রগতি ও আলোকের যুগে গোটা মানব জাতির ধর্মরূপে স্বীকৃতি পাবার যোগ্যতা একমাত্র ইসলাম ছাড়া আর কারো নেই। খ্রীষ্টধর্ম কেনো ব্যর্থকাম হয়েছে? কেবল এই জন্যে যে, তা কোনো সামাজিক মতাদর্শ নয়; বরং তা সমাজবদ্ধতারই ঘোর বিরোধী। সে শুধু ব্যক্তির নাজাত সম্পর্কেই আলোকপাতকরে আর সে নাজাতের জন্যেও সে দুনিয়ার প্রতি বিমুখ হয়ে আসমানী বাদশাহীর মুখাপেক্ষী হওয়াকে একমাত্র পন্থা বলে নির্দেশ করে। এ কারনেই ইউরোপের জাতিগুলো উন্নতি ও তরক্কির পথে পা বাড়াবার সঙ্গে সঙ্গে খ্রীষ্টধর্ম তাদের সহায়ক হবার পরিবর্তে প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়ায়। ফলে তাঁর বন্ধনকে ছিন্ন করেই তাদের এগিয়ে চলতে হয়। হিন্দুধর্মের অবস্থাটাও এরই সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তার কাছেও কোনো প্রগতিশীল জীবন দর্শন, কোনো যুক্তিসম্মত নৈতিক বিধান ও কোনো প্রসারমান সমাজপদ্ধতি বর্তমান নেই। আজ পর্যন্ত হিন্দুদেরকে একটি সমাজ পদ্ধতিতে বেধে রাখার এবং অন্যান্য সভ্যতার প্রভাব গ্রহণ থেকে তাদেরকে বিরত রাখার ব্যাপারে সবচাইতে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে তাদের বর্ণাশ্রম প্রথা। কিন্তু হতে বাধ্য এবং এ ছিন্ন হবেই। এরপর আর কোনো জিনিস হিন্দু সমাজকে ভাঙ্গনের হাত থেকে বাচাতে পারবেনা। ফলে তাঁর রুদ্ধ দরজা বহিপ্রভাবের জন্যে উন্মুক্ত হয়ে যাবে।পরন্তু এটাও লক্ষ্যণীয় যে, হিন্দুদের প্রাচীন সভ্যতা ও সমাজ বিধান, পুরনো মুর্তিপূজামূলক কুসংস্কার এবং তাদের অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক দার্শনিক মতগুলো আধুনিক যুগের বৈজ্ঞানিক উন্নতি ও সমাজ সচেতনতার সামনে টিকে থাকতে পারেনা। তাই এখন হিন্দুরা দিন দিন এমনি এক চরম সন্ধিক্ষনের নিকটবর্তী হচ্ছে যেখানে তাদের এবং বহুলাংশে ভারতের ভাগ্য নির্নীত হবে। হয়তো তারা তারা ইউরোপের রেনেসা আমলের খ্রীষ্টানদের ন্যায় ইসলামের প্রতি বিমূখ ও বিদ্বেষান্ধ হয়ে বস্তুতান্ত্রিক সভ্যতার পথ অবলম্বন করবে, নতুবা দলে দলে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করতে থাকবে।
এই ফয়সালা বহুলাংশে মুসলমানদের,বিশেষত প্রাচীন ও আধুনিক শিক্ষিত লোকদের কর্মধারার ওপর নির্ভর করছে। কারণ ইসলাম শুধু তাঁর নামের জোরেই কোনো মু’জিযা দেখাতে পারেনা। তাঁর নীতি ও আদর্শ শুধু কিতাবের পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ থাকলে তাঁর পক্ষেও কোনো মু’জিযা দেখানো সম্ভবপর নয়। যে অনৈক্য, বিশৃঙ্খলা ও নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে বর্তমানে মুসলমানরা লিপ্ত রয়েছে, যে জড়তা ও স্থবিরতা তাদের আলিম সমাজকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে এবং যেরূপ নারীসুলভ ভীরুতা ও লাজুকতা তাদের নব্যশিক্ষিত বংশধরদের মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে, তাতে ভারতের আত্নাকে জয় করা তো দূরের কথা, ইসলামের দাবিদারগণ নিজেদের জায়গায়ই টিকে থাকরে পারবে বলে আশা করা যায়না। বিপ্লবের খরস্রোতের মুখে কোনো জাতির স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব ব্যাপার। হয় তাকে স্রোতের মুখে ভেসে যেতে হবে, নতুবা পূর্ন বিক্রমের সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে স্রোতের গতিমুখ ঘুরিয়ে দিতে হবে।এই দ্বিতীয় অবস্থাটি কেবল এভাবেই সৃষ্টি হতে পারে যে, প্রথমত সাধারন মুসলমানদের নৈতিক অবস্থার সংশোধন করতে হবে এবং তাদের মধ্যে ইসলামী জিন্দেগীর মূল ভাবধারা উজ্জীবিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত আলেম সমাজ ও নব্য শিক্ষিত মুসলমানদের মিলিতভাবে ইসলামী নীতির আলোকে জীবিনের আধুনিক সমস্যাবলী অনুধাবন করতে হবে এবং আদর্শ ও বাস্তব উভয় দিক থেকেই সেগুলোর সুষ্ঠু সমাধান পেশকরতে হবে – যাতে করে অন্ধ বিদ্বেষী ছাড়া প্রতিটি যুক্তিবাদী মানুষই স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, একটি প্রগতিশীল সমাজের পক্ষে ইসলামী কৃষ্টি ও সভ্যতা ছাড়া আর কোনো ভিত্তিই নির্ভুল ও নির্দোষ হতে পারেনা।
ভারতে[উল্লেখ্য করা যেতে পারে যে,এই প্রবন্ধ লেখা হয়েছে ১৯৩৮ সালে।অবিভক্ত ভারতের তখনকার অবস্থায় পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রবন্ধে যেসব সমস্যার উল্লেখ করা হয়েছিলো,খন্ডিত তারতের দেশে দেশে আজো তা বর্তমান রয়েছে।–অনুবাদক] ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে আজকে যে ধরনের বিরোধ চলছে,আজ থেকে ৫০/৬০ বছর পূর্বে ইউরোপে তেমনি বিরোধই বর্তমান ছিলো। কিন্তু ইউরোপের উচ্ছিষ্টভোজী ভারতেও খুব শিগগীরই পট পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। কাজেই সেদিন বেশি দূরে নয়,যেদিন ধর্মের বিরুদ্ধে অন্তত যুক্তি ও জ্ঞানের দিক থেকে এই বিদ্বেষের অস্তিত্ব থাকবে না। অবশ্য সে জন্য শর্ত এই যে, সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্যে আগে থেকেই আমাদের তৈরী থাকতে হবে। লর্ড লোথিয়ান সংক্ষেপে এই নিগূঢ় সত্যের দিকেও ইংগিত করেছেনঃ৬০ বছর পূর্বে বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে যে লড়াই চলছিল, তার অবসানের কোনোই প্রত্যাশা ছিলোনা; বরং জীবনের আধ্যাত্ম্রিক ও যান্ত্রিক ধারণার মধ্যকার এই যুদ্ধ সম্পর্কে এমনি সংশয় দেখা দিয়েছিলো যে, এ দুয়ের মধ্যকার কোনো একটির মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত এর অবসান হবেনা। কিন্তু আজকে উভয় বিবাদমান পক্ষই রণে ভংগ দিয়েছে। বিজ্ঞানী কি ধার্মিক, এ দুয়ের কেউই আজ দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করছেন না যে, বিশ্ব প্রকৃতির তামাম রহস্য তিনি উদঘাটন করে ফেলেছেন – সমস্ত জটিলতার তিনি মীমাংসা করতে পেরেছেন; বরং প্রকৃতপক্ষে এ রহস্য সম্পর্কে তিনি আদৌ কিছু জানেন কিনা উভয়ের মনে এমনি একটা সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই আজকে এমন একটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে যা জ্ঞান বিজ্ঞানের নিত্য নতুন অগ্রগতির মাঝে অসম্ভব মনে হয়েছিলো।
লর্ড লোথিয়ান অবশ্য ধর্ম সম্পর্কে খ্রীস্টীয় ধারনার প্রভাবমুক্ত নন। তাছাড়া তিনি ধর্ম সম্পর্কে ইসলামের যুক্তিসম্মত ধারনাও সন্ধান পাননি। এ কারনে তিনি বড়জোর এটুকুই ভাবতে পারেন যে, ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে আজকে কোনো সমন্বয় হতে পারে। কিন্তু আমরা ধর্ম ও বিজ্ঞানের সমন্বয়কে সম্পূর্ণ অর্থহীন মনে করি। আজকে বিজ্ঞানের প্রাণবস্তু হবার পথে ইসলামের কোনো বাধা থেকে থাকলে তা তাঁর অন্তর্নিহিত ত্রুটি নয়; বরং তা হচ্ছে তাঁর অনুবর্তীদের সীমাহীন অলসতা এবং বিজ্ঞানের ধ্বজাবাহীদের অজ্ঞতা ও জাহিলীসুলভ বিদ্বেষ।এ দুটি বাধা অপসারিত হলে বিজ্ঞানের খাচার মধ্যে ইসলাম অবশ্যই প্রাণবস্তু হয়ে থাকবে।
সামনে অগ্রসর হয়ে প্রাজ্ঞ বক্তা আর একটি বিষরের প্রতি আলোকপাত করেছেন। তা হলো এই যে, বর্তমান যুগের বৈজ্ঞানিক জাগরণ ও বুদ্ধিভিত্তিক সমালোচনার মোকাবিলায় কোনো ধরনের ধর্ম কি টিকে থাকতে পারে? বর্তমান আলোকজ্জ্বল যুগে মানুষ যে ধর্মের অনিসন্ধিতসু,তার কি কি বৈশিষ্ট থাকা উচিৎ? এবং বর্তমান মানুষ কোন কোন মৌল প্রয়োজনে ধর্মের পথ নির্দেশ খুজে বেড়াচ্ছে?
এটিই হচ্ছে আলোচ্য ভাষোণের সবচাইতে বেশি লক্ষণীয় বিষয়।তিনি বলেছেনঃ
পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার ধারণা যদি ভ্রান্ত না হয়, তবে এ সত্য অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, বর্তমান সময়ের ধর্ম এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন। এ পরীক্ষায় সে কেবল তখনি সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হতে পারবে, যখন নব্য বংশধরগণ তাঁর অন্তর্নিহিত বিধি ব্যবস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারবে যে, জীবনের সমস্ত বাস্তব সমস্যা জিজ্ঞাসা ও জটিলতার সুষ্ঠু সমাধান এই ধর্মের মধ্যেই নিহিত। ব্যাক্তিগত ধর্মের দিন আজ আর নেই। সেদিন আগেই বিদায় নিয়েছে। নিছক ভাবপ্রবন ধর্মের আজ কারো প্রয়োজন নেই। যে ধর্ম কেবল মানুষের নৈতিক আচার ব্যবহার সম্পর্কেই কিছুটা বিধি ব্যবস্থা দেয়ার মতো সাহায্য করতে পারে এবং বড়জোড় পরকালীন মুক্তিরই প্রতিশ্রুতি দিতে সক্ষম, তার যুগও আজ শেষ হরে গিয়েছে। বর্তমান যুগের যুক্তিবাদী মানুষ তো প্রতিটি জিনিসকে এমন কি সত্যকেও প্রত্যক্ষ ফলাফলের মানদন্ডে যাচাই করে দেখতে চায়। তার যদি ধর্মের আনুগত্য করতে হয়, তা হলে পূর্বাহ্নে তাঁর এ প্রশ্নের জবাব দিতে হবে যে, ধর্মের কাছে তাঁর বাস্তব সমস্যাবলীর কি সমাধান রয়েছে। বহু জন্ম-জন্মান্তর পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাণ লাভের প্রত্যাশা কিংবা মৃত্যুর পর্যায় অতিক্রম করে আসমানী রাজত্বে উপনীত হবার প্রতীক্ষা এমন কোনো জিনিস নয় যে, কেবল এর ওপর ভরসা করেই সে ধর্ম গ্রহণ করবে। তার দার্শনিক অনুসন্ধিতার কারণে ধর্মকে সর্বপ্রথম এমন চাবিকাঠি সংগ্রহ করে দিতে হবে, যা দ্বারা সে বিশ্ব প্রকৃতির গোপন রহস্যের কোনো সন্তোষজনক সমাধান বের করতে পারে। উপরন্ত তাকে যথাযথ বৈজ্ঞানিক পন্থায় কার্য ও কারণ-তথা নিমিত্ত ও ফলাফলের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক প্রমাণ করে দেখাতে হবে যে, বর্তমান যেসব উদ্ধত ও দূর্বীনিত শক্তি মানব জাতির কল্যাণের পরিবর্তে ধ্বংসের হুমকি প্রদর্শন করছে, সেগুলোকে সে কিভাবে নিয়ন্ত্রণাধীনে আনতে পারে, অনুরূপভাবে সে বেকার সমস্যা, অযৌক্তিক বৈষম্য, জুলুম নীপিড়ন, অর্থনৈতিক শোষোণ, যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং অন্যান্য সামাজিক বিকৃতি কিভাবে নির্মূল করবে, লোকদের পারস্পরিক হানাহানি এবং পারিবারিক ব্যবস্থার বিপর্যয়কে কিভাবে রোধ করবে, ইত্যাকার বিষয়ও ধর্মে নির্দেশ করতে হবে। কারণ এই সমস্যাগুলোই মানুষের সমস্ত আনন্দকে ছিনিয়ে নিয়েছে। ধর্মের প্রতি আজ মানুষের এতোটা মুখাপেক্ষী হবার একমাত্র কারণ এই যে, বিজ্ঞান তাঁর সমস্যাবলীর সমাধানের পরিবর্তে একে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এ কারনেই সে ধর্মের কাছ থেকে নিজের সন্দেহ ও সমস্যাবলীর মীমাংসা করানোর ব্যাপারে আজকের মতো এতোটা ব্যাকুল আর কখনো হয়নি। কাজেই ধর্ম তাঁর চৌহিদ্দির নিরাপত্তা এবং তাঁর লুপ্ত মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে চাইলে উল্লেখিত প্রশ্নাবলীর আধাত্নিক অথচ বিজ্ঞানসম্মত জবাব দান করতে হবে – যাতে করে এই দুনিয়ায় বসেই তারে যথার্থতাকে ফলাফলের মানদন্ডে যাচাই, পরখ করা যেতে পারে।অর্থাৎ সে জবাবকে মৃত্যুরপরবর্তী দুনিয়ার জন্য শিকায় তুলে রাখা যাবেনা। আমরা পাশ্চাত্যবাসীরা জানি যে, এটিই হচ্ছে আমাদের এ যুগের সবচাইতে বড় সমস্যা। আপনারা ভারতবাসীরা এর কি জবাব দিতে পারেন?
