জামায়াত অনলাইন লাইব্রেরি
  • নীড়
  • সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
  • বিভাগ ভিত্তিক
    • আল কুরআন
    • আল হাদিস
    • ফিকাহ
    • দাওয়াত ও তাবলিগ
    • ঈমান ও আক্বীদাহ
    • আমল-আখলাক ও মুয়ামালাত
    • ইসলাম ও ইবাদাত
    • পারিবারিক ও সামাজিক জীবন
    • ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন
    • সীরাত ও ইতিহাস
    • সীরাতে সাহাবা
    • নারী
    • রাজনীতি
    • অর্থনীতি
    • বিবিধ
  • কর্মী সিলেবাস
  • রুকন সিলেবাস
    • রুকন সিলেবাস (স্বল্প শিক্ষিত)
    • রুকন সিলেবাস (শিক্ষিত)
  • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (শিক্ষিত)
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (স্বল্প শিক্ষিত)
  • উচ্চতর অধ্যয়ন
  • অডিও বই
  • অন্যান্য
    • দারসুল কুরআন
    • দারসুল হাদিস
    • আলোচনা নোট
    • বইনোট
    • প্রবন্ধ
    • বুলেটিন
    • স্মারক
    • ম্যাগাজিন
    • এপস
    • রিপোর্ট বই
    • ছাত্রী সিলেবাস
কোন ফলাফল নেই
সকল ফলাফল দেখুন
  • নীড়
  • সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
  • বিভাগ ভিত্তিক
    • আল কুরআন
    • আল হাদিস
    • ফিকাহ
    • দাওয়াত ও তাবলিগ
    • ঈমান ও আক্বীদাহ
    • আমল-আখলাক ও মুয়ামালাত
    • ইসলাম ও ইবাদাত
    • পারিবারিক ও সামাজিক জীবন
    • ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন
    • সীরাত ও ইতিহাস
    • সীরাতে সাহাবা
    • নারী
    • রাজনীতি
    • অর্থনীতি
    • বিবিধ
  • কর্মী সিলেবাস
  • রুকন সিলেবাস
    • রুকন সিলেবাস (স্বল্প শিক্ষিত)
    • রুকন সিলেবাস (শিক্ষিত)
  • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (শিক্ষিত)
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (স্বল্প শিক্ষিত)
  • উচ্চতর অধ্যয়ন
  • অডিও বই
  • অন্যান্য
    • দারসুল কুরআন
    • দারসুল হাদিস
    • আলোচনা নোট
    • বইনোট
    • প্রবন্ধ
    • বুলেটিন
    • স্মারক
    • ম্যাগাজিন
    • এপস
    • রিপোর্ট বই
    • ছাত্রী সিলেবাস
জামায়াত অনলাইন লাইব্রেরি

হাদিসের নামে জালিয়াতী

অন্তর্গতঃ uncategorized
A A
Share on FacebookShare on Twitter

সূচীপত্র

  1. ভূমিকা
  2. প্রথম পর্ব
  3. ১.১. ওহী ও হাদীস
  4. ১.২. মিথ্যা ও ওহীর নামে মিথ্যা
  5. ১.৩. মিথ্যা প্রতিরোধে সাহাবীগণ
  6. ১.৪. জালিয়াতি প্রতিরোধে মুসলিম উম্মাহ
  7. ১.৫. মিথ্যার কারণ ও মিথ্যাবাদীদের প্রকারভেদ
  8. ১.৬. মিথ্যার প্রকারভেদ
  9. ১.৭. মিথ্যার পরিচয় ও চিহ্নিতকরণ
  10. ১.৮. মিথ্যা হাদীস বিষয়ক কিছু বিভ্রান্তি
  11. দ্বিতীয় পর্বঃ
  12. ২.১. অশুদ্ধ হাদীসের বিষয়ভিত্তিক মূলনীতি
  13. ২.২. মহান স্রষ্টা কেন্দ্রিক জাল হাদীস
  14. ২.৩. পূর্ববর্তী সৃষ্টি ও নবীগণ ও তাফসীর বিষয়ক
  15. ২.৪. রাসূলুল্লাহ(সা) সম্পর্কে
  16. ২.৫. আহলু বাইত, সাহাবী ও উম্মাত সম্পর্কে
  17. ২.৬. তাবেয়ীগণ বিষয়ক
  18. ২.৭. আউলিয়া কেরাম ও বেলায়াত বিষয়ক
  19. ২.৮. ইলম ও আলিমদের ফযীলত বিষয়ক
  20. ২.৯ ঈমান বিষয়ক
  21. ২.১০ সালাত বিষয়ক
  22. ২.১১. বার চাঁদের সালাত ও ফযীলত বিষয়ক
  23. ২.১২. মৃত্যু, জানাযা ইত্যাদি বিষয়ক
  24. ২.১৩. যাকাত, সিয়াম ও হজ্জ বিষয়ক
  25. ২.১৪. যিকর, দোয়া, দুরূদ, সালাম ইত্যাদি
  26. ২.১৫. শুভ, অশুভ, উন্নতি, অবনতি বিষয়ক
  27. ২.১৬. পোশাক ও সাজগোজ বিষয়ক
  28. ২.১৭. পানাহার বিষয়ক
  29. ২.১৮. বিবাহ, পরিবার, সমাজ ইত্যাদি বিষয়ক
  30. ২.১৯. ভাষা, পেশা ইত্যাদি বিষয়ক

১.২. মিথ্যা ও ওহীর নামে মিথ্যা

১.২.১. মিথ্যার সংজ্ঞা
প্রসিদ্ধ ও পরিজ্ঞাত বিষয় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। মিথ্যার সংজ্ঞা কি? সত্যের বিপরীতই মিথ্যা। যা সত্য নয় তাই মিথ্যা। এমন কিছু বলা, যা প্রকৃতপক্ষে ঠিক নয় বা সত্য নয় তাই মিথ্যা।
১.২.১.১. ইচ্ছাকৃত বনাম অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা
বিষয়টি স্পষ্ট। তবে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত মিথ্যার বিষয়ে মুসলিম আলিমদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের আলেমগণ মনে করতেন যে, ভুল বশত যদি কেউ কিছু বলেন যা প্রকৃত অবস্থার বিপরীত তবে তা শরীয়তের পরিভাষায় মিথ্যা বলে গণ্য হবেনা। শুধুমাত্র জেনেশুনে মিথ্যা বললেই তা মিথ্যা বলে গণ্য হবে। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আলিমগণ এই ধারণার প্রতিবাদ করেছেন। তাঁদের মতে না জেনে বা ভুলে মিথ্যা বললেও তা শরীয়তের পরিভাষায় মিথ্যা বলে গণ্য হবে।
ইমাম আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনু শারাফ আন-নাবাবী(৬৭৬হি) বলেনঃ “হক্ক পন্থী আলেমদের মত হলো, ইচ্ছাকৃতভাবে, অনিচ্ছায়, ভুলে বা অজ্ঞতার কারণে প্রকৃত অবস্থার বিপরীত কোনো কথা বলাই মিথ্যা।” [নাবাবী, ইয়াহইয়া ইবনে শারাফ(৬৭৬ হি) শারহু সাহীহি মুসলিম ১/৯৪]
তিনি আরো বলেনঃ “আমাদের আহলুস সুন্নাহ-পন্থী আলিমগণের মতে মিথ্যা হলো প্রকৃত অবস্থার বিপরীত কোনো কথা বলা, তা ইচ্ছাকৃতভাবে হোক বা ভুলে হোক। মু্‘তাযিলাগণের মতে শুধু ইচ্ছাকৃত মিথ্যাই মিথ্যা বলে গণ্য হবে।” (নাবাবী, শারহু সাহীহি মুসলিম ১/৬৯)।
১.২.১.২. হাদীসের আলোকে অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা
হাদীসের ব্যবহার থেকে আমরা নিশ্চিত হই যে, ইচ্ছাকৃতভাবে, অনিচ্ছাকৃতভাবে, অজ্ঞতার কারণে বা যে কোনো কারণে বাস্তবের বিপরীত যে কোনো কথা বলাই মিথ্যা বলে গণ্য।
১. জাবির ইবনু আবদুল্লাহ(রা) বলেনঃ আরবী(******)
-হাতিব ইবনু আবী বালতা‘আ(রা) এর একজন দাস রাসূল(স) এর নিকট আগমন করে বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল!নিশ্চয় হাতিব জাহান্নামে প্রবেশ করবেন। তখন রাসূলুল্লাহ(স) বলেনঃ তুমি মিথ্যা বলেছ। সে জাহান্নামে প্রবেশ করবেনা; কারণ সে বদর ও হুদাইবিয়ায় উপস্থিত ছিল। (মুসলিম, আস সহীহ ৪/১৯৪২)।
এখানে রাসূলুল্লাহ(স) হাতিবের এই দাসের কথাকে মিথ্যা বলে গণ্য করেছেন। সে অতীতের কোনো বিষয়ে ইচ্ছাকৃত কোনো মিথ্যা বলেনি। মূলত সে ভবিষ্যতের বিষয়ে তার একটি ধারণা বলেছে। সে যা বিশ্বাস করেছে তাই বলেছে। তবে যেহেতু তার ভবিষ্যদ্বাণীটি বাস্তবের বিপরীত সেজন্য আল্লাহর রাসূল(স) তাকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন। এথেকে আমরা বুঝতে পারি যে, অতীত বা ভবিষ্যতের যে কোনো সংবাদ যদি বাস্তবের বিপরীত হয় তাহলে তা মিথ্যা বলে গণ্য হবে। সংবাদদাতার ইচ্ছা, অনিচ্ছা, অজ্ঞতা বা অন্য কোনো বিষয় এখানে ধর্তব্য নয়। তবে মিথ্যার পাপ বা অপরাধ ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত।
২. তাবেয়ী সালিম ইবনু আবদুল্লাহ বলেন, আমার পিতা আবদুল্লাহ ইবনু উমারকে(রা) বলতে শুনেছিঃ আরবী(*****)
-এই হলো তোমাদের বাইদা প্রান্তর, যে প্রান্তরের বিষয়ে তোমরা রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বল(তিনি এই স্থান হতে হজ্জের ইহরাম শুরু করেছিলেন বলে তোমরা বল।) অথচ রাসূলুল্লাহ(স) যুল হুলাইফা প্রান্তরে মসজিদের নিকট হতে হজ্জের ইহরাম বেঁধেছিলেন। (মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮৪৩)।
স্বভাবতই ইবনু উমার(রা)এসকল সাহাবী তাবেয়ীগণকে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বলার অভিযোগ করছেননা। রাসূলুল্লাহ(স) বিদায় হজ্জের সময় লক্ষাধিক সাহাবীকে নিয়ে হজ্জ করেন। তিনি মদীনা থেকে বের হয়ে ‘যুল হুলাইফা’ প্রান্তরে রাত্রি যাপন করেন এবং পরদিন সকালে সেখান থেকে হজ্জের এহরাম করেন। যুল হুলাইফা প্রান্তরের সংলগ্ন ‘বাইদা’ প্রান্তর। যে সকল সাহাবী কিছু দূরে ছিলেন তাঁরা তাঁকে যুল হুলাইফা থেকে এহরাম বলতে শুনেননি, বরং বাইদিয়া প্রান্তরে তাঁকে তালবীয়া পাঠ করতে শুনেন। তাঁরা মনে করেন যে, তিনি বাইদা থেকেই এহরাম শুরু করেন। একারণে অনেকের মধ্যে প্রচারিত ছিল যে, রাসূলুল্লাহ(স) বাইদা প্রান্তর থেকে এহরাম শুরু করেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমার যেহেতু কাছেই ছিলেন, সেহেতু তিনি প্রকৃত ঘটনা জানতেন।
এভাবে আমরা দেখছি যে, বাইদা থেকে এহরাম করার তথ্যটি ছিল অনিচ্ছাকৃত ভুল। যারা তথ্যটি প্রদান করেছেন তারা তাদের জ্ঞাতসারে সত্যই বলেছেন। কিন্তু তথ্যটি যেহেতু বাস্তবের বিপরীত এজন্য ইবনু উমার তাকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন।

১.২.১.৩. মিথ্যা বনাম ‘মাউদূ’(মাউযূ) ও ‘বাতিল’
(মূল আরবী উচ্চারণে আমরা মাউদূ বলতেই অভ্যস্ত। পক্ষান্তরে ফার্সী ও উর্দূ প্রভাবিত বাংলা ব্যবহারে আমরা মাউযূ বলে থাকি)।
হাদীসের পরিভাষায় ও প্রথম শতকে সাহাবী-তাবেয়ীগণের পরিভাষায় রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কথিত মিথ্যা কথাকে ‘মিথ্যা হাদীস’ বলে অভিহিত করা হতো। আবু উমামাহ(রা), বলেন রাসূলুল্লাহ(স) বলেনঃ আরবী(*******)
-যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে ‘মিথ্যা হাদীস’ বলবে তাকে জাহান্নামে বসবাস করতে হবে।(তাবারানী, সুলাইমান ইবনু আহমদ(৩৬০ হি), আল-মু’জামুল কাবীর ৮/১২২)
যে কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেননি তা তাঁর নামে বলা হলেও সাহাবীগণ বলতেনঃ এই হাদীসটি মিথ্যা, মিথ্যা হাদীস বা অনুরূপ শব্দ ব্যবহার করতেন। এই ধরনের মানুষদের সম্পর্কে ‘মিথ্যাবাদী’, ‘সে মিথ্যা বলে’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করতেন। [ইবনু আবু হাতিম, আবদুর রাহমান ইবনু মুহাম্মাদ(৩২৭ হি), আল-জারহু ওয়াত তা’দীল ১/৩৪৯, ৩৫০, ৩৫১, ৩/৪০৭, ৬/২১২, ৮/১৬, ৫২, ৩২৫; যাহাবী, মুহাম্মদ ইবনু আহমাদ(৭৪৮ হি) মীযানুল ই‘তিদাল ১/২৭১, ২৮৫, ২/৮০, ১০৯, ১২২, ২৪১, ৩/৪, ৫০, ৩৭৫, ৪৬৭, ৪৭৫, ৪/৩১, ৯১, ১৭৮, ১৯১, ৪২০, ৪২৮, ৪৩৭, ৫/৩, ২৯, ৫২, ৫৪, ৮৮, ১২৮, ১৬৯, ২০৭, ২২০, ৬/২৪, ৫৫, ১৩৮,২৪৬, ২৪৯, ৫৩৪, ৫৪৫, ৫৬৬, ৭/২১৯, ৩৪১, ৩৯৩, ৮/১৬২, ১৮২, ১৯৬; ইবনু হাজার আসকালানী, আহমাদ ইবনু আলী(৮৫২ হি), ফাতহুল বারী, ১৩/১১৩; আল-মুনাবী, মুহাম্মদ আবদুর রাউফ(১০৩১ হি), ফাইদুল কাদীর ১/৫৪০, ৩/২১৯, ৫/৩০০, ৬/১৫, ২১৬, ২২১, ৩৫৩।]
দ্বিতীয় হিজরী শতক হতে হাদীসের নামে মিথ্যার প্রসারের সাথে সাথে এ সকল মিথ্যাবাদীদের চিহ্নিত করতে মুহাদ্দিসগণ মিথ্যার সমার্থক আরেকটি শব্দ ব্যবহার করতে থাকেন। শব্দটি (আরবী*****)। শব্দটির মূল অর্থ নামানো, ফেলে দেওয়া, জন্ম দেওয়া। বানোয়াট অর্থে ও শব্দটি ব্যবহৃত হয়। [ইবনু দুরাইদ, মুহাম্মদ ইবনুল হাসান(৩২১হি), জামহারাতুল লাগহ ৩/৯৫; জাওহারী, ইসমাঈল ইবনে মুহাম্মাদ(৩৯৩ হি), আস-সিহাহ ৩/১২৯৯; ইবনু ফারিস, আহমদ(৩৯৫হি), মু‘জাম মাকাঈসুল লুগাহ ৬/১১৭-১১৮; ইবনুল আসীর, মুহাম্মদ ইবনুল মুবারক(৬০৬হি), আন-নিহাইয়াহ ৫/১৯৭, ১৯৮; ইবনূ মানযূর, মুহাম্মাদ ইবনুল মাকরাম(৭১১ হি), লিসানুল আরাব ৮/৩৯৬-৩৯৭; ফাল্লাতা, উমার ইবনু হাসান, আল ওয়াদউ ফিল হাদীস ১/১০৮]
ইংরেজীতেঃ To lay, lay Off, lay down, put down, set up…give birth, produce,…humiliate, to be low, humble(Hans Wehr, A Dictionary of Modern Written Arabic. P1076).
পরবর্তী যুগে মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় এই শব্দের ব্যবহারই ব্যাপকতা লাভ করে। তাঁদের পরিভাষায় হাদীসের নামে মিথ্যা বলাকে ‘ওয়াদউ’ এবং এ ধরনের মিথ্যা হাদীসকে ‘মাউদূ’ বলা হয়। ফার্সী উর্দূ প্রভাবিত বাংলা উচ্চারণে আমরা সাধারণত বলি ‘মাউযূ’।
অনেক মুহাদ্দিস ইচ্ছাকৃত মিথ্যা ও অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা বা ভুল উভয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেননি। উভয় প্রকার মিথ্যা হাদীসকেই তাঁরা মাউদূ হাদীস বলে অভিহিত করেছেন। বাংলায় আমরা মাউদূ অর্থ জাল বা বানোয়াট বলতে পারি।
মুহাদ্দিসগণ মাউযূ হাদীসের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন দুইভাবে; অনেক মুহাদ্দিস মাউযূ হাদীসের সংজ্ঞায় বলেছেন : “বানোয়াট জাল হাদীসকে মাউযূ হাদীস বলা হয়।” এখানে তাঁরা হাদীসের প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে সংজ্ঞা প্রদান করেছেন।
অন্যান্য মুহাদ্দিস মাউযূ হাদীসের সংজ্ঞায় বলেছেনঃ “যে হাদীস শুধুমাত্র কোনো মিথ্যাবাদী রাবী বর্ণনা করেছে তা মাউযূ হাদীস।” এখানে তাঁরা মাউযূ বা জাল হাদীসের সাধারণ পরিচয়ের দিকে লক্ষ্য করেছেন। আমরা পরবর্তী আলোচনায় দেখতে পাব যে, মুহাদ্দিসগণ মূলত তুলনামূলক নিরীক্ষার (Cross Examine) মাধ্যমে রাবীর সত্য মিথ্যা যাচাই করতেন।
কোনো কোনো মুহাদ্দিস ইচ্ছাকৃত মিথ্যা ও অনিচ্ছাকৃত মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তাঁরা অনিচ্ছাকৃত মিথ্যাকে ‘বাতিল’ ও ইচ্ছাকৃত মিথ্যাকে ‘মাউযূ’ বা ‘মাউদূ’ বলে উল্লেখ করেছেন। মুহাদ্দিসগণের তুলনামূলক নিরীক্ষা ও যাচাইয়ের মাধ্যমে যদি প্রমাণ হয় যে, এই বাক্যটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেননি, কিন্তু ভুল করে তাঁর নামে বলা হয়েছে, তাহলে তাঁরা সেই হাদীসটিকে ‘বাতিল’ বলে অভিহিত করেন। আর যদি নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখা যায় যে, বর্ণনাকারী ইচ্ছাপূর্বক বা জ্ঞাতসারে এই কথাটি রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে নামে বলেছে, তাহলে তাঁরা একে মাউযূ হাদীস নামে আখ্যায়িত করেন।
মিথ্যা হাদীস সংকলনের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ প্রথম পদ্ধতিই অনুসরণ করেছেন। তাঁরা ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত সকল প্রকার মিথ্যাকেই মাউযূ বলে গণ্য করেছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য হলো যে কথা রাসূলে করীম(স) বলেননি বা যে কর্ম তিনি করেননি, অথচ তাঁর নামে কথিত বা প্রচারিত হয়েছে, সেগুলি চিহ্নিত করে ওহীর নামে জালিয়াতি রোধ করা। বর্ণনাকারী ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যাটি বলেছেন, নাকি ভুলবশত তা বলেছেন সে বিষয় তাঁদের বিবেচ্য বিষয় নয়। এ বিষয় বিবেচনার জন্য রিজাল ও জারহ ওয়াত্ তাদীল শাস্ত্রে পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে। (আল মা’লামী, মুকাদ্দিমাতুল ফাওয়াইদ, পৃ ৫৭)।

