তৃতীয় খন্ড
ইসলামী শাসনের মূলনীতি
• মৌলিক মানবাধিকার
• অমুসলিমদের অধিকার
• ইসলাম ও সামাজিক সুবিচার
• ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার পথনির্দেশক মূলনীতি
দ্বাদশ অধ্যায়
• মৌলিক মানবাধিকার
দীর্ঘদিন থেকে কিছু লোকের মনমগযে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক থাচ্ছে যে, ইসলাম মৌলিক মানবাধিকারের আদৌ কোনো গ্যারান্টি দিয়েছে কি? যারা কেবল পাশ্চাত্যের ইতিহাস এব্ং রাজনৈতিক উন্নতির ব্যাপারেই ওয়াকিফহাল, অজ্ঞতাবশত এসব লোকের ধারণা হলো, মানবাধিকার সংরক্ষেণের বিষয়টি কেবল পাশ্চাত্য দেশগুলোতেই উন্নতি সাধিত হয়েছে। অথচ এ ধারণা একেবারেই ভ্রান্ত। ইসলামতো ঐ সময়ই মৌলিক মানবাধিকার সংরক্ষণের গ্যারান্টি দিয়েছে এবং বাস্তবেও মানবতা তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ভোগ করেছে, যখন অন্যদের মধ্যে মানবাধিকারের ধরণাই জন্মায়নি। মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী লাহোর রোটারী ক্লাবের আহ্বানে মৌলিক মানবাধিকারে ওপর বক্তব্য পেশ করেন এবং প্রসংগক্রমে সে ভাষাটি উল্লেখ করে দেয়া হলো।
মানবাধিকার একদিকে ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ, অপরদিকে ইসলামে যারতীয় নীতিমালার জন্যে অগ্রগন্য মূলনীতির মর্যাদা সম্পন্ন। গ্রন্থের তৃতীয় খন্ড এসব অধিকারের বর্ণনা দিয়ে আরম্ভ করা হলো।– সংকলক
মৌলিক মানবাধিকার
[এটা মূলত একটা বক্তৃতা। মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহঃ) লাহোরের রোটারী ক্লবে এই বক্তৃতা দেন। মাওলানা খলীল আহ্মদ হামেদী তা লিপিবদ্ধ করেন।]
মৌলিক অধিকার কোনো নতুন ধারণা নয়
আমাদের মুসলমানদরে সম্পর্কে বলা যায়, ‘মৌলিক মানবাধিকার’ মতবাদ আমাদের জন্য কোনো নতুন জিনিস নয়। হতে পারে অন্যদের দৃষ্টিতে এই অধিকারের ইতিহাস সম্মিলিত জতিসংঘের মহাসনদ থেকে অথবা ইংল্যান্ডের ম্যাগনা কারটা [Magna Carta] থেকে শুরু হয়েছে। কিন্তু আমাদের মতে এই মতবাদের সূচনা অনেক পূর্বে হয়েছে। এখানে আমি মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর আমাদের মতে এই মতবাদের সূচনা অনেক পূর্বে হয়েছে। এখনে আমি মানুষের মৌলিক অধিকারের ওপর আলোকপাত করার পূর্বে “মানবীয় অধিকার” মতবাদের সূচনা কি করে হলো তা সংক্ষেপে বলে দেয়া জরুরী মনে করি।
মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন উঠেছে কেন?
দুনিয়াতে মানুষই এমন এক জীব যার সম্পর্কে স্বয়ং মানুষের মধ্যেই বারবার প্রশ্ন উঠছে যে, তার মৌলিক অধিকার কি? বাস্তবিবপক্ষে এ এক আশ্চর্য ধরনের কথা। মানবজাতি ছাড়া দুনিয়ায় বসবাসরত অন্যান্য মাখলুকাতের অধিকার স্বয়ং প্রকৃতিই নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং তারা তা ভোগ করে যাচ্ছে। এজন্য তাদের কোনোরূপ চিন্তা ভাবনা করতে হয়না। কিন্তু মানুষই এমন মাখলূক যার সম্পর্কে প্রশ্ন উঠে যে, তার অধিকারসমূহ কি? এবং তাদের এ অধিকার নির্ধারণ করার প্রয়োজন দেখা দেয়।
অনুরূপভাবে এটাও আশ্চর্যর ব্যাপার যে, বিশ্বে এমন কোনো প্রকার সৃষ্টি নেই যে তার নিজস্ব শ্রেণভুক্ত অপর সদস্যের সাথে সেই ব্যবহার করছে যা মানুষ তার সমগোত্রের সাথে করছে। বরং আমরা তো দেখছি প্রাণীদের কোনো শ্রেণী এমন নেই যা অপর শ্রেণীর ওপর নিছক আনন্দ উপভোগ অথবা প্রভুত্ব করার জন্য আক্রমণ করছে।
প্রাকৃতিক বিধান যদিও এক ধরনের জীবকে অপর ধরনের জীবের খাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে, কিন্তু তা কেবল খাদ্যের সীমা পর্যন্ত। এমন কোনো হিংস্র জন্তু নেই যে খাদ্যের প্রয়োজন ছাড়া অথবা এই প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাওয়ার পর বিনা কারণে অন্যান্য প্রাণী হত্যা যাচ্ছে। মানুষ তার সমগোত্রীয়েদের সাথে যে আচরণ করছে জীব জন্তুর মধ্যে কোনো প্রাণিই তার সমগোত্রীয়দের সাথে তদ্রূপ আচরণ করেনা। আল্লাহ্ তায়ালা মানুষকে যে সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন এটা খুব সম্ভব তারই ফল। মানুষ দুনিয়াতে যে অসাধারণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হচ্ছে তা আল্লাহ্ তায়ালা কর্তৃক তাদেরকে প্রদত্ব জ্ঞান ও আবিষ্কার শক্তিরই চমৎকারিত্ব।
বাঘেরা আজ পর্যন্ত কোনো সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলেনি। কোনো কুকুর আজ পর্যন্ত অন্যান্য কুকুরগুলোকে গোলামে পরিণত করেনি। কোনো ব্যাঙ আজ পর্যন্ত অন্য ব্যাঙদের বাকশক্তি হরণ করেনি। কেবল মানুষই যখন আল্লাহ্ তায়ালার নির্দেশ উপেক্ষা করে তাঁর দেয়া শক্তিকে কাজে লাগাতে শুরু করে, তখন নিজের সগোত্রীয়দের ওপরই যুলুম শুরু করে দেয়। দুনিয়াতে মানব জাতির গোড়াপত্তন হওয়া থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সমস্ত পশুরা এতো মানুষ হত্যা করেনি যতোগুলো মানুষের জীবন কেবল দ্বিতীয় মাহযুদ্ধে মানুষে ছিনিয়ে নিয়েছে। এতে প্রমাণ হয় যে, বাস্তবিকপক্ষে মানুষ অন্য মানুষের অধিকারের কোনো তোয়াক্কা করেনা। এ ক্ষেত্রে কেবল আল্লাহ্ তায়ালাই মানব জাতিকে পথ প্রদর্শন করেছেন এবং তাঁর নবী রসূলদের মাধ্যমে মানবীয় অধিকার সম্পর্কে ওয়াকিফহাল করেছেন। মানবজাতির অধিকার নির্ধারণকারী মূলত মানুষের স্রষ্টাই হতে পারেন। সুতরাং মহান স্রষ্টাই মানুষের অধিকারসমূহ বিস্তারিতভাবে বলে দিয়েছেন।