লর্ড লোথিয়ানের ভাষণের এ অংশটি পড়ার পর মনে হয় সত্যই, একজন পিপাসার্ত ব্যক্তি যেনো যাতনায় ছটফট করছে। তার পানি সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই; কিন্তু পিপাসার লক্ষণগুলোকে সে যথাযথ অনুভব করছে এবং তার কলিজার আগুন কোন্ কোন্ গুণবিশিষ্ট জিনিস কামনা করছে, তাও সে স্পষ্টত বলে দিচ্ছে। এমতাবস্থায় তার সামনে পানি এনে হাযির করা হলে তার প্রকৃতি এমনি বলে উঠবে, এই জিনিসটির জন্যেই তো পিপাসায় অস্থির। এমনকি পানির পাত্রটি নিয়ে চুমুক লাগাতেও সে কিছুমাত্র দ্বিরুক্তি করবেনা। এই অবস্থা শুধু লর্ড লোথিয়ানেরই নয়; বরং ইউরোপ, আমেরিকা তথা পৃথিবীর যেখানেই মানুষ পাশ্চাত্য সভ্যতার আগুনে দগ্ধ হয়েছে এবং দর্শন ও বিজ্ঞানরূপ মরুভূমির তীরবর্তী সবুজ বর্ণালী অতিক্রম করে মধ্যবর্তী পানি তৃণ লতাহীন প্রান্তরে এসে উপনীত হয়েছে, তারা সবাই আজ একই রূপে তৃষ্ণার্ত এবং লর্ড লোথিয়ানের ন্যায় সবাই একই গুণবিশিষ্ট জিনিস কামনা করছে। এর কেউই পানির নাম জানেনা, তা কোথায় পাওয়া যায় সে কথাও কেউ জানেনা; কিন্তু থেকে থেকে শুধু চীৎকার করছে ‘যে জিনসটির দ্বারা কলিজার আগুন নেভানো যাবে, তা শীঘ্রই নিয়ে এসো!’
পানির নাম অবশ্য শুনেছে; কিন্তু তার আসল চেহারা তারা প্রত্যক্ষ করেনি; বরং অজ্ঞ ও বিদ্বেষান্ধ পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে তারা একথাও শুনে আসছে যে, ‘সাবধান! পানির কাছেও যেওনা, এ একটি বিষাক্ত ভয়ংঙ্কর জিনিস।’ এ কারণেই তারা এ নামটিকে ভয় করে আসছে। কিন্তু আজকে পরিস্থিতি এমনি পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, নামটি গোপন করে আসল জিনিসটি যদি তাদের সামনে পেশ করা হয়, তবে সত্যই তারা বলে উঠবেঃ ‘হ্যাঁ, এ জিনিসটির জন্যেই আমরা তৃষ্ণার্ত ছিলাম।’ তারপর যদি তাদের বলা হয়, ‘জনাব! যে নামটিকে আপনারা ভয় করছেন, এ হচ্ছে সেই পানি, তা হলে তারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলবেঃ ‘এতোদিন আমরা কী ধোকার মধ্যেই না ছিলাম!’
বর্তমান যুগের যুক্তিবাদী মানুষ খ্রীষ্টধর্মকে খুব ভালোমতো যাচাই পরখ করে দেখেছে। এ ধর্মটি যে তার ব্যাধির কোন প্রতিকার নয়, একথা দিবালোকের ন্যায় প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের হেয়ালী দর্শন এবং তাদের ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়াশীলতা দেখে কখনো কখনো সে মুগ্ধ হয় বটে কিন্তু বৈজ্ঞানিক সমালোচনা ও বিশ্লেষণের প্রথম আঘাতেই তাদের ব্যর্থতা প্রকট হয়ে পড়ে। বৌদ্ধ ধর্ম তো অনেকটা খ্রীষ্টধর্মেরই ভারতীয় সংস্করণ। আর হিন্দু ধর্ম নিজেই এমনসব সমস্যা ও জটিলতা সৃষ্টি করে চলেছে, যেগুলো থেকে নিস্তার লাভের আশায়ই বর্তমান যুগের যুক্তিবাদী মানুষ ধর্মের প্রয়োজন অনুভব করছে। এর চৌহদ্দির ভেতরেই মানুষে মানুষে অযৌক্তিক বৈষম্য সবচাইতে বেশি লক্ষ্য করা যায়। আর্থিক শোষণের সবচাইতে নিকৃষ্ট রূপ – অর্থাৎ মহাজনী ও সুদখোরী এর বিধি-ব্যবস্থার অচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ-বিগ্রহের মূল কারণ অর্থাৎ মানুষের গোত্রীয় বিভাগ ও বিদ্বেষ- তার ভিত্তিমূলে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে আছে। তার প্রতিষ্ঠিত সমাজ পদ্ধতি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেনা; বরং তাকে বেশুমার শ্রেণী ও গোত্রে বিভক্ত করে দেয়। তার সমাজ বিধান এতোই প্রাচীন ও জরাজীর্ণ যে, বর্তমান বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবধর্মী চেতনার যুগে হাজার হাজার বছরের খান্দানী হিন্দুরা পর্যন্ত সেগুলোকে লঙ্ঘন করতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ এগুলোর ভিত্তি জ্ঞান-বুদ্ধি ও যুক্তিবাদের ওপর নয়; বরং বিদ্বেষ ও কুসংস্কারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই সকল পার্থিব বিষয় ছাড়াও ন্যায় শাস্ত্র ও আধ্যাত্মবাদের ক্ষেত্রে তাকে আরো বেশি অকেজো বলে মনে হয়। বিশ্ব প্রকৃতির গোপন রহস্যাবলীর সন্তোষজনকভাবে মীমাংসা করার মতো কোন চাবিকাঠি তার কাছে নেই। তার প্রত্যয়গুলো নিছক কাল্পনিক বিষয় মাত্র, তার কোন একটি বিষয়ের পক্ষেও কোন বৈজ্ঞানিক বা বুদ্ধিভিত্তিক প্রমাণ পেশ করা যেতে পারে না। নীতি শাস্ত্রের ব্যাপারে চিত্তহারী কল্পনার একটি ইন্দ্রজাল সে অবশ্যি সৃষ্টি করে- যেমন একটি ইন্দ্রজাল মহাত্মা গান্ধীও সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু যুক্তি প্রমাণ ও বাস্তব বিচার বুদ্ধি (Practical wisdom) থেকে তা একেবারেই শূণ্য। কাজেই বর্তমান বৈজ্ঞানিক চেতনার যুগে তার ব্যর্থতা যে খুব শীঘ্রই প্রকটিত হয়ে উঠবে, এটা দৃঢ়তার সঙ্গেই বলা যায়।
এরপর বাকি থাকে শুধু ইসলাম। বস্তুত আজকের যুক্তিবাদী মানুষ তর ঈস্পিত ধর্মের জন্য যেসব মাপকাঠি পেশ করেছে বা করতে পারে তার প্রতিটি মাপকাঠিতে ইসলাম পুরোপুরি উত্তীর্ণ।
ধর্ম নিছক একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার এবং শুধু ব্যক্তিগত নীতিবোধের সঙ্গেই এর সম্পর্ক রয়েছে, একথা আজকে বাসি হয়ে গেছে। আসলে এ হচ্ছে ঊনিশ শতকেরই এক বিশেষ খামখেয়ালি মাত্র। অথচ বিশ শতকের এই চতুর্থ দশকে বসেও আমাদের দেশের একশ্রেণীর প্রতিক্রিয়াশীল লোক এই মতবাদটি প্রচার করে চলছে। এই শ্রেণীর লোকেরা ‘প্রগতি’ ‘প্রগতি’ বলে চিৎকার করা সত্ত্বেও হামেশা চলমান বিশ্বের চাইতে পঞ্চাশ বছর পেছনে চলতেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আজকে একথা প্রায় সর্বজন স্বীকৃত বলা চলে যে, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তির কোন চিন্তাই করা যেতে পারেনা। সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তিই অপরাপর ব্যক্তির সংঙ্গে বেশুমার ছোট বড় সম্পর্কে জড়িত। সমাজ হচ্ছে মোটামুটিভাবে একটি দেহ সদৃশ্য। এখানে ব্যক্তির মর্যাদা হচ্ছে জীবন্ত দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো। ধর্মের প্রয়োজন যদি থেকেই থাকে, তবে তা শুধু ব্যক্তির নিজস্ব মনোতুষ্টি বা পরকালীন মুক্তির জন্য নয়; বরং গোটা সমাজের সংগঠন এবংপার্থিব জীবের তাবৎ কাজ কারবার পরিচালনার জন্যেই প্রয়োজন। আর তার প্রয়োজন না থাকলে ব্যক্তি বা সমাজ কারুর জন্যেই নেই। সমাজের বিধি-ব্যবস্থা হবে একরূপ আর ব্যক্তির ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মচারণ হবে তার থেকে ভিন্নরূপ, এটা নিছক বালকসূলভ বক্তব্য বৈ কিছু নয়। সমাজ জীবনের সাথে ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মচারণের যদি সম্পর্ক না থাকে, তবে তো তেমন বিশ্বাস ও আচরণ একেবারেই নিরর্থক। শুধু নিরর্থক নয়, বরং যে সমাজ ব্যবস্থার অন্যান্য অংশের সাথে তা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত নয়, সেখানে তার বিলুপ্তি অনিবার্য। কাজেই দু’টি পন্থার মধ্যে কেবল একটি পন্থাই গৃহীত হতে পারেঃ হয় গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে একেবারে ধর্মহীন করতে হবে এবং কমিউনিস্ট মতবাদ অনুসারে মানব জীবন থেকে ধর্মকে চূড়ান্তরূপে নির্বাসিত করতে হবে; নতুবা সমাজ জীবনকে পুরোপুরি ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে এবং ইসলামের দাবি অনুসারে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কৃষ্টি তমুদ্দুন উভয় ক্ষেত্রেই ধর্মকে একমাত্র দিশারী বলে মানতে হবে। প্রথম পন্থাটি মানুষ বহুকাল ধরে পরীক্ষা করে দেখছে। তার যে বিষতিক্ত ফলের কথা লর্ড লোথিয়ান উল্লেখ করেছেন, তা-ই তা থেকে উৎপন্ন হতে পারে এবং তা-ই উৎপন্ন হয়েছে। আর ভবিষ্যতেও এ নিয়মের কোন ব্যতিক্রম ঘটবেনা। এমতাবস্তায় দুনিয়ার মুক্তি কেবল দ্বিতীয় পন্থাটির মধ্যেই নিহিত এবং এই পন্থাটি বাস্তবায়িত হবার সম্ভাবনা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠেছে।
কিন্তু পূর্বে যেমন বলেছি, এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা কিংবা একে চিরতরে হারিয়ে ফেলা সম্পূর্ণত মুসলমানদের ইচ্ছাধীন। বাস্তব ঘটনা দুনিয়া ও দুনিয়ার একটি অংশ হিসেবে আমাদের এই দেশকে এমন এক স্থানে নিয়ে এসেছে, যেখান থেকে চলার গতি ইসলামের দিকেও ঘুরে যেতে পারে, আবার বস্তুতন্ত্র ও নৈতিক অরাজকতার অতল গহ্বরে গিয়েও পৌঁছা সম্ভব। সম্ভবতই তার গতি আজ পর্যন্ত দ্বিতীয় পথের দিকেই রয়েছে; কারণ এক সুদীর্ঘকাল থেকে দুনিয়া এ পথেই এগিয়ে চলছে। অবশ্য এ পথের নানা বিপদাপদ ও বিভীষিকা দেখে সে ভীত ও শঙ্কিত হয়ে উঠেছে এবং এছাড়া কোনো বঁচার পথ আছে কিনা, চারদিকে সন্ধানী দৃষ্টি ফেলে তাও নিরীক্ষণ করছে। কিন্তু বাঁচার কোনো পথই তার দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছেনা। প্রকৃতপক্ষে তাদের দৃষ্টিশক্তিকে আবরণমুক্ত করা এবং ইসলামের সহজ সরল পথকে একমাত্র মুক্তির পথ বলে প্রমাণ করার মতো শক্তিশালী নেতৃবৃন্দের জন্য তারা প্রতীক্ষমান। এমন মোজাহিদ ও মোজতাহিদের কোনো দল যদি মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্টি হয় তো তারাই গোটা পৃথিবী দিশারী হতে সক্ষম। এমতাবস্থায় পূর্বে যে মর্যাদার আসনে তারা অভিষিক্ত ছিলো এবং সেখানে পাশ্চাত্য জাতিগুলোকে অধীষ্ঠিত দেখে আজকে তারা লালয়িত হচ্ছে, সে আসন আবার তারা লাভ করতে পারে। কিন্তু এ জাতির সংখ্যাগুরু অংশ যদি আজকের মতোই হতাশা ও নিরুৎসাহের সঙ্গে বসে থাকে, তার যুব সম্প্রদায় যদি পরের উচ্ছিষ্ট ভোজনকেই চরম স্বার্থকতা মনে করে, তার আলিম সমাজ যদি প্রাচীন ফিকাহ ও কালামের অন্তসারশূন্য বিতর্কে লিপ্ত থাকে, তার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নিকৃষ্ট মানসিকতা যদি ভিন জাতির পদাঙ্ক অনুসরণকেই ‘জিহাদী মনোবৃত্তির’ উচ্চতম আদর্শ বলে গণ্য করেন এবং আপন জাতিকে বিশ শতকের সবচাইতে বড় পতারণার ফাঁদে নিক্ষেপ করাকেই বিরাট কৃতিত্ব ও বুদ্ধিমত্তা বলে ভাবেন- ফলকথা এই বিশাল জাতির আপাদমস্তক সবটাই যদি নিষ্ক্রিয়তা ও অকর্মন্যতায়ই লিপ্ত থাকে এবং এই কোটি কোটি মানুষের মধ্যে থেকে কয়েকজন মর্দে মু’মিনও আল্লাহর পথে জিহাদ ইজতিহাদ ও সংগ্রাম সাধনার জন্যে দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে আসতে না পারেন, তাহলে দুনিয়া যে অতল গহ্বরের দিকে ধাবিত হচ্ছে, সে গহ্বরে এ জাতিও একদিন নিক্ষিপ্ত হবে। তারপর আল্লাহর গযব আর একবার গর্জন করে উঠবেঃ
(আরবী)
(অর্থঃ ধ্বংস হোক আলিম সম্প্রদায়।)
৭
তুরস্কের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংঘাত
[প্রবন্ধটি ১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাসিক তরজমানুল কুরআন পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়।– সম্পাদক]
খালেদা এদিব খানমের ভাষণ
[নামটির তুর্কী উচ্চারণ ‘হালিদা এদিব হানুম’।]
খ্যাতনামা তুর্কী বিদুষী ও সংগ্রামী মহিলা খালেদা এদিব খানম ১৯৩৫ সালের মধ্যভাগে ‘জামেয়া ইসলামিয়া’র আমন্ত্রণক্রমে ভারতে এসেছিলেন। তিনি দিল্লিতে যে য়টি ভাষণ প্রদান করেন, জামেয়ার অধ্যাপক ডক্টর সাইয়্যেদ আবিদ হোসাইন ‘তুরস্কে প্রাচ্যও পাশ্চাত্যের সংঘাত’ নামে তার উর্দু তরজমা প্রকাশ করেছেন। আলোচ্য নিবন্ধে উক্ত ভাষণগুলোর প্রতি আমরা কিছুটা আলোকপাত করবো।