১.২.২. মিথ্যার বিধান
ওহী বা হাদীসের নামে মিথ্যা বলার বিধান আলোচনার আগে আমরা সাধারণভাবে মিথ্যা বলার বিধান আলোচনা করতে চাই। মিথ্যাকে ঘৃণা করা মানুষের সহজাত প্রবৃতির একটা অংশ। এজন্য সকল মানব সমাজে মিথ্যাকে পাপ, অন্যায় ও ঘৃণিত মনে করা হয়। কুরআন কারীমে ও হাদীস শরীফে মিথ্যাকে অত্যন্ত কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কুরআন কারীমের বিভিন্ন আয়াতে মুমিনদিগকে সর্বাবস্থায় সত্যপরায়ণ হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাথে সাথে মিথ্যাকে ঘৃণিত পাপ ও কঠিন শাস্তির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সার্বক্ষণিক সত্যবাদিতার নির্দেশ দিয়ে এরশাদ হয়েছেঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ [٩:١١٩]
-হে মু’মিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভূক্ত হও।(সূরা তাওবাঃ ১১৯)
মিথ্যার ভয়ানক শাস্তির বিষয়ে বলা হয়েছেঃ
فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ [٢:١٠]
-তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাদের ব্যাধি বৃদ্ধি করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যাচারী। (সূরা বাকারাঃ ১০)
অন্যত্র এরশাদ করা হয়েছেঃ
فَأَعْقَبَهُمْ نِفَاقًا فِي قُلُوبِهِمْ إِلَىٰ يَوْمِ يَلْقَوْنَهُ بِمَا أَخْلَفُوا اللَّهَ مَا وَعَدُوهُ وَبِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ [٩:٧٧]
-পরিণামে তিনি(আল্লাহ) তাদের অন্তরে কপটতা স্থির করলেন আল্লাহর সাথে তাদের সাক্ষাৎ-দিবস পর্য্ন্ত, কারণ তারা আল্লাহর নিকট যে অঙ্গীকার করেছিল তা ভংগ করেছিল এবং তারা ছিল মিথ্যাচারী।(সূরা তাওবাঃ ৭৭)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছেঃ
إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ [٤٠:٢٨]
-আল্লাহ সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেননা (সূরা মুমিনঃ ২৮)।
অগণিত হাদীসে মিথ্যাকে ভয়ংকর পাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এক হাদীসে আবুদল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(********)
-সত্য পূণ্য। সত্য পূণ্যের দিকে পরিচালিত করে এবং পূণ্য জান্নাতের দিকে পরিচালিত করে। যে মানুষ সদা সর্বদা সত্য বলতে সচেষ্ট থাকেন তিনি এক পর্যায়ে আল্লাহর নিকট ‘সিদ্দীক’ বা মহা সত্যবাদী বলে লিপিবদ্ধ হন। আর মিথ্যা পাপ। মিথ্যা পাপের দিকে পরিচালিত করে আর পাপ জাহান্নামের দিকে পারিচালিত করে। যে মানুষটি মিথ্যা বলে বা মিথ্যা বলতে সচেষ্ট থাকে সে এক পর্যায়ে মহা মিথ্যাবাদী বলে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। [বুখারী, মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল (২৫৬ হি), আস-সহীহ ৫/২২৬১, মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (২৬২ হি), আস-সহীহ ৪/২০১২, ২০১৩]।
হাদীস শরীফে মিথ্যা বলাকে মুনাফিকীর অন্যতম চিহ্ন বলে গণ্য করা হয়েছে। এমনকি বলা হয়েছে যে, মুমিন অনেক অন্যায় করতে পারে, কিন্তু কথনো মিথ্যা কথা বলতে পারেনা। সা’দ ইবনু আবু ওয়াক্কাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী (*******)
-মুমিনের প্রকৃতিতে সব অভ্যাস থাকতে পারে, কিন্তু খিয়ানত ও মিথ্যা থাকতে পারেনা। [বাযযার, আবু বাকর আহমদ ইবনু আমর (২৯২ হি), আল মুসনাদ ৩/৩৪১, হাইসামী, আলী ইবনু আবী বাকর (৮০৭ হি), মাজমাউয যাওয়াইদ ১/৯২]

১.২.৩. ওহীর নামে মিথ্যা
মিথ্যা সর্বদা ঘৃণিত। তবে তা যদি ওহীর নামে হয় তাহলে তা আরো বেশি ঘৃণিত ও ক্ষতিকর। সাধারণভাবে মিথ্যা ব্যক্তিমানূষের বা মানবসমাজের জন্য জাগতিক ক্ষতি বয়ে আনে। আর ওহীর নামে মিথ্যা মানব সমাজের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক স্থায়ী ক্ষতি ও ধ্বংস করে। মানুষ তখন ধর্মের নামে মানবীয় বুদ্ধি প্রসূত বিভিন্ন কর্মে লিপ্ত হয়ে জাগতিক ও পারলৌকিক ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত হয়।
পূর্ববর্তী ধর্মগুলোর দিকে তাকালে আমরা বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। আমরা আগেই বলেছি যে, মানবীয় জ্ঞান প্রসূত কথাকে ওহীর নামে চালানোই ধর্মের বিকৃতি ও বিলুপ্তির কারণ। সাধারণভাবে এ সকল ধর্মের প্রাজ্ঞ পন্ডিতগণ ধর্মের কল্যাণেই এ সকল কথা ওহীর নামে চালিয়েছেন। তারা মনে করেছেন যে, তাদের এ সকল কথা, ব্যাখ্যা, মতামত ওহীর নামে চালালে মানুষের মধ্যে ‘ধার্মিকতা’, ‘ভক্তি’ ইত্যাদি বাড়বে এবং আল্লাহ খুশি হবেন। আর এভাবে তারা তাদের ধর্মকে বিকৃত ও ধর্মাবল্বীদেরকে বিভ্রান্ত করেছেন। কিন্তু তারা বুঝেননি যে, মানুষ যদি মানবীয় প্রজ্ঞায় এ সকল বিষয় বুঝতে পারতো তাহলে ওহীর প্রয়োজন হতোনা।
এর অত্যন্ত পরিচিত উদাহরণ খৃস্টধর্ম। প্রচলিত বিকৃত বাইবেলের বিবরণ অনুযায়ী ‘যীশুখৃস্ট’ তাঁর অনুসারীদেরকে কেবলমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে, ইহুদী ধর্মের ১০ মূলনীতি পালন করতে, খাতনা করতে, তাওরাতের সকল বিধান পালন করতে, শূকরের মাংস ভক্ষণ থেকে বিরত থাকতে ও অনুরূপ অন্যান্য কর্মের নির্দেশ প্রদান করেন। মিথ্যাবাদী শৌল পৌল নাম ধারণ করে ‘খৃস্টধর্মের প্রচার ও মানুষের মধ্যে ভক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে’ প্রচার করতে থাকেন যে, শুধুমাত্র ‘যীশুখৃস্টকে’ বিশ্বাস ও ভক্তি করলেই চলবে, এ সকল কর্ম না করলেও চলবে। তিনি বলতেন, আমি প্রত্যেক জাতির কাছে আমার পছন্দ মত মিথ্যা বলি, যেন ঈশ্বরের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
এভাবে তিনি মানবতার ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করেন। ক্রমান্বয়ে এই পৌলীয় কর্মহীন ভক্তিধর্মই খৃস্টানদের মধ্যে প্রসার লাভ করে। ফলে বিশ্বের কোটি কোটি মানব সন্তান শিরক-কুফর ও পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে। যেহেতু বিশ্বাসেই স্বর্গ, সেহেতু কোনোভাবেই ধর্মোপদেশ দিয়ে খৃস্টান সমাজগুলি থেকে মানবতা বিধ্বংসী পাপ, অনাচার ও অপরাধ কমানো যায়না।
ওহীর নামে মিথ্যা সবচেয়ে কঠিন মিথ্যা হওয়ার কারণে কুরআন কারীমে ও হাদীস শরীফে ওহীর নামে বা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলতে, সন্দেহজনক কিছু বলতে বা আন্দাজে কিছু বলতে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর অবতীর্ণ উভয় প্রকার ওহী যেন কেয়ামত পর্য্ন্ত সকল মানুষের জন্য অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত থাকে সেজন্য সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

১.২.৪. মিথ্যা থেকে ওহী রক্ষার কুরআনী নির্দেশনা
‘ওহী’র নামে মিথ্যা বা অনুমান-নির্ভর কথা প্রচারের দুটি পর্যায়ঃ প্রথমত, নিজে ওহীর নামে মিথ্যা বলা ও দ্বিতীয়ত, অন্যের বলা মিথ্যা গ্রহণ ও প্রচার করা। উভয় পথ রুদ্ধ করার জন্যে কুরআন কারীমে একদিকে আল্লাহর নামে মিথ্যা বা অনুমান নির্ভর কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। অপরদিকে কারো প্রচারিত কোনো তথ্য বিচার ও যাচাই ছাড়া গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।
১.২.৪.১. আল্লাহর নামে মিথ্যা ও অনুমান নির্ভর কথা বলার নিষেধাজ্ঞা
কুরআন কারীমে মহান আল্লাহ বারংবার আল্লাহর নামে মিথ্যা বলতে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে না জেনে, আন্দাজে, ধারণা বা অনুমানের উপর নির্ভর করে আল্লাহর নামে কিছু বলতে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলার অর্থ আল্লাহর নামে মিথ্যা বলা। কারণ রাসূলুল্লাহ(স) আল্লাহর পক্ষ থেকেই কথা বলেন। কুরআনের মত হাদীসও আল্লাহর ওহী। কুরআন ও হাদীস, উভয় প্রকারের ওহীই একমাত্র রাসূলুল্লাহ(স) এর মাধ্যমে বিশ্ববাসী পেয়েছে। কাজেই রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কোনো প্রকার মিথ্যা, বানোয়াট, আন্দাজ বা অনুমাননির্ভর কথা বলার অর্থই আল্লাহর নামে মিথ্যা বলা বা না-জেনে আল্লাহর নামে কিছু বলা। কুরআন কারীমে এ বিষয়ে বারংবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে কয়েকটি বাণী উল্লেখ করছি।
১. কুরআন কারীমে বারংবার এরশাদ করা হয়েছেঃ
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَىٰ عَلَى اللَّهِ كَذِبًا
-আল্লাহর নামে বা আল্লাহর সম্পর্কে যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলে তার চেয়ে বড় জালিম আর কে? (সূরা আল আনআমঃ ২১, ৯৩, ১৪৪; সূরা আরাফঃ ৩৭ সূরা ইউনূস ১৭)।
২. এরশাদ করা হয়েছেঃ
قَالَ لَهُم مُّوسَىٰ وَيْلَكُمْ لَا تَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ كَذِبًا فَيُسْحِتَكُم بِعَذَابٍ ۖ وَقَدْ خَابَ مَنِ افْتَرَىٰ [٢٠:٦١]
-দূর্ভোগ তোমাদের! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করোনা। করলে, তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দ্বারা সমূলে ধ্বংস করবেন। যে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে সেই ব্যর্থ হয়েছে। (সূরা তাহাঃ৬১)

৩. কুরআন কারীমে বারংবার না জেনে, আন্দাজে বা অনুমান নির্ভর করে আল্লাহ, আল্লাহর দ্বীন, বিধান ইত্যাদি সম্পর্কে কোনো কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন একস্থানে এরশাদ হয়েছেঃ
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ [٢:١٦٨]
إِنَّمَا يَأْمُرُكُم بِالسُّوءِ وَالْفَحْشَاءِ وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ [٢:١٦٩]
-হে মানবজাতি, পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে তা থেকে তোমরা আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করোনা। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সে তো কেবল তোমাদেরকে মন্দ ও অশ্লীল কার্যের এবং আল্লাহ সম্বন্ধে তোমরা যা জাননা এমন সব বিষয় বলার নির্দেশ দেয়। (সূরা আল বাকারাহঃ ১৬৮-১৬৯)
৪. অন্যত্র এরশাদ করা হয়েছেঃ
قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ [٧:٣٣]
-“বল, আমার প্রতিপালক নিষিদ্ধ করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা আর পাপ এবং অসংগত বিরোধিতা এবং কোনো কিছুকে আল্লাহর শরীক করা –যার কোনো সনদ তিনি প্রেরণ করেননি এবং আল্লাহর সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যে সম্বন্ধে তোমাদের কোনো জ্ঞান নেই।” (সূরা আল আরাফঃ৩৩)
এভাবে কুরআনে ওহীর জ্ঞানকে সকল ভেজাল ও মিথ্যা থেকে রক্ষার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মহিমাময় আল্লাহ, তাঁর মহান রাসূলুল্লাহ(স), তাঁর দ্বীন, তাঁরা বিধান ইত্যাদি বিষয়ে মিথ্যা, বানোয়াট, আন্দাজ বা অনুমান নির্ভর কথা বলা কঠিণভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