আধুনিক যুগে মানবাধিকার চেতনার ক্রমবিকশ
মানাধিকারের ইসলামী মেনিফেষ্টোর দফাগুলো সম্পর্কে আলোচনা করার পূরেব বর্তমান যুগে মানবাধিকার চেতনার ক্রমবিকাশ ইতিহাসের ওপর সংক্ষিপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করা যুক্তিসঙ্গত হবে।
১.ইংল্যান্ডের রাজা জন ১২১৫ খৃষ্টাব্দে যে ম্যাগনা কারটা জারি করেন তা মূলত ছিলো তার পারিষদবর্গের নির্যাতনের ফল। রাজা এবং পারিষদবর্গের মধ্যে এর মর্যাদা ছিলো একটি চাক্তিপত্রের সমতুল্য। অধিকান্তু তা পারিষদবর্গের স্বার্থ রক্ষার জন্যই প্রণয়ন করা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের অধিকারের কোনো প্রশ্ন এখানে ছিলোনা। পরবর্তীকালে লোকেরা এর মধ্যে আবিষ্কার করে যে, তা এই সনদ প্র্রণয়নকারীদের সামনে পাঠ করা হলে তারা হয়রান হয়ে যেতো। সপ্তদশ শতকের পেশাদার আইনবিদরা তার মধ্যে আবিষ্কর করলো , বিচার বিভাগের অযথা কয়েদ করার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা এবং কর আরোপ করার ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার অধিকার ইংল্যান্ডের অধিবাসীদের এই সনদের মধ্যে দেয়া হয়েছে।
২.টম পেনের [Paine Thomas-1737-1809] মানবাধিকার [Right of man] নামক পুস্তিকা পাশ্চাত্যবাসীদের চিন্তাধারায় ব্যাপক বৈপ্লবিক প্রভাব বিস্তার করে। তার এই পুস্তিকা [১৭১৯] পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে মানবাধিকারের ধারণাকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়। এই ব্যক্তি আসমানী কোনো ধর্মের সমর্থন ছিলেননা। আর তার যুগটাও ছিলো আসমানী ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের যুগ। এজন্য পাশ্চাত্যের জনগণ মনে করে বসলো আসমানী ধর্মগুলোতে মানবাধিকার সম্পর্কে কোনো বক্তব্য নেই।
৩. ফরাসী বিপ্লবের ঘটনাবলীর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে “মানবাধিকার ঘোষণা” [Declaration of the Rights of man] যা ১৭৮৯ সালে প্রকাশ পায়। এটা অষ্টাদশ শতকের সমাজদর্শন এবং বিশেষ করে রুশোর “সামাজিক আচরণ তত্ত্বের” [Social contact theory] ফল। এতে জাতীয় সরকার, স্বাধীনতা, সাম্য এবং মালিকানার স্বাভাবিক অধিকার সমর্থন করা হয়েছে। এতে ভোট দানের অধিকার, আইন প্রণয়ন এবং কর আরোপ করার এখতিয়ারের ওপর জনমতের নিয়ন্ত্রণ, বিচার বিভাগ কর্তৃক অপরাধের কারণ অনুসন্ধান [Trail by jury] ও পর্যালোচনা ইত্যাদির সমর্থন করা হয়েছে।
ফান্সের আইন পরিষদ বিপ্লব যুগে মানবাধিকারের উক্ত ঘোষণাগত্র এই উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করেছিল যে, যখন সংবিধান প্রণয়ন করা হবে তখন এটা তার ভূমিকায় সংযোজন করা হবে এবং গোটা সংবিধানে এর ভাবধারা ও প্রাণসত্তাকে উজ্জীবিত রাখা হবে।
৪. মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের [USA] সংবিধানের দশটি সংশোধনীতে বৃটিশ গণতান্ত্রিক দর্শনের ওপর ভিত্তিশীল মানবাধিকারের প্রায় সবগুলো ধারাই গ্রহণ করা হয়েছে।
৫. যুক্তরাষ্ট্রের স্টেটগুলো ১৯৪৮ সালে বেগোটা সম্মেলনে ‘মানুষের অধিকারও কর্তব্য’ সম্পর্কিত যে ঘোষণাপত্র অনুমোদন করে তাও যথেষ্ট গুরুত্বের অধিকারী।
৬. জাতিসংঘ [UNO] গণতান্ত্রিক দর্শনের অধীনে অর্যায়ক্রমে অনেকগুলো ইতিবাচক ও সংরক্ষণমূলক অধিকার সম্পর্কে প্রস্তাব পাশ করে। পরিশেষে তা “মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র” নামে সাধারণ্যে প্রকাশিত হয়।
১৯৪৬ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ একটি প্রস্তাব পাশ করে। এতে গণহত্যা বা অন্য যে কোনো উপায়ে জাতি বা সম্প্রদায়ের বিনাশ সাধনের [Genocide] চেষ্টাকে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে চরম অপরাধ বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
পুনরায় ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাসে গণহত্যার প্রতিরোধ এবং শাস্তি প্রদানের জন্য একটি প্রস্তাব পাশ করা হয় এবং ১৯৫১ সালের ১২ জানয়ারী তা কর্যকর হয়। তাতে গণহত্যার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছেঃ কোনো জাতি, সম্প্রদায়, ধর্মীয় সম্প্রদয় অথবা এর কোনো একটি অংশকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য নিন্মে উল্লেখিত যে কোনো পন্থা অবলম্বন করাঃ
ক. এই ধরনের কোনো সম্প্রদায়ের লোকদের হত্যা করা।
খ. তাদেরকে কঠোর দৈহিক অথবা মানসিক শাস্তি দেয়া।
গ. উদ্দেশ্যমূরকভাবে এ ধরনের কোনো সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রায় এমন পরিস্থিতি চাপিয়ে দেয়া যা তাদের দৈহিক অস্তিত্বের জন্য সম্পূর্ণরূপে অথবা আংশিকভাবে ধ্বংসকর হবে।
ঘ. এই সম্প্রদায়ের সংশধারা রোধ করার জন্য স্বৈরাচারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
ঙ. জবরদস্তীমূলকভাবে এই সম্প্রদায়ের সন্তানদের অন্য কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে স্থানান্তর করা।
১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর যে “মানবাধিকারের মহাসনদ” পাশ করা হয় তার ভূমিকায় অন্যান্য সংকল্পের সাথে মোটামুভাবে এও প্রকাশ করা হয় যে, “মৌলিক মানবধিকারের ক্ষেত্রে মানবজাতির মান সম্মান ও গুরুত্বের ক্ষেত্রে পুরুষ এবং নারীদের সমঅধিকারের ধর্মীয় বিশ্বাসকে শক্তিশালী করার জন্য।”