মুসলিম জাহানে বর্তমানে দু’টি রাষ্ট্র দু’টি ভিন্ন দিক দিয়ে থেকে বিশ্ব মুসলিমের নেতৃত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত। মানসিক দিক থেকে মিসর আর রাজনৈতিক দিক থেকে তুরস্ক। মিসরের সাথে মুসলিম জাতির সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে বেশি গভীর। কারণ তার ভাষা হচ্ছে আমাদেরই নিজস্ব আন্তর্জাতিক ভাষা -আরবি। তার বই পুস্তকাদি তামাম দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে প্রচারিত হয়। তার মানসিক প্রভাব চীন থেকে মরক্কো অবধি বিস্তৃত। এক কথায়, মিসরই হচ্ছে মুসলমানদের মধ্যকার মেলামেশা, বোঝাপড়া ও জানাজানির একমাত্র সূত্র। পক্ষান্তরে তুর্কী জাতির সংগ্রামী জীবন, পাশ্চাত্য অভিযানের বিরুদ্ধে তাদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা এবং জাতীয় মর্যাদার জন্যে তাদের বিপুল ত্যাগ ও কুরবানী নিসন্দেহে তামাম মুসলিম জাহানকে প্রভাবান্বিত করেছে। এ কারণেই তারা মুসলিম জাহানে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের আসনে উপবিষ্ট। কিন্তু ভাষাগত অপরিচিত এবং পারস্পরিক মেলামেশা ও বোঝাপার অভাব তুরস্ক ও অধিকাংশ মুসলিম দেশের মধ্যে একটি গভীর অন্তরালের সৃষ্টি করেছে। এর ফলে তুর্কী জাতির মানসিক ক্রমবিকাশ, তাদের বুদ্ধিভিত্তিক গড়ন, তার সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সম্পর্কে আমাদের জানাশোনা খুবই সীমাবদ্ধ। বিশেষত সাম্প্রতিক দশ বারো বছরে তুরস্কে যে বিরাট বিপ্লব ঘটে গেছে, তার অন্তর্নিহিত কারণ ও মূল ভাবধারাটি জানবার ও বুঝবার সুযোগ আমরা খুব কমই পেয়েছি। বহু লোক তুর্কিদের প্রতি যারপর নাই অসন্তুষ্ট। কেউ কেউ আবার তাদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করে। এমনকি কতক লোক তাদেরপাশ্চাত্য প্রীতিকে নিজেদের পাশ্চাত্য পূজার জন্যে চূড়ান্ত দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছে। কিন্তু প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্য এদের কারো কাছে নেই। কারো কারো কাছে সামান্য তথ্য বর্তমান থাকলেও আধুনিক তুরস্কের প্রাণসত্তাকে উপলব্ধি করার জনে তা মোটেই যথেষ্ঠ নয়।
এ পরিস্থিতিতে আমাদের পরম সৌভাগ্য যে, আধুনিক তুরস্কের একজন বিশিষ্ট নির্মাতা এখানে এসে নিজ জাতির অভ্যন্তরীণ অবস্থা ব্যক্ত করেছেন। তিনি শুধু সাম্প্রতিক বিপ্লবের মঞ্চাভিনেত্রীই ছিলেননা; বরং তিনি ছিলেন সে বিপ্লবের এক বিশিষ্ট ক্রিয়াশীল শক্তি। সেই সঙ্গে তিনি আল্লাহর ফযলে পন্ডিতোচিত দূরদৃষ্টি, দার্শনিকসূলভ উপলব্ধি ও মনীষীতুল্য ধী-শক্তির অধিকারিণী। এর ফলে তিনি বাহ্য ঘটনা প্রবাহের অন্তর্নিহিত কার্যকারণ যেমন বুঝতে পারেন, তেমনি তা বোঝাতেও পারেন। এমনি প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এই প্রথমবার আমরা তুরস্ককে সঠিকভাবে জানবার ও বুঝবার সুযোগ পেয়েছি। আধুনিক তুরস্কের প্রাণসত্ত্বাকে তিনি আমাদের সামনে উন্মোচিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। যে জাতি আজ মুসলিম দুনিয়ার শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বই প্রদান করছেনা, তার মানসিক নেতৃত্ব অর্জনেও প্রয়াসী। প্রকৃতপক্ষে তার অভ্যন্তরীণ অবস্থাটা কি, কি কি উপাদান দ্বারা তা সংগঠিত হয়েছে, কোন্ কোন্ শক্তি তার ভেতর কাজ করছে, কোন্ কোন্ কার্যকারণ তাকে বর্তমান জায়গায় টেনে নিয়ে এসেছে এবং আজকে কোন্ দিকেই বা এগিয়ে চলছে – এসব কথা পরিপূর্ণ সততা ও বিশ্বস্ততার সাথে তিনি আমাদের বলেছেন। এ প্রামাণ্য তথ্যাগারটি বিভিন্ন দিক থেকেই আমাদের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী। এর শুধু এই একটি ফায়দাই নয় যে, তুর্কী জাতির প্রকৃত অবস্থা আমাদের সামনে প্রকট হয়ে পড়েছে; বরং এর একটি বড় ফায়দা এই যে, তুরস্ক থেকে আমাদের নব্য বংশধরগণ আজকে যে পথনির্দেশ পাচ্ছে, তার মূল ভাবধারাকে আমরা অধিকতর উত্তমরূপে বুঝতে পারছি। মোটকথা, বর্তমানে মুসলিম জাহানে যে বিপ্লব সংগঠিত হতে চলছে, তার অভ্যন্তরীণ কার্যকরণকে বুঝবার আর একটি সুযোগ আমরা লাভ করেছি।
অবশ্য খালেদা খানমের মারফতে আধুনিক তুরস্ককে বুঝবার আগে খোদ তাঁকেই উত্তমরূপে বুঝে নেয়া দরকার। এটা নিসন্দেহ যে, খালেদা খানমের অন্তর পুরোপুরি মুসলমান এবং তা ঈমানী চেতনায় পরিপূর্ণ। আর সে ঈমানও যেনো তেনো রকম নয়, ঈর্ষা করার মতো। কারণ তা হচ্ছে এক মুজাহিদ নারীর ঈমান। [দুঃখের বিষয়, পরবর্তী অধ্যয়নের ফলে এই মতের ওপর অবিচল থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি (১৯৪৩)]
তাঁর চিন্তাধারায় নাস্তিকতা ও অধার্মিকতার চিহ্ন পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়না। ইসলামের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় অনুরাগ রয়েছে; সে অনুরাগ একজন খাঁটি মুসলিম নারীর মতোই।
কিন্তু তাঁর অন্তর যেমন মুসলমান, তাঁর মস্তিষ্ক ঠিক তেমন নয়। তিনি সম্পূর্ণ পাশ্চাত্য ধারায় শিক্ষালাভ করেছেন, পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞানই শুধু অধ্যয়ন করেছেন। পাশ্চাত্য চশমা দ্বারাই দুনিয়া, ইসলাম এবং নিজ জাতিকে দেখেছেন এবং তাঁর সমস্ত চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিই পাশ্চাত্য ছাঁচে গড়ে উঠেছে। অবশ্য তাঁর অন্তরের প্রচ্ছন্ন ইসলাম ও প্রাচ্যপ্রীতি পাশ্চাত্যপনার ঐ মানসিক বুদ্ধিভিত্তিক প্রতিপত্তিকে বহুলাংশে প্রতিরোধ করছে। সেই প্রতিরোধের ফলেই তুর্কী জাতির অন্যান্য বিপ্লবী নেতৃবৃন্দের তুলনায় তাঁর চিন্তাধারায় অনেকখানি ভারসাম্য লক্ষ্যকরা যায়। কিন্তু সে প্রতিরোধ তাঁকে পাশ্চাত্যপ্রীতির আধিপত্য থেকে একেবারে রক্ষা করতে পারেনি।
ইসলাম সম্বর্কে তাঁর জানাশোনা খুবই সীমিত বলে মনে হয়। পাশ্চাত্য দর্শন, ইতিহাস ও সমাজতত্বের অধ্যয়নে যতোটা সময় তিনি ব্যয় করেছেন, কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামের ইতিহাস অধ্যয়নে সম্ভবত তার এক দশমাংশ সময়ও ব্যয় করেননি। এই কারণেই তাঁর ভাষণে ইসলাম সম্পর্কে তাঁর চিন্তাধারার যেটুকু ঝলক আমাদের লক্ষ্যগোচর হয়েছে, তাতে সদুদ্দেশ্য আছে বটে, কিন্তু গভীর বোধশক্তি ও দুরদৃষ্টি খুবই কম।
তিনি শেষ ভাষণটিতে বলেছেন, ‘গান্ধীজীর ব্যক্তিত্ব আধুনিক ইসলামের এক পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টান্ত।’ একথা কেবল এমন ব্যক্তিই বলতে পারে, যার আদৌ জানা নেই যে, ইসলাম কি জিনিস, প্রাচীন ও আধুনিকের তুলনার চাইতেও তা কতোবড় মহান ও উন্নত এবং তার পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টান্ত কিরূপ হয়ে থাকে? ইসলামী চরিত্রের বৈশিষ্ট্যের প্রতি যার কিছুমাত্র লক্ষ্য আছে এবং যিনি সে চরিত্রের একটি ঝলক মাত্রও দেখতে পেয়েছেন, তাঁর দৃষ্টিতে গান্ধীজীর আর কি গুরুত্ব, বিশ্ব ইতিহাসের বড় বড় নায়করা পর্যন্ত মূল্যহীন। এটা কোনো জাতীয় বিদ্বেষপ্রসূত কথা নয়; বরং এ এক অনস্বীকার্য ঐতিহাসিক সত্য। আবুবকর সিদ্দীক রা., উমর ফারুক রা., আলী মুরতাযা রা., হাসান ইবনে আলী রা., আবু হানিফা র. আহমদ বিন হাম্বল র. আবদুল কাদের জিলানী র., প্রমুখের চরিত্র সামনে রাখুন। তারপর ইনসাফের সঙ্গে বলুন, নবীগণকে বাদ দিলে বিশ্ব ইতিহাসের কোন ব্যক্তিত্বটিকে এই চরিত্রগুলোর সামনে দাঁড় করানো যেতে পারে?
উসমানীয় জাতির রাজনৈতিক সমাজ গঠনে তুর্কী জাতির প্রাচীন বংশগত বৈশিষ্ট থেকে শুরু করে গ্রীস, বাইজান্টাইন, রোম, এমনকি প্লেটোর গণতন্ত্র পর্যন্ত সবকিছুরই প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু লক্ষ্যগোচর হয়না শুধু কুরআন এবং মুহাম্মদ সা.-এর শিক্ষার প্রভাব। অথচ এই বস্তুটিই মধ্য এশিয়ার বেদুঈন তুর্কীদের হাতে তাহযীব তমদ্দুনের আলোকবর্তিকা দিয়েছে, তাদের মধ্যে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃতি এবং জগতজোড়া খ্যাতি লাভের মতো যোগ্যতার সৃষ্টি করেছে এবং তাদেরকে মানব জাতির পক্ষে ধ্বংসাত্নক শক্তির পরিবর্তে এক সুসংগঠিত শক্তিতে পরিণত করেছে। খালেদা খানম উসমানীয়দের মধ্যে বড়জোর ইসলামের সাম্য ও সুবিচারের কিছুটা প্রভাব দেখতে পেয়েছেন। তারও অবস্থা হচ্ছে এই যে, সুলতান সলীম তাঁর প্রজাদের মধ্যে তরবারির জোরে ইসলাম প্রচার করতে চাইলে শায়খুল ইসলাম জামাল আফেন্দি তাঁকে একাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন এবং সলীমের মতো স্বৈরাচারী শাসকও সে নির্দেশের সামনে মাথা নতো করে দেন। কিন্তু এই বিরাট ঘটনার মধ্যে ইসলামী সুবিচারের পরিবর্তে ‘উসমানী জাতিত্বে’র অনুভূতি এবং ‘উসমানী রাজ্যশাসন নীতির’ সংরক্ষণের প্রেরণাই খালেদা খানমের লক্ষ্যগোচর হয়। তাঁর বোধগম্য নয় যে, জামাল আফেন্দীর ফতোয়ার মধ্যে ছিলো ‘লা ইকরাহা ফীদ্দ্বীনি’ এর ভাবধারা নিহিত।
ইসলামী সত্যানুরাগের শক্তিই তাঁকে সলীমের সামনে ফতোয়া জারীর সাহস যুগিয়েছিল। আর ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্বই সলীমকে তাঁর ফতোয়ার সামনে মাথা নতো করতে বাধ্য করেছিল।
তুরস্কের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর প্রান্তিকধর্মিকতা, যুলুম-পীড়ন, জবরদস্তিমূলক সমাজ-সংগঠন, সীমাহীন পাশ্চাত্য প্রীতি,বস্তুতান্ত্রিক মনোবৃত্তি এবং ধর্ম সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি খালেদা খানমকে অসন্তুষ্ট বলে মনে হয়। তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য রীতিনীতির মধ্যে একটা সুষম সমন্বয় কামনা করেন। ‘বস্তুবাদ’ ও ‘আধ্যাত্নবাদের’ মধ্যে তিনি একটি সঙ্গতি বিধানের পক্ষপাতি। তিনি এ সত্যও স্বীকার করেন যে, জীবনের এ দু’টি মতবাদের মধ্যে ইসলাম যে সমন্বয় সাধন করেছে তাই সর্বোত্তম। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে তিনি নিজে পূর্ণ দূরদৃষ্টির অধিকারী নন। এই কারনেই ইসলামী নীতি অনুসারে সমন্বয়ের সঠিক উপায় কি এবং দুই চরম প্রান্তের মধ্যে ভারসাম্যের সরল রেখা কোনটি এটা তাঁর জানা নেই। তবু তাঁর ব্যক্তিগত অভিমত বাদ দিলে তাঁর ভাষণে আমরা আধুনিক তুরস্কের মানসিকতা, তার ভাবধারা এবং সাম্প্রতিক বিপ্লবের ঐতিহাসিক কার্যকারণের একটি স্পষ্ট ও নির্ভুল বর্ণনা পেতে পারি; আর এটাই হচ্ছে আমাদের কাম্য।
তুর্কী জাতি যখন ইসলামে প্রবেশ করে, মুসলমানদের নৈতিক মানসিক অধপতন তখন শুরু হয়েছিল। [তুর্কী জাতি বলতে এখানে উসমানীয় তুরস্ককে বুঝানো হচ্ছে।] তাদের মধ্যে জিহাদী ভাবধারা বেঁচেছিল বটে, কিন্তু ইজতিহাদী ভাবধারা মরে গিয়েছিল। ইসলাম সম্পর্কে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তানায়ক ও ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন ফকীহগণ (আইনবেত্তা) তখন তিরোহিত হয়েছিলেন। ইসলামী কৃষ্টি সভ্যতা অর্ধমৃত এবং ইসলামী চিন্তাধারা প্রায় নিষ্প্রাণ হয়ে গিয়েছিল। ‘শরয়ী’ বিধানের ক্ষেত্রে অন্ধ তাকলীদের প্রতিপত্তি ছিলো। সমাজ ও সভ্যতায় অনারব ও রোমদের রীতিনীতি অনুপ্রবেশ করেছিল। তাসাউফের ওপর প্রাচ্যবাদ এবং দর্শনের ওপর নিউ প্ল্যাটোবাদের প্রভাব বদ্ধমূল হয়েছিল। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে সরাসরি জ্ঞানার্জন করার মতো উপযুক্ত লোকের অভাব দেখা দিয়েছিল। আলিম সমাজের বেশির ভাগই শব্দের মারপ্যাঁচে জড়িত কালামের জটিল তর্কে লিপ্ত হচ্ছিলেন এবং পূর্বসুরীদেরই অনুসৃত পথে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ঝড়ো হাওয়া বইয়ে দিচ্ছিলেন। শাসকদের অধিকাংশই কাইজার ও কিসরার অন্ধ অনুকরণে ব্যস্ত ছিলেন। সূফী সম্প্রদায় ও আধ্যাত্নিক নেতৃবৃন্দ ইসলামের সোনালী যুগের সত্যিকার সূফীবাদ পরিহার করে সন্নাসী ও যোগীদের অনুসরণ করে চলছিলেন। জ্ঞান বিজ্ঞান ও শিল্পকলায় মুসলমানদের উন্নতির ধারা রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। চিন্তা গবেষণা ও আবিষ্কারের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রগতি প্রায় নিশেষ হয়ে গিয়েছিল। ফলকথা, উথানের পর অধঃপতনের স্পষ্ট লক্ষণাদি তখন গোটা মুসলিম জাহানেই দেখা দিয়েছিল।
এভাবে ইসলামের ইতিহাসে তুর্কীদের আবির্ভাবই ছিলো মৌলিক দুর্বলতা নিয়ে। আর ইউরোপে যে যুগে মানসিক ক্রমবিকাশ ও বৈজ্ঞানিক অভিযাত্রার সূচনা হচ্ছিল, প্রায় সেই সময়েই উসমানীয় সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়।