১.২.৪.২. যে কোনো তথ্য গ্রহণের পূর্বে যাচাইয়ের নির্দেশ
নিজে আল্লাহ বা তাঁর রাসূল(স)এর নামে মিথ্যা বলা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি অন্যের কোনো অনির্ভরযোগ্য, মিথ্যা বা অনুমান নির্ভর বর্ণনা বা বক্তব্য গ্রহণ করাও নিষিদ্ধ। যে কোনো সংবাদ বা বক্তব্য গ্রহণে মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে কুরআন কারীম। এরশাদ করা হয়েছেঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ [٤٩:٦]
-“হে মুমিনগণ, যদি কোনো পাপী তোমাদের নিকট কোনো বার্তা আনয়ন করে, তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত না কর, এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।” (সূরা আল হুজুরাতঃ ৬)।
এই নির্দেশের আলোকে কেউ কোনো সাক্ষ্য বা তথ্য প্রদান করলে তা গ্রহণের পূর্বে সে জাতির ব্যক্তিগত সততা ও তথ্য প্রদানে তার নির্ভূলতা যাচাই করা মুসলিমের জন্য ফরয। জাগতিক সকল বিষয়ের চেয়েও বেশি সতর্কতা ও পরীক্ষা করা প্রয়োজন রাসূলুল্লাহ(স) বিষয়ক বার্তা বা বাণী গ্রহণের ক্ষেত্রে। কারণ জাগতিক বিষয়ে ভুল তথ্য বা সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করলে মানুষের সম্পদ, সম্ভ্রম বা জীবনের ক্ষতি হতে পারে। আর রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীস বা ওহীর জ্ঞানের বিষয়ে অসতর্কতার পরিণতি ঈমানের ক্ষতি ও আখিরাতের অনন্ত জীবনের ধ্বংস। এজন্য মুসলিম উম্মাহ সর্বদা সকল তথ্য, হাদীস ও বর্ণনা পরীক্ষা করে গ্রহণ করেছেন।

১.২.৫. মিথ্যা থেকে ওহী রক্ষায় হাদীসের নির্দেশনা
ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত সকল প্রকার বিকৃতি, ভুল বা মিথ্যা থেকে তাঁর বাণী বা হাদীসকে রক্ষা করার জন্য রাসূলুল্লাহ(স) তাঁর উম্মতকে বিভিন্ন প্রকার নির্দেশনা দিয়েছেন। সেগুলির মধ্যে রয়েছেঃ

১.২.৫.১. বিশুদ্ধরূপে হাদীস মুখস্ত রাখার ও প্রচারের নির্দেশনা
বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ(স) তাঁর হাদীস বা বাণী হুবহু বিশুদ্ধরূপে মুখস্ত করে তা প্রচার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। জুবাইর ইবনু মুতয়িম(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(*****)
-“মহান আল্লাহ সমুজ্জল করুন সেই ব্যক্তির চেহারা যে আমার কোনো কথা শুনল, অতঃপর তা পূর্ণরূপে আয়ত্ত্ব করল ও মুখস্ত করল এবং যে তা শুনেনি তার কাছে পৌছে দিল।” [তিরমিযী, মুহাম্মদ ইবনু ঈসা(২৭৯ হি), আস-সুনান ৫/৩৩-৩৪; আবু দাউদ, সুলাইমান ইবনে আশ‘আস(২৭৫ হি)]
এই অর্থে আরো অনেক হাদীস অন্যান্য অনেক সাহাবী থেকে বর্ণিত ও সংকলিত হয়েছে।
১.২.৫.২. রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলার নিষেধাজ্ঞা
অপরদিকে কোনো মানবীয় কথা যেন তাঁর নামে প্রচারিত হতে না পারে সেজন্য তিনি তাঁদেরকে তাঁর নামে মিথ্যা বা অতিরিক্ত কথা বলতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। হযরত আলী (রা) বলেন, রাসূলে করীম(স) বলেছেনঃ আরবী(*****)
-তোমরা আমার নামে মিথ্যা বলবেনা, কারণ যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা বলবে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে। [বুখারী, মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল(২৫৬ হি), আস-সহীহ ১/৫২, ফাতহুল বারী১/১৯৯]।
যুবাইর ইবনুল আউয়াম(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(******)
-যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা বলবে তার আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। (বুখারী, আস-সহীস ১/৫২)
সালামাহ ইবনে আকওয়া(রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(******)
-আমি যা বলিনি সে কথা যে আমার নামে বলবে তার আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। (বুখারী, আস-সহীস ১/৫২)
এভাবে ‘আশারায়ে মুবাশশারাহ’ সহ প্রায় ১০০ জন সাহাবী এই মর্মে রাসূলুল্লাহ(স) এর সাবধান বাণী বর্ণনা করেছেন। আর কোনো হাদীস এত বেশি সংখ্যক সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়নি।[নববী, ইয়াহইয়া ইবনু শারাফ(৬৭৬ হি), শারহু সহীহ মুসলিম ১/৬৮, ইউনুল জাউযী, আল মাউযূ’আত]
১.২.৫.৩. বেশি হাদীস বলা ও মুখস্ত ছাড়া হাদীস বলার নিষেধাজ্ঞা
বেশি হাদীস বলতে গেলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য এ বিষয়ে সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ(স)। বিশুদ্ধ মুখস্ত ও নির্ভূলতা সম্পর্কে পরিপূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে কোনো হাদীস বর্ণনা করতে নিষেধ করেছেন। আবু কাতাদাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) মিম্বরের উপরে দাঁড়িয়ে বলেনঃ আরবী(*****)
-খবরদার! তোমরা আমার নামে বেশি বেশি হাদীস বলা হতে বিরত থাকবে। যে আমার নামে কিছু বলে, সে যেন সঠিক কথা বলে। আর যে আমার এমন কিছু বলে যা আমি বলিনি তাকে জাহান্নামে বসবাস করতে হবে। [ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/১৪; আলবানী, মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন, সহীহ সুনানি ইবনে মাজাহ ১/২৯, আল মুসতাদরাক ১/১৯৪]।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস(রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(********)
“তোমরা আমার থেকে হাদীস বর্ণনা পরিহার করবে, শুধুমাত্র যা তোমরা জান তা ছাড়া।”(তিরমিযী, আস-সুনান ৫/১৮৩)।
আবু মূসা মালিক ইবনু উবাদাহ আল গাফিকী(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) আমাদেরকে সর্বশেষ ওহীহত ও নির্দেশ প্রদান করে বলেনঃ আরবী(******)
-“তোমরা আল্লাহর কিতাব সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবে ও অনুসরণ করবে। আর অচিরেই তোমরা এমন সম্প্রদায়ের নিকট গমন করবে যারা আমার নামে হাদীস বলতে ভালবাসবে। যদি কারো কোনো কিছু মুখস্ত থাকে তাহলে সে তা বলতে পারে। আর যে ব্যক্তি আমার নামে এমন কিছু বলবে যা আমি বলিনি তাকে জাহান্নামে তার আবাসস্থল গ্রহণ করতে হবে।” (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১২)
এভাবে বিভিন্ন হাদীসে আমরা দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ(স) তাঁর উম্মাততে তাঁর হাদীস হুবহু ও নির্ভূলভাবে মুখস্ত রাখতে ও এইরূপ মুখস্ত হাদীস প্রচার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। অপরদিকে পরিপূর্ণ মুখস্ত না থাকলে বা সামান্য দ্বিধা থাকলে সে হাদীস বর্ণনা করতে নিষেধ করেছেন। কারণ ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, তিনি যা বলেননি সে কথা তাঁর নামে বলা নিষিদ্ধ ও কঠিনতম পাপ। ভুলক্রমেও যাতে তাঁর হাদীসের মধ্যে হেরফের না হয় এজন্য তিনি পরিপূর্ণ মুখস্ত ছাড়া হাদীস বলতে নিষেধ করেছেন। আমরা দেখতে পাব যে, সাহাবীগণ এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতেন।
১.২.৫.৪. মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারীদের থেকে সতর্ক করা
নিজের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি অন্যের বানানো মিথ্যা গ্রহণ করাও নিষিদ্ধ। মুসলিম উম্মাহর ভিতরে মিথ্যাবাদী হাদীস বর্ণনাকারী ব্যক্তিবর্গের উদ্ভব হবে বলে তিনি উম্মাতকে সতর্ক করেছেন। আবু হুরাইরা(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ আরবী(******)
-শেষ যুগে আমার উম্মাতের কিছু মানুষ তোমাদেরকে এমন সব হাদীস বলবে যা তোমরা বা তোমাদের পিতা-পিতামহগণ কখনো শুননি। খবরদার! তোমরা তাদের থেকে সাবধান থাকবে, তাদের থেকে দূরে থাকবে। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১২)।
ওয়াসিলাহ ইবনুল আসকাহ(রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(*****)
-কেয়ামতের পূর্বেই শয়তান বাজারে-সমাবেশে ঘুরে ঘুরে হাদীস বর্ণনা করে বলবে: আমাকে অমুকের ছেলে অমুক এই এই বিষয়ে এই হাদীস বলেছে। (ইবনু আদী, আহমদ, আল-কামিল ফী দুআফাইর রিজাল ১/১১৫)।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ(রা) বলেনঃ আরবী(******)
-শয়তান মানুষের রূপ ধারণ করে মানুষদের মধ্যে আগমন করে এবং তাদেরকে মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করে। এরপর মিথ্যা হাদীস শুনে সমবেত মানুষগুলো সমাবেশ ভেঙ্গে চলে যায়। অতঃপর তারা সে সকল হাদীস বর্ণনা করে বলে : আমি এক ব্যক্তিকে হাদীসটি বলতে শুনেছি যার চেহারা আমি চিনি তবে তার নাম জানিনা। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১২)

১.২.৫.৫. সন্দেহযুক্ত বা অনির্ভরযোগ্য বর্ণনা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা
রাসূলুল্লাহ(স) যাচাই না করে কোনো হাদীস গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। যদি কেউ যাচাই না করে যা শুনে তাই হাদীস বলে গ্রহণ করে ও বর্ণনা করে তাহলে হাদীস যাচাইয়ে তার অবহেলার জন্য সে হাদীসের নামে মিথ্যা বলার পাপে পাপী হবে। ইচ্ছাকৃত মিথ্যা হাদীস বানানোর জন্য নয়, শুধুমাত্র সত্য মিথ্যা যাচাই না করে হাদীস গ্রহণ করাই তার মিথ্যাবাদী বানানোর জন্য যথেষ্ট বলে হাদীসে বলা হয়েছে। উপরন্তু, যদি কোনো হাদীসের বিশুদ্ধতা ও নির্ভূলতা সম্বন্ধে দ্বিধা বা সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তি সে হাদীস বর্ণনা করে তাহলে সেও মিথ্যাবাদী বলে গণ্য হবেও মিথ্যা হাদীস বলার পাপে পাপী হবে।
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(*******)
-একজন মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এতটুকেই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তাই বর্ণনা করবে।(মুসলিম আস-সহীহ ১/১০)।
সামুরাহ ইবনে জুনদুব(রা) ও মুগীরাহ ইবনু শু’বা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(****)
-যে ব্যক্তি আমার নামে কোনো হাদীস বলবে এবং তার মনে সন্দেহ হবে যে, হাদীসটি মিথ্যা, সেও একজন মিথ্যাবাদী। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/৯)।

১.২.৬. হাদীসের নামে মিথ্যা বলার বিধান
১.২.৬.১. হাদীসের নামে মিথ্যা বলা কঠিনতম কবীরা গোনাহ
উপরে উল্লিখিত আয়াত ও হাদীসের আলোকে আমরা অতি সহজেই বুঝতে পারি যে, হাদীসের নামে মিথ্যা বলা ও মানুষের কথাকে হাদীস বলে চালানো জঘন্যতম পাপ ও অপরাধ। এ বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কোনোরূপ দ্বিধা বা সংশয় নেই। আমরা পরবর্তী আলোচনায় দেখতে পাব যে, রাসূলুল্লাহ(স) এর সাহাবীগণ সামান্যতম অনিচ্ছাকৃত বা অসাবধানতামূলক ভুলের ভয়ে হাদীস বলা হতে বিরত থাকতেন। অনিচ্ছাকৃত ভুলকেও তাঁরা ভয়ানক পাপ মনে করে সতর্কতার সাথে পরিহার করতেন। এছাড়া অন্যের বানানো মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করাকেও তাঁরা মিথ্যা হাদীস বানানোর মত অপরাধ বলে গণ্য করতেন।
উপরে উল্লেখিত হাদীসগুলির আলোচনা প্রসঙ্গে ইমাম আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনু শারাফ আন-নাবাবী (৬৭৬ হি) বলেনঃ এ সকল হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলা কঠিনতম হারাম, ভয়ন্করতম কবীরা গোনাহ এবং তা জঘন্যতম ও ধ্বংসাত্মক অপরাধ। এ বিষয়ে মুসলিম উম্মাহ একমত। তবে অধিকাংশ আলিমের মতে এই অপরাধের জন্য কাউকে কাফির বলা যাবেনা। যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কোনো মিথ্যা বলবে সে যদি তার এই মিথ্যা বলাকে হালাল মনে না করে তাহলে তাকে কাফির বলা যাবেনা। সে পাপী মুসলিম। আর যদি সে এই কঠিনতম পাপকে হালাল মনে করে তাহলে সে কাফির বলে গণ্য হবে। তবে মুহাম্মদ আল জুআইনী ও অন্যান্য কতিপয় ইমাম এই অপরাধকে কুফরী বলে গণ্য্ করেছেন। জুআ্ইনী বলতেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলবে সে কাফির বলে গণ্য হবে এবং তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করতে হবে।
এ সকল হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে যে কোনো মিথ্যাই সমভাবে হারাম, তা যে কোনো বিষয়েই হোক। শরীয়তের বিধিভিধান, ফযীলত, নেককাজে উৎসাহ প্রদান, পাপের ভীতি বা অন্য যে কোনো বিষয়ে তাঁর নামে কোনো মিথ্যা বলা কঠিনতম হারাম ও ভয়ঙ্করতম কবীরা গোনাহ। এ বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত রয়েছে। যাঁরা মতামত প্রকাশ করতে পারেন এবং যাঁদের মতামত গ্রহণ করা যায় তাঁরা সকলেই এই বিষয়ে একমত। (নববী, শারহু সহীহ মুসলিম ১/৬৯)।

১.২.৬.২. মাউযূ হাদীস উল্লেখ বা প্রচার করাও কঠিনতম হারাম
ইমাম নববী আরো বলেনঃ জ্ঞাতসারে কোনো মিথ্যা বা বানোয়াট হাদীস বর্ণনা করাও হারাম, তা যে অর্থেই হোকনা কেন। তবে মিথ্যা হাদীসকে মিথ্যা হিসেবে জানানোর জন্য তার বর্ণনা জায়েয। (নববী, তাকরীব, তাদরীবুর রাবী সহ ১/২৭৪)।
অন্যত্র, তিনি বলেনঃ যদি কেউ জানতে পারেন যে, হাদীসটি মাউযূ অর্থাৎ মিথ্যা বা জাল, অথবা তার মনে জোরালো ধারণা হয় যে, হাদীসটি জাল তাহলে তা বর্ণনা করা তার জন্য হারাম। যদি কেউ জানতে পারেন যে, হাদীসটি মিথ্যা এবং তারপরও তিনি সেই হাদীসটি বর্ণনা করেন, কিন্তু হাদীসটির বানোয়াট হওয়ার বিষয় উল্লেখ না করেন, তবে তিনিও হাদীস বানোয়াটকারী বলে গণ্য হবেন এবং এ সকল হাদীসে উল্লেখিত ভয়ানক শাস্তির অন্তর্ভূক্ত হবেন। (নববী, শারহু সহীহ মুসলিম ১/৭১)।
ইমাম যাইনুদ্দীন আব্দুর রাহীম ইবনুল হুসাইন আল-ইরাকী(৮০৬ হি) বলেনঃ মাউযূ বা জাল হাদীস যে বিষয়ে বা যে অর্থেই হোক, তা বলা হারাম। আহকাম, গল্প-কাহিনী, ফযীলত, নেককর্মে উৎসাহ, পাপ থেকে ভীতি প্রদর্শন বা অন্য যে কোনো বিষয়েই হোকনা কেন, যে ব্যক্তি তাকে মাউযূ বলে জানতে পারবে তার জন্য তা বর্ণনা করা, প্রচার করা, তার দ্বারা দলীল দেওয়া বা তার দ্বারা ওয়ায করা জায়েয নয়। তবে হাদীসটি যে জাল বা বানোয়াট সে কথা উল্লেখ করে তা বলা যায়। (ইরাকী, ফাতহুল মুগীস, পৃ. ১২০-১২১)।