অনন্তর উক্ত ভূমিকায় জাতিসংঘের উদ্দেশ্যসমূহের মধ্যে একটি উদ্দেশ্য এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, “মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য এবং জাতি, ধর্ম, ভাষা, বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতিকে মৌলিক স্বাধিকার প্রদানের কাজে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা লাভ।”
অনুরূপভাবে উক্ত সনদের ৫৫ ধারায় জাতিসংঘের এই ঘোষণাপত্র বলছেঃ “জাতিসংঘ পরিষদ মানবধিকার এবং সবার জন্য মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি বিশ্বব্যাপী সম্মান এবং সংরক্ষণে ব্যাপকতা আনয়ন করে।”
এই ঘোষণাপত্রের কোনো একটি অংশ নিয়েও কোনো দেশের প্রতিনিধিই দ্বিমত পোষণ করেননি। দ্বিমত পোষণ না করার কারণ ছিলো এই যে, এটা ছিলো সাধারণ মূলনীতিসমূহের ঘোষণা এবং প্রকাশ মাত্র। কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতা কারো ওপর আরোপ করা হয়নি। এটা এমন কোনো চুক্তি নয় যার ভিত্তিতে স্বাক্ষর দানকারী রাষ্ট্রগুলো এর আনুগত্য করতে বাধ্য হয় এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদের ওপর আইনগত বাধ্যবাধকাত আরোপ হতে পারে। তাতে পরিষ্কার বলে দেয়া হয়েছে, এটা একটা মানদন্ড যে পর্যন্ত পৌছার চেষ্টা করা উচিত। তাতে উপরন্তু কোনো কোনো দেশ এর সপক্ষে অথবা বিপক্ষে ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে।
এখন দেখুন এই ঘোষণাপত্রের ছত্রছায়ায় সারা দুনিয়াব্যাপী মানবতার একেবারে প্রাথমিক অধিকারসমূহের নির্বেচার হত্যা চলছে। স্বয়ং সভ্যতার চরম শিখরে উন্নিত হওয়ার দাবীদার এবং দুনিয়ার নেতৃত্বদানকারী দেশগুলোর অভ্যন্তরে মানবাধিকারের নির্বিচার গণহত্যা চলছে।
অথচ তারাই এ সনদ পাশ করিয়েছিলেন।
এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে একথা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, [এক] পশ্চিমা জগতের কাছে মানবাধিকার ধারণা সংক্রান্ত দুই তিন শতাদ্বী পূর্বের কোনো ইতিহাস নেই। [দুই] আজ যদিও এসব অধিাকরের উল্লেখ করা হচ্ছে, কিন্তু তার পিছনে কোনো সনদ [Sanction] এবং কোনো কার্যকরকারী শক্তি [Authority] নেই। বরং এটা শুধু চিত্তাকর্ষক অভিলাষ মাত্র। এর বিপরীতে ইসলাম কুরআন মজীদে মানবাধিকারের যে ঘোষণাপত্র দিয়েছে এবং যার সংক্ষিপ্তসার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জ্বের মাহাসম্মেলনে ঘোষণা করেছেন তা উল্লেখিত সনদগুলোর তুলনায় অধিক প্রাচিন একান্তই বাধ্য। তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও খোলাফায়ে রাশেদীন বাস্তবে তা কার্যকর করে অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ইসলাম মানুষকে যেসব অধিকার দান করেছে এখন আমি তা সংক্ষেপে আলোচনা করবো।
১. জীবনের মর্যাদা এবং বাঁচার অধিকার
কুরআন মজীদে দুনিয়ার সর্বপ্রথম হত্যাকান্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটা ছিলো মানবজাতির ইতিহাসের সর্বপ্রথম দুর্ঘটনা এতে এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির জীবন সংহার করেছে। এ সময় প্রথম বারের মতো মানুষকে তাদের জীবনের প্রতি মর্যাদাবোধের শিক্ষা দেয়ার এবং প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার সম্পর্কে তাদের সচেতন করে তোলার প্রয়োজন দেখা দিলো। কুরআন এই ঘটনার উল্লেখ করার পর বলা হয়েছেঃ
“যে ব্যক্তি হত্যার অপরাধ কিংবা বিশ্বে বিপর্যয় সৃষ্টির অপরাধ ছাড়া অপর ব্যক্তিকে হত্যা করলো, সে যেনো গোটা মানব জাতিকে হত্যা করলো। আর যে ব্যক্তি তাকে বাঁচিয়ে রাখালো সে যোনো গোটা মানব জাতিকে বাঁচিয়ে রাখলো।” [সূরা ময়েদাঃ ৩২]
কুরআন মজীদ উল্লেখিত আয়াতে একটি মাত্র মানুষেকে হত্যা করার অপরাধকে গোটা মানব জগতকে হত্যা করার সমতুল্য অপরাধ গণ্য করেছে এবং এর বিপরীতে একজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখাকে গোটা মানব জাতিকে বাঁচিয়ে রাখার সমান গণ্য করেছে। ‘আহ্ইয়া’ শব্দের অর্থ হচ্ছে জীবিত করা। অন্য কথায় বলা যায় যে, ব্যক্তি মানুষের জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করলো সে তাকে জীবন্ত করার কাজ করলো। এই প্রচেষ্টাকে সমগ্র মানব জাতিকে বাঁচিয়ে রাখার সমতুল্য সৎকাজ কলে গণ্য করা হয়েছে। এই মূলনীতি থেকে দু’টি বিষয়কে ব্যতিক্রম করা হয়েছেঃ
এক. যদি কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে হত্যা করে তাহলে তাকে কিসাসের আওতায় মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে।
দুই. কোনো ব্যাক্তি পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করলে তকেও মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে। এসব অবস্থা ছাড়া মানুষের জীবনকে ধ্বংস করা যেতে পারেনা।
মানুষের জীবনের নিরাপত্তার এই নীতিমালা মানবেতিহাসের সূচনা লগ্নেই আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন। মানব জতি সম্পর্কে এ ধারণা করা সম্পূর্ণ ভুল যে অন্ধকারের মধ্যেই তার যাত্রা শুরু হয়েছে এবং নিজের সমজাতীয় প্রাণীদের হত্যা করতে করতে কোনো এক পর্যায়ে সে চিন্তা করলো মানুষ খুন উচিত নয়। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং আল্লাহ্ তায়ালা সম্পর্কে সংশয়ের ওপর ভিত্তিশীল। কুরআন আমাদের বলছে, আল্লাহ্ তায়ালা মানব জাতির গোড়াপত্তন থেকেই তাদের পথপ্রদর্শন করে আসছেন। তিনি মানুষকে মানুষের অধিকারের সাথেও যে পরিচয় করিয়েছেন, তাও এই পথপ্রদর্শনের মধ্যে শামিল রয়েছে।