অবশ্য প্রথম দিকের দু’আড়াই শতকে ইউরোপকে উপর্যুপরি পরাভূত করে উসমানীয়গণ ইসলামের বিজয়কেতন উড্ডীন করেছিল। কিন্তু সে যুগে সাধারণ মুসলিম জাতিগুলোর সঙ্গে তুর্কীরাও ধীরে ধীরে অধপতনের দিকে নেমে যাচ্ছিল এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পাশ্চাত্য জাতিগুলো দ্রুততার সাথে বৈষয়িক ও মানসিক উন্নতির দিকে এগিয়ে চলছিল। ঈসায়ী সতের শতকে পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্নরূপ ধারণ করলো। ফিরিঙ্গীদের সামরিক সংগঠন এবং বৈষয়িক ও মানবিক শক্তি এতোখানি বেড়ে গেলো যে, সেন্ট গোথার্ডের যুদ্ধে প্রথমবার তারা পতনশীল তুর্কীদেরকে শোচনীয়রুপে পরাজিত করলো। কিন্তু তাতেও তুর্কীদের চক্ষু উম্মীলিত হলোনা। তারা ক্রমাগত অধপতনের দিকেই যেতে লাগলো এবং ফিরিঙ্গীরা সেই অনুপাতে উন্নতির শীর্ষদেশে আরোহণ করতে লাগলো। এমনকি আঠারো শতকে তুর্কীদের নৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও তামাদ্দুনিক অবস্থা চরম অধপতনে গিয়ে পোঁছলো। এবং ফিরিঙ্গীদের আধিপাত্য পুরোপুরি উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো।
ঊনিশ শতকের প্রারম্ভে সুলতান সলীম তুর্কী জাতির এই সার্বিক দুর্বলতা অনুভব করলেন। তিনি শাসন ব্যবস্থার সংস্কার, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচার, নব্য পদ্ধতিতে সামরিক সংগঠন এবং আধুনিক পাশ্চাত্য যুদ্ধাস্ত্রের প্রচলন শুরু করলেন। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা ও তার ভাবধারা সম্পর্কে অজ্ঞ ও মূর্খ সূফী সম্প্রদায় এবং সংকীর্ণমনা আলিম সমাজ ধর্মের নামে এই সংস্কার কার্যের বিরোধিতা করলেন। ইউরোপীয় পন্থায় সামরিক সংগঠনকে তারা ধর্মদ্রোহীতা বলে আখ্যা দিলেন। আধুনিক ফৌজী পোশাককে তারা নাসারাদের অনুকরণ বলে অভিহিত করলেন। সঙ্গীণ ব্যবহার করা তাদের মতে গুনাহর কাজ। পরন্তু সলীমের বিরুদ্ধে এই বলে বিদ্ধেষ ছড়ানো হলো যে, কাফিরদের নীতি প্রবর্তন করে সে ইসলামকে বিকৃত করে ফেলেছে।
শায়খুল ইসলাম আতাউল্লাহ আফেন্দী ফতোয়া দিলেন, যে বাদশাহ কুরআনের বিরুদ্ধে কাজ করে, সে বাদশাহীর উপযুক্ত নয়। অবশেষে ঈসায়ী ১৭০৭ সালে সলীমকে পদচ্যুত করা হলো। এই প্রথমবার ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ তাঁদের অজ্ঞতা ও অন্ধত্বের দ্বারা ইসলামকে প্রগতির অন্তরায় বলে ধারণার সৃষ্টি করলেন।
যুগের পরিস্থিতি দ্রুততার সাথে পরিবর্তিত হচ্ছিলো অন্যান্য মুসলমানদের তুলনায় তুর্কীদের ওপর এই পরিবর্তনের প্রভাব অত্যন্ত তীব্রভাবে পড়ছিল। তারা ছিলো ইউরোপের একেবারে মুখোমুখী দাঁড়িয়ে এবং সেই সঙ্গে ছিলো পরস্পর যুদ্ধমান। পাশ্চাত্য জাতিগুলোর সঙ্গেই ছিলো তাদের গভীর রাজনৈতিক, তামাদ্দুনিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক। এমনকি, তাদের অধীনস্থ ইউরোপীয় জাতিগুলো পর্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে পাশ্চাত্য প্রভাব গ্রহণ করছিলো। কিন্তু ইসলামী জ্ঞানে বুৎপত্তি ও ইজতিহাদী শক্তি থেকে মুক্ত এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ তুর্কী ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ঐ পরিবর্তন সম্পর্কে ছিলেন একেবারেই উদাসীন। ফলে তুর্কী জাতিকে তাঁরা সাত’শ বছরের পূর্বেকার পরিস্থিতি থেকে এক পা-ও সামনে না এগুতে বাধ্য করলেন।
সলীমের পর সুলতান মাহমুদ সংস্কার কার্যের চেষ্টা করলেন। আলিম সম্প্রদায় ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ আবার তাঁর বিরোধিতা করলেন। অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রমের পর ১৮২৬ সালে মাহমুদ আধুনিক সামরিক সংগঠনের নীতি চালু করতে সক্ষম হলেন। কিন্তু আলিম সমাজ ও সূফী সম্প্রদায় অবিরাম এই প্রচার চালাতে লাগলেন যে, এই ধরনের সংস্কার কার্য বিদয়াতের শামিল, এর দ্বারা ইসলামকে বিকৃত করা হচ্ছে; সুলতান বে-দ্বীন হয়ে গিয়েছেন এবং আধুনিক কায়দার সেনাবাহিনীতে ভর্তি হলে মুসলমানদের ঈমান নষ্ট হতে বাধ্য।
এ যুগেই তুরস্কের চিন্তাশীল লোকদের মধ্যে নিজেদের জাতীয় অধপতন সম্পর্কে সাধারণ অনুভূতির সৃষ্টি হয়। তারা পাশ্চাত্য জাতিগুলোর উন্নতির কারণ সম্পর্কে চিন্তা করলো, তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান আচার-পদ্ধতি অধ্যয়ন করলো, তাদের প্রশাসন ব্যবস্থার প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিক্ষেপ করলো; সেই সঙ্গে আপন রাজ্যের আইন কানুন, প্রশাসনিক বিষয়াদি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামরিক ব্যবস্থায় এমন সংস্কার নীতি পরিবর্তনের চেষ্টা করলো, যাতে করে তারা পাশ্চাত্য জাতিগুলোর সঙ্গে সমান তালে উন্নতি করতে পারে। খালেদা খানমের ভাষায়, এই লোকগুলোর শিরা উপশিরায় ছিলো ইসলামী ভাবধারার প্রাণ-প্রবাহ। তাদের মন ও মগজ দুই-ই ছিলো মুসলমান। তাঁদের মধ্যে আপন দুর্বলতার অনুভূতি অবশ্য ছিলো; কিন্তু পাশ্চাত্যের মোকাবিলায় মোটেই হীনমন্যতাবোধ ছিলোনা। তাঁরা পাশ্চাত্যের প্রতি সম্মোহিত ছিলোনা। নির্বিচারে তার প্রত্যেকটি জিনিসই গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলোনা; বরং পাশ্চাত্যের ভালো জিনিসগুলো দ্বারা আপন রাজ্য এবং জাতির দুর্বলতার নিরসন করা এবং জীবনের সর্বত্র ইউরোপীয়দের সাথে সমান তালে প্রতিযোগীতা করাই ছিলো তাদের একমাত্র লক্ষ্য। তারা সুলতান আবদুল মজীদ খানের আমলে শাসন ব্যবস্থার সংস্কার ও সামরিক বাহিনী পুনর্গঠন করলো। আপন জাতির কৃষ্টি ও সভ্যতায় প্রাণের স্পন্দন ফুঁকে দিলো। নতুন নতুন স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা করলো। এভাবে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তারা এমন একটি নয়া জাতি গড়ে তুললো, যার ভেতর ইসলামী সভ্যতার তামাম মণিমুক্তা সমেত চিন্তা গবেষণা করার মতো উন্নত প্রতিভাও বর্তমান ছিলো। সুলতান আবদুল আজীজের পদচ্যুতি (১৮৭৬) পর্যন্ত এই দলটি ভেতর ও বাইরের অসংখ্য বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও জাতীয় পুনর্গঠনের কাজ উত্তমরূপে সম্পাদন করলো। এর ফলেই উমর পাশার ন্যায় জেনারেল, মুদহাত পাশার ন্যায় সংগঠক এবং নামিক কামাল ও আবদুল হক হামিদের মতো সাচ্চা মুসলিম চিন্তানায়ক ও সাহিত্যিকের আবির্ভাব হলো।
কিন্তু সুলতান আবদুল হামীদ এসে হঠাৎ গোটা গতিপথই বদলে দিলেন। ১৮৭৬ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত মোট ৩৩ বছর ছিলো তাঁর শাসনকাল। এই সময়ের মধ্যে অন্য একটি প্রাচ্য জাতি (জাপান) উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে কোথা থেকে কোথায় গিয়ে পৌছলো। আর এই স্বার্থপর সুলতান শুধু নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতার মোহে তুর্কী জাতির মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, তামাদ্দুনিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উন্নতির পথ রোধ করা এবং তার প্রাণচেতনাকে নিস্তেজ করার কাজেই সময় ব্যয় করলেন। এই ব্যক্তির কীর্তিকলাপ সম্পর্কে কোনো বিস্তৃত সমালোচনার অবকাশ এখানে নেই। তবে তার সংক্ষিপ্ত সার এই যে, গঠনমূলক কার্যের সর্বোত্তম সময়টিকে- যার প্রতিটি ঘন্টাই ছিলো অতি মূল্যবান- তিনি ধ্বংসাত্নক কাজে ব্যয় করেন। তুর্কী জাতির শ্রেষ্ঠতম প্রতিভাগুলোকে তিনি বরবাদ করে দেন। এমনকি জামালউদ্দীন আফগানীর মতো অতুলনীয় ব্যক্তিত্বকেও তিনি নষ্ট করে ফেলেন। কিন্তু তার বদৌলতে শুধু তুর্কী জাতির নয়; বরং গোটা মুসলিম জাহানের যে সবচাইতে বড় ক্ষতিটি হয়েছে, তাহলো এই যে, খিলাফতের ধর্মীয় শক্তি এবং প্রতিক্রিয়াশীল আলিম ও ধর্মনেতাদের প্রভাবকে তিনি সংগঠন যুগের তুর্কী সংস্কারকদের গড়া ভিত্তিগুলোর এবং তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারগুলোর মুলোচ্ছেদের জন্যে ব্যবহার করেন। তার এই স্বার্থপরতামূলক ও অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজের ফলে তুর্কী নওজোয়ানদের মধ্যে এক বিপ্লবাত্নক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো। এর ফলে তারা সোজা ধর্মকেই প্রগতির অন্তরায় বলে ভাবতে লাগলো। তাদের মন মগজ ইসলামী শিক্ষার প্রতি বিদ্রোহী হয়ে উঠলো। প্রতিক্রিয়াশীল আলিম ও ধর্মনেতাদের প্রতি স্বাভাবিকভাবে তাদের মনে যে ঘৃণা ও বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়েছিলো, বিপ্লববাদের আতিশয্যে তার গতিধারা ধর্মের দিকে ঘুরে গেলো। তারা ভাবলো এবং মূর্খ আলিম ও ধর্মনেতারা তাদের ভাবতে বাধ্য করলো যে, ইসলাম একটি অচল ও গতিহীন ধর্ম। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার কোনো ক্ষমতা তার নেই। তার আইন কানুন, অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারেনা। মাত্র কতিপয় আকীদা বিশ্বাস ছাড়া তার ভেতরে আর কোনো সুদৃঢ় ও শক্তিশালী জিনিস নেই। এই ৩৩ বছরে জুলুমপীড়ন – দুর্ভাগ্যবশত যা ধর্মীয় রং ধারণ করেছিলো – তুর্কীদের নব্য বংশধরগণের মধ্যে নাস্তিকতা, বস্তুতান্ত্রিকতা, পাশ্চাত্যের প্রতি সম্মোহন, পাশ্চাত্যের চিন্তাধারার অন্ধ তাকলিদ, নিজস্ব ঐতিহ্যের প্রতি বিদ্বেষ, প্রতিটি পুরনো জিনিসের প্রতি বিদ্রোহ এবং খিলাফত ও ইসলামী ঐক্যের প্রতি সুলতান আবদুল হামিদ যাকে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার বানিয়েছিলেন – তীব্র ঘৃণার সৃষ্টি করে দিলো। সেই সঙ্গে তাদের মধ্যে এ ধারণাও দৃঢ়মূল করে দেয়া হলো যে, দুনিয়ার উন্নতি ও সম্মৃদ্ধিলাভ করতে হলে অতীতের সকল ভিত্তিকে ধ্বসিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ পাশ্চাত্য কায়দায় তুর্কবাদের প্রাসাদ গড়ে তোলা আবশ্যক।
১৯০৮ সালের বিপ্লব সুলতান আবদুল হামিদকে সিংহাসনচ্যুত করলো। এর ফলে বিদ্রোহী মানসিকতাসম্পন্ন অত্যুৎসাহী ও উত্তেজনাপ্রবণ নওজোয়ানদের হাতে রাজ্যের একচ্ছত্র ক্ষমতা চলে গেলো। খালেদা খানমের ভাষায়, সংগঠন যুগের সংস্কারপন্থীদের চাইতে এ লোকগুলো ছিলো ভিন্ন ধরণের। এদের মধ্যকার একটি লোকও শিক্ষাগত যোগ্যতা, চিন্তা গবেষণা ও মার্জিত বুদ্ধিতে সংগঠন যুগের চিন্তানায়কদের সমকক্ষ ছিলোনা। এদের সামনে না সেই মহান লক্ষ্য বর্তমানছিলো, আর না ছিলো তাদের চরিত্রে তেমনি দৃঢ়তা। ভদ্রতা, সৌজন্য ও শিক্ষা দীক্ষায় তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো তুলনাই ছিলোনা। এদের মধ্যে না সেই প্রখর জাতীয়তাবোধ ছিলো, না ছিলো প্রাচীন ও আধুনিকের সঠিক পার্থক্য বুঝার মতো বিচার ক্ষমতা। এই মুষ্টিমেয় যুব সম্প্রদায়টি ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানে অজ্ঞ এবং ইসলামী শিক্ষা দীক্ষায় অপরিপক্ক ছিলো।অবশ্য পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞানেও এদের প্রগাঢ় দৃষ্টি ছিলোনা। আপন ধর্ম, সভ্যতা, জ্ঞান বিজ্ঞান, রীতি নীতি এবং প্রাচীন সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর্ বিরুদ্ধে তাদের মন মগজে তীব্র ঘৃণার সঞ্চার হয়েছিলো। পাশ্চাত্যের উন্নতি ও অগ্রগতির ফলে তাদের মধ্যে পুরোমাত্রায় সম্মোহনের সৃষ্টি হয়েছিলো। নিজেদের প্রতিটি জিনিসকেই বদলে ফেলার জন্যে এরা অস্থিরচিত্ত হয়ে পড়েছিলো। তাদের হাতে যখন রাষ্ট্রক্ষমতা এসে পড়লো, তখন দীর্ঘ ৩৩ বছরের বদ্ধ ও দূষিত পানি যেন বন্যার বেগে ফেটে বেরুল। এই যুগেই তুর্কীদের উপর স্বাদেশিকতা ও তুরাণী [তুরানি কথাটি এসেছে ‘তুরা’ বা ‘তুরান’ নামক যায়গা থেকে। এটি মধ্য এশিয়ায় অবস্থিত তুর্কিদের আদি বাসভুমি। সম্ভবত মঙ্গল অভিজানকালে এখানকার ‘তুর্ক’ উপজাতিদের একটি শাখা বর্তমান তুরস্কে গিয়ে বসবাস শুরু করে এবং সেখান থেকেই ‘উসমানীয় তুর্কি’ বা আধুনিক তুরস্কের অভ্যুদয় ঘটে] জাত্যাভিমানের দৈত্য সওয়ার হয়ে বসলো। ইসলামী ঐক্যের প্রতি নিস্পৃহতা প্রদর্শন শুরু হলো। ধর্মের সমালোচনার কাজ পুরোদস্তুর শুরু হয়ে গেলো। ইসলামপূর্ব প্রাচীন সভ্যতাকে পুরোপুরি গ্রহণ করার জন্যে বিপুল শক্তি নিয়োজিত হতে লাগলো। অতীতের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে পাশ্চাত্যের সাথে নৈকট্য স্থাপনের জন্যে লাতিন বর্ণমালা গ্রহণের প্রস্তাব উল্থাপিত হলো। আধুনিক মতাদর্শের ছাঁচে ইসলামকে ঢালাই করার জন্যে সরকারী আলিমদের একটি দল এগিয়ে এলো। যিয়াকোক আল্প ছিলেন এই দলটির পুরোধা। এই লোকটি ইসলামী ঐক্যের মোকাবিলায় তুরাণী ঐক্যের জন্যে তীব্র প্রচার চালালেন। ইসলামী যুগের ইতিহাস ও তার প্রখ্যাত বীর সন্তানদের সম্পর্কে তুর্কীদের মনে ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা জাগিয়ে প্রাচীন অসভ্য তাতারীদের গর্ববোধ করতে শেখালেন। (যার মধ্যে চেঙ্গিজ ও হালাকুর ব্যক্তিত্ব সবচাইতে বেশি উল্লেখযোগ্য)। তুর্কী ভাষাকে ইসলামী সাহিত্যের প্রভাব মুক্ত করার চেষ্টা করলেন। তুর্কীদের সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, রীতিনীতি এবং বাস্তব জীবনের সমস্ত আচরণে পাশ্চাত্যের পুরোপুরি অনুকরণের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করলেন। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ব্যক্তি আধুনিক বিপ্লবী দলের অগ্রনায়ক হয়ে এলেন। তিনি তাঁর অনুগামীদের সঙ্গে মিলে ইসলামী শিক্ষার এমনি ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করলেন, যাতে করে মুষ্টিমেয় কয়েকটি বিশ্বাস ও নৈতিক বিধান ছাড়া ইসলামের প্রতিটি জিনিসকেই পরিবর্তন করে পাশ্চাত্যের ছাঁচে ঢালাই করা যেতে পারে।