১.২.৬.৩. হাদীস বানোয়াটকারীর তওবার বিধান
হাদীসের নামে মিথ্যা বলা ও অন্যান্য বিষয়ে মিথ্যা বলার মধ্যে একটি বিশেষ পার্থক্য হলো, হাদীসের নামে মিথ্যাবাদীর তাওবা মুহাদ্দিসগণেল নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। যদি কোনো ব্যক্তির বিষয়ে প্রমাণিত হয় যে, তিনি কোনো কথাকে মিথ্যাভাবে রাসূলুল্লাহ(স) এর কথা বলে উল্লেখ করেছেন বা প্রচার করেছেন এবং এরপর তিনি তাওবা, তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতেও পারেন, তবে মুহাদ্দিসগণের নিকট তিনি তাওবার কারণে গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাবেননা। মুহাদ্দিসগণ কখনোই ঐ ব্যক্তির বর্ণিত হাদীস সত্য ও নির্ভরযোগ্য বলে মনে করবেননা।
পঞ্চম শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকীহ আহমদ ইবনু সাবিত খাতীব বাগদাদী(৪৬৩ হি) বলেনঃ যে ব্যক্তি মানুষের সাথে মিথ্যা বলে তার হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়। তবে সে যদি তাওবা করে এবং তার সততা প্রমাণিত হয় তাহলে তার হাদীস গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে বলে ইমাম মালিক উল্লেখ করেছেন। আর যদি কেউ হাদীস জাল করে, হাদীসের মধ্যে কোনো মিথ্যা বলে বা যা শুনেনি তা শুনেছে বলে দাবি করে তাহলে তার বর্ণিত হাদীস সত্য বা সঠিক বলে গণ্য করা যাবেনা। আলিমগণ উল্লেখ করেছেন যে, সে যদি পরে তাওবা করে তাহলেও তার বর্ণিত কোনো হাদীস সত্য বলে গণ্য করা যাবেনা। ইমাম আহমদ(২৪১ হি) কে প্রশ্ন করা হয়: একব্যক্তি একটিমাত্র হাদীসের ক্ষেত্রে মিথ্যা বলেছিল, তারপর সে তাওবা করেছে এবং মিথ্যা বলা পরিত্যাগ করেছে, তার বিষয়ে কী করণীয়? তিনি বলেনঃ তার তাওবা তার ও আল্লাহর মাঝে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে কবুল করতে পারেন। তবে তার বর্ণিত কোনো হাদীস আর কখনোই সঠিক বলে গ্রহণ করা যাবেনা বা কখনোই তার বর্ণনার উপর নির্ভর করা যাবেনা। ইমাম সুফিয়ান সাওরী(১৬১ হি), আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক(১৮১ হি)ও অন্যান্য ইমামও অনুরূপ কথা বলেছেন।
ইমাম বুখারীর অন্যতম ওস্তাদ আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর আল-হুমাইদী(২১৯ হি) বলেন, যদি কেউ হাদীস বর্ণনা করতে যেয়ে বলেঃ আমি অমুকের কাছে হাদীসটি শুনেছি, এরপর প্রমাণিত হয় যে, সে উক্ত ব্যক্তি হতে হাদীসটি শুনেনি, বা অন্য কোনোভাবে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তার মিথ্যা ধরা পড়ে তবে তার বর্ণিত কোনো হাদীসই আর সঠিক বা নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করা যাবেনা। খতীব বাগদাদী বলেন, ইচ্ছাকৃত মিথ্যা ধরা পড়লে সেক্ষেত্রে এই বিধান। [খতীব বাগদাদী, আহমাদ ইবনু আলী ইবনু সাবিত(৪৬৩ হি), আল কিফাইয়াতু ফী ইলমুর রিওয়াইয়া, পৃ. ১১৭-১১৮]।
শাইখ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলবী(১০৫২ হি) বলেনঃ যদি কোনো ব্যক্তির বিষয়ে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে জীবনে একবারও ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলার কথা প্রমাণিত হয় তবে তার বর্ণিতে কোনো হাদীস সঠিক বা নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য হবেনা, যদিও সে তাওবা করে। (আব্দুল হক দেহলবী, মুকাদ্দিমাহ ফী উসূলিল হাদীস, পৃ. ৬৩-৬৪)।

১.২.৭. হাদীসের নামে মিথ্যা বলার উন্মেষ
আমরা জানি যে, সকল সমাজ, জাতি ও ধর্মে মিথ্যা ও মিথ্যাবাদী ঘৃণিত। সত্যবাদীতা সর্বদা ও সর্বত্র প্রশংসিত ও নিন্দিত। এজন্যই আরবের জাহেলী সমাজেও মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অতুলনীয় সত্যবাদিতা প্রশংসিত হয়েছে। তিনি ‘আল-আমীন’ ও ‘আস-সাদিক’: বিশ্বস্ততা ও সত্যবাদী বলে আখ্যায়িত হয়েছেন।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সত্যবাদী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সহচর সাহাবীগণকে অনুপম অতুলনীয় সত্যবাদিতার উপর গড়ে তুলেছেন। তাঁদের সত্যবাদিতা ছিল আপোষহীন। কোনো কষ্ট বা বিপদের কারণেই তাঁরা সত্যকে বাদ দিয়ে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেননি। উপরন্তু তিনি ওহীর নামে ও হাদীসের নামে মিথ্যা বলতে বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন এবং এর কঠিন শাস্তির কথা বারংবার বলেছেন।
আমরা পরবর্তী আলোচনায় দেখতে পাব যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে ইচ্ছাকৃত কোনো মিথ্যা তো দূরের কথা, সামান্যতম অনিচ্ছাকৃত ভুল বা বিকৃতিকেও তাঁরা কঠিনতম পাপ বলে গণ্য করে তা পরিহার করতেন।
এজন্য আমরা দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় বা তাঁর ইন্তিকালের পরে তাঁর সাহাবীগণের মধ্যে কখনোই কোনো অবস্থায় তাঁর নামে মিথ্যা বলার কোনো ঘটনা ঘটেনি। বরং আমরা দেখতে পাই যে, অধিকাংশ সাহাবী অনিচ্ছাকৃত ভুলে ভয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে কোনো হাদীসই বলতেননা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় মদীনার সমাজে কতিপয় মুনাফিক বাস করত। এদের মধ্যে মিথ্যা বলার প্রচলন ছিল। তবে এরা সংখ্যায় ছিল অতি সামান্য এবং সমাজে এদের মিথ্যাবাদিতা জ্ঞাত ছিল। এজন্য তাদের গ্রহণযোগ্যতা ছিলনা। তাদের কথা কেউ বিশ্বাস করতোনা এবং তারাও কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামে মিথ্যা বলার সাহস বা সুযোগ পাননি।
একটি ঘটনায় বর্ণিত হয় যে, এক যুবক এক যুবতীর পানিপ্রার্থী হয়। যুবতীর আত্মীয়গণ তার কাছে তাদের মেয়ে বিবাহ দিতে অসম্মত হয়। পরবর্তী সময়ে ঐ যুবক তাদের কাছে গমন করে বলে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তোমাদের বংশের যে কোনো মেয়ে বেছে নিয়ে বিবাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যুবকটি সেখানে অবস্থান করে। ইত্যবসরে তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে বিষয়টির সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তিনি বলেন, যুবকটি মিথ্যা বলেছে। তোমরা তাকে জীবিত পেলে মৃত্যুদন্ড প্রদান করবে। ….তবে তাকে জীবিত পাবে বলে মনে হয়না। …..তারা ফিরে গিয়ে দেখেন যে, সাপের কামড়ে যুবকটির মৃত্যু হয়েছে।……..
এই বর্ণনাটি নির্ভরযোগ্য হলে এ থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় তাঁর নামে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বলার একটি ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু এই বর্ণনাটির সনদ অত্যন্ত দূর্বল। কয়েকজন মিথ্যায় অভিযুক্ত ও অত্যন্ত দূর্বল রাবীর মাধ্যমে ঘটনাটি বর্ণিত। (যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ৩/৪০১-৪০২; ইবনু আদী, আল-কামিল ৪/৫৪)।
সাধারণভাবে আমরা দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পরে যতদিন মুসলিম সমাজে সাহাবীগণের আধিক্য ছিল ততদিন তাঁর নামে মিথ্যা বলার কোনো ঘটনা ঘটেনি।
সময়ের আবর্তনে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। প্রথম হিজরী শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এ সময়ে অনেক সাহাবী মৃত্যুবরণ করেন। অগণিত নও মুসলিম ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এদের মধ্যে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে মিথ্যা বলার উন্মেষ ঘটে। ক্রমান্বয়ে তা প্রসার লাভ করতে থাকে।
২৩ হিজরী সালে যুন্নুরাইন উসমান ইবনু আফফান(রা) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৩৫ হিজরী পর্য্ন্ত প্রায় ১২ বৎসর তিনি খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে ইসলামী বিজয়ের সাথে সাথে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ইসলামের প্রসার ঘটে। অগণিত মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষই ইসলামের প্রাণকেন্দ্র মদীনা থেকে বহুদূরে মিশর, কাইরোয়ান, কুফা, বাসরা, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, খোরাসান ইত্যাদি এলাকায় বসবাস করতেন। সাহাবীগণের সাহচর্য্ থেকেও তারা বঞ্চিত ছিলেন।
তাঁদের অনেকের মধ্যে প্রকৃত ইসলামী বিশ্বাস, চরিত্র ও কর্মের পূর্ণ বিকাশ ঘটতে পারেন। এদের অজ্ঞতা, পূর্ববর্তী ধর্মের প্রভাব, ইসলাম ধর্ম বা আরবদের প্রতি আক্রোশ ইত্যাদির ফলে এদের মধ্যে বিভিন্ন মিথ্যা ও অপপ্রচার ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ইসলামের অনেক শত্রু সামরিক ময়দানে ইসলামের পরাজয় ঘটাতে ব্যর্থ হয়ে মিথ্যা ও অপপ্রচারের মাধ্যমে ইসলামের ধ্বংসের চেষ্টা করতে থাকে। আর সবচেয়ে কঠিন ও স্থায়ী মিথ্যা যে মিথ্যা ওহী বা হাদীসের নামে প্রচারিত হয়। ইসলামের শত্রুরা সে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে।
এ সময় এসকল মানুষ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বংশধরদের মর্যাদা, ক্ষমতা, বিশেষত আলী ইবনু আবী তালিব(রা) এর মর্যাদা, বিশেষ জ্ঞান, বিশেষ ক্ষমতা, অলৌকিকত্ব, তাকে ক্ষমতায় বসানোর প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয়ে ও উসমান ইবনু আফফান(রা) এর নিন্দায় অগণিত কথা বলতে থাকে। এ সব বিষয়ে অধিকাংশ কথা তারা বলতো যুক্তি তর্কের মাধ্যমে। আবার কিছু কথা তারা আকারে ইঙ্গিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামেও বানিয়ে বলতে থাকে। যদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে সরাসরি মিথ্যা বলার দুঃসাহস এ সকল পাপাত্মাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। তখনো অগণিত সাহাবী জীবিত রয়েছেন। মিথ্যা ধরা পড়ার সমূহ সম্ভাবনা। তবে মিথ্যার প্রবণতা গড়ে উঠতে থাকে।
৩য়-৪র্থ হিজরী শতকের অন্যতম ফকীহ, মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনী জারীর তাবারী(৩১০ হি) ৩৫ হিজরীর ঘটনা আলোচনা কালে বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু সাবা ইয়ামানের ইহুদী ছিল। উসমান(রা) এর সময়ে সে ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর বিভিন্ন শহরে ও জনপদে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক কথা প্রচার করতে থাকে। হিজাজ, বসরা, কূফা ও সিরিয়ায় তেমন সুবিধা করতে পারেনি। তখন সে মিশরে গমন করে। সে প্রচার করতে থাকে: অবাক লাগে তার কথা ভাবতে যে ঈসা(আ) পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করবে বলে বিশ্বাস করে, অথচ মুহাম্মাদ(স) পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করবেন বলে বিশ্বাস করেনা। ঈসার পুণরাগমনের কথা সে সত্য বলে মানে, আর মুহাম্মদ(স) এর পুনরাগমনের কথা বলতে তা মিথ্যা বলে মনে করে।…….. হাজারো নবী চলে গিয়েছেন। প্রত্যেক নবী তাঁর উম্মতের একজনকে ওসীয়তের মাধ্যমে দায়িত্ব প্রদান করে গিয়েছেন। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রদত্ত ওহীয়ত ও দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তি আলী ইবনু আবী তালিব। …….. মুহাম্মাদ(স) শেষ নবী এবং আলী শেষ ওসীয়ত প্রাপ্ত দায়িত্বশীল। ……যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওসীয়ত ও দায়িত্ব প্রদানকে মেনে নিলনা, বরং নিজেই ক্ষমতা নিয়ে নিল, তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে।……..[তাবারী, মুহাম্মাদ ইবনু জারীর(৩১০ হি), তারীখুল উমামি ওয়াল মুলুক ২/৬৪৭]।
এখানে আমরা দেখছি যে, আবদুল্লাহ ইবনু সাবা নিজের বিভ্রান্তিগুলিকে যুক্তির আবরণে পেশ করার পাশাপাশি কিছু কথা পরোক্ষভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে বলেছে। আলী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাকে দায়িত্ব প্রদান না করা জুলুম ইত্যাদি কথা সে বলেছে।
আমরা পরবর্তী আলোচনায় দেখবো যে, এই সময় মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে সত্যপরায়ণতার ক্ষেত্রে এই ধরণের দূর্বলতা দেখা দেওয়ায় সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসের নামে মিথ্যা বলা প্রতিরোধের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ ও কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেন।
প্রথম হিজরী শতকের শেষদিকে নিজ নিজ বিভ্রান্ত মত প্রমাণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে বানোয়াট হাদীস তৈরি করার প্রবণতা বাড়তে থাকে। সাহাবীদের নামেও মিথ্যা বলার প্রবণতা বাড়তে থাকে। পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহর সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও বৃদ্ধি পেতে থাকে।
মুখতার ইবনু আবু উবাইদ সাকাফী(১-৬৭ হি) সাহাবীগণের সমসাময়িক একজন তাবিয়ী। ৬০ হিজরীতে কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন(রা) এর শাহাদাতের পরে তিনি ৬৪-৬৫ হিজরীতে মক্কার শাসক আবুদল্লাহ ইবনু যুবাইরের(১- ৭৩ হি)পক্ষ হতে কুফায় গমন করেন। কুফায় তিনি ইমাম হুসাইনের হত্যায় জড়িতদের ধরে হত্যা করতে থাকেন। এরপর তিনি আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইরের আনুগত্য অস্বীকার করে নিজেকে আলীর পুত্র মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যার প্রতিনিধি বলে দাবি করেন। এরপর তিনি নিজেকে ওহীর ইলহামপ্রাপ্ত, রাসূলুল্লাহ(স) এর বিশেষ প্রতিনিধি, খলীফা ইত্যাদি দাবি করতে থাকেন। অবশেষে ৬৭ হিজরীতে আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইরের বাহিনীর কাছে তিনি পরাজিত ও নিহত হন।
তার এ সকল দাবীদাওয়ার সত্যতা প্রমাণের জন্য তিনি একাধিক ব্যক্তিকে তার পক্ষে মিথ্যা হাদীস বানিয়ে বলার জন্য আদেশ, অনুরোধ ও উৎসাহ প্রদান করেন।
আবু আনার হাররানী বলেন, মুখতার ইবনু আবু উবাইদ সাকাফী একজন হাদীস বর্ণনাকারীকে বলেন, আপনি আমার পক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে একটি হাদীস তৈরী করুন, যাতে থাকবে যে, আমি তাঁর পরে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে আগমন করব এবং তাঁর সন্তানের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করব। এজন্য আমি আপনাকে দশহাজার দিরহাম, যানবাহন, ক্রীতদাস ও পোশাক পরিচ্ছদ উপঢৌকন প্রদান করব। ঐ হাদীস বর্ণনাকারী বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে হাদীস বানানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে কোনো একজন সাহাবীর নামে কোনো কথা বানানো যেতে পারে। এজন্য আপনি আপনার উপঢৌকন ইচ্ছামত কম করে দিতে পারেন। মুখতার বলেঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে কিছু হলে তার গুরুত্ব বেশি হবে। ঐ ব্যক্তি বলেনঃ তার শাস্তিও বেশি কঠিন হবে। (ইবনুল জাওযী, আল মাউদূ’আত ১/১৬-১৭)।
মুখতার অনেককেই এভাবে অনুরোধ করে। প্রয়োজনে ভীতি প্রদর্শন বা হত্যা ও করেছেন। সালামাহ ইবনু কাসীর বলেন, ইবনু রাব’য়া খুযায়ী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগ পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, আমি একবার কূফায় গমন করি। আমাকে মুখতার সাকাফীর নিকট নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আমার সাথে একাকী বসে বলেন, জনাব, আপনিতো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগ পেয়েছেন। আপনি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে কোনো কথা বলেন তা মানুষেরা বিশ্বাস করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে একটি হাদীস বলে আমার শক্তি বৃদ্ধি করুন। এই ৭০০ স্বর্ণমুদ্রা আপনার জন্য। আমি বললামঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে মিথ্যা বলার পরিণতি নিশ্চিত জাহান্নাম। আমি তা বলতে পারবোনা। [বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল (২৫৬ হি), আত-তারীখূল কাবীর ৮/৪৩৮; আত-তারীখুস সাবীর ১/১৪৭]।
সাহাবী আম্মার ইবনু ইয়াসীরের(রা) পুত্র মুহাম্মাদ ইবনু আম্মারকেও মুখতার তার পক্ষে তাঁর পিতা আম্মারের সূত্রে হাদীস বানিয়ে প্রচার করতে নির্দেশ দেয়। তিনি অস্বীকার করলে মুখতার তাকে হত্যা করে। [বুখারী, আত-তারীখুস সাগীর ১/১৪৭, আল জারহু ওয়াত তা’দীল ৮/৪৩]।
প্রথম হিজরী শতকের শেষ দিক থেকে প্রখ্যাত সাহাবীগণের নামে মিথ্যা বলার প্রবণতা দেখা দেয়। বিশেষত আলী ইবনু আবু তালিব(রা) এর নামে মিথ্যা বলার প্রবণতা তাঁর কিছু অনুসারীর মধ্যে দেখা দেয়। তিনি আবু বাকর(রা) ও উমার(রা) কে মনে মনে অপছন্দ করতেন বা নিন্দা করতেন, তিনি অলৌকিক সব কাজ করতেন, তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকারের বানোয়াট কথা তারা বলতে শুরু করে।
প্রখ্যাত তাবেয়ী ইবনু আবু মুলাইকা আবদুল্লাহ ইবনু উবাইদুল্লাহ(১১৭ হি) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাসের (৬৮ হি)নিকট পত্র লিখে অনুরোধ করি যে, তিনি যেন আমাকে কিছু নির্বাচিত প্রয়োজনীয় বিষয় লিখে দেন। তখন তিনি বলেঃ আরবী(********)
-বিশ্বস্ত ও কল্যাণকামী যুবক। আমি তার জন্য কিছু বিষয় বিশেষ করে পছন্দ করে লিখব এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয় বাদ দিব। তখন তিনি আলী(রা) এর বিচারের লিখিত পান্ডুলিপি চেয়ে নেন। তিনি তা থেকে কিছু বিষয় লিখেন। আর কিছু কিছু বিষয় পড়ে তিনি বলেনঃ আল্লাহর কসম, আলী এই বিচার কখনোই করতে পারেননা। বিভ্রান্ত না হলে কেউ এই বিচার করতে পারেনা।(মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৩)।
অর্থাৎ আলীর কিছু অতি উৎসাহী ও অতি ভক্ত সহচর তাঁর নামে এমন কিছু মিথ্যা কথা এসব পান্ডুলিপির মধ্যে লিখেছে যা তাঁর মর্যাদাকে ভুলুন্ঠিত করেছে, যদিও তারা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই এগুলো বাড়িয়েছে।
এ বিষয়ে অন্য তাবেয়ী তাঊস ইবনু কাইসার (১০৬ হি) বলেনঃ আরবী(********)
-ইবনু আব্বাস(রা) এর নিকট আলী(রা) এর বিচারের পান্ডুলিপি আনয়ন করা হয়। তিনি এক হাত পরিমাণ বাদে সেই পান্ডুলিপির সব কিছু মুছে ফেলেন। (মুসিলম, আস-সহীহ ১/১৩)।
প্রখ্যাত তাবেয়ী আবু ইসহাক আস সাবীয়ী(১২৯ হি) বলেন, যখন আলী(রা) এর এ সকল অতিভক্ত অনুসারী তাঁর ইন্তেকালের পরে এসকল নতুন বানোয়াট কথার উদ্ভাবন ঘটালো তখন আলী(রা) এর অনুসারীদের মধ্যে এক ব্যক্তি বলেনঃ আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন। কত বড় ইলম এরা নষ্ট করল! (মুসিলম, আস-সহীহ ১/১৩)।
তাবিয়ী মুগীরাহ ইবনু মিকসাম আদ-দাব্বী(১৩৬ হি) বলেনঃ আরবী(******)
-[আলী(রা) এর অনুসারীদের মধ্যে মিথ্যাচার এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে] আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ এর সাহচর্য্ লাভ করেছে এমন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ আলী(রা) হতে হাদীস বর্ণনা করলে তা সঠিক ও নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করা হতোনা। (মুসিলম, আস-সহীহ ১/১৩)।
এভাবে আমরা দেখেছি যে, প্রথম হিজরী শতকের মাঝামাঝি থেকে ক্রমান্বয়ে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন স্বার্থে ও উদ্দেশ্যে হাদীসের নামে মিথ্যা বলার প্রবণতা দেখা দেয। যুগের বিবর্তনের সাথে সাথে এই প্রবণতা বাড়তে থাকে। হিজরী দ্বিতীয় শতক থেকে ক্রমেই মিথ্যাবাদীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং মিথ্যার প্রকার ও পদ্ধতিও বাড়তে থাকে। আমরা পরবর্তী পরিচ্ছেদে মিথ্যাবাদী জালিয়াতদের পরিচয়, শ্রেণীবিভাগ ও জালিয়াতির কারণসমূহ আলোচনা করব। তবে তার আগেই আমরা মিথ্যা প্রতিরোধে মুসলিম উম্মাহর কর্মপন্থা আলোচনা করতে চাই।
সাহাবীগণ ও তাঁদের পরবর্তী যুগগুলোর মুসলিম মনীষীগণ সকল প্রকার মিথ্যা থেকে বিশুদ্ধ হাদীসকে পৃথক রাখতে অত্যন্ত কার্য্কর ও বৈজ্ঞানিক পন্থা অবলম্বন করেছেন। আমরা এখানে তাঁদের কর্মধারা আলোচনা করতে চাই।