২. অক্ষম ও দুর্বলদের নিরাপত্তা
দ্বিতীয় যে কথা কুরআন থেকে জানা যায় এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে তা হচ্ছে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, আহত এবং রুগ্নদের ওপর কোনো অবস্থাতেই হাত উঠানো বৈধ নয়। চাই সে নিজের জাতির হোক অথবা শত্রু পক্ষের। তবে এদের মধ্যে যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে তাদের কথা স্বতন্ত্র। অন্যথায় তাদের ওপর অন্য কোনো অবস্থায় হাত তোলা নিষেধ। এই মূলনীতি কেবল নিজের জাতির জন্যই নিদিষ্ট নয়, বরং সমগ্র মানব জতির সাথেই এই নীতি অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে ব্যাপক পথনির্দেশ দান করেছেন। খোলাফায়ে রাশেদীনের অবস্থা ছিলো এই যে, তাঁরা যখন শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযান সেনাবাহিনী পাঠাতেন তখন তাঁরা গোটা বাহিনীকে পরিষ্কারভাবে বলে দিতেনঃ শত্রুদের ওপর আক্রমণকালীন অবস্থায় কোনো নারী, শিশু, বৃদ্ধ, আহত এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের ওপর হাত তোলা যাবেনা।
৩. মাহিলাদের মান সম্ভ্রমের হিফাযত
কুরআন থেকে আমরা আরো একটি মূলনীতি জানতে পারি এবং হাদীসেও তা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ রয়েছে। তা হচ্ছঃ যে কোনো অবস্থায় নারীদের সতীত্ব, পরিত্রতা ও মান সম্ভ্রমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া অত্যাবশ্যক। অর্থাৎ যুদ্ধের মাঠে যদি শত্রু পক্ষের কোনো নারী সামনে এসে যায় তাহলে কোনো মুসলিম সৈনিকের জন্য তাকে স্পর্শ জায়েয নয়। কুরআনের দৃষ্টিতে যেনা ব্যভিচার সাধারণত হারাম তা যে কোনো মাহিলার সাথেই করা হোক, চাই সে নারী মুসলমান হোক অথবা অমুসলিম, নিজ সম্প্রদায়ের হোক
অথবা ভিন্ন সম্প্রদায়ের, মিত্র রাষ্ট্রের হোক অথবা শত্রু রাষ্ট্রের।
৪.অর্থনৈতিক নিরাপত্ত
একটি মৌলনীতে হচ্ছে এই যে, ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে যে কোনো অবস্থায় খাদ্য দান করতে হবে। উলংগ ব্যক্তিকে যে কোনো অবস্থায় বস্ত্র দিতে হবে। অসুস্থ ব্যক্তির জন্য যে কোনো অবস্থায় চিকিৎসার সুযোগ করে দিতে হবে, চাই তারা শত্রু হোক অথবা বন্ধু। এটা চিরন্তন [Universall] অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। দুশমনদের সাথেও আমরা এই ব্যবহার করবো। শত্রু পক্ষের কোনো ব্যক্তি যদি আমাদের কাছে চলে আসে, তাহলে তাকে ক্ষুধার্ত, উলংগ না রাখা আমাদের জন্য ফরয। যদি সে আহত অথবা রুগ্ন হয় তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য।
৫. সুবিচার
কুরআন করীমের স্থায়ী নীতি হলো, মানুষের সাথে আদল ও সুবিচার করতে হবে। মহান আল্লাহ্ বলেনঃ
“কোনো বিশেষ দলের শত্রুতা তোমাদের যেনো এতোটা উত্তেজিত না করে [যার ফলে] তোমরা সুবিচার ত্যাগ করে ফেলবে। ন্যায়বিচার করো। বস্তুত খোদাভীতির সাথে এর গভীর নৈকট্য ও সামঞ্জস্য রয়েছে।” [সূরা মায়েদাঃ ৮]
এ আয়াতে ইসলাম এই নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, মানুষকে ব্যক্তি, সমাজ, জাতি নির্বিশেষে সবার সাথে যে কোনো অবস্থায় সুবিচার করতে হবে। আমরা বন্ধুদের সাথে সুবিচার করাবো আর শত্রুদের ক্ষেত্রে এই নীতি বিসর্জন দেবো ইসলামে তা চূড়ান্তভাবেই নিষিদ্ধ।
৬. সৎ কজে সহযোগিতা অসৎ কাজে অসহযোগিতা
কুরআন মজীদের নির্ধারিত আরেকটি মূলনীতি হচ্চেঃ সৎ কাজে এবং অধিকার পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে প্রত্যেকের সাথে সহযোগিতা করতে হবে আর খারাপ কাজ ও যুলুমের ক্ষেত্রে কারোরই সহযোগিতা করা যাবেনা। নিজের ভাইও যদি খারাপ কাজ করে তবে আমরা তার সহযোগিতা করবোনা। আর ভালো কাজ যদি দুশমনরাও করে তাহলে তাদের প্রতি সহযোগিতা হাত বাড়িয়ে দেবো। মহান আল্লাহ্ বলেনঃ
“ন্যায় ও খোদাভীতিমূলক কাজে সবাইর সহযোগিতা করো এবং যা সীসালংঘনমূলক ও গুনাহের কাজ তাতে করো সহযোগিতা করোনা।” [সূরা মায়েদাঃ২]
এ আয়াতে সৎ, ন্যায় ও ভালো কাজ বুঝাবার জন্যে ‘বির’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ‘বির’ শব্দের অর্থ কেবল সৎকাজই নয় বরং আরবী ভাষার এ শব্দ ‘অধিকার পৌঁছে দেয়ার’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ অন্যের প্রাপ্য অধিকার প্রদান, তাকওয়া ও খোদাভীতির কাজে আমরা প্রত্যেকেরই সহযোগিতা করবো। এটা কুরআনের স্থায়ী মূলনীতি।
৭. সমতার অধিকার
আরো একটি মূলনীতি যা কুরআন মজীদ জোরেসোরে বর্ণনা করেছে। তা হচ্ছে সব মানুষ সমান। যদি কারো প্রধান্য থেকে তাহলে এটা নির্ধারিত হবে চরিত্র ও নৈতিকতার মাপকাঠিতে। এ ব্যাপারে কুরআনের ঘোষণা হচ্ছেঃ
“হে মানুষ! আমরা তোমাদের একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও গোত্রে এজন্য বিভক্ত করেছি যেনো তোমরা পরস্পরকে কাছে সর্বাধিক সম্মনিত।”[সূরা হুজরতঃ ১৩]