একদিকে তুর্কী জাতির মধ্যে এতোবড় বিপ্লবের সূচনা হচ্ছিল অন্যদিকে তুর্কী আলিম সমাজ ও ধর্ম নেতাগণ তখনো সপ্ত সতকের পরিবেশ থেকে বাইরে বেরুতে প্রস্তুত ছিলেন না, তাঁদের অথর্বতা, কুসংস্কার, প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং যুগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার চরম অসম্মতি সুলতান সলীমের আমলের মতোই অব্যাহত ছিলো। তাঁরা তখনো বলছিলেন যে, হিজরী চার শতকের পর ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।অথচ তাঁদের সামনেই ধর্মদ্রোহিতার দরজা উন্মুক্ত হচ্ছিলো। তাঁরা তখনও দর্শন ও কালাম শাস্ত্রের এমনসব কিতাবাদি পাঠন পাঠনে লিপ্ত ছিলেন, যেগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করে যুগের গতি পাঁচশো বছর এগিয়ে গিয়েছিলো। তারা তখনো নিজেদের ওয়ায নসিহতে কুরআনের সেই পুরনো ধরনের তাফসীর এবং সেইসব দুর্বল হাদীস শোনাচ্ছিলেন, যা শুনে একশো বছরের আগেরকার লোকেরা হায় আফসোস করতো বটে, কিন্তু সমকালীন মস্তিস্কবান লোকেরা তা শুনে কেবল ঐ মুফাসসির ও মুহাদ্দিসদের প্রতিই নয়, বরং খোদ কুরআন ও হাদিসের প্রতিও বিতৃষ্ণ হয়ে উঠতো। তারা তখনো তুর্কী জাতির মধ্যে ‘শামী’ ও ‘কানজুদ-দাকায়েক’-এ লিখিত বিধিব্যবস্থা প্রবর্তন করার জন্যেই জিদ্ করছিলে- সে জিদের ফলে তুর্কীরা কুরআন ও সুন্নাহর নির্ধারিত বিধানের আনুগত্য বর্জন করলেও তাঁরা তাঁদের মত পরিবর্তনে প্রস্তুত ছিলনা।
ফলকথা, আলিম সমাজ ও ধর্মনেতাগণ এমন ভ্রান্ত নীতি অনুসরণ করছিলেন, যা তুর্কী জাতিকে মাত্র এক’শ বছরের মধ্যে সাংগঠনিকতার পর্যায় থেকে বিচ্যুত করে বিপ্লববাদের এই স্তরে নিয়ে এসেছিলো।অন্যদিকে তুর্কী জাতির বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ মনে-প্রাণে মুসলমান হলেও চিন্তা, বুদ্ধি ও কর্মের বাস্তব জগতে ইসলাম থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিলেন। ঠিক এই সময়েই প্রথম মহাযু্দ্ধের দামামা বেজে উঠলো। এতে আরব ও ভারতের হতভাগ্য মুসলমানেরা ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে মিলে তুর্কীদের গলা কাটলো। অতপর মহাযুদ্ধের মহযুদ্ধের অবসানের পর তুর্কীরা যখন আপন জাতীয় জীবনকে চূড়ান্ত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে সংগ্রামে লিপ্ত হলো, তখন তাদের সবচাইতে বেশি বিরোধিতা করলেন তৎকালীন খলীফা ও শাইখুল ইসলাম। বিপ্লবী ও তুর্কীদের অর্ধমৃত ইসলামী চেতনার পক্ষে এই সর্বশেষ আঘাতগুলো ছিলো ধ্বংসাত্মক। এরই অনিবার্য ফল আমরা নব্য তুরস্কের মাত্রাহীন আধুনিকতার মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। ১৯০৮ সালে যে বিপ্লবী চিন্তাধারা অপরিপক্ক ছিলো এবং ত্রিপোলির যুদ্ধ, বলকান যুদ্ধ ও গ্রীক হামলার ব্যস্ততা যাকে পরিপক্ক হতে বাধা দিয়েছিলো, লোজান [এটি সুইজারল্যান্ডের একটি শহর। ১৯২৩ সালে এখানে ইংরেজ ও তুর্কিদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সন্মেলনের পরই তুরস্ক পুরপুরি ধরমনিরপেক্ষতাবাদের কবলে নিক্ষিপ্ত হয়] সম্মেলনের পর হঠাৎ তা পরিপক্কতা লাভ করলো এবং একেবারে বাস্তব রূপ ধারণ করতে লাগলো। এভাবে সমাজ ও সভ্যতায় পুরোপুরি পাশ্চাত্য নীতির রূপায়ণ; ভাষা সাহিত্য ও রাজনীতিতে পূর্ণমাত্রায় জাতীয়তাবাদের প্রতিফলন; খিলাফতের পতনের পর ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্যের সৃষ্টি খালেদা খানমের ভাষায় রাষ্ট্রকে ধর্মের প্রভাবমুক্ত করে ধর্মকেই রাষ্ট্রের অনুগত করে দিলো। ইসলামী আইনের পরিবর্তে সুইজারল্যান্ডের আইন প্রবর্তন করা; মীরাস, বিবাহ, তালাক ইত্যাদি প্রশ্নে কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশাবলী পর্য়ন্ত বদলে ফেলা; মহিলাদেরকে ইসলামী শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত এবং মহাযুদ্ধ পরবর্তীকালে ইউরোপীয় মহিলাদের অনুরূপ বল্গাহীন স্বাধীনতার পথে ছেড়ে দেয়া ইত্যাদি সবকিছূই হচ্ছে মূর্খ আলিমদের অথর্বতা, আত্ম পূজারী সূফীদের ভ্রান্তি, খিলাফতের পদমর্যাদা থেকে অবৈধ সুযোগ গ্রহণকারী সুলতানদের স্বার্থপরতা এবং কুরআন ও সুন্নাহের জ্ঞান সম্পর্কে বিপ্লবী নেতৃবৃন্দের নিদারুণ অজ্ঞতারই স্বাভাবিক পরিণতি। পরিতাপের বিষয় যে, এই শতকের মধ্যে তুর্কী জাতি কুরআন ও হাদীসের গভীর ব্যুৎপত্তির অধিকারী এবং ইসলামী শিক্ষার মৌল ভাবধারা উপলব্ধি করতে সক্ষম, এমন একটি প্রতিভাও জন্ম দিতে পারেনি- যিনি যুগের পরিবর্তনশীল অবস্থা তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করে ইজতিহাদী শক্তি ব্যবহার করতে এবং সে অবস্থার ওপর ইসলামী নীতি প্রয়োগ করে, কুরআন ও সুন্নাহর ওপর ভিত্তিশীল এবং যুগের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার উপযোগী একটি সুসামঞ্জস্য জীবনধারা গড়ে তুলতে পারতেন।
তুর্কী ইতিহাসের এই গতিধারা সম্পর্কে যারা অবহিত নয়, তারা এক আজব ধরনের ভ্রান্তিতে লিপ্ত হচ্ছে। পুরনো ধর্মীয় দৃষ্টিসম্পন্ন লোকেরা নব্য তুর্কীদের সম্পর্কে কুফরী ও ফাসিকীর ফতোয়া প্রচার করে চলেছেন। কিন্তু ঐ নব্য তুর্কীদের চাইতে তুর্কী আলেম ও ধর্মনেতারাই যে বেশি গুনাহগার. এ খবরটি তাদের জানা নেই। যে মুজাহিদ কওমটি দীর্ঘ পাঁচ’শ বছর ধরে ইসলামের জন্যে এককভাবে লড়াই করছিলো, এইসব আলিম ও ধর্মনেতাদের অথর্বতাই তাদেরকে ইসলাম থেকে ফিরিঙ্গীপনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই ধরনের অথর্বতা অন্যান্য মুসলমান কওমকেও একদিন ঐদিকে ঠেলে দিলে তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবেনা।
অন্যদিকে প্রগতিবাদীরা আঙ্কারা থেকে অবতীর্ণ প্রত্যেকটি ‘ওহী’-কেই মুসলমানদের সামনে এমনিভাবে পেশ করছে, যেনো কুরআন রহিত হয়ে গিয়েছে, মুহাম্মদ সা.-এর রিসালাত খতম হয়ে গিয়েছে। এখন হেদায়েত থাকলে আছে শুধু আতাতুর্কের জীবনাদর্শে, জ্ঞানের রশ্মি থাকলে আছে আঙ্কারার আসমান থেকে অবতীর্ণ ‘ওহী’র মধ্যে। অথচ বেচারা আতাতুর্ক এবং তাঁর অনুগামীদের অবস্থা হচ্ছে এই যেঃ
(আরবী)
(অথচ এ বিষয়ে তাদের কোনো জ্ঞান নেই। তারা তো কেবল অনুমানের পিছেই ছুটে চলেছে।–সুরা যুখরুফ: ২০)
৮
যুক্তিবাদের প্রতারণা
[প্রবন্ধটি ১৯৩৪ সালের ডিসেম্বরে মাসিক তরজমানুল কুরআনে প্রথম প্রকাশিত হয়]
এক
ইসলামী শিক্ষা দীক্ষায় অপরিণত কিংবা একেবারে আনাড়ী নওজোয়ানদের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির ওপর পাশ্চাত্য শিক্ষা, কৃষ্টি ও সভ্যতা কিরূপ গভীর প্রভাব বিস্তার করে, তা এই শ্রেণীর লোকদের প্রকাশিত রচনা ও বক্তৃতা থেকেই অনুমান করা যেতে পারে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, সম্প্রতি যুক্তপ্রদেশের জনৈক মুসলিম গ্রাজুয়েটের একটি প্রবন্ধ আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। উক্ত প্রবন্ধে তিনে নিজের চীন ও জাপান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ
আমাদের চীনা সহগামীরা বেজায় পেটুক এবং মদখোর। শুকরের মাংস তো তাদের প্রাণতুল্য। এবার আমি খ্রীষ্টধর্মের উন্নতির রহস্যটি বুঝতে পেরেছি। চীনারা তাদের প্রাচীন ধর্মের আনুগত্যকে আধুনিক শিক্ষার পরিপন্থি মনে করে। তারা যদি বুঝতে পারতো তো তাদের ইসলাম গ্রহণে অসুবিধা হতোনা। কিন্তু ইসলাম তাদের সমস্ত প্রিয় খাদ্য থেকেই বঞ্চিত করে; তাই বাধ্য হয়ে তারা খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করে। এমতাবস্থায় ভবিষ্যতে খ্রীষ্টধর্ম চীনের সরকারি ধর্মে পরিণত হলে তাতে বিস্ময়ের কিছুই থাকবেনা। শুকরের মাংসের ব্যাপারে আমি ইউরোপ ও চীনের নওমুসলিমদের একটু সুবিধা দেবার পক্ষপাতী। কুরআন থেকেও এর স্পষ্ট হারাম হবার ব্যাপারে আমার সন্দেহ রয়েছে। বড়জোর আরবদের জন্যে হয়তো কোনো বিশেষ কারণে এটি হারাম করা হয়েছে। কিন্তু যে দেশে এছাড়া ‘ফামানিদ তুর্বা গাইরা বাগিওঁ ওয়ালা আদিন’ (অর্থাৎ চলা অসম্ভব) হয়ে পড়ে সেখানে এর ব্যবহারে ক্ষতিটা কি। মোটকথা, কুরআনের এই একটিমাত্র বিধানের তাৎপর্য, অর্থাৎ এর সাধারণ নিষেধাজ্ঞার কারণটি আমার বোধগম্য হয়নি। নচেৎ নীতিগতভাবে পাকস্থলী ও নৈতিক চেতনার মধ্যে এতোখানি ব্যবধান থাকতেও ধর্ম যদি আমাদের জন্যে খাদ্যতালিকা তৈরি করতে পারে, তবে সে লৌহকর্ম, অলঙ্কার গড়ন, দর্জীগিরী ইত্যাদি কেন শিক্ষা দেবেনা? আমার মতে, দুনিয়ায় ইসলামের উন্নতি ও বিস্তৃতি না হবার গূঢ় কারণ এই যে, সে মানুষের তামাম মানবিক অধিকার হরণ করে তাকে একটি নির্জীব জড়পিন্ড এবং নিতান্ত অবোধ শিশুতে পরিণত করে। যার ফলে সে নিজের পার্থিব উন্নতির পথই হারিয়ে ফেলে। নচেৎ খ্রীষ্টানরা যেমন বুঝতে পেরেছে, আমাদেরও ধর্ম ঠিক তেমনি হওয়া উচিত।
এরপর তিনি সাংহাইয়ের অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে লিখছেনঃ
খোদার সৃষ্ট এই বেশুমার সুখী-সমৃদ্ধ সানুষগুলোকে দেখে আমার মন কিছুতেই সায় দেয়না যে, মাত্র কয়েক বছর পরই এরা দোযখের ইন্ধনে পরিণত হবে-যেনো এদের সৃষ্টির পেছনে খোদার এই একটিমাত্র উদ্দেশ্যই নিহিত রয়েছে। তাছাড়া এদের জনকয়েক ছাড়া বাদবাকি সবাই যদি কাফির ও মূর্তিপূজক হয়, তবে তাদের দোযখে নিক্ষেপের জন্য এটাই কি অপরাধ বলে গণ্য করা হবে যে, তারা খোদার দুনিয়াকে সমৃদ্ধ ও সুশোভিত করেছে? তারা তো হাজীদেরকে হত্যা বা রাহাজানি করেনা! লূত কওমের দৃষ্কৃতিু তাদের মধ্যে নেই। কারো ধন মাল তারা আত্মসাৎ করেনা এবং তা ‘হালাল’ করার জন্যে কোনো যুক্তি তর্কেরও অবতারণা করেনা। তারা নির্বিবাদে ও সুশৃংখলভাবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করছে। এতদ্বসত্ত্বেও তারা দোযখের উপযুক্ত বলে গণ্য হবে কেন? মুশরিকী ধারণা নিসন্দেহে একটি বাজে ও অন্তসারশূন্য জিনিস। কিন্তু আমায় বলুন, এক ব্যক্তি যদি কোনো সত্তাকে স্বভাবতই তার জীবন মৃত্যুর মালিক বলে মনে করে, কিন্তু তার নিগূঢ় রহস্য উপলব্ধি করতে সে আমাদের মতোই অক্ষম কিংবা সে আরবীকে খোদার ভাষা বলে বিশ্বাস করেনা- কেবল এইটুকু কারণেই আপনারা তার দুশমন এবং সে আপনাদের হয়ে যাবে? কিন্তু না, আপনাদের দৃষ্টিতে এতো কিছুরও প্রয়োজন নেই। আপনাদের শুধু প্রয়োজন হচ্ছে এক বিশেষ ধরনের পায়জামা এবং বিশেষ কাটিং-এর জামা পরিধান করতে হবে। বিশেষ ধরনের খাদ্য খেতে হবে। মুখের ওপর চার আঙ্গুল পরিমাণ দাড়ি রাখতে হবে। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করা যাবেনা; কারণ সেখানে ধর্মীয় ভাষা ও শাস্ত্র শিক্ষা দেয়া হয়না।
জাপানের কোবে বন্দর সম্পর্কে তিনি লিখছেনঃ
দু’ঘন্টাকাল আমি কোবে বন্দর ঘুরে দেখছিলাম। কোথাও একটি ভিক্ষুক আমি দেখতে পাইনি- জীর্ণ-ছিন্ন বস্ত্র পরিহিত কোনো দরিদ্রও আমার চোখে পড়েনি। যে জাতি ধর্ম বা খোদার নাম পর্যন্ত জানেনা, তারা এতোখানি উন্নত!