১.৩. মিথ্যা প্রতিরোধে সাহাবীগণ

ওহীর জ্ঞানের নির্ভূল ও অবিমিশ্র সংরক্ষণের বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের সামগ্রিক নির্দেশ, ওহীর নামে মিথ্যা বা আন্দাজে কথা বলার ভয়াবহ পরিণতি, হাদীসের নির্ভূল ও অবিমিশ্র সংরক্ষণে রাসূলুল্লাহ(স) এর বিশেষ নির্দেশ ও হাদীসের নামে মিথ্যা বলার নিষেধাজ্ঞার আলোকে সাহাবীগণ হাদীসে রাসূল (স) কে সকল প্রকার অনিচ্ছাকৃত, অজ্ঞতাপ্রসূত বা ইচ্ছাকৃত ভুল, বিকৃতি বা মিথ্যা থেকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তাঁরা একদিকে নিজেরা হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতেন। পরিপূর্ণ ও নির্ভূল মুখস্ত সম্পর্কে পূর্ণ নিশ্চিত না হলে তাঁরা হাদীস বলতেননা। অপরদিকে তাঁরা সবাইকে এভাবে পূর্ণরূপে হুবহু ও নির্ভূলভাবে মুখস্ত করে হাদীস বর্ণনা করতে উৎসাহ ও নির্দেশ প্রদান করতেন। তৃতীয়ত, তাঁরা সাহাবী ও তাবিয়ী যে কোনো হাদীস বর্ণনাকারীর হাদীসের নির্ভূলতা বিষয়ে সামান্যতম দ্বিধা হলে তা বিভিন্ন পদ্ধতিতে নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করার পরে গ্রহণ করতেন।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, তাঁদের যুগে ইচ্ছাকৃত ভুলের কোনো সম্ভাবনা ছিলনা। মানুষের জাগতিক কথাবার্তা ও লেনদেনেও কেউ বলতেননা। সততা ও বিশ্বস্ততাই ছিল তাঁদের বৈশিষ্ট্য। তা সত্ত্বেও অনিচ্ছাকৃত, অজ্ঞতাপ্রসূত বা আসাবধানতাজনিত সামান্যতম ভুল থেকে হাদীসে রাসূল(স) এর রক্ষায় তাঁদের কর্মধারা দেখলে হতবাক হয়ে যেতে হয়।

১.৩.১. অনিচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলা থেকে আত্মরক্ষা
আমরা জানি যে, মিথ্যা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত হতে পারে। অনিচ্ছাকৃত ভুলও মিথ্যা বলে গণ্য। সাহাবীগণ নিজে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত ‘মিথ্যা’ থেকে আত্মরক্ষার জন্য নির্ভূলভাবে ও আক্ষরিকভাবে হাদীস বলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তাঁদের সতর্কতার অগণিত ঘটনা হাদীস গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এখানে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করছি।
তাবিয়ী আমর ইবনু মাইমূন আল আযদী(74 হি) বলেনঃ আরবী(*********)
-আমি প্রতি বৃহস্পতিবার আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ(রা)এর নিকট আগমন করতাম। তিনি তাঁর কথাবার্তার মধ্যে রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন, এ কথাটা কখনো বলতেননা। এক বিকেলে তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন’, এরপর তিনি মাথা নিচু করে ফেলেন। আমি তাঁর দিকে তাঁকিয়ে দেখি তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাঁর জামার বোতামগুলি খোলা। তাঁর চোখ দুটি লাল হয়ে গিয়েছে এবং গলার শিরাগুলি ফুলে উঠেছে। তিনি বললেনঃ অথবা এর কম, অথবা এর বেশি, অথবা এর মত, অথবা এর কাছাকাছি কথা রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন। (ইবনু মাজাহ, আস সুনান 1/10-11, আস-সুনান 1/88, আল মুসতাদরাক ১/194)।
তাবিয়ী মাসরূক ইবনুল আজদা আবু আইশা (৬১ হি) বলেনঃ আরবী(***)
-একদিন আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ(রা) রাসূলুল্লাহ(স) হতে একটি হাদীস বর্ণনা করেন। তখন তিনি কেঁপে উঠেন এমনকি তাঁর পোশাকেও কম্পন পরিলক্ষিত হয়। এরপর তিনি বলেনঃ অথবা অনুরূপ কথা তিনি বলেছেন। (হাকিম, আল মুসতাদরাক 1/193)।
তাবিয়ী মুহাম্মাদ ইবনু সিরীন(১১০ হি) বলেনঃ আরবী(****)
আনাস ইবনু মালিক(রা) যখন হাদীস বলতেন তখন হাদীস বর্ণনা শেষ করে বলতেন: অথবা রাসূলুল্লাহ(স) যা বলেছেন (আমার বর্ণনায় ভুল হতে পারে)। (ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/১১)।
হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সাহাবীগণ জ্ঞাতসারে একটি শব্দেরও পরিবর্তন করতেননা। আক্ষরিকভাবে হুবহু বর্ণনা করতেন তাঁরা। তাবেয়ী সা’দ ইবনু উবাইদাহ সুলামী (১০৩ হি) বলেন: সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু উমর(৭৩ হি) বলেন: রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(******)
-“পাঁচটি বিষয়ের উপর ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে: একমাত্র আল্লাহর ইবাদত বা তাওহীদ, সালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত প্রদান করা, রামাদানের সিয়াম পালন এবং হ্জ্জ।” তখন এক ব্যক্তি বলে: “হজ্জ ও রামাদানের সিয়াম”। তিনি বলেন: “না, রামাদানের সিয়াম ও হজ্জ।” এভাবেই আমি রাসূলুল্লাহ(স) হতে শুনেছি। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/৪৫)।
ইয়াফুর ইবনু রূযী নামক তাবেয়ী বলেনঃ আমি শুনলাম, উবাইদ ইবনু উমাইর (৭২ হি) নামক প্রখ্যাত তাবিয়ী ও মক্কার সুপ্রসিদ্ধ ওয়ায়িয একদিন ওয়াযের মধ্যে বলেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ আরবী(*****)
-“মুনাফিকের উদাহরণ হলো দুইটি ছাগলের পালের মধ্যে অবস্থানরত ছাগীর ন্যায়।” একথা শুনে সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু উমার(৭৩ হি) বলেনঃ আরবী(****)
-দূর্ভোগ তোমাদের! তোমরা রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলবেনা। রাসুলুল্লাহ(স) তো বলেছেন: “মুনাফিকের উদাহরণ হলো দুইটি ছাগলের পালের মধ্যে যাতায়াতরত (wandering, roaming) ছাগীর ন্যায়।” (মুসলিম, আস-সহীহ ১/৪৫)।
হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সতর্কতা ও পরিপূর্ণ নির্ভূলতা নিশ্চিত করার জন্য অধিকাংশ সাহাবী রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকতেন। শুধুমাত্র যে কথাগুলি বা ঘটনাগুলি তাঁরা পরিপূর্ণ নির্ভূলভাবে মুখস্ত রেখেছেন বলে নিশ্চিত থাকতেন সেগুলিই বলতেন। অনেকে কখনোই রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কিছু বলতেননা। সাহাবীগণের সংখ্যা ও হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীগণের সংখ্যার মধ্যে তুলনা করলেই আমরা বিষয়টি বুঝতে পারি। রাসূলুল্লাহ(স) এর কম বেশি সাহচর্য্ লাভ করেছেন এমন সাহাবীর সংখ্যা লক্ষাধিক। নাম পরিচয় সহ প্রসিদ্ধ সাহাবীর সংখ্যা ১০ সহস্রাধিক। অথচ হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর সংখ্যা মাত্র দেড় হাজার।
সাহাবীদের নামের ভিত্তিতে সংকলিত প্রসিদ্ধ সর্ববৃহৎ হাদীসগ্রন্থ মুসনাদ আহমদ। ইমাম আহমদ এতে মোটামুটি গ্রহণ করার মত সকল হাদীস ও যয়ীফ হাদীস সংকলিত করেছেন। এতে ৯০৪ জন সাহাবীর হাদীস সংকলিত হয়েছে। পরিচিত, অপরিচিত, নির্ভরযোগ্য, অনির্ভরযোগ্য সকল হাদীসের বর্ণনাকারী সাহাবীর সংখ্যা একত্রিত করলে ১৫৬৫ হয়।
এখানে আরো লক্ষ্যণীয় যে, হাদীস বর্ণনাকারী সহস্রাধিক সাহাবীর মধ্যে অধিকাংশ সাহাবী মাত্র ১ টি থেকে ২০/৩০ টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ১০০ টির বেশি হাদীস বর্ণনা করেছেন এমন সাহাবীর সংখ্যা মাত্র ৩৮ জন। এঁদের মধ্যে মাত্র ৭ জন সাহাবী থেকে ১০০০ এর বেশি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। বাকী ৩১ জন সাহাবী থেকে ১০০ হতে কয়েকশত হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকার অনেক ঘটনা সাহাবীগণ থেকে বর্ণিত হয়েছে।
সাইদ ইবনু ইয়াযীদ(৯১ হি) একজন সাহাবী ছিলেন। ছোট বয়সে তিনি বিদায় হজ্জে রাসুলুল্লাহ(স) এর সাহচর্য্ লাভ করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি সাহাবীগণের সাহচর্যে জীবন কাটিয়েছেন। তিনি বলেনঃ আরবী(******)
-আমি আবদুর রাহমান ইবনু আউফ(রা), তালহা ইবনু উবাইদুল্লাহ(রা), সাদ ইবনু আবী ওয়াক্কাস(রা) ও মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ(রা) প্রমূখ সাহাবীর সাহচর্যে সময় কাটিয়েছি। তাঁদের কাউকে রাসূলুল্লাহ(স) হতে হাদীস বলতে শুনিনি। তবে শুধুমাত্র তালহা ইবনু উবাইদুল্লাহকে আমি ওহুদ যুদ্ধ সম্পর্কে বলতে শুনেছি। (ইবনু আদী, আল কামিল ফী দুআফাইর রিজাইল ১/৯৩)।
তিনি আরো বলেনঃ “আমি সা’দ ইবনু মালিক(রা) এর সাহচর্যে মদীনা থেকে মক্কা পর্য্ন্ত গিয়েছি। এই দীর্ঘ পথে দীর্ঘ সময়ে তাঁকে রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে একটি হাদীসও বলতে শুনিনি।”
হিজরী প্রথম শতকের প্রখ্যাত তাবিয়ী শা’বী(২০৪ হি) বলেনঃ “আমি আবুদল্লাহ ইবনে উমারের(রা) সাথে একটি বৎসর থেকেছি, অথচ তাঁকে রাসূলুল্লাহ(স) হতে কিছুই বলতে শুনিনি।”
অন্যত্র তিনি বলেনঃ “আমি দুই বৎসর বা দেড় বৎসর আবদুল্লাহ ইবনে উমার(রা) এর কাছে বসেছি। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁকে মাত্র একটি হাদীস বলতে শুনেছি…….।” (বুখারী, আস-সহীহ ৬/২৬৫২; ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ১৩/২৪৩)।
সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর(রা) বলেন, আমি আমার পিতা যুবাইর ইবনুল আওয়াম(রা) কে বললাম, অন্যান্য কোনো কোনো সাহাবী যেমন হাদীস বর্ণনা করেন আপনাকে তদ্রুপ হাদীস বলতে শুনিনা কেন? তিনি বলেনঃ “শুনে রাখ, ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আমি কখনো তাঁর সাহচর্য্ থেকে দূরে যাইনি। কিন্তু আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, আমার নামে (ইচ্ছাকৃতভাবে) যে ব্যক্তি মিথ্যা বলবে তাকে অবশ্যই জাহান্নামে বসবাস করতে হবে।(বুখারী, আস-সহীহ ১/৫২; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/১৪)।
তাহলে যুবাইর ইবনু আওয়াম(৩৬ হি) এর হাদীস না বলার কারণ অজ্ঞতা নয়। তিনি নব্যূয়তের প্রথম কিশোর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এরপর দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর রাসূলুল্লাহ(স) এর সাহচর্যে জীবন কাটিয়েছেন। তাঁর ইন্তিকালের পরে তিনি প্রায় ২৫ বৎসর বেঁচে ছিলেন। অথচ তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৪০ টিরও কম। মুসনাদে আহমদে তাঁর থেকে ৩৬টি হাদীস সংকলিত হয়েছে। ইবনু হাযাম উল্লেখ করেছেন যে, নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য সনদে তাঁর নামে বর্ণিত সকল হাদীসের সংখ্যা মাত্র ৩৮ টি।(ইবনু হাযাম, আসমাউস সাহাবাহ আর-রুওয়াত, পৃ.৯৫)।
আমরা দেখেচি যে, অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে তিনি হাদীস বলা থেকে বিরত ছিলেন। কারণ রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলার শাস্তি জাহান্নাম। আর অনিচ্ছাকৃত ভুল বা শব্দগত পরিবর্তন ও তাঁর নামে মিথ্যা বলা হতে পারে। এজন্য তিনি হাদীস বর্ণনা থেকে অধিকাংশ সময় বিরত থাকতেন।
অন্যান্য সাহাবীও অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে এভাবে হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকতেন। তাবিয়ী আবদুর রহমান ইবনু আবী লাইলা(৮৩ হি) বলেনঃ “আমরা সাহাবী যাইদ ইবনু আরকাম(৬৮ হি) কে বললাম, আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীস বর্ণনা করুন। তিনি বলেনঃ আমরা বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছি এবং বিস্মৃতি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি। রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে হাদীস বলা খুবই কঠিন দায়িত্ব।”
সাহাবী সুহাইব ইবনু সিনান(রা) বলতেনঃ “তোমরা এস, আমি তোমাদেরকে যুদ্ধ বিগ্রহের কাহিনী বর্ণনা করবো। তবে কোনো অবস্থাতেই আমি ‘রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন’ একথা বলবনা। (আনসারুল আশরাফ ১/১৮৩)।
তাবিয়ী হাশিম হুরমুযী বলেন, আনাস ইবনু মালিক(রা) বলতেন, “ আমার ভয় হয় যে আমি অনিচ্ছাকৃত ভুল করে ফেলব। এই ভয় না থাকলে আমি অনেক কিছু তোমাদেরকে বলতাম যা আমি তাঁকে বলতে শুনেছি। কিন্তু তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক আমার নামে মিথ্যা বলবে তাকে জাহান্নামে বসবাস করতেই হবে। (আহমদ, আল মুসনাদ ৩/১৭২)।
এভাবে সাহাবীগণ অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকতেন। এখানে লক্ষণীয় যে, আনাস ইবনু মালিক ও আবু কাতাদাহ দুজনেই বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ(স)‘ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর নামে হাদীস বলার শাস্তি বর্ণনা করেছেন।’ কিন্তু তাঁরা অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে তাঁর নামে হাদীস বর্ণনা পরিহার করেছেন। কারণ ভুল হতে পারে জেনেও সাবধান না হওয়ার অর্থ ‘ইচ্ছাকৃতভাবে অনিচ্ছাকৃত ভুলের সুযোগ দেওয়া।’ অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে সর্বাত্মক সতর্ক না হওয়ার অর্থ ইচ্ছাকৃত বিকৃতিকে প্রশ্রয় দেওয়া। কাজেই যে ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে সতর্ক না হওয়ার কারণে ভুল করল, সে ইচ্ছাকৃতভাবেই রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা বলল। কোনো মুমিন রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীসের বিষয়ে অসতর্ক হতে পারেননা।