এ আয়াতে প্রথম কথা বলা হয়েছে, গোটা মানব জাতি একই মূল থেকে উৎসারিত। বংশ, বর্ণ, ভাষা ইত্যাদির পার্থক্য মানব জাতিকে বিভক্ত করার জন্য মূলত কোনো যুক্তিযুক্ত কারণই নয়।
দ্বিতীয় কথা বলা হয়েছে, আমরা এই জাতিগত বন্টন পরিচয় লাভের জন্য করেছি। অন্য কথায় এক গোষ্ঠী, এক গোত্রের এবং এক জাতির লোকদের অন্যদের ওপর এমন কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই যে তারা নিজেদের অধিাকারের তালিকা দীর্ঘায়িত করবে এবং অন্যদের তালিকা সংকুচিত করবে। আল্লাহ্ তায়ালা এই যে পার্থক্য করেছেন, পরস্পরের দৈহিক কাঠামো ভিন্ন ভিন্ন বানিয়েছেন, ভাষায় প্রার্থক্য রেখেছেন, এসব কিছু গৌরব ও অহংকারের জন্য নয় বরং পারস্পরিক স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করার জন্যই তা করেছেন। যদি সমস্ত মানুষ একই রকম হতো তাহলে পার্থাক্য করা যেতো না। এদিক থেকে এই বিভক্তি প্রকৃতিগত, কিন্তু অন্যদের অধিকার আত্মসাত করা এবং অনর্থক স্বাতন্ত্র্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। সম্মান ও গৌরবের ভিত্তি নৈতিক অবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই কথাটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ভিন্ন পন্থায় বর্ণনা করেছেন।
“কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং কোনো আরবের ওপরও কোনো অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কিন্তু তাকওয়ার ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব হতে পারে। বংশের ভিত্তিতেও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।
অর্থাৎ দীনদারী, সততা ও তাকওয়ার ভিত্তিতেই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণিত হয়। এমন তো নয় যে, কোনো ব্যক্তিকে রূপা দিয়ে, কোনো ব্যক্তিকে পাথর দিয়ে আর কোনো ব্যক্তিকে মাটি দিয়ে তৈরী করা হয়েছে, বরং সমস্ত মানুষ এক।১.[১ ফেরউনী ব্যাবস্থাকে কুরআন মজীদ যেসব কারণে বাতিল সাব্যস্ত করেছে তার একটি এই যেঃ “নিশ্চয়ই ফেরাউন যমীনের বুকে দুর্বিনীত হয়ে পড়েছিলো এবং দেশের জনগণকে দলে উপদেলে বিভক্ত করে দিয়েছিল। তাদের একদলকে (বনী ইসলাঈল) সে এতাটা দুর্বল করে দিয়েছিল যে ….।” (সূরা কাসাসঃ ৪)
অর্থাৎ ইসলাম এই নীতির পোষাকতা করেনা যে, কোন সামাজে মানুষকে উচ্চ শ্রেণী এবং নিন্ম শ্রেণী অথবা শাসক ও শাসিত শ্রেণীতে বিভক্ত করে রাখা হবে।]
৮. পাপাচার থেকে বাঁচার অধিকার
আরেকটি মূলনীতে হচ্ছে, কোনো ব্যাক্তিকে পাপের কাজ করার নির্দেশ দেয়া যাবেনা এবং কোনো ব্যক্তিকে যদি খারাপ কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয় তাহলে এই নির্দেশ পালন করা তার জন্য বাধ্যতামূলকও নয় এবং বৈধও নয়। যদি কোনো অফিসার তার অধীনস্থ কর্মচারীকে নাজায়েয কাজ করার নির্দেশ দেয়, অথবা কারো ওপর হাত তোলার নির্দেশ দেয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী অধীনস্থ কর্মচারীর জন্য তার ঊর্ধতন কর্মকর্তার নির্দেশ পালন করা বা তার আনুগত্য করা মোটেই জায়েয নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, স্রষ্টা যেসব জিনিসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং অপরাধ বলে সাব্যস্ত করেছেন সুগুলো করার জন্য কেউ কাউকে নির্দেশ দেয়ার অধিকার রাখেনা। কোনো নির্দেশদাতার জন্যও এরূপ কাজের নির্দেশ দেয়া বৈধ নয় এবং এ ধরনের নির্দেশ পালন করাও কারো পক্ষে বৈধ নয়।
৯.যালিমের অনুগত্য করতে অস্বীকার করার অধিকার
ইসলামের একটি মহান নীতি হলো, কোনো যালিমের আনুগত্য দাবী করার অধিকার নেই। কুরআনে করীমে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ তায়ালা ইবরাহীম আলাইহিস্ সালামকে নেতৃত্বেরপদে নিয়োগ করে বললেনঃ “ আমি তোমাকে মানুষের নেতা নিযুক্ত করেছি।” তখন হযরত ইবরাহীম আলাইহিস্ সালাম আল্লাহ্র কাছে আরয করলেন, “আমার বংশধরদের জন্যও কি এই ওয়াদা?” আল্লাহ্ তায়ালা জবাবে বললেনঃ “যালিমদের ক্ষেত্রে আমার এ ধরনের ওয়াদা নেই।”২. [২ সূরা বাকারাঃ ১১৪] ইংরেজী ভাষায় Letter of Appointment- এর যে অর্থ এখানে ‘আহদুন’ শব্দটি সেই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলায় এর অর্থ নিয়োগপত্র। এ আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, ‘যালিমদের এরূপ কোনো নিয়োগপত্র দেয়া হয়নি যার ভিত্তিতে সে অন্যদের আনুগত্য দাবী করতে পারে। ৩. [৩ আরো ব্যাখ্যার জন্য এই আয়াতগুলো সামনে রাখুন। অর্থাৎ
ক. “যারা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে সেই লাগামহীন লোকদের আনুগত্য করোনা।” (সূরা শুয়ারাঃ ১৫১) খ. “যে ব্যক্তির দিলকে আমার স্মরণশূন্য করে দিয়েছি তার আনুগত্য করোনা।” (সূরা কাহ্ফঃ ২৮) গ. তাগুতের বন্দেগী থেকে দূরে থাক।” (সূরা নাহলঃ ৩৬) ঘ. “এবং সেই আদ জাতি যারা তাদের প্রতিপালকের নির্দেশ প্রত্যাখান করেছিল, তাঁর রসূলদের আগ্রহ্য করেছিল এবং তারা প্রত্যেকে অবাধ্য স্বৈরাচারীর নির্দেশের অনুসরণ করেছিল।” (সূরা হূদঃ ৫৯)
ইমাম আবু হানীফা (রাঃ) বলেন, কোনো যলিম ব্যক্তির মুসলমানদের নেতা হওয়ার অধিকার নেই। যদি এরূপ ব্যক্তি নেতা হয়ে যায় তাহলে তার আনুগত্য বাধ্যতামূলক নয়। তাকে শুধু সহ্য করা যেতে পারে মাত্র।৪.[৪ এ পর্যায়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্যে গ্রন্থকারের খিলাফত ও রাজতন্ত্র গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।