এরপর তিনি নিজেই ‘সদুপদেশ’ ঝাড়তে শুরু করলেনঃ
স্মরণ রাখবেন, ‘ইহসান’ই হচ্ছে ধর্মের মূল জিনিস। কিন্তু এটি কোনো ভাষা বা শাস্ত্রের মুখাপেক্ষী নয়। এর স্বাভাবিক লক্ষ্য হচ্ছে, আমাদেরকে পরকালীন জীবনে কি ইহজীবনে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে দায়িত্বশীল করে তোলা। এটিই হচ্ছে প্রকৃত ইসলাম ধর্ম। এর বেশি যে জিনিসটি নাম আপনারা ধর্ম রেখেছেন, তা শুধু আপনাদের আত্মপ্রবঞ্চনা কিংবা মস্তিস্কবিকৃতি মাত্র। যেদিন আপনারা দু’টি জিনিসের মধ্যে ধর্মকে সীমাবদ্ধ রাখবেন এবং শরীয়তের যাবতীয় বন্ধন ছিন্ন করে ফেলবেন, সেদিনআপনারাও অন্যান্য জাতির সাথে উন্নতির শীর্ষদেশে পৌছতে পারবেন; বরং একথা বলুন যে, সেদিন আপনারা জাতিসমূহের মধ্যে বিবেক বুদ্ধি জাগিয়ে তুলবেন। কারও হাত থেকে যদি দুনিয়ার কতৃর্ত্ব না যায় তো ‘আসমানী বাদশাহী’ ও যাবেনা। আপনারা নিজেরা কোনো জাতি নয়, বরং অন্যান্য জাতির সংস্কারক। কিন্তু আল্লাহর ওয়াস্তে এ কথা বলার সুযোগ দেবেননা যে, অমুক যাতি উন্নতির শীর্ষদেশে আরোহণ করেছে; কিন্তু তাদের মধ্যকার মুসলমানদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। এটা নিঃসন্দেহ যে, তাদের এই শোচনীয় অবস্থার জন্য দায়ী হচ্ছে তাদের অদ্ভুত প্রকৃতির ধর্ম।
এই উদ্ধৃতিটুকু আমাদের নব্য শিক্ষিত তরুণ সমাজের সাধারণ মানসিক অবস্থার একটি স্পষ্ট নমুনা। তাঁরা মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেছে, মুসলিম সমাজের অঙ্গ হিসেবেই লালিত পালিত হয়েছে, মুসলমানদের সাথে সমাজ ও সভ্যতার বন্ধনে তাঁরা আবদ্ধ। এই কারণেই ইসলামের প্রতি অনুরক্তি, মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতি এবং মুসলিম হিসেবে বেচে থাকার আকাঙ্খা তাদের সহজাত। এই আকাঙ্খা তাদের ইচ্ছাশক্তি, বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তাশক্তির প্রভাব ছাড়াই তাদের মনমগজে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই অনিচ্ছাকৃত ও চেতনাহীন ইসলামকে শিক্ষাদীক্ষার সাহায্যে ইচ্ছাকৃত ও চেতনালব্ধ ইসলামে পরিণত করা, মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পূর্বে ইসলামী শিক্ষাকে পুরোপুরি উপলব্ধি করা এবং বাস্তব জীবনে ইসলামী বিধি ব্যবস্থা ও আইন কানুন অনুশীলন করে দেখার মতো যোগ্যাতা সৃষ্টি করা একান্ত উচিত ছিল। কিন্তু তার পূর্বেই তাদেরকে ইংরেজী শিক্ষার জন্য স্কুল কলেজে প্রেরণ করা হল। সেখানে সম্পূর্ণ অনৈসলামিক শিক্ষা দীক্ষার মধ্যে তাদের মন মানস ও চিন্তা শক্তি বিকাশ লাভ করলো। তাদের মন মস্তিস্কের উপর পাশ্চাত্য সভ্যতা ও চিন্তাধারা গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করলো। এর ফলে প্রত্যেকটি জিনিসকেই তারা পাশ্চাত্য দৃষ্টিতে দেখলো। প্রতিটি সমস্যাকেই তারা পাশ্চাত্য মানসিকতা দিয়েই বিচার করতে লাগলো। মোটকথা, পাশ্চাত্যবাদের এই সর্বাত্মক প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে কোনরূপ চিন্তা ভাবনা ও পর্যবেক্ষন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। তারা পাশ্চাত্য থেকে যুক্তিবাদের সবক গ্রহণ করলো বটে; কিন্তু তাদের নিজস্ব কোন যুক্তিজ্ঞান ছিলনা। তাদের যুক্তি ছিল ইউরোপ থেকে ধার করা। এই কারণেই তাদের যুক্তিবাদ মূলত ফিরিঙ্গী যুক্তিবাদে পরিনত হলতা আর মোটেই স্বাধীন যুক্তিবাদ রইলো না। তারা পাশ্চাত্য থেকে সমালোচনার শিক্ষাও গ্রহণ করলো; কিন্তু এটিও স্বাধীন সমালোচনার শিক্ষা ছিলোনা; বরং এ শিক্ষার সারকথা হলো এই যে, পাশ্চাত্য রীতিনীতিকে অভ্রান্ত জানবে, যার মানদণ্ডে প্রাচ্যের সবকিছুকেই যাচাই করবে কিন্তু খোদ পাশ্চাত্য রীতিনীতিকে সমালোচনার উর্ধ্বে মনে করবে।
এহেন শিক্ষা দীক্ষার পর তারা যখন কলেজের চৌহদ্দি পেরিয়ে জীবনের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করলো, তখন তাদের মন ও মস্তিস্কের মধ্যে বিরাট ব্যবধান দেখা দিলো। তাদের মন ছিল মুসলমান, কিন্তু মস্তিস্ক ছিল অমুসলিম। তারা বাস করতো মুসলিম সমাজে। দিনরাত সমস্ত কাজ কারবার করতো মুসলিমদের সঙ্গে। সমাজ ও সভ্যতার বন্ধনে আবদ্ধ ছিল মুসলমানদের সাথে। নিজেদের চারিদিকে লক্ষ্য করতো মুসলমানদেরই ধর্মীয় ও তামাদ্দুনিক ক্রিয়াকলাপ। ভালবাসা ও সহানুভূতির সম্পর্ক মুসলমানদের সাথেই সম্পৃক্ত ছিলো; কিন্তু তাদের চিন্তা ভাবনা বিচার বিবেচনা ও মত গঠন করার সমস্ত শক্তিই ছিল পাশ্চাত্যের ছাঁচে গড়া। তার সাথে ইসলামের কোন রীতিনীতি বা মুসলমানদের কোন আচরণের আদৌ কোন সঙ্গতি ছিলোনা। এর ফলে পাশ্চাত্য মানদণ্ডেই ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতিটি জিনিস বিচার করতে শুরু করলো। এই মান্দন্ডের বিপরীত প্রতিটি জিনিসকে – তা ইসলামের কোনো মূলনীতি বা খুঁটিনাটি বিষয় হোক আর মুসলমানদের কোনো আচরণ হোক – তারা ভ্রান্ত ও সংশোধনীয় বলে মনে করলো। তাদের কেউ কেউ গবেষণা ও পর্যবেক্ষনের জন্য ইসলাম সম্পর্কে কিছুটা অধ্যায়নও করলো। কিন্তু তাদের সমালোচনা ও গবেষণার মানদন্ড ছিল তেমনি পাশ্চাত্য ধরণের। কাজেই তাদের মানসিকতার বাঁকা ছিদ্রপথে ইসলামের সোজা পেরেক আঁটবে কি করে?
এই শ্রেণীর ভদ্রলোকেরা যখন ধর্মীয় ব্যাপারে মত প্রকাশ করেন, তখন এদের কথাবার্তা থেকে স্পষ্ট মনে হয় যে, কোনোরূপ চিন্তা ভাবনা ছাড়াই যেন অনর্গল বক্তৃতা ঝেড়ে চলছেন। তার ভূমিকাটা যেমন সুসঙ্গত হয়না তেমনি তা যুক্তি বিজ্ঞানের নিয়মানুযায়ী সুবিন্যস্তও নয়। এমনকি, সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য কোনো চেষ্টা পর্যন্ত এরা করেননা। সবচাইতে বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, কথা বলবার সময় নিজের ভূমিকাটা পর্যন্ত এরা নির্ধারণ করেনা। একই কথা প্রসঙ্গে এরা অবলীলাক্রমে বিভিন্ন ভূমিকা গ্রহণ করতে থাকেন – এক বিশেষ ভূমিকার কথা বলতে বলতে অকস্মাৎ অন্য এক ভূমিকা গ্রহণ করে বসেন এবং নিজেরাই পুর্ববর্তী ভূমিকার বিরুদ্ধে বলতে শুরু করেন। শিথিল চিন্তা হচ্ছে এদের ধর্মীয় আলোচনার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ধর্ম ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে এরা অত্যান্ত হুশিয়ারী ও সতর্কতার সাথে কথা বলবেন। কারণ সেখানে কোনো অসংবদ্ধ কথা বললে সূধীমন্ডলীর দৃষ্টিতে যে কোনো মর্যাদাই থাকবেনা – একথা তারা ভাল করেই জানেন। কিন্তু তাদের কাছে ধর্মের কোন মূল্য বা গুরুত্ব না থাকার কারণে সে সম্পর্কে কথা বলার সময় নিজের মস্তিস্কের উপর গুরত্ব আরোপ করার কোনো প্রয়োজনই তারা বোধ করেননা। এই কারণেই তারা এখানে সম্পূর্ণই নিশ্চিতভাবে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে পারেন। তাদের অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আহারের পর আরাম কেদারায় শুয়ে যেনো একটু রসালাপ করছেন মাত্র, তাই এ ব্যাপারে কথা বলার রীতির প্রতি লক্ষ্য রাখারও কোনো প্রয়োজন নেই।
এই জাতীয় লোকদের রচনাবলীতে দ্বিতীয় যে জিনিসটি স্পষ্টত পাওয়া যায়, তাহলো এদের চিন্তার স্থূল ও জ্ঞানের দৈন্যতা। ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপারে এতটা কম জ্ঞান এবং এত নগণ্য চিন্তা ভাবনা নিয়ে কথা বলার সাহস এদের নেই। কারণ প্রকৃত তথ্য না জেনে সেখানে কোন কথা বললে সম্ভ্রমহানি হবার ভয় থাকে। কিন্তু ধর্মের ব্যাপারে অনুসন্ধান, অধ্যায়ন ও চিন্তা ভাবনা করার তারা প্রয়োজনই বোধ করেননা। হালকাভাবে যা কিছু জানতে পারেন, তার ভিত্তিতেই তারা সিধান্ত করে নেন এবং অসংকোচে তাই বিবৃত করে যান। কারণ, এখানে ধরপাকড়ের ভয় নেই। ধরপাকড় করলে হয়তো মৌলুভিরা করবেন; কিন্তু আগে থেকে এটা সুপরিকল্পিতভাবে ধরে নেওয়া হয়েছে যে, মৌলুভিরা হচ্ছে অন্ধ, সেকেলে ও সঙ্কীর্ণমনা।
সুযোগ্য লেখকের আলোচ্য নিবন্ধটিতে এই উভয় বৈশিষ্ট্যই পুরোপুরি বজায় রয়েছে। তাঁর প্রবন্ধ থেকে প্রথমত এটা বোঝাই যায়না যে, তিনি মুসলিম হিসেবে কথা বলছেন কি অমুসলিম হিসেবে। অথচ ইসলাম সম্পর্কে যিনি কথা বলবেন, তাঁর মাত্র দুটি ভুমিকাই থাকতে পারেঃ হয় তিনি মুসলমানদের ভুমিকা গ্রহণ করবেন, নচেৎ অমুসলিম হিসেবে কথা বলবেন। যিনি মুসলমান হিসেবে কথা বলবেন, তিনি অন্ধবিশ্বাসী (Orthodox), স্বাধীনচেতা, সংস্কারবাদী যাই হোক না কেন, তাকে অবশ্যই ইসলামের সীমার মধ্যে থেকে কথা বলতে হবে। অর্থ্যাৎ কুরআন মজীদকে চূড়ান্ত বিধান (Final Authority) এবং কুরআন নির্ধারিত ধর্মীয় নীতি ও শরয়ী বিধানকে তাঁর নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিতে হবে। কারণ, কুরআনের প্রামাণিকতাকে তিনি বিশ্বাস না করলে এবং কুরআন থেকে প্রমাণিত কোনো বিষয়ের সমালোচনা করার অবকাশ আছে মনে করলে তাকে ইসলামের বাইরে চলে যেতে হবে। এভাবে সীমা অতিক্রমের পর তিনি আর মুসলমানের ভুমিকায় কথা বলতে পারেননা। পক্ষান্তরে তিনি দ্বিতীয় ভুমিকা গ্রহণ করলে, অর্থ্যাৎ ঘোষিত অমুসলিম হলে কুরআনের মূলনীতি ও বিধি ব্যবস্থা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সমালোচনা করতে পারেন। কারণ তিনি কুরআনকে চূড়ান্ত দলিল বলে স্বীকার করেননা। কিন্তু এই ভূমিকা গ্রহণ করার পর মুসলিম হিসেবে কথা বলার, মুসলমান সেজে মুসলমানদের ইসলামের তাৎপর্য বোঝাবার এবং ইসলামের জন্য উন্নতির পথনির্দেশ করার কোনো অধিকারই তার থাকতে পারেনা। একজন বুদ্ধিমান ও চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তি যখন বুঝে শুনে ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা করবেন, তখন এই দুটি ভূমিকার মধ্যে কোনটি তাঁর পক্ষে গ্রহণযোগ্য তার যুক্তিসম্মত শর্তাবলীর প্রতিও তিনি লক্ষ্য রাখবেন। কারণ একই সময় নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয় দেয়া আবার কুরআন নির্ধারিত মূলনীতি ও বিধিব্যাবস্থা সম্পর্কে সমালোচনা করা অথবা কুরআনের প্রামাণিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করা আবার মুসলমানদের সদুপদেশও খয়রাত করা – কোনো বুদ্ধিমান লোকেরই কাজ হতে পারেনা। এ হচ্ছে দুটি বিপরীতধর্মী জিনিসকে একত্রিত করার ব্যর্থ প্রয়াস মাত্র। এর মানে হচ্ছে এই যে, একই সময়ে এক ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান এবং অমুসলমান উভয় নামেই পরিচয় দিচ্ছেন – একই সময়ে ইসলামের সীমার মধ্যে ও বাইরে উভয় জায়গায়ই তিনি অবস্থান করছেন।