১.৩.২. অন্যের বলা হাদীস যাচাই পূর্বক গ্রহণ করা
এভাবে আমরা দেখেছি যে, সাহাবীগণ নিজেরা হাদীস বর্ণনার সময় আক্ষরিকভাবে নির্ভূল বলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন এবং কোনো প্রকারের দ্বিধা বা সন্দেহ হলে হাদীস বলতেননা। হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষায় তাঁদের দ্বিতীয় কর্মধারা ছিল অন্যের হাদীস বর্ণনা করার ক্ষেত্রেও অনুরূপ সতর্কতা অবলম্বন করা। অন্য কোনো সাহাবী বা তাঁদের সমকালীন তাবিয়ীর বর্ণিত হাদীসের আক্ষরিক নির্ভূলতা বা যথার্থতা(Accuracy) সম্বন্ধে সামান্যতম সন্দেহ হলে তাঁরা তা যাচাই না করে গ্রহণ করতেননা।
অর্থাৎ তাঁরা নিজে হাদীস বলার সময় যেমন ‘অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা’ থেকে আত্মরক্ষার সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন, তদ্রুপভাবে অন্যের বর্ণিত হাদীস সঠিক বলে গণ্য করার পূর্বে তাতে কোনো মিথ্যা বা ভুল আছে কিনা তা যাছাই করতেন। এই সূক্ষ্ম যাচাই ও নিরীক্ষাকে তাঁরা হাদীসের বিশুদ্ধতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য আল্লাহ ও তাঁর মহান রাসূলুল্লাহ(স)এর নির্দেশিত অন্যতম দায়িত্ব বলে মনে করতেন। এজন্য এতে কেউ কখনো আপত্তি করেননি বা অসম্মানবোধ করেননি।

১.৩.২.১. নির্ভূলতা নির্ণয়ে তুলনামূলক পরীক্ষা
পূর্বের আলোচনা হতে আমরা জেনেছি যে, মিথ্যা ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত উভয় প্রকারের হতে পারে। উভয় ধরনের মিথ্যা বা ভুল থেকে হাদীসকে রক্ষার জন্য সাহাবায়ে কেরাম কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
তাঁদের যুগে কোনো সাহাবী মিথ্যা বলতেননা এবং নির্ভূলভাবে হাদীস বলার চেষ্টায় কোনো ত্রুটি করতেননা। তবুও তাঁরা হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর কোনো ভুল হতে পারে সন্দেহ হলেই তাঁর বর্ণনাকে তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে তা গ্রহণ করতেন।
তুলনামূলক নিরীক্ষার প্রক্রিয়া ছিল বিভিন্ন ধরনের।
১. বর্ণিত হাদীস অর্থাৎ বাণী, নির্দেশ বা বর্ণনাকে মূল নির্দেশদাতার নিকট পেশ করে তার যথার্থতা ও নির্ভূলতা(Accuracy) নির্ণয় করা।
২. বর্ণিত বাণী, নির্দেশ বা বর্ণনা(হাদীস) কে অন্য কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তির বর্ণনার সাথে মিলিয়ে তার যথার্থতা ও নির্ভূলতা নির্ণয় করা।
৩. বর্ণিত বাণী, নির্দেশ বা বর্ণনা(হাদীস) কে বর্ণনাকারীর বিভিন্ন সময়ের বর্ণনার সাথে মিলিয়ে তার যথার্থতা ও নির্ভূলতা নির্ণয় করা।
৪. বর্ণিত হাদীসটির বিষয়ে বর্ণনাকারীকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে বা শপথ করিয়ে বর্ণনাটির যথার্থতা বা নির্ভূলতা নির্ধারণ করা।
৫. বর্ণিত বাণী, নির্দেশ বা হাদীসটির অর্থ কুরআন ও হাদীসের প্রসিদ্ধ অর্থ ও নির্দেশের সাথে মিলিয়ে দেখা।
এ সকল নিরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা হাদীস বর্ণনাকারী হাদীসটি সঠিকভাবে মুখস্ত রাখতে ও বর্ণনা করতে পেরেছে কিনা যাচাই করতেন।
সাহাবীগণের যুগ থেকে পরবর্তী সকল যুগে হাদীসের বর্ণনার নির্ভূলতা ও বিশুদ্ধতা নির্ধারণে এ সকল পদ্ধতিতে নিরীক্ষাই ছিল মুহাদ্দিসগণের মূল পদ্ধতি। আমরা জানি যে, বিশ্বের সকল দেশের সকল বিচারালয়ে প্রদত্ত সাক্ষ্যের যথার্থতা ও নির্ভূলতা নির্ণয়ের জন্য ও এই পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়। কোনো বর্ণনা বা সাক্ষ্যের বিশুদ্ধতা ও নির্ভূলতা নির্ণয়ের জন্য এটাই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। আমরা এখানে সাহাবীগণের যুগের কিছু উদাহরণ আলোচনা করব।

১.৩.২.২. মূল বক্তব্যদাতাকে প্রশ্ন করা
কোনো সাক্ষ্য বা বর্ণনার সত্যাসত্য যাচাইয়ের সর্বোত্তম উপায় বক্তব্যদাতাকে প্রশ্ন করা। রাসূলুল্লাহ(স) এর জীবদ্দশায় কোনো সাহাবী অন্য কোনো সাহাবীর বর্ণিত হাদীসের নির্ভূলতা বিষয়ে সন্দীহান হলে রাসূলুল্লাহ(স) কে প্রশ্ন করে নির্ভূলতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন। বিভিন্ন হাদীসে এ সংক্রান্ত অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এখানে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করছি।
১. জাবির ইবনু আবদুল্লাহ(রা) বিদায় হজ্জের বর্ণনার মধ্যে বলেনঃ আরবী(*******)
-[(বিদায় হজ্জের পূর্বে রাসূলুল্লাহ(স) আলী(রা) কে ইয়ামেন এর প্রশাসক রূপে প্রেরণ করেন। ফলে) আলী(রা) ইয়ামান থেকে মক্কায় হজ্জে আগমন করেন। তিনি মক্কায় এসে দেখেন যে, ফাতিমা(রা) উমরা পালন করে ‘হালাল’ হয়ে গিয়েছেন। তিনি রঙিন সুগন্ধময় কাপড় পরিধান করেছেন এবং সুরমা ব্যবহার করেছেন। আলী এতে আপত্তি করলে তিনি বলেনঃ আমার আব্বা আমাকে এভাবে করত নির্দেশ দিয়েছেন। আলী বলেনঃ আমি ফাতিমার বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ(স) এর কাছে অভিযোগ করলাম, সে যে রাসূলুল্লাহ(স) এর নির্দেশের কথা বলছে তাও বললাম এবং আমার আপত্তির কথাও বললাম। ….তখন রাসূলুল্লাহ(স) বলেনঃ ‘সে ঠিকই বলেছে, সে সত্যই বলেছে।(মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮৮৬-৮৯২)।
এখানে আমরা দেখতে পাই যে, আলী(রা) ফাতেমার(রা) বর্ণনার যথার্থতা সম্পর্কে সন্দীহান হন। তিনি তাঁর সত্যবাদিতায় সন্দেহ করেননি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ(স) এর বক্তব্য সঠিকভাবে বুঝা ও বর্ণনা করার বিষয়ে তাঁর সন্দেহ হয়। অর্থাৎ তিনি অনিচ্ছাকৃত মিথ্যার বিষয়ে সন্দীহান হন। এজন্য তিনি রাসূলুল্লাহ(স) কে প্রশ্ন করে নির্ভূলতা যাচাই করেন।
২. উবাই ইবনু কা’ব বলেনঃ আরবী(*******)
-একদিন রাসূলুল্লাহ(স) জুমু’আর দিনে খুতবায় দাঁড়িয়ে সূরা তাবারাকা(সূরা আল ফুরকান)পাঠ করেন এবং আমাদেরকে আল্লাহ নেয়ামত ও শান্তি সম্পর্কে ওয়ায করেন। এমতাবস্থায় আবু দারদা বা আবু যার আমার দেহে মৃদু চাপ দিয়ে বলেনঃ এই সূরা কবে নাযিল হলো, আমি তো এখনই প্রথম সূরাটি শুনছি। তখন উবাই তাকে ইশারায় চুপ থাকতে বলেন। সালাত শেষ হলে তিনি(আবু যার বা আবু দারদা) বলেনঃ আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, সূরাটি কখন নাযিল হয়েছে, অথচ আপনি আমাকে কিছুই বললেননা! তখন উবাই বলেনঃ আপনি আজ আপনার সালাতের কোনোই সাওয়াব লাভ করেননি, শুধুমাত্র যে কথাটুকু বলেছেন সেটুকুই আপনার(কারণ খুতবার সময় কথা বললে সালাতের সাওয়াব নষ্ট হয়।) তখন তিনি রাসূলুল্লাহ(স) এর নিকট যেয়ে বিষয়টি বললেনঃ তিনি বলেন ‘উবাই সত্য বলেছে।।’(ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৩৫২-৩৫৩)