১০. রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অধিকার
মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহের মধ্যে একটি বড় অধিাকর ইসলাম এই নির্দিষ্ট করেছে যে, সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি জাতীয় সরকারের অংশীদার। সবার পরামর্শক্রমে সরকার গঠন হতে হবে। কুরআনে বলা হয়েছেঃ
“আল্লাহ্ তায়ালা তাদের (অর্থাৎ ঈমানদারদের) পৃথিবীল বুকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করবেন।” [সূরা নূরঃ ৫৫]
এখানে বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, আমরা কতিপয় লোককে নয় বরং গোটা জাতিকে খিলাফত দান করবো। রাষ্ট্র কোনো এক ব্যক্তির বা এক বংশের বা এক শ্রেণীর নয়, বরং গোটা জাতির এবং সমগ্র জনগণের পরামর্শ অনুযায়ী সরকার গঠিত হবে।
কুরআনে বলা হয়েছেঃ
“এই রাষ্ট্র পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে চলবে।” [সূরা শূ’রাঃ ৩৮]
এ ব্যাপারে হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর পরিষ্কার বক্তব্য মওজূদ রয়েছেঃ “মুসলমানদের সাথে পরামর্শকরা ব্যতিবেকে তাদের শাসন করার অধিকার কারো নেই। তারা যদি সম্মত হয় তাহলে তাদের ওপর শাসন পরিচালনা করা যাবে। আর যদি রাযী না হয় তাহলে তা করা যাবেনা। এই নির্দেশের আলোকে ইসলাম একটি ‘গণতান্ত্রিক সংসদীয় সরকারী ব্যবস্থার নীতি’ নির্ধারণ করে। এটা ভিন্ন ব্যাপার যে, আমাদের দুর্ভাগ্যের কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী আমাদের ওপর রাজতন্ত্র চেপে রয়েছিল। ইসলাম আমাদের এ ধরনের রাজতন্ত্রের অনুমতি দেয়নি। বরং এটা ছিলো আমাদের আহাম্মকির ফল।
১১. ব্যক্তি স্বাধীনতার সংরক্ষণ
ইসলামের একটি মূলনীতি এই যে, সুবিচার ব্যতিরেকে কারো ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করা যাবেনা। হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন “ইসলামের নীতি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া গ্রেফতার করা যাবেনা।” এর পরিপ্রেক্ষিরত আদ্ল ও ইনসাফের সেই দর্শনই কায়েম হয়, যাকে আধুনিক পরিভাষায় Judicial process of law [বিচার বিভাগীয় কার্যপ্রণালী] বলা হয়। অর্থাৎ কারো ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করতে হলে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন, প্রকাশ্য আদালতের তার বিচরকার্য পরিচালনা এবং তাকে আত্মপক্ষ সমর্থন করার পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। এছাড়া কোনো কার্যক্রমের ওপর সুবিচারের বৈশিষ্ট্য আরোপ করা যায়না। এতো সাধারণ জ্ঞানের ব্যাপার যে, অপরাধীকে আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ না দিয়ে বন্দী করে রাখা ইসলাম অনুমোদন করেনি। ইসলামী রাষ্ট্র, সরকার এবং বিচার বিবাগের জন্য ইনসাফের দাবী পূর্ণ করা কুরআন অত্যাবশ্যকীয় করে দিয়েছে।
১২. ব্যক্তি মালিকানা সংরক্ষণ
ইসলাম ব্যক্তি মালিকানার স্বীকৃতি দেয়। কুরআন আমাদের সামনে ব্যক্তি মালিকানার চিত্র তুলে ধরেছে। মহান আল্লাহ্ বলেনঃ
“তোমরা বাতিল পন্থায় একে অপরের সম্পদ আত্মসাৎ করোনা।” [সূরা বাকারাঃ ১৮৮]
কুরআন, হাদীস এবং ফিক্হ অধ্যয়নে জানা যায়, অপরের সম্পদ ভোগ করার কোন্ কোন্ পন্থা ভ্রান্ত। ইসলাম এসব পন্থা অম্পষ্ট রাখেনি। এই মূলনীতির আলোকে কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে অবৈধ পন্থায় মাল হস্তগত করা যাবেনা। কোনো ব্যক্তি বা সরকারের এ অধিকার নেই যে, সে আইন ভঙ্গ করে এবং ইসলামী শরীয়ত কর্তৃক সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত পন্থাসমূহ ব্যতিরেকে কারো মালিকানার ওপর হস্তক্ষেপ করবে।
১৩. মানসম্ভ্রমের হিফাযত
মান সম্মান ও ইজ্জত আব্রুর হিফাযাত করার মৌলিক অধিকার প্রতিটি মানুসের রয়েছে। সূরা হুজুরাতে এই অধিকারের বিস্তারিত বর্ণনা মওজূদ রয়েছে। যেমন বলা হয়েছেঃ
“তোমাদের কেউ অপরকে ঠাট্রা বিদ্রূপ করবেনা।”
“তোমরা একে অপরকে নিকৃষ্ট উপাধিতে ডিকোনা।”
“একে অপরের দোষ চর্চ করোনা।” [আয়াতঃ ১১,১২]
অর্থাৎ মানুষের মান সম্মানের প্রতি আঘাত করার যতোগুলো পন্থা রয়েছে তা সবই নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। পরিষ্কর বলে দেয়া হয়েছে কোনো ব্যক্তি চাই উপস্থিত থাক বা না থাক, তাকে ঠাট্রা বিদ্রূপ করা যাবেনা, তাকে নিকৃষ্ট উপাধি দেয়া যাবেনা। তার ক্ষতি করা যাবেনা এবং তার দোষ চর্চ {গীবত} করা যাবেনা। প্রত্যক ব্যক্তির আইনগত অধিকার রয়েছে যে, কেউ তার ইজ্জতের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারবেনা। এবং হাতের দ্বারা অথবা যবানের দ্বারা তার ওপর কোনোরূপ বাড়াবাড়ি করতে পারবেনা।
১৪. গোপনীয়তা রক্ষা করার অধিকার
ইসলামের মৌলিক অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিটি লোক ব্যক্তিগত জীবনের গোপণীয়তা রক্ষা করার অধিকার রাখে। এ ব্যাপারে সূরা নূরে পরিষ্কার বলে দেয়া হয়েছেঃ
“নিজের ঘর ছাড়া অন্যদের ঘরে অনুমতি না নিয়ে প্রবেশ করোনা।” (আয়াতঃ ২৭)
সূরা হুজুরাতে বলা হয়েছেঃ