লেখকের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং তাঁর বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে আমরা এতখানি বিরূপ ধারণা পোষণ করিনা যে, ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কথা বলতে হলে একইভাবে দুটি পরস্পরবিরোধী ভূমিকা তিনি গ্রহণ করতেন। আমরা তাঁর কাছ থেকে এ প্রত্যাশাও করিনা যে, ভারত সম্রাটের [মনে রাখতে হবে যে, প্রবন্ধটি লেখা হয়েছিল ১৯৩৪ সালে] আদালতে বসে তিনি ভারত সম্রাটেরই প্রবর্তিত বিধিব্যবস্থার সমালোচনা করবেন। আমরা তাঁর কাছ থেকে এ দুঃসাহসও আশা করিনা যে, তিনি কোনো ধর্ম বা মতাদর্শের (School of Thought) আনুগত্যের দাবি করার পর সেই ধর্মেই মৌলনীতির সমালোচনায় প্রবৃত্ত হবেন। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, ইসলাম সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী দুটি ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। এমনকি, তিনি যে বারংবার ভূমিকা বদলাচ্ছেন, এই অনুভূতিটি পর্যন্ত তাঁর নেই। একদিকে তিনি নিজেকে মুসলমান বলে জাহির করছেন, মুসলমানী নামে পরিচয় দিচ্ছেন, মুসলমানের দুর্দশার জন্য আক্ষেপ করছেন, ইসলামের উন্নতির জন্য আগ্রহ প্রকাশ করছেন, মুসলমানদের ‘ইহসান’ অর্থ্যাৎ ‘খাটি ধর্মের’ নসীহত শুনাচ্ছেন। অন্যদিকে যে কিতাবের উপর ইসলামের ভিত্তি অবস্থিত এবং যাকে চূড়ান্ত দলিল বলে স্বীকার করা মুসলমান হবার জন্যে অপরিহার্য শর্ত, তাঁর মুলনীতি ও বিধিব্যবস্থা সম্পর্কে বেপরোয়া সমালোচনাও করছেন। কুরআন শুধু এক আধটি ক্ষেত্রেই নয়, অন্তত, চার জায়গায় শূকরের মাংসকে [দেখুনঃ আল বাকারাঃ আয়াত ১৭৩, আল মায়েদাঃ আয়াত ৩, আল আনআমঃ আয়াত ১৪৫, আননাহলঃ আয়াত ১১৫] স্পষ্ট ভাষায় হারাম ঘোষণা করেছে। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে লোকদেরকে সুবিধা দেবার পক্ষপাতি। মজার ব্যাপার হলো, সুবিধা দেবার এই আগ্রহটাও নাকি ‘ইসলামের উন্নতির’ খাতিরে! মনে হয় যেনো কুরআনের চাইতেও ইসলামের উন্নতির চিন্তা তাকে বেশী পেয়ে বসেছে। অথবা তিনি কুরআন বহির্ভূত কোনো ইসলামের তরক্কির জন্য অধীর হয়ে পরেছেন! কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কুরআন অন্যান্য জিনিসের ন্যায় মানুষের জন্য খাদ্য তালিকাও (Menu) প্রস্তুত করে এবং খাদ্য দ্রব্যের মধ্যে হালাল হারাম ও পাক- নাপাকের পার্থক্য নির্ধারণ করে দেয়। এমনকি, স্পষ্টত বলে দেয় যে, ‘তোমরা নিজেদের খেয়াল খুশি অনুযায়ী কোনো জিনিসকে হালাল বা হারাম ঘোষণা করার অধিকারী নও’। [আননাহলঃ আয়াত ১১৬] কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে নিজের অধিকারের উপরই জোর দিচ্ছেন এবং কুরআনের অধিকার স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ করছেন। অর্থ্যাৎ পানাহারের ব্যাপারে ধর্মের কোনো হস্তক্ষেপ মানতেই তিনি রাজি নন! বস্তুত সেন্ট পলের [ইনি যিশুখ্রিস্টের অন্যতম প্রধান শিষ্য। মৃত্যু, আনুমানিক ৬৭ খ্রিস্টাব্দ। বর্তমান খ্রিস্টান জগত এঁরই মতের অনুগামী।–সম্পাদক] (যীশুখ্রিষ্ট নন) অনুগামীদের ন্যায় কুরআন ধর্মকে কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে আবদ্ধ করে রাখেনি। বরং পোশাক পরিচ্ছদ, খানাপিনা, বিবাহ তালাক, উত্তরাধিকার, লেনদেন, রাজনীতি, বিচারালয়, দন্ডবিধি ইত্যাদি প্রত্যেকটি ব্যাপারেই সে আইন প্রদান করে। অথচ তিনি একে ইসলামের উন্নতি ও তরক্কির পথে অন্তরায় মনে করেন। তিনি অভিজোগ করেছেন যে, এই আইন মানুষকে একটি নির্জীব লাশ এবং অবোধ শিশুতে পরিণত করে। আর তাই তিনি প্রস্তাব করেছেন, খ্রিষ্টানরা (প্রকৃতপক্ষে পল অনুগামীরা) যেমন বুঝছে, আমাদের ধর্মও ঠিক তেমনটিই হওয়া উচিত। কুরআন নিজেই শরয়ী বিধান তৈরী করেছে এবং তাকে আল্লাহ নির্ধারিত সীমা আখ্যা দিয়ে তার আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু তিনি শরীয়তের এই সীমারেখাকে বেড়ি বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সেন্ট পলের ন্যায় ধর্মের প্রচার ও উন্নতির জন্যে সে বেড়ি ছিন্ন করা আবশ্যক মনে করেছেন। কুরআনের দৃষ্টিতে ঈমান হচ্ছে মুক্তির জন্যে প্রথম ও আবশ্যিক শর্ত। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমানদার নয়, তার সম্পর্কে কুরআন সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করছে যে, সে দোজখের ইন্ধনে পরিণত হবে। [আল আম্বিয়াঃ আয়াত ৯৮] তারা সংখ্যায় অগণিত হোক কি মুষ্টিমেয়, স্বচ্ছল হোক কি দরিদ্র তাতে কিছুই যায় আসেনা। কিন্তু তার অবস্থা হচ্ছে এইযে, কাফির ও মূর্তিপূজারীদের অগণিত জনসংখ্যাকে সুখী স্বচ্ছল ও সমৃদ্ধশালী দেখে তার মন কিছুতেই সায় দিচ্ছেনা যে, কয়েক বছর পরেই তারা দোজখের ইন্ধনে পরিনত হবে! কারণ তারা খোদার দুনিয়াটাকে সমৃদ্ধ ও সুশোভিত করা ছাড়া আর কি অপরাধ করেছে, এটা তার বোধগম্যই হচ্ছেনা! প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, কুরআনের সঙ্গে এতটা খোলাখুলি মতবিরোধ পোষণ করে তিনি কিভাবে মুসলমান থাকতে পারেন? কিংবা মুসলমান হয়ে তিনি কিভাবে কুরআনের সাথে মতবিরোধ পোষণ করেন? তিনি যদি মুসলমান হন তো কুরআনের সাথে তার মতবিরোধ না করাই উচিত। আর যদি মতবিরোধ চান, তাহলে ইসলামের নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়েই করা উচিত। যে ব্যক্তি কোনো ধর্মের মূলনীতি ও বিধিব্যবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট নয়, যার মন সে বিধিব্যবস্থার সত্যতায় সায় দেয়না, যিনি তার কার্যকারণ ও যৌক্তিকতা উপলব্ধি করতে অক্ষম, যার দৃষ্টিতে তার কতক বা অধিকাংশ বিষয়ই আপত্তিকর, তার সামনে দুটি পথই খোলা রয়েছেঃ হয় তিনি সে ধর্ম থেকে বেরিয়ে গিয়ে তার যেকোনো নিয়ম ও বিধান সম্পর্কে নির্বিবাদ সমালোচনা করার অধিকার লাভ করবেন, কিংবা অসন্তুষ্ট মনোভাব নিয়ে সে ধর্মের মধ্যে থাকতে চাইলে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ থেকে বিরত থাকবেন এবং ‘মুজতাহিদ’ সেজে তার বিধিব্যবস্থার উপর করাত না চালিয়ে যথার্থ শিক্ষার্থীর ন্যায় নিজের সন্দেহ দূর করার চেষ্টা করবেন। সুস্থ বিচার বুদ্ধি অনুসারে কেবল এই দুটি পন্থাই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। আর সত্যিকার বিবেকসম্পন্ন কোনো লোক এমনি পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে এর যেকোনো একটি পন্থাই অবলম্বন করবেন। কিন্তু লেখক প্রবর এবং তার ফিরিঙ্গী শিক্ষাপ্রাপ্ত অনেক লোকেরই অবস্থা হচ্ছে এই যে, প্রথম পথটি গ্রহণ করার মত নৈতিক সাহস তাদের মধ্যে নেই, আর দ্বিতীয় পথ অবলম্বন করতেও তাদের লজ্জাবোধ করেন। এই কারনেই তারা মাঝামাঝি একটা অযৌক্তিক পন্থা অবলম্বন করেছেন; তা হল এই যে, একদিকে তারা মুসলমানদের মধ্যে শামিল হয়ে ইসলামের উন্নতি ও তরক্কিওকামনা করেন, ইসলাম ও মুসলমানদের দুঃখ দরদে অস্থিরতাও প্রকাশ করেন, অন্যদিকে ইসলামের বিরুদ্ধে এমন সবকিছুই বলেন এবং করেন, যা একমাত্র অমুসলমানদের পক্ষেই সম্ভব। হাদিস ও ফিকাহ তো দুরের কথা, খোদ কুরআন মজীদের সমালোচনা করতেও এঁরা কুণ্ঠিত নন। ইসলামের প্রতিটি ভিত্তির ওপরই এঁরা অবলীলাক্রমে আঘাত হেনে চলছেন। এই শ্রেণীর ভদ্রজনেরা দাবি করেন যে, সমাজে এঁরাই একমাত্র যুক্তিবাদী লোক; সুতরাং যুক্তিবিরদ্ধ কোনো কথা এরা মানতে পারেননা। আর “মোল্লা”দের বিরুদ্ধে এদের সবচাইতে বড় অভিযোগ এই যে, তারা কোনো ব্যাপারেই বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করেনা। কিন্তু এদেরই অবস্থা হচ্ছে এই যে, ধর্মের ব্যাপারে এরা স্পষ্টত স্ববিরোধী কথা বলছেন, পরস্পর বিরোধী কর্মনীতি অবলম্বন করছেন এবং নিজেরই এক কথার দ্বারা অন্য কথার প্রতিবাদ করে চলছেন- এটা কোন ধরনের যুক্তিবাদ যা আবিস্কার করে প্রগতিবাদী গবেষকরা কৃতিত্ব অর্জন করছেন?
এবার তাদের জ্ঞানের বহর এবং চিন্তার গভীরতা একটু তলিয়ে দেখুন।
ইসলাম তরক্কির জন্যে লেখকপ্রবর খ্রিস্টধর্মের ন্যায় তাবৎ শরয়ী বিধি নিষেধ তুলে দেয়া এবং ইসলামকে নিছক একটি বিশ্বাসমূলক ধর্ম বানিয়ে রাখা আবশ্যক মনে করেন। কারণ খ্রিস্টধর্মের উন্নতির মূলে এই রহস্যটি তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, সেখানে হারাম হালালের কোনো সীমারেখা নেই। কোনো নৈতিক বিধি নিষেধের বালাই নেই। সেখানে মানুষের মানবিক অধিকার হরণ করে তাকে নিষ্প্রাণ লাশ ও অবোধ শিশুতে পরিণীত করা হয়নি; বরং খ্রিস্টের প্রতি বিশ্বাস রেখে যা খুশি তা করবার স্বাধীনতা তাকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি এটা তলিয়ে চিন্তাই করেননি যে, যে জিনিসটাকে ইসলাম বলা হয়, তা রয়েছে কুরআনে। আর কুরআন ঈমান ও সৎকাজ উভয়েরই সমাবেত নাম রেখেছে ইসলাম। পরন্তু সৎকাজের জন্যে সে স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করেছে, বিধি ব্যবস্থা তৈরি করে দিয়েছে এবং ব্যক্তিগত ও সামস্টিক জীবনের জন্যে একটি পরিপূর্ণ কর্মপদ্ধতি নির্দেশ করেছে। এমনি পদ্ধতি ছাড়া একটি দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) এবং একটি সভ্যতা হিসেবে ইসলাম কিছুতেই প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনা। আর সে পদ্ধতি এবং সীমারেখাকে বিলোপ করার অধিকারও কোনো মুসলমানকে দেয়া হয়নি। কারণ তার বিলুপ্তি ইসলামের বিলুপ্তিরই নামান্তর মাত্র। আর ইসলামই যদি বিলুপ্ত হয়ে যায় তো তার উন্নতির কি অর্থ থাকতে পারে? তিনি ইচ্ছা করলে নিজেই কোনো ধর্ম আবিস্কার করে তার প্রচার করতে পারেন, কিন্তু কুরআনের বিরুদ্ধ জিনিসকে ইসলামের নামে চালানো এবং তার উন্নতিকে “ইসলামের উন্নতি” আক্ষা দেয়ার তার কী অধিকার রয়েছে?