৩. আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস(রা) বলেনঃ আরবী(*******)
-আমাকে বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ কোনো ব্যক্তি বসে সালাত আদায় করলে তা অর্ধেক সালাত হবে। তখন আমি তাঁর নিকট গমন করলাম। আমি দেখলাম যে, তিনি বসে সালাত আদায় করছেন। তখন আমি তাঁর মাথার উপর আমার হাত রাখলাম। তিনি বললেনঃ হে আবদুল্লাহ ইবনু আমর, তোমার বিষয় কি? আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে বলা হয়েছে যে, আপনি বলেছেন, কোনো ব্যক্তি বসে সালাত আদায় করলে তা অর্ধ সালাত হবে, আর আপনি বসে সালাত আদায় করছেন। তিনি বললেনঃ হ্যা, (আমি তা বলেছি), তবে আমি তোমাদের মত নই।(মুসলিম, আস-সহীহ ১/৫০৭)।
এভাবে অনেক ঘটনায় আমরা হাদীসে দেখতে পাই যে, কারো বর্ণিত হাদীসের যথার্থতা বা নির্ভূলতার বিষয়ে সন্দেহ হলে সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ(স) কে প্রশ্ন করে যথার্থতা যাচাই করতেন। তাঁরা বর্ণনাকারীর সততার বিষয়ে প্রশ্ন তুলতেননা। মূলত তিনি বক্তব্য সঠিকভাবে বুঝেছেন কিনা এবং নির্ভূলভাবে বর্ণনা করেছেন কিনা তা তাঁরা যাচাই করতেন। এভাবে তাঁরা হাদীসের নামে ‘অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা’ বা ভুলক্রমে বিকৃতি প্রতিরোধ করতেন।
১.৩.২.৩. অন্যদেরকে প্রশ্ন করা
সাক্ষ্য বা বক্তব্যের যথার্থতা নির্ণয়ের জন্য দ্বিতীয় পদ্ধতি বক্তব্যটি অন্য কেউ শুনেছেন কিনা এবং কিভাবে শুনেছেন তা খোঁজ করা। যে কোনো সাক্ষ্য বা বক্তব্যের নির্ভূলতা নির্ণয়ের জন্য তা সর্বজনীন পদ্ধতি। সকল বিচারালয়ে বিচারপতিগণ একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্যের তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমেই রায় প্রদান করে থাকেন। একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্যের মিল বিষয়টির সত্যতা প্রমাণ করে এবং অমিল প্রামাণ্যতা নষ্ট করে।
রাসূলুল্লাহ(স) এর ইন্তিকালের পর সাহাবীগণ এই পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। কোনো সাহাবীর বর্ণিত কোনো হাদীসের যথার্থতা বা নির্ভূলতা বিষয়ে তাঁদের কারো দ্বিধা হলে তাঁরা অনান্যা সাহাবীকে প্রশ্ন করতেন বা বর্ণনাকারীকে সাক্ষী আনতে বলতেন। যখন এক বা একাধিক ব্যক্তি বলতেন যে, তাঁরাও ঐ হাদীসটি রাসূলুল্লাহ(স) এর মুখ থেকে শুনেছেন, তখন তাঁরা হাদীসটি গ্রহণ করতেন। আবু বাকর সিদ্দীক(রা) এই পদ্ধতির শুরু করেন। পরবর্তী খলীফাগণ ও সকল যুগের মুহাদ্দিসগণ তা অনুসরণ করেন। এখানে সাহাবীগণের যুগের কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করছি।
১. সাহাবী কাবীসাহ ইবনু যুআইব (৮৪ হি) বলেনঃ আরবী(*******)
-“এক দাদী আবু বাকর(রা) এর নিকট এসে মৃত পৌত্রের সম্পত্তিতে তার উত্তরাধিকার দাবী করেন। আবু বাকর(রা) তাকে বলেনঃ আল্লাহর কিতাবে আপনার জন্য(দাদীর উত্তরাধিকার বিষয়ে) কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ(স) এর সুন্নাতেও আপনার জন্য কিছু আছে বলে আমি জানিনা। আপনি পরে আসবেন, যেন আমি এ বিষয়ে অন্যদের প্রশ্ন করে জানতে পারি। তিনি এ বিষয়ে মানুষদের প্রশ্ন করেন। তখন সাহাবী মুগীরাহ ইবনু শু’বা(রা) বলেনঃ আমার উপস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ(স) দাদীকে (পরিত্যক্ত সম্পত্তির) এক ষষ্ঠাংশ প্রদান করেন। তখন আবু বাকর(রা) বলেনঃ আপনার সাথে কি অন্য কেউ আছেন? তখন অন্য সাহাবী মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ আনসারী(রা) উঠে দাঁড়ান এবং মুগীরার অনুরূপ কথা বলেন। তখন আবু বাকর সিদ্দীক(রা) দাদীর জন্য ১/৬ অংশ প্রদানের নির্দেশ প্রদান করেন।”[মালিক ইবনু আনাস (১৭৯ হি), আল মুআত্তা ২/৫১৩]।
এখানে আমরা দেখছি যে, আবু বাকর সিদ্দীক(রা)হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতার শিক্ষা দিলেন। মুগীরাহ ইবনে শু’বার একার বর্ণনার উপরই তিনি নির্ভর করতে পারতেন। কারণ তিনি প্রসিদ্ধ সাহাবী এবং কুরাইশ বংশের অত্যন্ত সম্মানিত নেতা ছিলেন। সমাজের যে কোনো পর্যায়ে তাঁর একার সাক্ষ্যই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু তা সত্ত্বেও আবু বাকর(রা) সাবধানতা অবলম্বন করলেন। মুগীরার বিশ্বস্ততা প্রশ্নাতীত হলেও তাঁর স্মৃতি বিশ্বাসভঙ্গ করতে পারে বা তাঁর অনুধাবনে ভুল হতে পারে। এজন্য তিনি দ্বিতীয় আর কেউ হাদীসটি জানেন কিনা প্রশ্ন করেন। দুজনের বিবরণের উপর নির্ভর করে তিনি হাদীসটি গ্রহণ করেন।
এজন্য মুহাদ্দিসগণ আবু বাকর(রা) কে হাদীস সমালোচনার জনক বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লামা হাকিম নাইসাপূরী(৪০৫ হি) তাঁর সম্পর্কে বলেনঃ “তিনিই সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে মিথ্যা হাদীস বর্ণনা প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। (মুহাম্মাদ মুস্তাফা আল-আযামী, মানহাজুন নাকদ ইনদাল মুহাদ্দিসীন, পৃ ১০)।
আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু তাহির ইবনুল কাইসুরানী(৫০৭ হি) সিদ্দীকে আকবারের জীবনী আলোচনাকালে বলেনঃ “তিনিই সর্বপ্রথম হাদীস গ্রহণ করার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করেন।”
২. দ্বিতীয় খলীফা উমার(রা) এ বিষয়ে তাঁর পূর্বসূরী সিদ্দীকে আকবরের অনুসরণ করেছেন। বিভিন্ন ঘটনায় তিনি সাহাবীগণকে বর্ণিত কোনো হাদীসের জন্য দ্বিতীয় কোনো সাহাবীকে সাক্ষী হিসেবে আনয়ন করতে বলতেন। এ জাতীয় কতিপয় ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি।
আবু সাঈদ খুদরী(রা) বলেনঃ আরবী(*******)
-আমি আনসারদের এক মজলিসে বসা ছিলাম। এমতাবস্থায় আবু মূসা আশআরী(রা) সেখানে আগমন করেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি অস্থির বা উৎকন্ঠিত। তিনি বলেনঃ আমি উমার(রা) এর ঘরে প্রবেশের জন্য তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করি। অনুমতি না দেয়ায় আমি ফিরে আসছিলাম। উমার(রা) আমাকে ডেকে বলেনঃ আপনার ফিরে যাওয়ার কারণ কি? আমি বললামঃ আমি তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করি, কিন্তু অনুমতি জানানো হয়নি। আর রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “যদি তোমরা তিনবার অনুমতি প্রার্থনা কর এবং অনুমতি না দেওয়া হয় তাহলে তোমরা ফিরে যাবে।” তখন উমার(রা) বলেনঃ আল্লাহর শপথ, এই বর্ণনার উপর আপনাকে অবশ্যই সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। (আবু মূসা বলেন): আপনাদের মধ্যে কেউ কি এই হাদীসটি রাসূলুল্লাহ(স) হতে শুনেছেন? তখন উবাই ইবনে কা’ব (রা) বলেনঃ আমাদের মধ্যে যার বয়স সবচেয়ে কম সেই আপনার সাথে যাবে। (আবু সাঈদ খুদরী বলেন) আমি উপস্থিতদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়স্ক ছিলাম। আমি আবু মুসার(রা) সাথে যেয়ে উমারকে(রা) বললাম যে, রাসূলুল্লাহ(সা) একথা বলেছেন।(বুখারী, আস-সহীহ ৫/২৩০৫; মুসলিম, আস-সহীহ ৩/১৬৯৪)।
৩. তাবেয়ী উরওয়া ইবনুয যুবাইর(৯৪ হি) বলেনঃ আরবী(*****)
-উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) মানুষদের কাছে জানতে চান, আঘাতের ফলে গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যু হলে তার দিয়াত বা ক্ষতিপূরণ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ(স) কি বিধান দিয়েছেন তা কেউ জানে কিনা? তখন মুগীরাহ ইবনু শু’বা (রা) বলেন: আমি তাঁকে এ বিষয়ে একজন দাস বা দাসী প্রদানের বিধান প্রদান করতে শুনেছি। উমার(রা) বলেন: আপনার সাথে এ বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য কাউকে আনয়ন করুন। তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ বলেন: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, রাসূলুল্লাহ(স) অনুরূপ বিধান দিয়েছেন।(বুখারী, আস-সহীহ ৬/২৫৩১; মুসলিম, আস –সহীহ ৩/১৩১১)।
৪. সাহাবী আমর ইবনু উমাইয়াহ আদ-দামরী(রা) বলেনঃ আরবী(*****)
-তিনি একটি চাদর ক্রয়ের জন্য তা দাম করছিলেন। এমতাবস্থায় উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) তাঁর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। উমার বলেনঃ এটি কি? তিনি বলেনঃ আমি এই চাদরটি ক্রয় করে দান করতে চাই। এরপর তিনি তা ক্রয় করে তাঁর স্ত্রীকে প্রদান করেন এবং বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ(স) কে বলতে শুনেছিঃ ‘তোমরা স্ত্রীগণকে যা প্রদান করবে তাও দান বলে গণ্য হবে।’ তখন উমার বলেন: আপনার সাথে সাক্ষী কে আছে? তখন তিনি আয়েশা(রা) এর নিকট গমন করেন এবং দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়ান। আয়েশা(রা) বলেনঃ কে? তিনি বলেনঃ আমি আমর। আপনি কি শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ তোমরা স্ত্রীগণকে যা প্রদান করবে তাই দান? আয়েশা বলেনঃ হ্যাঁ। [বাইহাকী, আহমদ ইবনুল হুসাইন (৪৫৮ হি)]
৫. ওয়ালীদ ইবনু আবদুর রাহমান আল-জুরাশী নামক তাবিয়ী বলেনঃ আরবী(*********)
“সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু উমার(রা) অন্য সাহাবী আবু হুরায়রা(রা) এর নিকট দিয়ে গমন করছিলেন। সে সময় আবু হুরায়রা(রা) রাসূলুল্লাহ(স) হতে হাদীস বর্ণনা করছিলেন। হাদীস বর্ণনার মধ্যে তিনি বলেনঃ ‘কেউ যদি কারো জানাযার অনুগমন করে এবং সালাতে অংশগ্রহণ করে তবে সে এক কীরাত সাওয়াব অর্জন করবে। আর যদি সে তার দাফনে উপস্থিত থাকে তাহলে সে দুই কীরাত সাওয়াব অর্জন করবে। এক কীরাত ওহুদ পাহাড়ের চেয়েও বড়।’ তখন আবদুল্লাহ ইবনু উমার বলেনঃ আবু হুরাইরা আপনি ভেবে দেখুনতো আপনি রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কি বলছেন। তখন আবু হুরাইরা(রা)তাকে সাথে নিয়ে আয়েশা(রা) এর নিকট গমন করেন এবং তাঁকে বলেনঃ হে উম্মুল মুমিনীন, আমি আপনাকে আল্লাহর নামে কসম করে জিজ্ঞাসা করছি, আপনি কি রাসূলুল্লাহ(স) কে বলতে শুনেছেন যে, ‘কেউ যদি কারো জানাযার অনুগমন করে ও সালাতে অংশগ্রহণ করে তবে সে এক কীরাত সাওয়াব অর্জন করে। আর যদি সে তার দাফনে উপস্থিত থাকে তাহলে দুই কীরাত সাওয়াব অর্জন করবে।’ তিনি বলেনঃ হ্যাঁ, অবশ্যই শুনেছি।”(আহমদ, আল-মুসনাদ ২/২, আল মুসতাদরাক ৩/৫৮৪)।

১.৩.২.৪. বিভিন্ন সময়ের বর্ণনার মধ্যে তুলনা করা
কোনো সাক্ষ্য বা বক্তব্যের নির্ভূলতা নির্ণয়ের জন্য অন্য একটি পদ্ধতি হলো তাকে একই বিষয়ে একাধিক সময়ে প্রশ্ন করা। যদি দ্বিতীয়বারের উত্তর প্রথমবারের সাথে হুবহু মিলে যায় তাহলে তবে তার নির্ভূলতা প্রমাণিত হয়। আর উভয়ের বৈপরীত্য অগ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে। সাহাবীগণ হাদীসের নির্ভূলতা নির্ণয়ে এ পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। একটি উদাহরণ দেখুন।
তাবিয়ী উরওয়া ইবনু যুবাইর বলেনঃ আরবী(******)
-“আমার খালাম্মা আয়েশা(রা) আমাকে বলেনঃ ভাগ্নে, শুনেছি সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস(রা) আমাদের এলাকা দিয়ে হজ্জে গমন করবেন। তমি তাঁর সাথে দেখা কর এবং তার থেকে প্রশ্ন করে শিখ। কারণ তিনি রাসূলুল্লাহ(স) হতে অনেক জ্ঞান অর্জন করেছেন। উরওয়া বলেনঃ আমি তখন তাঁর সাথে সাক্ষাত করি এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করি। তিনি সে সব বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(স) থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি যে সকল কথা বলেন, তার মধ্যে তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেনঃ “নিশ্চয় আল্লাহ মানুষ থেকে জ্ঞান ছিনিয়ে নেবেননা। কিন্তু তিনি জ্ঞানীদের কব্জা করবেন(মৃত্যুর মাধ্যমে তাদের গ্রহণ করবেন), ফলে তাদের সাথে জ্ঞানও উঠে যাবে। মানুষের মধ্যে মূর্খ নেতৃবৃন্দ অবশিষ্ট থাকবে, যারা ইলম ছাড়াই ফতওয়া প্রদান করবে এবং এভাবে নিজেরা বিভ্রান্ত হবে এবং অন্যদেরও বিভ্রান্ত করবে।” উরওয়া বলেনঃ আমি যখন আয়েশাকে(রা) একথা বললাম তখন তিনি তা গ্রহণ করতে আপত্তি করলেন। তিনি বলেন: তিনি কি তোমাকে একথা বলেছেন যে, একথা তিনি রাসূলুল্লাহ(স) হতে শুনেছেন? উরওয়া বলেনঃ পরের বছর আয়েশা(রা) আমাকে বলেন: আবদুল্লাহ ইবনু আমর আগমন করেছেন। তুমি তাঁর সাথে আগমন করে তাঁর সাথে কথাবার্তা বল। কথার ফাঁকে ইলম উঠে যাওয়ার হাদীসটির বিষয়েও কথাও বলবে। উরওয়া বলেনঃ আমি তখন তাঁর সাথে সাক্ষাত করি এবং তাঁকে প্রশ্ন করি। তিনি তখন আগেরবার যেভাবে বলেছিলেন সেভাবেই হাদীসটি বললেন। উরওয়া বলেনঃ আমি যখন আয়েশা(রা)কে বিষয়টি জানালাম তখন তিনি বলেনঃ আমি বুঝতে পারলাম যে, আবদুল্লাহ ইবনু আমর ঠিকই বলেছেন। আমি দেখেছি যে, তিনি একটুও বাড়িয়ে বলেননি বা কমিয়ে বলেননি।(মুসলিম, আস-সহীহ ৪/২০৫৮-২০৫৯)।
এখানেও আমরা হাদীষ গ্রহণের ক্ষেত্রে সাহাবীগণের অকল্পনীয় সাবধানতার নমুনা দেখতে পাই। আয়েশা(রা) আবদুল্লাহ ইবনু আমরের সততা বা সত্যবাদিতায় সন্দেহ করেননি। কিন্তু সৎ ও সত্যবাদী ব্যক্তিরও ভুল হতে পারে। কাজেই বিনা নিরীক্ষায় তাঁরা কিছুই গ্রহণ করতে চাইতেননা। রাসূলুল্লাহ(স) এর নামে কথিত কোনো হাদীস তারা নিরীক্ষার আগেই ভক্তিভরে হৃদয়ে স্থান দিতেননা।
১.৩.২.৫. বর্ণনাকারীকে শপথ করানো
বর্ণনা বা সাক্ষ্যের নির্ভূলতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনে বর্ণনাকারী বা সাক্ষীকে শপথ করানো হয়। সত্যপরায়ণ ও আল্লাহভীরু মানুষ ইচ্ছাকৃত মিথ্যা কথা বলেননা। তবে তাঁর স্মৃতি তাঁকে ধোঁকা দিতে পারে বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের মধ্যে তিনি নিপতিত হতে পারেন। কিন্তু আল্লাহর নামে শপথ করতে হলে তিনি কখনো পরিপূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে কিছু বলবেননা। এজন্য সত্যপরায়ণ ব্যক্তির জন্য শপথ করানো সাক্ষ্য বা বক্তব্যের নির্ভূলতা যাচাইয়ের জন্য কার্য্কর পদ্ধতি। তবে মিথ্যাবাদীর জন্য শপথ যথেষ্ট নয়। তার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশ্ন (cross interrogation) এর মাধ্যমে তার বক্তব্যের যথার্থতা যাচাই করতে হয়।
সাহাবীগণ সকলেই ছিলেন সত্যপরায়ণ অত্যন্ত আল্লাহভীরু মানুষ। তা সত্ত্বেও অনিচ্ছাকৃত ভুলের সম্ভাবনা দূর করার জন্য সাহাবীগণ কখনো হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীকে শপথ করাতেন। আলী(রা) বলেনঃ আরবী(*****)
-আমি এমন একজন মানুষ ছিলাম যে, রাসূলুল্লাহ(স)থেকে কোনো কথা নিজে শুনলে আল্লাহ আমাকে তা থেকে তাঁর মর্জিমত উপকৃত হতে তাওফীক প্রদান করতেন। আর যদি তাঁর কোনো সাহাবী আমাকে কোনো হাদীস শুনাতেন তবে আমি তাকে শপথ করাতাম। তিনি শপথ করলে আমি তার বর্ণিত হাদীস সত্য বলে গ্রহণ করতাম।(তিরমিযী, আস-সুনান ১/৪৪৬)।
১.৩.২.৬. অর্থ ও তথ্যগত নিরীক্ষা
‘ওহী’র জ্ঞান মানবীয় জ্ঞানের অতিরিক্ত, কিন্তু কখনোই মানবীয় জ্ঞানের বিপরীত বা বিরুদ্ধ নয়। অনুরূপভাবে হাদীসের মাধ্যমে প্রাপ্ত ‘ওহী’ কুরআনের মাধ্যমে প্রাপ্ত ‘ওহী’র ব্যাখ্যা, সম্পূরণ বা অতিরিক্ত সংযোজন হতে পারে, কিন্তু কখনোই তা কুরআনের বিপরীত বা বিরুদ্ধ হতে পারেনা।
সাহাবীগণের কর্মপদ্ধতি থেকে আমরা দেখতে পাই যে, তাঁরা এই মূলনীতির ভিত্তিতে বর্ণিত হাদীসের অর্থগত নিরীক্ষা করতেন। আমরা দেখেছি যে, সাধারণভাবে তাঁরা কুরআনের অতিরিক্ত ও সম্পূরক অর্থের জন্যেই হাদীসের সন্ধান করতেন। কুরআন কারীমে যে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই তা হাদীসে আছে কিনা তা জানতে চাইতেন। পাশাপাশি তাঁরা প্রদত্ত তথ্যের অর্থগত নিরীক্ষা করতেন। তাঁদের অর্থ নিরীক্ষা পদ্ধতি ছিল নিম্নরূপঃ
(১) হাদীসের ক্ষেত্রে প্র্রথম বিবেচ্য বিষয় হলো, তা রাসূলুল্লাহ(স) এ কথা বলে প্রমাণিত কিনা। যদি বর্ণনাকারীর বর্ণনা, শপথ বা অন্যান্য সাক্ষ্যের মাধ্যমে নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হয় যে, কথাটি রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন, তবে সেক্ষেত্রে তাঁদের নীতি ছিল তাকে কুরআনের সম্পূরক নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করা এবং তারই আলোকে কুরআনের ব্যাখ্যা করা। ইতোপূর্বে দাদীর উত্তরাধিকার ও গৃহে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা বিষয়ে আমরা তা দেখতে পেয়েছি। দাদীর বিষয়ে কুরআনে কিছু বলা হয়নি। এক্ষেত্রে হাদীসের বিবরণটি অতিরিক্ত সংযোজন। অনুমতি প্রার্থনার ক্ষেত্রে কুরআনে বলা হয়েছে যে, অনুমতি চাওয়ার পরে “যদি তোমাদেরকে বলা হয় যে, ‘তোমরা ফিরে যাও’ তবে তোমরা ফিরে যাবে।”(সূরা নূরঃ২৮)।
এক্ষেত্রে হাদীসের নির্দেশনাটি বাহ্যত এই কুরআনী নির্দেশনার ‘বিরুদ্ধ’। কারণ তা কুরআনী নির্দেশনাকে আংশিক পরিবর্তন করে বলছে যে, তিন বার অনুমতি প্রার্থনার পরে ‘তোমরা ফিরে যাও’ বলা না হলেও ফিরে যেতে হবে।
সাহাবীগণ উভয় হাদীসকে কুরআনের ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
(২) কোনো কথা রাসূলুল্লাহ(স) বলেননি বলে প্রমাণিত হলে বা গভীর সন্দেহ হলে, কোনোরূপ অর্থ বিবেচনা না করেই তা প্রত্যাখ্যান করতেন। আমরা দেখেছি যে, বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততায় ও নির্ভরযোগ্যতায় সন্দেহ হলে তাঁরা কোনোরূপ অর্থ বিবেচনা ছাড়াই সেই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করতেন।
(৩) কখনো কখনো দেখা গিয়েছে যে, বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততার কারণে বর্ণিত হাদীস বাহ্যত গ্রহণযোগ্য। তবে বর্ণনাকারীর অনিচ্ছাকৃত ভুলের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে তাঁরা সেই হাদীসের অর্থ কুরআনে কারীম ও তাঁদের জানা হাদীসের আলোকে পর্যালোচনা করেছেন এবং হাদীসটির অর্থ কুরআনে কারীম ও প্রসিদ্ধ সুন্নাতের সুস্পষ্ট বিপরীত হলে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এইরূপ অর্থ বিচার ও নিরীক্ষার কয়েকটি উদাহরণ দেখুনঃ
১. আবু আসসান আল আরাজ নামক তাবিয়ী বলেনঃ আরবী(****)
-দুই ব্যক্তি আয়েশা(রা) এর নিকট গমন করে বলেনঃ আবু হুরাইরা(রা) বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন: নারী, পশু বা বাহন ও বাড়ি ঘরের মধ্যে অযাত্রা ও অশুভত্ব আছে। একথা শুনে আয়েশা(রা) এত বেশি রাগাণ্বিত হন যে, মনে হলো তাঁর দেহ ক্রোধে ছিন্নভিন্ন হয়ে আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি বলেনঃ যিনি কুরআন নাযিল করেছেন তাঁর কসম, তিনি এভাবে বলতেননা। রাসূলুল্লাহ(স)বলতেনঃ “জাহিলিয়্যাতের যুগের মানুষেরা বলতঃ নারী, বাড়ি ও পশু বা বাহনে অশুভত্ব আছে।” এরপর আয়েশা(রা) কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করেনঃ (সূরা আল হাদীসঃ ২২)।“পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপর্য্য় আসে আমি তা সংঘটিত করার পূর্বেই তা লিপিবদ্ধ থাকে।” (আহমদ, আল মুসনাদ ৬/১৫০, ২৪৬)।
এখানে আয়েশা(রা) আবু হুরাইরা(রা) এর বর্ণনা গ্রহণ করেননি। তিনি রাসূলুল্লাহ(স) হতে যা শুনেছেন এবং কুরআনের যে আয়াত পাঠ করেছেন তার আলোকে এই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
২. উমরাহ বিনতে আবদুর রাহমান বলেনঃ আরবী(*******)
-‘আয়েশা(রা) এর নিকট উল্লেখ করা হয় যে, আবদুল্লাহ ইবনু উমার(রা) রাসূলুল্লাহ(স) হতে বর্ণনা করেছেন যে, ‘জীবিতের ক্রন্দনে মৃতব্যক্তি শাস্তি পায়।’ তখন আয়েশা(রা) বলেনঃ আল্লাহ ইবনু উমারকে ক্ষমা করুন। তিনি মিথ্যা বলেননি। তবে তিনি বিস্মৃত হয়েছেন বা ভুল করেছেন(দ্বিতীয় বর্ণনায়ঃ শুনতে অনেক সময় ভুল হয়)। প্রকৃত কথা হলো, রাসূলুল্লাহ(স) এক ইহুদী মহিলার(কবরের) নিকট দিয়ে গমন করেন, যার জন্য তার পরিজনেরা ক্রন্দন করছিল। তিনি তখন বলেনঃ‘এরা তার জন্য ক্রন্দন করছে এবং সে তার কবরে শাস্তি পাচ্ছে।’ আল্লাহ বলেছেনঃ (সূরা আল আনআমঃ ১৬৪, সূরা ফাতির ১৮)। ‘এক আত্মা অন্য আত্মার পাপের বোঝা বহন করবেনা।’’’(মুসলিম, আস-সহীহ ২/৬৪০-৬৪৩)।
৩. ফাতিমা বিনতে কাইস(রা) নামক একজন মহিলা সাহাবী বলেন, তাঁর স্বামী তাঁকে তিন তালাক প্রদান করেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ(স) বলেন যে, তিনি(ঐ মহিলা) ইদ্দতকালীন আবাসন ও ভরণপোষণের খরচ পাবেননা। তাঁর এই কথা শুনে খলীফা উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) বলেনঃ আমরা আল্লাহর গ্রন্থ ও রাসূলে কারীম(স) এর সুন্নাত একজন মহিলার কথায় ছেড়ে দিতে পারিনা। কারণ আমরা বুঝতে পারছিনা যে, তিনি বিষয়টি মুখস্ত রেখেছেন না ভুলে গিয়েছেন। তিন তালাক প্রাপ্তা মহিলাও ইদ্দতকালীন আবাসন ও খোরপোশ পাবেন। মহিমাময় পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেছেনঃ(সূরা আত তালাকঃ১) তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বহিষ্কার করোনা এবং তারাও যেন বের না হয়, যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়।”(মুসলিম, আস-সহীহ ২/১১১৮, আস-সুনান ২/২৯৭)।