“গোয়েন্দাগিরি করোনা” [আয়াতঃ ২৭]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীঃ ‘অন্যের ঘরে উকি মারার অধিকার কোনো ব্যক্তির নেই।’ যে কোনো ব্যক্তির আইনগত অধিকার রয়েছে যে, সে তার নিজের ঘরে অপরের শোরগোল, উকিঝুকি এবং অনুপ্রবেশ থেকে নিরাপদ থাকবে। তার সংসারের শান্তি শৃংখলা ও পর্দাপুশিদা রক্ষা করার অধিকার তার রয়েছে। এমনকি কোনো ব্যক্তির চিঠিপত্রের ওপরও
অন্য ব্যক্তিগত দৃষ্টি নিক্ষেপ করার অধিকার নেই, পড়া তো দূরের কথা। ইসলাম মনুষের ব্যক্তিগত গোপণীয়াতার পূর্ণ হিফাযত করে এবং পরিষ্কারভাবে নিষেধ করে দেয় যে, অন্যের ঘরের মধ্যে উকিঝুকিমারা যাবেনা। কারো ডাক বা চিঠিপত্র দেখা যাবেনা। কিন্তু কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে যদি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানা যায় যে, সে ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িত আছে তাহলে স্বতন্ত্র কথা। অন্যথায় কারো পিছনে অযথা গিায়েন্দাগিরে করা ইসলামী জায়েয নেই।
১৫. যুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার
ইসলাম প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের মধ্যে একটি হলো, যে কোনো ব্যক্তি যুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অধিকার রাখে। মহান আল্লাহ্ বলেনঃ
“মানুষ খারাপ কথা বলুক তা আল্লাহ পছন্দ করেননা। তবে কারো প্রতি যুলুম করা হয়ে থাকলে ভিন্ন কথা।” [সূরা নিসাঃ ১৪৮]
অর্থাৎ যালিমের বিরুদ্ধে মযলুমের সোচ্চার হওয়ার অধিকার রয়েছে।
১৬. মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা
আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাকে বর্তমান যুগে মত প্রকোশের স্বাধীনতা
[Freedom of Expression] বলা হয়, কুরআন তা অন্য পরিভাষায় বর্ণনা করে। কিন্তু দেখুন, তুলনামূলকভাবে কুরআনের দর্শন কতো উন্নত। কুরআনের বাণী হচ্ছে “সত্য ও ন্যায়ের প্রতষ্ঠা” এবং “অন্যায় ও অসত্যের প্রতরোধ” করা কেবল মানুষের অধিকারই নয় বরং অবশ্য পালনীয় কর্তব্য।
“তোমরাই হচ্ছো সর্বোত্তম উম্মহ্ যাদেরকে মানুষের কল্যাণ সাধনের জন্য কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত করা হয়েছে। তোমরা ন্যায় কাজের নির্দেশ দাও, অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে লোকদের বিরত রাখো।” [সূরা আলে ইমরানঃ১১০]
কুরআনের দৃষ্টিকোণ থেকেও এবং হদীসের বলবে এবং মুতাবিকও মানুষের কর্তব্য হচ্ছে সে লোকদের ভালো কাজ করার কথা বলেবে এবং খারাপ কাজ থেকে তাদের প্রতিরোদ করবে। যদি কোনো খারাপ কাজ সংঘটিত হয় তাহলে এর বিরুদ্ধে শ্লোগান তুলেই দায়িত্ব শেষ হয়না। বরং এর সূলোৎপাটনের চিন্তা ভাবনা না করা হয় তাহলে উল্ট গুনাহ হবে। ইসলামী সমাজকে পাক পরিত্র রাখা মুসলমানদের উপর ফরয। এ ক্ষেত্রে যদি মুসলমানদের কন্ঠরোধ করা হয়, তাহলে এর চেয়ে বড় আর যুলুম হতে পারেনা। যদি কেউ ভালো কাজের প্রতিরোধ করে তাহলে সে কেবল একটি মৌলিক অধিকারই হরণ করেনি বরং একটি ফরয আদায় করতে বাধা দিচ্ছে। সমাজের স্বাস্থ্য অটুট রাখতে হলে মানুষের সব সময় এ অধিকার থাকতে হবে। কুরআন মজীদ বনী ইসলাঈল জাতির অধপতনের কারণসমূহ বর্ণনা করেছে। তার মধ্যে একটি কারণ এই বর্ণনা করা হয়েছেঃ
“তারা একে অপরকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখতোনা।” [সূরা মায়েদাঃ৭৯]
অর্থাৎ যদি কোনো জাতির মধ্যে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়ে যায় যে, তাদের মধ্যে দুষ্কৃতির বিরুদ্ধে আওয়ায তোলার মতো কোনো লোক নেই তাহলে শেষ পর্যন্ত গোটা জাতির মধ্যে ক্রমান্বয়ে দুষ্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে। পরিশেষে তা একটি শূন্য ঝুড়ির মতো হয়ে যায় যা তুলে ডাষ্টবিনে নিক্ষেপ করা হয়। এই রকম জাতি আল্লাহ্র গযবে নিপতিত হওয়ার আর কোনো ঘাটতিই অবশিষ্ট থাকেনা।
১৭. বিবেক ও আকীদা বিশ্বাসের স্বাধীনতা
ইসলাম মানব জাতিকে “দীনের ব্যাপারে কোনো জোর জবরদস্তি নেই” [সূরা বাকারাঃ ২৫৬] এই সূলনীতি দান করেছে। এর অধীনে সে প্রতিটি মানুষকে কুফর অথবা ঈমান, এর যে কোনো একটি পথ অবলম্বন করার ইখতিয়ার দিয়েছে। ইসলাম যদি শক্তির প্রয়োগ থেকে থাকে তাহলে দু‘টি প্রয়োজনে। এক. ইসলামী ব্যবস্থা, সামাজিক শান্তি ও শৃংখলা বজায় রাখা এবং দুষ্কৃতি ও বিচ্ছিন্নতার মূলোৎপাটনের জন্য বিচার বিভাগীয় এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ।
লক্ষ্য ও আকীদা বিশ্বাসের স্বাধীনতাই ছিলো মূল্যবান অধিকার যা অর্জন করার জন্য মক্কার তের বছরের বিপদ সংকূল যুগে মুসলামানরা মার খেয়ে খেয়ে সত্যের কালেমা সমুন্নত করেছে। অবশেষে যেভাবে অর্জন করেছে, অনুরূপভাবে অন্যদের জন্যও এর পূর্ণ স্বীকৃতি দান করেছে। মুসলমানরা নিজেদের অমুসলিম প্রজাদের ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করছে, অথবা কোনো জাতিকে নির্যাতন করে কালেমা পড়তে বাধ্য করেছে ইসলামের ইতিহাসে এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই।
১৮. ধর্মীয় মানসিক নির্যাতন থেকে সংরক্ষণ
ইসলাম এটা কখনো সমর্থন করেনা যে, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় একে অপরের বিরুদ্ধে কটুবাক্য ব্যবাহার করেবে, একে অপরের ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ি করবে। কুরআন শিক্ষা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছেঃ
“এসব লোক আল্লাহ্কে বাদ দিয়ে যাদের মা’বূদ বানিয়ে ডাকে তোমরা তাদের গালাগালি করোনা।” [সূরা আনয়ামঃ১০৮]
অর্থাৎ বিভিন্ন ধর্ম ও আকীদা বিশ্বাসের ওপর যুক্তিপূর্ণ আলোচনা করা, যুক্তিরপন্থায় সমালোচনা করা অথবা মতভেদ ব্যক্ত করা তো বাক স্বাধীনতার অন্তুর্ভুক্ত। কিন্তু মনে কষ্ট দেয়ার জন্য অভদ্র ভাষায় কথা বলা মোটেও সমীচীন নয়।
১৯. সভা সংগঠন করার অধিকার
বাক স্বাধীনাতার দার্শনিক ফলশ্রুতিই সভা সমিতি করার অধিকারের সূত্রপাত হয়। মতবৈষম্যকে মানব জীবনের একটি বাস্তব সত্য হিসেবে কুরআন বারবার ঘোষণা করেছে। তাহলে মতভেদ সৃষ্টি হওয়াকে কিভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব? সব লোক একই মত পোষণ করে কিভাবে একত্রিত হতে পারে? একই মূলনীতি এবং দৃষ্টিভংগির অধিকারী একটি জাতির মধ্যেও বিভিন্ন মাযহাব [School of thoughts] হতে পারে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অবশ্য পরস্পরের কাছাকাছিই থাকবে। কুরআনের বাণীঃ
“তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক থাকতেই হবে যারা কল্যাণের দিকে ডাকবে, ভালো কাজের নির্দেশ দেবে এবং অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে।” [সূরা আলে ইমরানঃ ১০৪]
কর্মসয় জীবনে যখন ‘কল্যাণ’ ‘অন্যায়’ এর ব্যাপক ধারণার মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয় তখন জাতির মৌলিক অখন্ডতা অটুট রেখেও তার মধ্যে বিভিন্ন চৈন্তিক গোষ্ঠীর উদ্ভাব হয়ে থাকে। একথা কাংখিত মানের যতো নিচেই হোক দল উপদলের আত্মপ্রকাশ ঘটছেই। সুতরাং আমাদের এখানে কথাবার্তায়, ফিকহ্ ও আইন কানুন এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভংগির ক্ষেত্রেও মতবিরোধ হয়েছে এবং সাথে সাথে বিভিন্ন দল উপদল অস্তিত্ব লাভ করেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামী সংবিধান এবঙ মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রের দৃষ্টিতে বিভিন্ন দল উপদলগুলোর সভা সমিতি করার অধিকার আছে কি? এই প্রশ্ন সর্বপ্রথম হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর সামনে খারিজী সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশের পর উঠেছিল। তিনি তাদের সংগঠন ও সভা সমিতি করার অধিকার স্বীকার করে নেন। তিনি খারিজীদের বলেন, “তোমরা যতক্ষণ তরবারির সাহায্য নিজেদের মতবাদ অন্যের ওপর চাপাতে চেষ্টা না করবে তোমরা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে।”
২০. একের অপরাধের জন্য অন্যকে দায়ী করা যাবেনা।
ইসলামে যে কোনো ব্যক্তিকে কেবল নিজের কার্যকলাপ এবং নিজের অপরাধের জন্যই জবাবদিহি করতে হয়। অপরের কার্যকলাপ ও অপরাধের জন্য তাকে গ্রেফতার করা যায়না। কুরআন এই নীতি নির্ধারণ করেছে যেঃ
“কোনো ভার বহনকারীই অপর কারো ভার বহন করতে বাধ্য নয়।” [সূরা আনয়ামঃ১৬৪]
অপরাধ করবে দাড়িওয়ালা আর আত্মরক্ষার এ অধিকার রয়েছে যে, তদন্ত ও অনুসন্ধান ছাড়া তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া যাবেনা। এ ব্যাপারে কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে যে, কারো বিরুদ্ধে কিছু অবগত হলে তদন্ত করে নাও। এরূপ যেনো না হতে পারে যে, কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অজ্ঞাতসারে কোনো পদক্ষেপ নিয়ে বসো। কুরআনে বলা হয়েছেঃ
“ হে ঈমানদারগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমরাদের কাছে কোনো খবর নিয়ে এলে তার সত্যতা যাচাই করে নিও। এমন যেনো না হয় যে, তোমরা অজ্ঞাতসারে কোনো মানব গোষ্ঠীর ক্ষতি সাধন করে বসবে, আর নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।” [সূরা হুজুরাতঃ ৬]
উপরন্তু কুরআন এ হিদায়াতও দান করা হয়েছেঃ
“খুব বেশী খারাপ ধারণা পোষণ থেকে বিরত থাকো।” [সূরা হুজুরাতঃ ১২]
সংক্ষেপে এই হচ্ছে সেই সব মৌলিক অধিকার ইসলাম যা মানব জাতিকে দান করেছে। এর দর্শন সম্পুর্ণ পরিষ্কার এবং পরিপূর্ণ যা মানুষকে তার জীবনের সূচনাতেই বলে দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে বর্তমান সময়েও দুনিয়াতে মানবাধিকারের যে ঘোষণা [Declaration of Human Rights] প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তার না আছে কোনো প্রকারের স্বীকৃতি আর না আছে কার্যকর হওয়ার শক্তি। ব্যস একটি উন্নত মানদন্ড পেশ করা হয়েছে, কিন্তু এই মানদন্ড অনুযায়ী কাজ করতে কোনো জাতিই বাধ্য নয়। এটা এমন কোনো সর্বজন গ্রাহ্য চুক্তিপত্রও নয় যা সকল জাতির কাছ থেকে এসব অধিকার আদায় করে দিতে পারে। কিন্তু মুসলমানদের ব্যাপার সম্পূর্ণ ভিন্ন, তারা আল্লাহ্র কিতাব এবং তাঁর রসূলের হিদায়াতের আনুগত্যকারী আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূল মৌলিক অধিকারসমূহের পূর্ণাংগ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যে রাস্ট্রই ইসলামী রাষ্ট্র হতে চায় তাকে এ অধিকারগুলো অবশ্যই লোকদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। মুসলমানদের ও এ অধিকার দিতে হবে এবং অমুসলমানদেরও। এ ক্ষেত্রে এমন কোনো চুক্তিপত্রের প্রয়োজন নেই যে, অমুক জাতি আমাদের যদি এই অধিকার দেয়, তাহলে আমরাও তাদের দেব। বরং মুসলমানরা এ অধিকার দিতে বাধ্য শত্রুকেও মিত্রকেও।