তিনি নিছক একটি বিশ্বাসকে ইসলাম বলতে চান; আর তাহলো এই যে, আমরা ইহজীবন ও পরজীবনে আমাদের কৃতকর্মের জন্যে দায়িত্বশীল। সম্ভবত একথাটি তিনি এই আশায় বলেছেন যে, আর দ্বারা ইসলাম সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। তার প্রকৃতি সহজ ও মোলায়েম হয়ে যাবে এবং তা দ্রত প্রসার লাভ করতে থাকবে।
কিন্তু তিনি এই বিশ্বাসটির তাৎপর্য সম্পর্কে একটু তলিয়ে চিন্তা করলেই বুঝতে পারতেন যে, এভাবে সীমিত হবার পরও ইসলাম তাঁর মনোপুত হতে পারেনা। কারণ এই বিশ্বাসটিকে ধর্ম আখ্যা দিতে হলে সর্বপ্রথম পারলৌকিক জীবনের প্রতি ঈমান পোষণ আবশ্যক হয়ে পড়ে। পরন্তু জবাবদিহি বা দায়িত্ববোধ তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। প্রথমত যার সামনে জবাবদিহি করতে হবে, তাঁর স্বরূপ নির্ণয় করা এবং তাঁর সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়া। দ্বিতীয়ত, জবাবদিহির প্রকৃতি নির্ণয় করা এবং তদনুযায়ী বাস্তব জীবনে সফল ও ব্যর্থ কাজগুলোর মধ্যে পার্থক্য করে চলা। তৃতীয়ত, জবাবদিহির ব্যাপারে সাফল্য ও ব্যর্থতার পৃথক পৃথক ফলাফল নির্ণয় করা। কারণ ব্যর্থতা ও সাফল্য উভয়ের ফলাফল একরূপ হলে কিংবা আদৌ কোনো ফলাফল না থাকলে জবাবদিহিই সম্পূর্ণ নিরর্থক হয়ে পড়ে। লেখকপ্রবর যে বিশ্বাসটিকে “খাঁটি ধর্ম” আখ্যা দিতে চান, এ হচ্ছে তারই যুক্তিসঙ্গত দাবি। তাঁর প্রস্তাব আনুযায়ী এই বিশ্বাসটির উপর ইসলামকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়, তবু যে আপদ থেকে তিনি বাঁচতে চান তা এসে চেপে বসবেই। এর ফলে আবার সেই খোদাকে মানা আবশ্যক হয়ে পড়বে, যাকে বাদ দিয়েই জাপান উন্নতির শীর্ষদেশে আরোহণ করেছে বলে মনে হচ্ছে। আবার সেই শরয়ী বন্ধন ও নৈতিক শৃঙ্খল তৈরি হয়ে যাবে, যাকে তিনি ছিন্ন করতে চান এবং যার ভেতরে ইসলামের উন্নতি না করার গোপন রহস্যটি নিহিত রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। আবার সেই আযাব ও সওয়াব তথা শান্তি ও পুরস্কারের তর্ক আত্মপ্রকাশ করবে বং খোদার বেশুমার সৃষ্টিকে বিশ্বাস ছাড়াই সুখী সমৃদ্ধ দেখে তাঁর মন সায় দিতে অস্বীকার করবে যে, মাত্র কয়েক বছর পরই এরা আযাবের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে।
কাজেই তিনি একটু ভেবে চিন্তে বরং এমন একটা জিনিসের নাম ইসলাম রেখে দিন, যাতে কোনোরূপ বিধি নিষেদের বালাই থাকবেনা। যার প্রতি বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসী উভয়েরই পরিনাম ফল একরূপ হবে। যাতে পারলৌকিক সাফল্যের জন্যে খোদার দুনিয়াটাকে সমৃদ্ধ সুবিন্যাস্ত করাই যথেষ্ট হবে এবং যার প্রতি অবিশ্বাসী বেশুমার সৃষ্টিকে সুখী সমৃদ্ধ দেখে তাঁর মন সায় দিতে পারবে যে, কয়েক বছর পরে এদের সবাইকে জান্নাতের বুলবুলে পরিণত করা হবে।
কুরআনের বিধানানুসারে শুকুরের মাংস চূড়ান্তভাবে হারাম হবার ব্যাপারটি লেখকের মনে সঠিক অ প্রামাণ্য নয়। তিনি সন্দেহ পোষণ করেছেন যে, হয়তো আরবদের জন্যে কোনো বিশেষ কারণে এটি হারাম করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই অভিমত প্রকাশ করার আগে কুরআন শরীফ খুলে একটু দেখে নিলেই তাঁর সন্দেহটা ঘুচে যেতো। কুরআনে স্পষ্টত বলা হয়েছেঃ
(আরবী)
অর্থঃ হে নবী! বলে দাওঃ আমার প্রতি যে ওহী নাযিল করা হয়েছে, তাতে কোনো ভোজনকারীর ভোজ্য জিনিসকে হারাম করা হয়নি, অবশ্য মৃতদেহ, প্রবাহিত রক্ত আর শুকুরের মাংস ছাড়া- কারণ এগুলো নিসন্দেহে অপবিত্র; কিংবা অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো নামে জবাই করা প্রানী ব্যতীত। অতপর যে ব্যক্তি নিরুপাই হয়ে পড়েছে (এবং এর কোনো জিনিস খেয়ে ফেলেছে) সে যদি আবাধ্যচারী অ সীমা লঙ্ঘনকারী না হয় তো তোমার প্রভু ক্ষমাশীল অ দয়াময়।“ ( সুরা আনয়ামঃ ১৪৫)
এই আয়াতে শুকুরের মাংস প্রত্যেক ‘ভজন’কারীর (আরবী) জন্যেই হারাম করে দেয়া হয়েছে। এর হারাম ঘোষণার জন্যেই এই কারণ দর্শানো হয়েছে যে, তা হচ্ছে ‘অপবিত্র’ (আরবী)। প্রশ্ন হলো, এখানে ভোজনকারী বলতে কি আরবের ভোজনকারীকে বুঝানো হয়েছে? তাছাড়া একই জিনিস কি আরবের জন্যে পবিত্র এবং অনারবের জন্যে অপবিত্র হতে পারে? এই সুত্র ধরেই কি লেখক মুর্দাখোরদের জন্যেও সুবিধা দেয়া পছন্দ করবেন। শুকুরের মাংসের বেলায় তিনি সুবিধা দিতে চাইলে নিজের পক্ষ থেকেই দিন। কিন্তু কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণার বিরুদ্ধে একথা বলার অধিকার তিনি কোথায় পেলেন যে, কুরআন দ্বারা এর চূড়ান্ত হারাম হবার ব্যাপারটা সন্দেহমুক্ত নয়।
আজকের নব্য মুজতাহিদরা ইজতিহাদের জন্যে এক অদ্ভুত নীতি আবিস্কার করেছেন। তাঁদের একটি বিশিষ্ট নীতি হচ্ছে এই যে, ইসলামের যে বিধানটির তারা বিরুদ্ধাচরন করতে চান, সে সম্পর্কে তারা নির্দ্বিধাই বলে দেন যে, এই বিশেষ ব্যবস্থাটি আরবদের জন্যে করা হয়েছিলো। এই বিশেষিতকরণ সম্পর্কে কুরআনে কোনো সামান্য ইঙ্গিত এবং এর স্বপক্ষে কোনো যুক্তি বা দৃষ্টান্ত না থাকলেও এ ধরনের উক্তি করতে তাঁরা মোটেই কুণ্ঠাবোধ করেননা। এমনিতর ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো কুরানকেই একদিন তাঁরা আরবদের জন্যে নিদৃষ্ট করে দিতে চাইবেন।
পরন্তু (আরবী)( অবাধ্যচারী ও সীমা লঙ্ঘনকারী না হয়ে যে ব্যক্তি নিরুপাই হয়ে পড়ে)- এর সাহায্যে যুক্তি প্রদর্শন করাটা এমনি হাস্যকর যে, ভ্রমণবৃত্তান্ত লেখকের জ্ঞান বুদ্ধির প্রশংসা করতে ইচ্ছে হয়। সম্ভবত আয়াতটির তিনি এই অর্থ গ্রহন করেছেন যে, ‘যখন শুকুরের মাংস খাবার স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছা জাগবে তখন খেয়ে নিও, কিন্তু বাগানে বসে খেয়োনা এবং তাঁর অভ্যাসও করোনা।‘
বস্তুত, এই আয়াত থেকে শুকুরের মাংসের ব্যাপারে ইউরোপীয় ও চীনাদেরকে সুবিধা দানের অবকাশ এমন ব্যক্তিই বের করতে পারে, যে নিরুপাই, অবাধ্য ও অভ্যস্ত- এর কোনো একটি শব্দেরই অর্থ বোঝেনা। নচেৎ যে ব্যক্তি এ শব্দগুলোরঅর্থ জানে, তার পক্ষে এতোখানি দুঃসাহস দেখানো সম্ভভপর নয়। প্রকৃতপক্ষে আয়াতটির অর্থ এ নয় যে, যারা মুর্দাভক্ষন বা রক্তপানে আসক্ত কিংবা যারা শুকুরের মাংসের জন্যে প্রাণপাত করে, অথবা যাদের মধ্যে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো নামে জবাই করা প্রাণীর মাংস ভোজন সাধারণভাবে প্রচলিত, তারা সবাই উপায়হীনের অন্তর্ভুক্ত। এমনি হলে তো গোটা নিষেধাজ্ঞাটিই অর্থহীন হয়ে দাঁড়াতো। কারণ নিষেধাজ্ঞাটি যদি এই জিনিসগুলোর ভক্ষণকারীদের প্রতি প্রযোজ্য হতো তো তারা ব্যতিক্রম অবস্থার সুযোগ গ্রহন করে নিজেদের অভ্যাস অনুসারেই খেতে থাকতো কিংবা যারা নিজেরাই এই জিনিসগুলোর বর্জনকারী, নিষেধাজ্ঞাটি তাদের জন্যে হলেও এর কোনো প্রয়োজন ছিলোনা। প্রকৃতপক্ষে নিরুপাই (****) শব্দটির সঙ্গে ‘অবাধ্য ও সীমা লঙ্ঘনকারী ছাড়া’র শর্তারোপ করে এ ব্যতিক্রম সৃষ্টি করা হয়েছে, তার অর্থ এই যে, কোনো ব্যক্তি যদি ক্ষুধার জ্বালায় মারা যাবার উপক্রম এবং হারাম জিনিস ছাড়া অপর কোনো জিনিস সে সংগ্রহ করতে না পারে, তাহলে শুধু প্রাণ বাঁচানোর জন্যেই সে হারাম জিনিস খেতে পারে কিন্তু সে শর্ত এই যে, অনুমতির সীমা লংঘন করা যাবেনা। অর্থাৎ প্রাণ রক্ষার জন্যে যতোটুকু পরিমান অপরিহার্য, তার বেশি খাবেনা এবং আল্লাহ্র নির্ধারিত সীমা লংঘনের বাসনা মনে পোষণ করবেনা এ কথাটিই অন্যত্র শুকুরের মাংস, মৃতদেহ ইত্যাদির নিষিদ্ধকরণ প্রসঙ্গে আইভাবে বিবৃত হয়েছেঃ
(আরবী)
অর্থাৎ ক্ষুধার জ্বালায় কেউ নিরুপাই হয়ে পড়লে তার মনে যদি গুনাহর প্রতি আকর্ষণ না থাকে, তবে এমনি অবস্থায় সে হারাম জিনিস খেতে পারে।‘ কোথায় কুরআনের বিধান আর কোথায় ইউরোপ ও চীনাবাসীদের জন্যে লেখকের ওকালতি। ঐসকল দেশের অধিবাসীরা যেহেতু শুকুরের মাংসের জন্যে প্রাণপাত করে, এই কারণেই (আরবী) এর সুযোগে তাদের জন্যে শুকুরের মাংস জায়েয করতে হবে এবং তাও আবার তাদের ইসলামের দাখিল হবার জন্যে- কী উদ্ভট যুক্তি! এভাবে যদি প্রত্যেক জাতির আসক্তি ও আগ্রহের প্রতি লক্ষ্য রেখে ইসলামের বিধি ব্যবস্থায় সুবিধা দানের ধারা শুরু হয়ে যায়, তাহলে মদ, ব্যভিচার, সুদ এবং এ ধরনের তামাম নিষিদ্ধ বস্তুকেই একে একে হালাল করতে হবে। প্রশ্ন হলো এই যে, যারা আল্লাহর বিধানের অনুবর্তন করতে, তার নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলতে এবং হারামকে হারাম ভাবতেই প্রস্তুত নয়, তাদেরকে ইসলামে দাখিল করাবার প্রয়োজনটা কী? ইসলাম কবে এ ধরনের লোকদের মুখাপেক্ষী ছিলো যে, এদেরকে সম্মত করাবার জন্যে দর কষাকষি করতে হবে?
প্রথমে শুধু শুকুরের মাংস হারাম হবার কারণটাই লেখকের বোধগম্য হয়নি। কিন্তু পরে কিছুটা চিন্তা ভাবনার পর তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, নীতিগতভাবে পাকস্থলী ও নৈতিক চেতনার মধ্যে বিরাট ব্যবধান রয়েছে। কাজেই তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, খাদ্যদ্রবের মধ্যে হালাল হারামের পার্থক্য নির্দেশ করার কোনো অধিকার ধর্মের নেই। তাঁর এই বক্তব্য থেকে এ রহস্যও উদঘাঁটিত হলো যে, কুরআন সম্পর্কে তিনি যা কিছু জানেন, জড় বিজ্ঞান (Physical Science) সম্পর্কে তার চাইতে বেশি মোটেই জানেননা। অবশ্য কুরআন সম্পর্কে না যানাটা একজন শিক্ষিত ও আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তির পক্ষে তেমন কোনো লজ্জার ব্যাপার নয়, কিন্তু বিজ্ঞান সম্পর্কে এতোখানি অজ্ঞতা তো নিসন্দেহে এক বিরাট লজ্জাজনক ব্যাপার। এখন পর্যন্ত তিনি এই কথাটুকুই জানেননা যে, মানুষের আত্মার সঙ্গে তাঁর দৈহিক গঠনের এবং দৈহিক গঠনের সাথে খাদ্যের সম্পর্কটা কী? যে বস্তুটি দেহের ক্ষয়প্রাপ্ত উপাদান সরবরাহ করে, যাদ্বারা দেহের তামাম শিরা উপশিরা ও স্নায়ুমণ্ডলী গঠিত হয়, হৃদয় ও আত্মার ওপর তাঁর স্বভাবগত প্রভাব পড়াটা নয়; বরং না পড়াটাই বিস্ময়কর। এই সত্যের প্রতি বিজ্ঞান জগতও পূর্বে সাধারণভাবে উদাসীন ছিলো; কিন্তু খাদ্য বিজ্ঞান (Dietetics) সম্পর্কে ইদানিং যেসব গবেষণা হয়েছে, তার থেকে এই রহস্য প্রতিভাত হয়ে উঠেছে যে, মানুষের নৈতিক চরিত্র ও তার মানসিক শক্তির ওপর খাদ্য অবশ্যই প্রভাবশালী হয়ে থাকে। তাই বিভিন্নরূপ খাদ্য আমাদের আত্মা ও চিন্তাশক্তির ওপর কি ধরনের প্রভাব বিস্তার করে, আধুনিক বিজ্ঞানীরা সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান চালাচ্ছেন। মনে হয় বিজ্ঞান সম্পর্কে আমাদের গ্রাজুয়েট বন্ধুর জানাশোনা মোটেই অধুনাতম (Up-to- Date) নয়। নচেৎ এতোবড় ধৃষ্টতার সাথে তিনি এ দাবি করতে পারতেননা যে, নীতিগতভাবে পাকস্থলী ও নৈতিক চেতনার মধ্যে বিরাট ব্যবধান রয়েছে।