১.৩.৩. ইচ্ছাকৃত মিথ্যার সম্ভাবনা রোধ করা
সাহাবীগণের যুগের প্রথম দিকে সাহাবীগণই হাদীস বর্ণনা করতেন। এক সাহাবী অন্য সাহাবীকে অথবা পরবর্তী প্রজন্ম তাবিয়ীগণকে হাদীস শুনাতেন ও শিক্ষা দিতেন। রাসূলুল্লাহ(স) এর ইন্তেকালের ২০/২৫ বছরের মধ্যে একদিকে যেমন অনেক সাহাবী ইন্তেকাল করেন, তেমনি অনেক সাহাবী হাদীস বর্ণনা ও শিক্ষাদান শুরু করেন। আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি যে, এ সময় থেকে কোনো কোনো নও মুসলিম তাবেয়ীর মধ্যে ইচ্ছাকৃত মিথ্যার প্রবণতা দেখা দেয়। তখন সাহাবীগণ হাদীস গ্রহণের বিষয়ে আরো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে থাকেন।
এক সাহাবী অন্য সাহাবী হতে হাদীস বর্ণনা করলে শ্রোতা বা শিক্ষার্থী সাহাবী বর্ণনাকারীর ব্যক্তিগত সততা ও সত্যপরায়ণতায় কোনোরূপ সন্দেহ করতেননা বা তিনি নিজ কর্ণে হাদীসটি রাসূলুল্লাহ(স) হতে শুনেছেন বা অন্য কেউ তাকে বলেছেন সে বিষয়েও প্রশ্ন করতেননা। রাসূলুল্লাহ(স) এর সাহচর্য্ প্রাপ্ত সকল মানুষই ছিলেন তাঁরই আলোয় আলোকিত মহান মানুষ ও সত্যবাদিতায় আপোষহীন। তবে বিস্মৃতি, অনিচ্ছাকৃত ভুল বা হৃদয়ঙ্গমের অপূর্ণতা জনিত ভুল হতে পারে বিধায় উপরোক্ত বিভিন্ন পদ্ধতিতে তাঁরা বর্ণিত হাদীসের নির্ভূলতা যাচাই করতেন।
তাবিয়ী বর্ণনাকারীদের হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁরা উপরোক্ত নিরীক্ষার পাশাপাশি দুইটি অতিরিক্ত বিষয় যোগ করেন। প্রথমত, তাঁরা বর্ণনাকারীর ব্যক্তিগত সত্যপরায়ণতা ও বিশ্বস্ততার বিষয়ে অনুসন্ধান করতেন এবং দ্বিতীয়ত, তাঁরা বর্ণনাকারী কার নিকট হতে হাদীসটি শুনেছেন তা(Reference)জানতে চাইতেন।
তৃতীয় খলীফায়ে রাশেদ হযরত ওসমানের(রা)খেলাফত যুগে(২৩-৩৫ হি) মদীনার কেন্দ্র হতে দূরে অবস্থিত নও-মুসলিমদের মাঝে বিভ্রান্তিকর প্রচারণার কারণে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভ্রান্তি ও হানাহানি ঘটে এবং নও-মুসলিমদের মধ্যে সত্যপরায়ণতার কমতি দেখা দেয়। তখন হতেই সাহাবীগণ উপরোক্ত দুইটি পদ্ধতি গ্রহণ করেন। প্রথম হিজরী শতকের প্রখ্যাত তাবিয়ী মুহাম্মাদ ইবনু সিরীন(১১০ হি) বলেনঃ “তাঁরা(সাহাবীগণ) সনদ বা তথ্যসূত্র সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করতেননা। যখন(উসমানের খেলাফতের শেষ দিকে,৩০-৩৫ হি) ফিতনা-ফাসাদ ঘটে গেল তখন তাঁরা বললেনঃ তোমাদেরকে যারা হাদীস বলেছেন তাঁদের নাম উল্লেখ কর। কারণ দেখতে হবে, তারা যদি আহলুস সুন্নাত বা সুন্নাত পন্থীগণের অন্তর্ভূক্ত হন তাহলে তাদের হাদীস গ্রহণ করা হবে। আর তারা যদি আহলুল বিদ‘আত বা বিদ‘আত পন্থী গণের অন্তর্ভূক্ত হন তাহলে তাদের হাদীস গ্রহণ করা হবেনা। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৫)।
প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস(রা) (৬৮ হি) বলেনঃ “আমরা তো হাদীস মুখস্ত করতাম এবং রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীস (যে কোনো বর্ণনাকারী হতে) মুখস্ত করা হতো। কিন্তু তোমরা যেহেতু খানা খন্দক ও ভাল মন্দ সব পথেই চলে গেলে সেহেতু এখন(বর্ণনাকারীর বিচার নিরীক্ষা ছাড়া) কোনো কিছু গ্রহণ করার সম্ভাবনা সুদূর পরাহত।
তাবিয়ী মুজাহিদ (১০৪ হি) বলেনঃ “বাশীর ইবনু কা’ব আল-আদাবী নামক একজন প্রাচীন তাবিয়ী আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাসের(রা) নিকট আগমন করেন এবং হাদীস বলতে শুরু করেন। তিনি বলতে থাকেনঃ রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন। কিন্তু ইবনু আব্বাস তার দিকে কর্ণপাত ও দৃষ্টিপাত করলেননা। তখন বাশীর বলেনঃ হে ইবনু আববাস, আমার কি হলো! আপনি আমার হাদীস শুনেছেন কি? আমি আপনাকে রাসূলুল্লাহ(স) এর হাদীস বর্ণনা করছি অথচ আপনি কর্ণপাত করছেননা। তখন ইবনু আব্বাস(রা) বলেনঃ একসময় ছিল যখন আমরা কাউকে বলতে শুনতাম ‘রাসূলুল্লাহ(স) বলেছেন’ তখনই আমাদের দৃষ্টিগুলি তার প্রতি আবদ্ধ হয়ে যেত এবং আমরা পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তার প্রতি কর্ণপাত করতাম। কিন্তু যখন মানুষ খানাখন্দক ভাল মন্দ সব পথেই চলে গেল তখন থেকে আমরা আর মানুষদের থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করিনা, শুধুমাত্র সুপরিচিত ও পরিজ্ঞাত বিষয় ব্যতিরেকে। (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১৩)।

১.৩.৪. হাদীস বর্ণনা ও গ্রহণে সতর্কতার নির্দেশ
এভাবে সাহাবীগণ হাদীস বর্ণনা ও গ্রহণে চূড়ান্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। পাশাপাশি তাঁরা অন্য সবাইকে এমন সতর্কতা অবলম্বন করতে উৎসাহ ও নির্দেশ প্রদান করতেন। এক্ষেত্রে কোনোরূপ অবহেলা বা ঢিলেমি তাঁরা সহ্য করতেননা। তাঁরা বিনা যাচাইয়ে হাদীস গ্রহণ করতে নিষেধ করতেন। অনেক সময় কারো হাদীস বর্ণনায় অনিচ্ছাকৃত ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বা শ্রোতাদের মধ্যে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তাঁকে হাদীস বলতে নিষেধ করতেন। এখানে কয়েকটি নমুনা উল্লেখ করছি।
১. আবু উসমান আন-নাহদী বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব(রা) বলেনঃ ‘‘একজন মানুষের মিথ্যা বলার জন্য এই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে সবই বর্ণনা করবে।’’ (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১১)।
২. আবুল আহওয়াস বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ(রা) বলেনঃ ‘‘একজন মানুষের মিথ্যা বলার জন্য এই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে সবই বর্ণনা করবে।’’ (মুসলিম, আস-সহীহ ১/১১)।
৩. সাহাবী আবদুর রাহমান ইবনু আউফ(রা) এর পুত্র মদীনার প্রখ্যাত আলিম, ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইবরাহীম ইবনু আবদুর রাহমান(৯৫ হি) বলেনঃ “উমার ইবনুল খাত্তাব(রা), আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ(রা), আবু দারদা(রা), আবু মাসঊদ(রা) কে ডেকে পাঠান। তিনি তাঁদেরকে বলেনঃ আপনারা রাসূলুল্লাহ(স) থেকে এত বেশি হাদীস বলছেন কেন? এরপর তিনি তাঁদেরকে মদীনাতেই অবস্থানের নির্দেশ দেন। তাঁর শাহাদাত পর্য্ন্ত তাঁরা মদীনাতেই ছিলেন।(তাবারানী, আল-মুজা’মুল আউসাত ৪/৮৬, নং ৩৪৪৯)।
এই তিনজন সাহাবী হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। উমার ইবনে খাত্তাব(রা) তাঁদের নির্ভূল হাদীস বলার ক্ষমতা বা যোগ্যতার বিষয়ে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ করেননি। কিন্তু বেশি হাদীস বললে কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে পারে। বিশেষত, কূফা বা সিরিয়ার মত প্রত্যন্ত এলাকায় যেখানে ইসলামী বিজয়ের সেই প্রথম দিনগুলিতে অধিকাংশ নও মুসলিম অনারব বসবাস করতেন, তাদের মধ্যে বেশি হাদীস বর্ণনা করলে অনেক শ্রোতা তা সঠিক ভাবে হৃদয়ঙ্গম ও মুখস্ত করতে পারবেননা বলে আশঙ্কা থাকে। এজন্য হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য উমার ইবনুল খাত্তাব তাঁদেরকে মদীনায় অবস্থানের নির্দেশ প্রদান করেন।
অন্য ঘটনায় আমরা দেখতে পাই যে, উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) নিজে কুরআন ও হাদীসের কিছু বিষয় হজ্জ মওসূমে মক্কায় জনসম্মুখে আলোচনা করতে চান। কিন্তু সাহাবী আবদুর রাহমান ইবনু আউফ(রা) তাঁকে বলেন যে, মক্কায় উপস্থিত অগণিত অনারব ও নও মুসলিম হজ্জ পালনকারী হয়ত আপনার কথা ঠিকমত বুঝতে পারবেননা। এতে ভুল বুঝা ও অপব্যাখ্যার সুযোগ এসে যাবে। কাজেই আপনি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করার পর বিষয়গুলি আলোচনা করবেন। উমার(রা) এই পরামর্শ অনুসারে মক্কায় বিষয়গুলি আলোচনার সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করেন।(বুখারী, আস-সহীহ ৬/২৫০৩-২৫০৪)।

Page 3 of 26
Prev1234...26Next

© Bangladesh Jamaat-e-Islami

  • আমাদের সম্পর্কে
  • প্রাইভেসি পলিসি
  • যোগাযোগ
কোন ফলাফল নেই
সকল ফলাফল দেখুন
  • নীড়
  • সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
  • বিভাগ ভিত্তিক
    • আল কুরআন
    • আল হাদিস
    • ফিকাহ
    • দাওয়াত ও তাবলিগ
    • ঈমান ও আক্বীদাহ
    • আমল-আখলাক ও মুয়ামালাত
    • ইসলাম ও ইবাদাত
    • পারিবারিক ও সামাজিক জীবন
    • ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন
    • সীরাত ও ইতিহাস
    • সীরাতে সাহাবা
    • নারী
    • রাজনীতি
    • অর্থনীতি
    • বিবিধ
  • কর্মী সিলেবাস
  • রুকন সিলেবাস
    • রুকন সিলেবাস (স্বল্প শিক্ষিত)
    • রুকন সিলেবাস (শিক্ষিত)
  • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (শিক্ষিত)
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (স্বল্প শিক্ষিত)
  • উচ্চতর অধ্যয়ন
  • অডিও বই
  • অন্যান্য
    • দারসুল কুরআন
    • দারসুল হাদিস
    • আলোচনা নোট
    • বইনোট
    • প্রবন্ধ
    • বুলেটিন
    • স্মারক
    • ম্যাগাজিন
    • এপস
    • রিপোর্ট বই
    • ছাত্রী সিলেবাস

@BJI Dhaka City South